বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন প্রবাদ প্রতিম সেনাবাহিনী প্রধান (১৯৮৬-১৯৯০) লেফটেন্ট্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ আতিকুর রহমান, গত ২০ ডিসেম্বর ২০২৩ তারিখে মৃত্যুবরণ করেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে একটি সুশৃংখল, সুপ্রশিক্ষিত ও পেশাদার শক্তিশালী বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে যে জেনারেলগণ অনবদ্য অবদান রেখেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন জেনারেল আতিক। জেনারেল আতিকের সৈনিকসুলভ নেতৃত্বগুণ, দৃঢ়তা, সততা, নিষ্ঠা, ন্যায়পরায়নতা, আপোষহীনতা, স্বজনপ্রীতিহীন মনোভাব ও সর্বোপরি পেশাদারিত্ব তাঁকে কালজয়ী একজন সেনানায়কের মর্যাদা দিয়েছে।
জেনারেল আতিকের মৃত্যুর পর তাঁর পরিচিত মানুষের মাঝে বিশেষত অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের কমিউনিটিতে শোকের ছায়া নেমেছে। তাঁকে শ্রদ্ধা-স্মরনে ভাসছিল সোসাল মিডিয়ার টাইম লাইন। অত্যন্ত কৃতিত্বপূর্ণ ও বর্নাঢ্য জীবনের অধিকারী জেনারেল আতিক ছিলেন একজন ভালো মানুষ।
প্রিয়জন, সামরিক কর্মকর্তা ও শুভ্যানুধায়ীগন সেনাধ্যক্ষ জেনারেল আতিককে নানা অভিধায় অভিসিক্ত করেছেনঃ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এক দিকপালের প্রস্থান, কালজয়ী সেনাপ্রধান, পেশাদার সেনাপ্রধান, কিংবদন্তি সেনাপ্রধান, প্রবাদ প্রতিম সেনাপ্রধান, সফল সেনাপ্রধানের গল্প….। ইংরেজীতে কেউ কেউ লিখেছেনঃ এ গ্রেট চীফ, রোল মডেল, এ চীফ উইন অনার এন্ড ডিগনিটি, লিভিং লিজেন্ড, এ ট্রু সোলজার। ফেসবুকের কল্যানে এই নিবেদিত প্রান- সৈনিকের যাপিত জীবনের কর্মময় প্রায় পূর্নাঙ্গ অবয়ব প্রস্ফুটিত হয়েছে। এই লেখাটি জেঃ আতিকের উপর নির্মোহ কোন মূল্যায়ণ বা বিশ্লেষন নয়। স্মৃতিপটে ভেসে আসা জেঃ আতিকের উপর আলোচিত কিছু ঘটনা, বিষয়ের চিত্রাংঙ্কনমূলক নিবেদন।
তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও সেনাবাহিনী প্রধান বিএ-৫০ লেঃ জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, এনডিসি, পিএসসি ১৯৮৬ সালে ৩০ আগষ্ট সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন। এর পর, ১৯৮৬ সালের ৩১ আগষ্ট তারিখে বিএ-৫৯ লেফটেনেন্ট জেনারেল আতিকুর রহমান জি+ কে চতুর্থ সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা হয়। দীর্ঘ চার বছর সেনাবাহিনীকে অত্যন্ত সফলতার সাথে কমান্ড বা পরিচালনা করে এই দিকপাল ফৌজি ১৯৯০ সালের ৩০ আগষ্ট তারিখে বিএ-১১৮ লেঃ জেনারেল মোহাম্মদ নুরউদ্দীন খান, পিএসসি এর নিকট দায়িত্ব হস্তান্তর করে অবসরে গমন করেন।
প্রজন্মের বিচিত্র যত অভিজ্ঞতা।
প্রত্যেক প্রজন্মের থাকে স্বকীয়তা, নিজ নিজ অভিজ্ঞতা। জেঃ আতিকের প্রজন্মের অভিজ্ঞতা বেশ বিচিত্র। তিনি ব্রিটিশ ভারতের পরিমন্ডলে জন্মে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে বড় হয়েছেন। শৈশবে দেখেছেন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ঘটনাবলী, দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা, দেশ বিভাগ। পাকিস্তানের শুরুর দিনগুলোতে নতুন আত্মপরিচয়ের উত্তেজনা। কিন্তু মোহমুক্তি হতে বিলম্ব হলো না। দেখলেন নিদারুন বঞ্চনাও বৈষম্য। এরপর দেখলেন ষড়যন্ত্র, আন্দোলন, যুদ্ধ। তারপর এলো মহান ৭১ এর সংগ্রাম। বাংলাদেশের অভ্যুদয়। ইতিহাসের এতো পট পরিবর্তন খুব কম প্রজন্মই দেখেছে। পরবর্তীতে এইসব অভিজ্ঞতা জেনারেল আতিককে সংগ্রামী, রেজিলিয়েন্ট, ধৈর্যশীল, পরিপক্ক ও ভারসাম্যমূলক ব্যক্তিত্বে পরিনত করে।
পাহাড়ে সেনাপ্রধান-সংবাদ
১৯৮৬ সালের ০১ সেপ্টেম্বর। রাঙ্গামাটির পূর্ব দিকে কাপ্তাই হ্রদের পাড়ে অবস্থিত রাজমনি পাড়া ক্যাম্পে বিকেলে একটা স্পিড বোট (ট্রাইসার্ক বোট) এসে থামলো। বোট থেকে নামলেন ২৫ ইস্ট বেংগল এর অধিনায়ক লে: কর্নেল মুহাম্মদ ফারুক খান (বর্তমানে সংসদ সদস্য, মন্ত্রী)। অধিনায়ককে সঙ্গে নিয়ে মেজর নেসারউদ্দিন আহমেদ ও আমি পেট্রল-সহ পূর্ব দিকে কান্দি ক্যাম্পের দিকে এগিয়ে যাই। নতুন সেনাপ্রধান হিসেবে জেনারেল আতিকের দায়িত্ব গ্রহণের কথা অধিনায়ক আমাদের জানালেন। হ্রদের জলসীমা থেকে আমরা ধীরে ধীরে উচু পাহাড়ের পথে চলছি। আমাদের উত্তরে রয়েছে বিশাল উচ্চতার বসন্ত পাহাড়। সেনাপ্রধান হিসেবে জেনারেল আতিকের চ্যালেঞ্জগুলো বসন্ত পাহাড়ের মতোই ছিল। তবে তিনি শান্ত, অথচ বলিষ্ঠভাবে, অবিচলিত নেতৃত্বের পথে এগিয়ে যান ও সফল হন।
জন্ম, শৈশব ও শিক্ষা জীবন
জেনারেল আতিক ১৯৩১ সালের ০১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন বৃটিশ-ভারতের (বর্তমান ইন্ডিয়া) মুর্শিদাবাদ জেলার ‘‘খারেরা’’ গ্রামে সম্ভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আবদুর রহমান সাবেক বৃটিশ-ভারত ও পরবর্তীতে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ছিলেন। তার মায়ের নাম আফজালা খাতুন। তাঁরা ছিলেন ৬ ভাই, ৪ বোন। নয়াদিল্লির ‘দি ইউনিয়ন একাডেমি’তে তিনি একাদশ শ্রেনি পর্যন্ত পড়াশুণা করাকালীন ১৯৪৭ সালে পাক-ভারত বিভক্তির সময় তাঁর পিতার কর্মস্থল রাওয়ালপিন্ডিতে চলে যান। সেখানে ‘দি গর্ডন কলেজ’-এ (আমেরিকান মিশনারি কলেজ) ভর্তি হন এবং সেখান থেকে বিএসসি পাশ করেন। উল্লেখ্য গ্রীস্মকালের ‘দি ইউনিয়ন একাডেমির’কার্যক্রম শীতের ছয়মাস দিল্লিতে এবং গ্রীষ্মের ছয়মাস সিমলাতে পরিচালিত হতো।
মুর্শিদাবাদের খারেরা গ্রামঃ জন্ম স্থানের স্মৃতি বিস্তৃতি
১৯৮১ সালের কথা। মেজর জেনারেল আতিক তখন বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) এর মহাপরিচালক। ব্রাহ্মনবাড়িয়ার কসবা এলাকায় বিওপি পরিদর্শনে এসেছেন তিনি। স্থানীয় বিডিআর ব্যাটালিয়ান কমান্ডার মেজর শেখ দলিল উদ্দিন আহমেদ তাকে নৌকায় সীমান্তের একটি বিওপির দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। সালদা নদী দিয়ে চলছে ছোট্ট নৌকা। ১৯৭১ সালে এটি ছিল ২নং সেক্টরের আলোচিত রনাঙ্গন। কুষ্টিয়ার একসময়ের তুখোড় ছাত্র নেতা-মুক্তিযোদ্ধা, মেজর দলিল মহাপরিচালককে ‘খাড়েরা বিওপি’র’ কথা বলেন-যা তাঁদের গন্তব্য। ‘খাড়েরা’ বিওপি’র কথা শুনে জেনারেল আতিক বললেন — “দলিল, আমার জন্মস্থান কিন্তু ভারতের মুর্শিদাবাদের ‘‘খারেরা’’ গ্রামে। এরপর কিছুক্ষন নীরব থাকেন মহাপরিচালক। সম্ভবত তাঁর জন্মস্থানের কথা ভাবছিলেন। যেখানে ১৯৪৭ সালের পরে আর যাওয়া হয়নি। পরেও কোনদিন আর তাঁর সেখানে যাওয়া হবে না।
সিমলা পাহাড়ের দিনগুলি
কিশোর বয়সে সিমলার সোনালি দিনের স্মৃতি জেঃ আতিককে পেছনে ফিরে টানবে। আশ্চর্য ছিল সেই সময়। বিগত ১০০ বছর ধরে বছরে ৫ মাস ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের গ্রীস্মকালীন রাজধানী হিসেবে সিমলার খ্যাতি প্রতিপত্তি। ৭৩০০ ফুট উচুতে পাহাড়ের কোলের মধ্যে নিরিবিলি পরিবেশে এই শৈল শহর অবস্থিত। কি নিবিড় সবুজ, কেমন স্নিগ্ধ শীতল এর পরিবেশ। পড়ার ঘরের জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালেই দেহমন জুড়িয়ে যাচ্ছে কিশোর আতিকের। চোখের সামনেই ঝকমক করছে তুষারমন্ডিত সুমহান হিমালয় আর তার গিরি শৃঙ্গগুলো। লম্বা লম্বা দেবদারু গাছগুলো সবুজ পাতার ঘোমটা পরে আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রকৃতি যেন নিপুন মালিনীর মতন পাহাড়ের গায়ে সবুজ ফার্ন গাছের কুঞ্জ বানিয়ে রেখেছে।
এপ্রিল মাসে রাজধানী বদলের তোড় জোড়। বড় লাটের সাদা হলুদ রঙের স্পেশাল ট্রেন ভোঁ বাজিয়ে সবাইকে জানান দিয়ে দিল্লি থেকে চলতে শুরু করে সিমলার দিকে…। ফারগাছের গায়ে হেলান দিয়ে এখনও এখানে ফুটে চলেছে লিলি, ডেফোডিল আর রডোডেনড্রন গুচ্ছ। দূরে ঝলমল করছে তুষার মুকুট হিমালয়ের শৃঙ্গ…। সিমলার প্রকৃতি তরুন আতিকের মনে সৌন্দর্য্যবোধ জাগিয়ে তোলে। যার প্রভাব থাকবে সারাজীবন। ইউনিয়ন একাডেমীর প্রায়- আন্তর্জাতিক পরিবেশ তাকে সকল কাজে কনফিডেন্স যোগাবে পরবর্তীকালে
পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান:
গর্ডন কলেজ থেকে বিএসসি পাশ করে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নবম পিএমএ লং কোর্সের ক্যাডেট হিসেবে নির্বাচিত হন এবং ১৯৫১ সালের ২৮ আগষ্ট কোয়েটার ‘’জয়েন্ট সার্ভিসেস প্রি-ক্যাডেট ট্রেনিং স্কুলে’’ যোগদান করেন। লং কোর্সের আড়াই বছরের প্রশিক্ষনের প্রথম ছয়মাস এ প্রতিষ্ঠানে সামরিক প্রশিক্ষন গ্রহণ করার নিয়ম প্রচলিত ছিল। অতঃপর বাকি দু’বছরের প্রশিক্ষণের জন্য ১৯৫২ সালের ২৬ মার্চ কাকুলের পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমীতে (পিএমএ) যোগদান করেন। দীর্ঘ আড়াই বছর কঠোর প্রশিক্ষণ শেষে ১৯৫৪ সালের ১৩ মার্চ আর্টিলারি বা গোলন্দাজ বাহিনীর ২০ হেভি এন্টি এয়ারক্রাফ্ট আর্টিলারি রেজিমেন্টে কমিশন লাভ করেন।
মার্চের ৩য় সপ্তাহ, ১৯৫৪। সদ্য কমিশন প্রাপ্ত অফিসার হিসেবে নতুন ইউনিটে যোগদানের আগের রাতে রাওয়ালপিন্ডির বাসায় তাঁর পিতা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে কর্মরত অত্যন্ত সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা আবদুর রহমান চাকুরিকালীন দায়িত্ব পালন নিয়ে তাঁর পুত্র সেকেন্ড লেঃ আতিককে বিভিন্ন উপদেশ দেন। তাঁর পিতা বলেন — ‘‘সেনাবাহিনীতে তোমার উপর যেকোন দায়িত্ব ইবাদত হিসেবেই পালন করবে’’। এই উপদেশটি সৈনিক আতিককে সারাজীবন অনুপ্রানিত করেছে। উল্লেখ্য, ১৯৫০ এর দশকে রাওয়ালপিন্ডিতে জেনারেল আতিকের পিতার ব্রিটিশ আমলের তৈরী বাসস্থানটি ছিল ‘‘অবান্ধব, স্বজনহীন ও অপরিচিত পরিবেশে’’ সুদুর বাংলা থেকে আসা অনেক বাঙালি ক্যাডেট ও তরুন কর্মকর্তাদের প্রিয় স্থান ছিল। [ক্রমশ]