ঋতুপর্ণ ঘোষের সিনেমা চোখের বালি মুক্তি পায় ২০০৩-এ। বিনোদিনী চরিত্রে ছিলেন ঐশ্বর্য রাই, আশালতা চরিত্রে রাইমা সেন। সিনেমাটিতে রবীন্দ্রনাথের ‘চোখের বালি’-র বিনোদিনীকে ঐশ্বর্য রাইয়ের খুল্লামখুল্লা অভিনয় দিয়ে পরিচালক এতটাই শরীরী করে তুলেছিলেন, খবরের কাগজের চিঠিপত্র বিভাগে তাঁকে ‘বি-নুডিনি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। পত্রলেখক কে ছিলেন, মনে নেই।
রবীন্দ্রনাথের এই ধ্রুপদী উপন্যাস পড়তে গিয়ে দেখেছি, বিনোদিনীর কথা এলে প্রায়শ ‘বালিশ’ এর অনুষঙ্গও এনেছেন রবীন্দ্রনাথ। পদেপদে তিনি এটি করেছেন। একি বিনোদিনীর একাকিত্বকে বালিশ দিয়ে পূরণ করার সচেতন ফ্রয়েডীয় প্রয়াস! মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করার জন্য যোগ্য মানুষ আছেন, তাঁদের দৃষ্টি আকর্ষণ করাই যায়। নাকি এমনি এমনি বালিশ এসে গেছে? এখন যেমন সোশ্যাল মিডিয়ায় লোকে এমনি এমনি ‘বালিশচাটা’ শব্দটি ব্যবহার করে চলেছেন!
চোখের বালি উপন্যাসটির কতকগুলি জায়গার উদ্ধৃতি দিলেই ‘বালিশ’-এর মাহাত্ম্য বোঝা যাবে,-
‘নিস্তব্ধ মধ্যাহ্নে মা যখন ঘুমাইতেছেন, দাসদাসীরা একতলার বিশ্রামশালায় অদৃশ্য, মহেন্দ্র বিহারীর তাড়নায় ক্ষণকালের জন্য কালেজে গেছে এবং রৌদ্রতপ্ত নীলিমার শেষ প্রান্ত হইতে চিলের তীব্র কণ্ঠ অতিক্ষীণ স্বরে কদাচিৎ শুনা যাইতেছে, তখন নির্জন শয়নগৃহে নিচের বিছানায় বালিশের উপর আশা তাহার খোলা চুল ছড়াইয়া শুইত এবং বিনোদিনী বুকের নিচে বালিশ টানিয়া উপুড় হইয়া শুইয়া গুনগুন-গুঞ্জরিত কাহিনীর মধ্যে আবিষ্ট হইয়া রহিত, তাহার কর্ণমূল আরক্ত হইয়া উঠিত, নিশ্বাস বেগে প্রবাহিত হইতে থাকিত।’
‘বিনোদিনী যে-বালিশ চাপিয়া শুইয়াছিল, সেই বালিশটা টানিয়া লইয়া মহেন্দ্র তাহাতে মাথা রাখিল; এবং বিষবৃক্ষখানি তুলিয়া লইয়া তাহার পাতা উল্টাইতে লাগিল। ক্রমে কখন এক সময় পড়ায় মন লাগিয়া গেল, কখন পাঁচটা বাজিয়া গেল — হুঁশ হইল না।’
‘যদিও তাঁহার রোগ সারিয়াছে, তবু মহেন্দ্র যাইবে শুনিয়া তখনি তিনি নিজেকে অত্যন্ত রুগ্ন ও দুর্বল বলিয়া কল্পনা করিলেন; বিনোদিনীকে বলিলেন, “দাও তো বাছা বালিশটা আগাইয়া দাও।” বলিয়া বালিশ অবলম্বন করিয়া শুইলেন, বিনোদিনী আস্তে আস্তে তাঁহার গায়ে হাত বুলাইয়া দিতে লাগিল।’

‘আজ মহেন্দ্র কালেজ হইতে ফিরিয়া আসিয়া আপনার শয়নঘর দেখিয়া আশ্চর্য হইয়া গেল। দ্বার খুলিয়াই দেখিল, চন্দনগুঁড়া ও ধুনার গন্ধে ঘর আমোদিত হইয়া আছে। মশারিতে গোলাপি রেশমের ঝালর লাগানো। নিচের বিছানায় শুভ্র জাজিম তকতক করিতেছে এবং তাহার উপরে পূর্বেকার পুরাতন তাকিয়ার পরিবর্তে রেশম ও পশমের ফুলকাটা বিলাতি চৌকা বালিশ সুসজ্জিত। তাহার কারুকার্য বিনোদিনীর বহুদিনের পরিশ্রমজাত। আশা তাহাকে জিজ্ঞাসা করিত, “এগুলি তুই কার জন্যে তৈরি করিতেছিস ভাই।” বিনোদিনী হাসিয়া বলিত, “আমার চিতাশয্যার জন্য। মরণ ছাড়া তো সোহাগের লোক আমার আর কেহই নাই।”
“পরিশ্রান্ত মহেন্দ্র মেঝের উপরকার শুভ্র বিছানায় শুইয়া নূতন বালিশগুলির উপর মাথা রাখিবামাত্র একটি মৃদু সুগন্ধ অনুভব করিলেন — বালিশের ভিতরকার তুলার সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে নাগকেশর ফুলের রেণু ও কিছু আতর মিশ্রিত ছিল।
মহেন্দ্রের চোখ বুজিয়া আসিল, মনে হইতে লাগিল, এই বালিশের উপর যাহার নিপুণ হস্তের শিল্প, তাহারই কোমল চম্পক-অঙ্গুলির যেন গন্ধ পাওয়া যাইতেছে।
এমন সময় দাসী রূপার রেকাবিতে ফল ও মিষ্ট, এবং কাঁচের গ্লাসে বরফ-দেওয়া আনারসের শরবত আনিয়া দিল। এ-সমস্তই পূর্বপ্রথা হইতে কিছু বিভিন্ন এবং বহু যত্ন ও পারিপাট্যের সহিত রচিত। সমস্ত স্বাদে গন্ধে দৃশ্যে নূতনত্ব আসিয়া মহেন্দ্রের ইন্দ্রিয়সকল আবিষ্ট করিয়া তুলিল।
তৃপ্তিপূর্বক ভোজন সমাধা হইলে, রূপার বাটায় পান ও মসলা লইয়া বিনোদিনী ধীরে ধীরে ঘরে প্রবেশ করিল। হাসিতে হাসিতে কহিল, “এ-কয়দিন তোমার খাবার সময় হাজির হইতে পারি নাই, মাপ করিয়ো ঠাকুরপো। আর যাই কর, আমার মাথার দিব্য রহিল, তোমার অযত্ন হইতেছে, এ-খবরটা আমার চোখের বালিকে দিয়ো না। আমার যথাসাধ্য আমি করিতেছি — কিন্তু কী করিব ভাই, সংসারের সমস্ত কাজই আমার ঘাড়ে।”
এই বলিয়া বিনোদিনী পানের বাটা মহেন্দ্রের সম্মুখে অগ্রসর করিয়া দিল। আজিকার পানের মধ্যেও কেয়া-খয়েরের একটু বিশেষ নূতন গন্ধ পাওয়া গেল।
মহেন্দ্র কহিল, “যত্নের মাঝে-মাঝে এমন এক-একটা ত্রুটি থাকাই ভালো।”
বিনোদিনী কহিল, “ভালো কেন, শুনি।”
মহেন্দ্র উত্তর করিল, “তার পরে খোঁটা দিয়া সুদসুদ্ধ আদায় করা যায়।”
“মহাজন-মহাশয়, সুদ কত জমিল।”
মহেন্দ্র কহিল, “খাবার সময় হাজির ছিলে না, এখন খাবার পরে হাজরি পোষাইয়া আরো পাওনা বাকি থাকিবে।”

বিনোদিনী হাসিয়া কহিল, “তোমার হিসাব যে-রকম কড়াক্কড়, তোমার হাতে এক বার পড়িলে আর উদ্ধার নাই দেখিতেছি।”
মহেন্দ্র কহিল, “হিসাবে যাই থাক্, আদায় কী করিতে পারিলাম।”
বিনোদিনী কহিল, “আদায় করিবার মতো আছে কী। তবু তো বন্দী করিয়া রাখিয়াছ।” বলিয়া ঠাট্টাকে হঠাৎ গাম্ভীর্যে পরিণত করিয়া ঈষৎ একটু দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিল।
মহেন্দ্রও একটু গম্ভীর হইয়া কহিল, “ভাই বালি, এটা কি তবে জেলখানা।”
এমন সময় বেহারা নিয়মমতো আলো আনিয়া টিপাইয়ের উপর রাখিয়া চলিয়া গেল।
হঠাৎ চোখে আলো লাগাতে মুখের সামনে একটু হাতের আড়াল করিয়া নতনেত্রে বিনোদিনী বলিল, “কী জানি ভাই। তোমার সঙ্গে কথায় কে পারিবে। এখন যাই, কাজ আছে।”
মহেন্দ্র হঠাৎ তাহার হাত চাপিয়া ধরিয়া কহিল, “বন্ধন যখন স্বীকার করিয়াছ, তখন যাইবে কোথায়।”
বিনোদিনী কহিল, “ছি ছি, ছাড়ো। যাহার পালাইবার রাস্তা নাই, তাহাকে আবার বাঁধিবার চেষ্টা কেন।”
বিনোদিনী জোর করিয়া হাত ছাড়াইয়া লইয়া প্রস্থান করিল।
মহেন্দ্র সেই বিছানার সুগন্ধ বালিশের উপর পড়িয়া রহিল, তাহার বুকের মধ্যে রক্ত তোলপাড় করিতে লাগিল। নিস্তব্ধ সন্ধ্যা, নির্জন ঘর, নববসন্তের বাতাস দিতেছে, বিনোদিনীর মন যে ধরা দিল-দিল — উন্মাদ মহেন্দ্র আপনাকে আর ধরিয়া রাখিতে পারিবে না এমনি বোধ হইল। তাড়াতাড়ি আলো নিবাইয়া ঘরের প্রবেশদ্বার বন্ধ করিল, তাহার উপরে শাসি আঁটিয়া দিল, এবং সময় না হইতেই বিছানার মধ্যে গিয়া শুইয়া পড়িল।
এও তো সে পুরাতন বিছানা নহে। চার-পাঁচখানা তোশকে শয্যাতল পূর্বের চেয়ে অনেক নরম। আবার একটি গন্ধ — সে অগুরুর, কি খসখসের, কি কিসের, ঠিক বুঝা গেল না। মহেন্দ্র অনেক বার এপাশ-ওপাশ করিতে লাগিল — কোথাও যেন পুরাতনের কোনো একটা নিদর্শন খুঁজিয়া পাইয়া তাহা আঁকড়াইয়া ধরিবার চেষ্টা। কিন্তু কিছুই হাতে ঠেকিল না।
রাত্রি ন-টার সময় রুদ্ধ দ্বারে ঘা পড়িল। বিনোদিনী বাহির হইতে কহিল, “ঠাকুরপো, তোমার খাবার আসিয়াছে, দুয়ার খোলো।”
তখনই দ্বার খুলিবার জন্য মহেন্দ্র ধড়ফড় করিয়া উঠিয়া শার্শির অর্গলে হাত লাগাইল। কিন্তু খুলিল না — মেঝের উপর উপুড় হইয়া লুটাইয়া কহিল, “না না, আমার ক্ষুধা নাই, আমি খাইব না।”
‘বিনোদিনী যে-বালিশ চাপিয়া শুইয়াছিল, সেই বালিশটা টানিয়া লইয়া মহেন্দ্র তাহাতে মাথা রাখিল; এবং বিষবৃক্ষখানি তুলিয়া লইয়া তাহার পাতা উল্টাইতে লাগিল। ক্রমে কখন এক সময় পড়ায় মন লাগিয়া গেল, কখন পাঁচটা বাজিয়া গেল — হুঁশ হইল না।’
মহেন্দ্রবাবুর হুঁশ না হলেও, আমার হুঁশ আছে, উদ্ধৃতি সুদীর্ঘ হলে পাঠকের বিড়ম্বনার কারণ হয়। তাই আর চোখের বালি নয়, অভিধানের চোরাবালিতে পড়া যাক!

বালিশ শব্দটি যতই মস্তকের নীচে তুলতুলে এক তুলোর আধার বোঝাক না কেন, এটির অর্থ আরও ব্যাপক, আরও গভীরগামী।
হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’-এ বালিশের উপাধান(মাথা রাখার উপকরণ) অর্থ ছাড়াও আরও অনেক অর্থ দিয়েছেন।
বালিশ ১- সং বিণ [বলি(পরদত্তোপহার) + √শো + অ (ক)-ক- ‘বলিশ’ + অ(অণ) স্বার্থে (অ টী)]
১. অজ্ঞ, মূঢ়, মূর্খ।
২. শিশু
৩. শিশুবৎ নিরভিমান
৪. উপাধান (ক্লীব)
বালিশ২ (ফারসি)
উপাধান(উদাহরণ, পিরীতি বালিশে আলিস ত্যজিব, চণ্ডীদাস)
বাংলা একাডেমি বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধানে বলিশের আর একটি অর্থ পাই,-
ছয় রাগ ও ছত্রিশ রাগিণীর সমবায়ে ৪২ সুরের উপযুক্ত ৪২ প্রকার সুর ও বাদ্য।
মুকুন্দরাম চক্রবর্তী ১৬০০ সালে লিখে গেছেন,
“বাজএ বালিশ বাজনা”।
বাংলা প্রবাদ আছে, ‘দিনে বালিশ, রাতে চালিস্’। অর্থাৎ দুপুরের খাবারের পর বালিশ নিয়ে শয়ন, রাতের খাওয়ার পরে হাঁটা।
মাথার বালিশ, কোল বালিশ, পাশবালিশ, তাকিয়াবালিশ, বালিশের শেষ নেই। বালিশ আবার মারামারির গার্হস্থ উপকরণও বটে। শুধু চোখের বালির রোম্যান্টিক বালিশ নয়, যুযুধান স্বামীস্ত্রী বালিশাস্ত্রও প্রয়োগ করেন।
বাংলা প্রবাদেই আছে,
বউয়ের গায়ে কি হাত উঠায়,
লোক দেখিয়ে বালিশ কিলায়!’