| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার স্বাধীনতা তুমি কার : সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্বাধীনতা — অর্জন নয়, দায়িত্বও : যশোবন্ত রায় চোখের বালি যখন চোখের বালিশ : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বাগ্মী কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী হুমায়ুন কবিরকে কি বাঙালি ভুলে গেল : অসিত দাস পূর্বিতা পুরকায়স্থ-র ছোটগল্প ‘প্রান্তিক’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ উই দ্য পিপল অব ইণ্ডিয়া : দিলীপ মজুমদার সিনে সেন্ট্রালের লুসোফন চলচ্চিত্র উৎসবে পর্তুগিজ ছবি — ফ্লাইট অফ ক্রোকোডাইল : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মুখার্জিবাড়ি — জিরাট ও রসা রোড : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার বাংলাদেশেকে লুক ইস্ট পলিসি বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হবে : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গা / ৩৫৭ Views জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬

২০১. আমাদের শাসনব্যবস্থায় পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। অভিযোগ শোনা ও বিচারের জন্য সুনির্দিষ্ট নিয়মকানুন প্রবর্তিত হয়েছে; এবং এই প্রক্রিয়াটি এমন সব আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয় যা দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টি করে। যারা কোনো অন্যায়ের শিকার হয়ে অভিযোগ জানানোর অধিকারী এবং নিজেদের বিবেচনায় অবিলম্বে প্রতিকার পাওয়ার দাবি রাখেন, তাদের কাছে কেবল দীর্ঘদিনের অভ্যাসের কারণেই এই বিলম্ব হয়তো গ্রহণযোগ্য মনে হতে পারে।

২০২. এই সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার অনিবার্য অনুষঙ্গ হিসেবে যে বিলম্ব ঘটে, তা নিজেই একটা অভিযোগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়—বিশেষ করে নিম্নবিত্তের কাছে, যারা এর ফলে প্রকৃত ক্ষতির সম্মুখীন হয়। যে দেশে প্রবাদ আছে যে ‘দীর্ঘসূত্র বিচার’-এর চেয়ে ‘সংক্ষিপ্ত অবিচার’-ও শ্রেয়, সেখানে এই মন্তব্যের সপক্ষে বিশেষ কোনো প্রমাণের প্রয়োজন পড়ে না। এটাও লক্ষণীয় যে, একই কারণে অসংখ্য মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করা হয়, যার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলোকে ব্যর্থ বা ব্যাহত করা। অভিযোগ দায়েরের মাধ্যমে যখন কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য সাধিত হয়ে যায়, তখন অভিযোগকারীরা আর দৃশ্যপটে থাকে না।

২০৩. মুসলিম শাসনামলে প্রতিটি বিভাগের ক্ষমতা একজন ব্যক্তির হাতেই ন্যস্ত থাকত। সরকারি কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যের সহায়তায় ‘খালসা’ বিভাগের দেওয়ান অত্যন্ত দ্রুততার সাথে রাজস্ব সংক্রান্ত হিসাব-নিকাশ যাচাই-বাছাই করতেন — এমন গতিতে যা আমাদের পক্ষে অর্জন করা অসম্ভব। এই বিভাগে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের কেবল চাকরিচ্যুতির (যা সামান্য সন্দেহের বশবর্তী হয়ে তদন্তের আগেই বা পরেই ঘটতে পারত) ঝুঁকিই ছিল না; বরং অপরাধ প্রমাণিত হলে — কিংবা কেবল সন্দেহের বশবর্তী হলেও — তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও ব্যক্তিগত শাস্তির সম্মুখীন হতে হতো। সংগ্রহের কাজটিও এমন এক কঠোর নিষ্ঠার সাথে করা হয়েছিল, যার কোনো নজির কোনো ইওরোপিয়র ক্ষেত্রে দেখা যায়নি।

২০৪. মুসলিম শাসনব্যবস্থায় রাজস্ব আদায়ের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা এবং রাজস্ব প্রদানের চুক্তিবদ্ধ জমিদার বা ইজারাদার — উভয়ই তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব বা চুক্তির শর্ত পালনে কোনো পন্থা অবলম্বনেই দ্বিধা করতেন না। আদেশ অমান্য করা, তা এড়িয়ে যাওয়া কিংবা হিসাব গোপন বা বিকরা করাকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হতো; তবে প্রকৃত বা আরোপিত অপরাধের দায় থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে প্রায়শই ব্যক্তিগতভাবে অর্থ প্রদানের মাধ্যমে রফা করা হতো। কোনো ক্ষমতাই — তা যেভাবেই প্রয়োগ করা হোক না কেন — অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারত না; কিন্তু আমি যে শাসনপদ্ধতির কথা বর্ণনা করেছি, তার ভয়ভীতি ও শাস্তির মধ্যে এমন এক ধরনের কঠোর নিয়ন্ত্রণক্ষমতা ছিল যা আমাদের ব্যবস্থায় অনুপস্থিত। স্থানীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে যদি এই মন্তব্যগুলোর সত্যতা নিয়ে কোনো সন্দেহ জাগে, তবে তা সহজেই যাচাই করা সম্ভব। এর জন্য ‘নাজিম’ বা শাসকদের অধীনে সংঘটিত অপরাধ ও প্রদত্ত শাস্তির সাথে আমাদের শাসনামলে রাজস্ব বিভাগের দেশীয় কর্মচারী ও জমিদারদের দ্বারা অবাধে সংঘটিত আদেশ অমান্য, ফাঁকি, জালিয়াতি, তথ্য গোপন ও জোরকরে অর্থ আদায়ের ঘটনাগুলোর তুলনা করলেই চলবে। নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, আমাদের সরকারের নমনীয়তার সুযোগ নিয়ে জমিদার, রায়ত ও প্রজারা প্রায়শই সরকারি আদেশ লঙ্ঘন করে থাকে। তারা জানে যে শাস্তি কোনো খেয়ালখুশিমতো বা তাৎক্ষণিকভাবে দেওয়া হয় না; অপরাধ শনাক্তকরণের পথে যেসব বাধা রয়েছে এবং অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে যেসব আনুষ্ঠানিকতা পালন করতে হয়, সে সম্পর্কেও তারা অবগত। তারা ঘটনাকে বিকরা ও জটিল করে তোলার নিজস্ব দক্ষতার ওপর আস্থা রাখে এবং বিশ্বাস করে যে, শেষ পর্যন্ত আমাদের আইন ও মানবিকতা — পাশাপাশি তাদের আচার-আচরণ ও রীতিনীতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে — তাদের অপরাধের জন্য কিছুটা ছাড় দেবে। আমাদের সাথে তর্কের সময় তারা আমাদের নীতিমালার দোহাই দেয়, অথচ নিজেদের আচরণের ক্ষেত্রে তারা নিজস্ব নীতি অনুসরণ করে; কারণ স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের কঠোরতা অপসারিত হলেও, সেই শাসনের ফলে গড়ে ওঠা অভ্যাসগুলো এখনো রয়ে গেছে।

২০৫. সহজেই অনুমেয় যে, এমন এক শাসনব্যবস্থায় — যেখানে একজন ব্যক্তি স্বৈরতান্ত্রিকভাবে প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন এবং যিনি নিজে তাঁর কর্মকর্তা ও প্রজাদের ভাষা ও রীতিনীতির সাথে সুপরিচিত ছিলেন — সেখানে কাজের খুঁটিনাটি বিষয়ের প্রতি যে ধরনের মনোযোগ দেওয়া সম্ভব ছিল, আমাদের ব্যবস্থায় তা সম্ভব নয়। এ ধরনের সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও কর্মতৎপরতা তাদের কার্যক্রমে যে প্রাণশক্তি জোগাত, তা আমাদের ক্ষেত্রে অনেক বেশি সুশৃঙ্খল ও নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতির মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হয়; আমাদের কার্যক্রমগুলো আনুষ্ঠানিক ও সুবিন্যস্ত প্রক্রিয়ায় পরিচালিত হয়; সরকারি বোর্ডে পাওয়া সমস্ত নথিপত্র ও চিঠি পড়া ও সেগুলোর বিষয়ে আলোচনা করা হয়; এরপর গৃহীত সিদ্ধান্ত ও প্রদত্ত উত্তরসহ সেগুলো নিয়মিতভাবে নথিবদ্ধ করা হয়। রাজস্ব সংক্রান্ত নথিপত্র ও হিসাবের ক্ষেত্রে অনুবাদ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার আবশ্যকতা রয়েছে। কেবল উপযুক্ত কাজ করাই যথেষ্ট নয়; আমাদের সিদ্ধান্তের ভিত্তি ও কারণও প্রদর্শন করতে হবে। এই আনুষ্ঠানিকতা পালনে যে সময় ব্যয় হয়, সেই একই সময়ে একজন দেওয়ান তাঁর কর্মপদ্ধতি অনুযায়ী এর চেয়ে দশ গুণ বেশি কাজ সম্পন্ন করতে পারতেন। রাজস্ব কালেক্টররাও নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলতে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য, হিসাব ও কার্যক্রমের ভিত্তি ইংরেজিতে ‘বোর্ড অফ রেভিনিউ’-এর কাছে জানাতে বাধ্য—অথচ এই তথ্যগুলোর অনুবাদ করতে যে সময় লাগত, তার অর্ধেক সময়েই মূল প্রতিবেদনটি তৈরি করা সম্ভব ছিল। একজন ‘আমিল’-এর কাজ ছিল কেবল নথির অনুলিপি তৈরি করার নির্দেশ দেওয়া এবং তাঁর ‘মুন্সি’র লেখা একটা সংক্ষিপ্ত পত্রসহ সেগুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো।

২০৬. আমার বিশ্বাস, বিশ্বের কোনো দেশেই সরকারি কর্মকর্তারা বাংলার মতো সরকারি কাজকর্ম সম্পাদনে এতটা সময় ও মনোযোগ দেন না। যাঁরা নিষ্ঠা ও একাগ্রতার সাথে এই দায়িত্ব পালন করেন, তাঁদের কাছে দাপ্তরিক কাজগুলো অকল্পনীয় রকমের শ্রমসাধ্য — সরকারি নথিপত্রই এর প্রমাণ। কিন্তু পরিশ্রম ও প্রচেষ্টারও একটা সীমা আছে। যদি অতিরিক্ত কাজের চেষ্টা করা হয়, তবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অবহেলিত হতে পারে। কালেক্টরদের ওপর ‘বোর্ড অফ রেভিনিউ’-এর নিয়ন্ত্রণ এবং তাঁদের ও অন্যান্য বিভাগের ওপর সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ — উভয়ই অকার্যকর হয়ে পড়বে যদি তাঁদের মনোযোগ খুঁটিনাটি বিষয়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।

২০৭. এই পর্যবেক্ষণগুলো অত্যন্ত স্পষ্ট, যা কারও দৃষ্টি এড়াতে পারে না; তাই সরকারি কাজকর্ম পরিচালনার — বিশেষ করে রাজস্ব সংক্রান্ত — কোনো ব্যবস্থা প্রবর্তনের সময় এগুলোর গুরুত্ব বিবেচনা করা আবশ্যক। পূর্ববর্তী সরকার যে কাজগুলো কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা, তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত ও দ্রুততার মাধ্যমে সম্পন্ন করতে পারত, সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও পদ্ধতি মেনে চলা সীমিত ক্ষমতার বর্তমান সরকারের পক্ষে একই সময়ে বা একই উপায়ে তা করা সম্ভব নয়। সুতরাং, পূর্ববর্তী প্রশাসন যা কেবল তাদের নিজস্ব পদ্ধতিতে সম্পন্ন করতে পারত, আমাদের প্রশাসনের পক্ষে তা করার চেষ্টা করা উচিত নয়; বরং নীতিমালার সাথে সামঞ্জস্য রেখে কর্মপদ্ধতি পরিবর্তন করতে হবে এবং সর্বত্র কাজের ক্ষেত্রে সামঞ্জস্য বিধান করতে হবে। কাজের অপ্রয়োজনীয় বৃদ্ধি রোধ করতে হবে; কারণ এটা যদি তার যথাযথ সীমা অতিক্রম করে, তবে একে নিয়ন্ত্রণ করার সম্ভাবনা আর থাকবে না; আর এটা অত্যন্ত স্পষ্ট যে, কোনো ব্যবস্থাই সাধারণত সফল হতে পারে না যদি তার গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব পালনে নিয়ন্ত্রণকারী শক্তিটি অক্ষম হয়। নির্ধারিত পদক্ষেপগুলোকে ব্যর্থ করার জন্য যখনই কোনো ছলচাতুরী বা এড়ানোর কৌশল অবলম্বন করা হয়, তখন যদি সরকারকে নতুন আদেশ জারি করতে হয় বা তার সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব প্রয়োগ করতে হয় — অথবা মন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত চলাকালীন যদি সেই কার্যক্রমের গতি মন্থর হয়ে পড়ে (কারণ অভিযোগ উত্থাপিত হলে এমনটা ঘটাই স্বাভাবিক) — তবে যে ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্য এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল তা বিলীন হয়ে যাবে, অথবা পুরো বিষয়টিই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার নিজস্ব বিবেচনার ওপর ছেড়ে দিতে হবে। আমার মতে, এমন কোনো নীতিমালার ওপর ভিত্তি করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা অনেক বেশি বুদ্ধিমানের কাজ হবে যার জন্য এ ধরনের অসাধারণ প্রচেষ্টার প্রয়োজন হবে না; এবং যা সাধারণ মেধা ও পরিশ্রমের মাধ্যমেই ধাপে ধাপে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া সম্ভব।

কিস্তি ৩৭  ২০১-২০৭ টিকা

জন শোরের ২০০ স্তবক এবং তার পরের স্তবকেও ব্রিটিশ প্রশাসনের একজন নাটবল্টু হয়ে মুঘল শাসনকে ‘স্বৈরাচারী’ (despotic) চিহ্নিত করেছে, আর সেই স্বৈরাচারিতার ‘স্বাভাবিক পরিণতি’ হিসেবে সংক্ষিপ্ত তদন্ত ও স্বেচ্ছাচারী শাস্তিকে উপস্থাপন করেছে। কিন্তু রিচার্ড ঈটন-এর Islam in Bengal Frontier-এর তথ্য এই ব্রিটিশ বর্ণনার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরে। শোর তাঁর ২০০ স্তবকে বলেছেন — মুঘল শাসন ছিল স্বৈরাচারী; তার স্বাভাবিক পরিণতি ছিল সংক্ষিপ্ত তদন্ত ও স্বেচ্ছাচারী শাস্তি; প্রজা বা জমিদাররা অভিযোগ করলে তদন্ত অনুমানের বাইরে যেত না; স্থানীয়রা প্রায়শই ভুল সিদ্ধান্ত দিত। এই বর্ণনার উদ্দেশ্য ছিল-ব্রিটিশ শাসনকে ‘ন্যায়পরায়ণ’ ও ‘সংস্কারমূলক’ হিসেবে প্রচার করা; মুঘল শাসনকে ‘অরাজক’ ও ‘অত্যাচারী’ হিসেবে দেখিয়ে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করা; ব্রিটিশ শাসনের স্বৈরাচারী চরিত্রকে গোপন রাখা।

উত্তরবঙ্গের কোচবিহারে (বা তৎকালীন মুঘল সুবাদারির অংশে) যখন রাজস্ব কর্মচারীরা প্রজাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করতে শুরু করে, তখন প্রজারা সরাসরি মুঘল দপ্তরে ডেপুটেশন (প্রতিনিধি দল) পাঠায়, এবং সেই কর্মচারীদের সরিয়ে নতুন কর্মচারী নিয়োগ করা হয়। এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়: মুঘল শাসন স্বৈরাচারী ছিল না — প্রজাদের অভিযোগ শোনার ও প্রতিকারের ব্যবস্থা ছিল; একটি প্রতিষ্ঠিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ছিল, যেখানে প্রজারা সরাসরি দপ্তরে গিয়ে অভিযোগ জানাতে পারত; অভিযোগের ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়া হত — কর্মচারীদের সরিয়ে দেওয়া হত। এটি কোনো স্বৈরাচারী শাসনের বৈশিষ্ট্য নয়। স্বৈরাচারী শাসনে প্রজাদের অভিযোগের কোনো সুযোগ নেই, এবং অভিযোগ করলে শাস্তি দেওয়া হয়। মুঘল ব্যবস্থায় উল্টো — অভিযোগকারী প্রজাদের ডেপুটেশন গৃহীত হত, এবং পদক্ষেপ নেওয়া হত। শোরের নিজের বর্ণনায় ব্রিটিশ শাসনের বৈশিষ্ট্য ছিল – সংক্ষিপ্ত তদন্ত; স্বেচ্ছাচারী শাস্তি; অনুমানের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত; স্থানীয়দের প্রতি অবিশ্বাস। আরও বড় কথা, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অধীনে প্রজাদের অভিযোগের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না। জমিদাররা ছিলেন স্বৈরাচারী, এবং তাঁদের বিরুদ্ধে প্রজারা ব্রিটিশ আদালতে গেলে শোর যেমন বলেছেন — তদন্ত হত না, শাস্তি দেওয়া হত না, বরং অভিযোগকারীকেই শাস্তি দেওয়া হত। অর্থাৎ “ব্রিটিশদের বর্ণনায় মুঘলদের যতটা ডেসপট ছিল দেখতে পাই — আদতে তারা তা ছিল না, বরং ব্রিটিশেরাই ডেসপট ছিল। শোরের ২০০ এবং তার পরের কয়েকটা স্তবক প্রমাণ কত্র সেই ব্রিটিশ স্বৈরাচারিতার আবরণ বা মুখড়া মাত্র, যা মুঘল শাসনকে কালো করে ব্রিটিশ শাসনকে সাদা করার জন্য তৈরি।

এবারে ঈটনের দেওয়া তথ্যে প্রবেশ করি প্রমাণ করতে মুঘল শাসনে প্রজাদের যে অধিকার ছিল, ব্রিটিশ শাসনে বিলুপ্ত হল। শোরের বর্ণনা ছিল সেই বিলুপ্তির আবরণ। মুঘলরা যখন বাংলার উত্তর সীমান্তে (বর্তমান কুচবিহার ও আসামের কিছু অংশ) তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে, তখন তারা সেখানে একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের সমাজের সম্মুখীন হয় — ভিন্ন সামাজিক কাঠামো: এই অঞ্চলের মানুষজন, যেমন কুচ ও মেচ সম্প্রদায়, তখনও পুরোপুরি ব্রাহ্মণ্য বা হিন্দু সমাজ ব্যবস্থায় একীভূত হয়নি। তাদের সমাজ ছিল মূলত উপজাতীয় কাঠামোতে গঠিত। অর্থনৈতিক ব্যবস্থা: এখানে অর্থনীতির ভিত্তি ছিল মুদ্রার বদলে কোরভি শ্রম (corvée labor) বা বিনামূল্যের বাধ্যতামূলক শ্রমের ওপর। কুচ রাজার অধীনে ‘পাইক’ (paik) প্রথা চালু ছিল, যেখানে চারটি পরিবারের মধ্যে একজন রাজার জন্য কাজ করত। ধর্মীয় অবস্থা: এই অঞ্চলের মানুষজন স্থানীয় দেবদেবীতে বিশ্বাসী ছিল এবং ব্রাহ্মণ্য হিন্দুধর্ম তখনও তাদের মধ্যে গভীরভাবে প্রবেশ করেনি।

যখন মুঘল সেনাবাহিনী এই অঞ্চল জয় করে, তখন তারা এখানে পশ্চিম বাংলার মতো সহজে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি —

প্রশাসনিক পরিবর্তন: মুঘলরা এখানে মুদ্রা-ভিত্তিক অর্থনীতি, কেন্দ্রীয় রাজস্ব ব্যবস্থা এবং নতুন কর আরোপ করে। এর ফলে স্থানীয় ‘পাইক’ প্রথা ভেঙে পড়ে।

প্রতিরোধের সূচনা: এই নতুন ব্যবস্থার কারণে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দেয়। স্থানীয় রাজা পরীক্ষিৎ নারায়ণ (Parikshit Narayan) পালিয়ে গেলে, গ্রামবাসীরা নতুন কর ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

গ্রামবাসীদের ডেপুটেশন (প্রতিনিধি দল): আপনি যে ঘটনাটি উল্লেখ করছেন, তা সম্ভবত এই সময়কার। যখন স্থানীয় রাজস্ব কর্মচারীরা অতিরিক্ত অর্থ আদায় শুরু করে, তখন প্রজারা সরাসরি মুঘল দপ্তরে প্রতিনিধি দল (ডেপুটেশন) পাঠায়। এর ফলে অভিযুক্ত কর্মচারীদের সরিয়ে নতুন নিয়োগ করা হয়। এটি প্রমাণ করে যে মুঘল শাসন যেমন স্বৈরাচারী হতে পারে, তেমনই মুঘল আমলে প্রজাদের কাছে অভিযোগ জানানোর একটি প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়াও ছিল। আমরা আদতে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দ্বন্দ্ব উন্মোচিত করতে চাইছি। জন শোরের মতো ব্রিটিশ কর্মকর্তারা মুঘল শাসনকে “স্বৈরাচারী” (despotic) বলে চিহ্নিত করতেন, কিন্তু এই উত্তরবঙ্গের ঘটনা তার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরে। এটি প্রমাণ করে যে মুঘল আমলে প্রজাদের নিজেদের অধিকার রক্ষার জন্য অভিযোগ জানানোর একটি আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া বিদ্যমান ছিল, যা পরবর্তী ব্রিটিশ আমলে ক্রমশ বিলুপ্ত হয়।

চলবে

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভলিউম-২, ইন্ট্রোডাকশন অ্যান্ড বেঙ্গল এপেন্ডিক্স।

বিশ্বেন্দু নন্দ

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Currently Maintained by the2.dev