
আমাদের আদি বাড়ি ছিল বাগবাজার। দাদু-ঠাকুমার মুখে শোনা। দু-একবার গেছি। তখন আমার বয়স একআনা বরোজোর দেড়-আনা। এখন স্মৃতি থেকে সব ফর্সা। তবে পিপুল পাকতে ঠাকুমার মুখ থেকে সে সময়ের উত্তর কলকাতার কিছু গল্প শুনেছিলাম। ঠাকুমা বলেছিল ফিটন গাড়ি করে বাড়ির মেয়েরা বাগবাজার থেকে কালীঘাটে পুজো দিতে যেত। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ-এর রাস্তার ওপার দিয়ে না গিয়ে এপার দিয়ে যেত। কারন ওপারটা খারাপ ছিল। কেন! ওই পারটা ভাল ছিল না। ছুতোর পাড়া, গোয়ালাপাড়া, শুঁড়িপাড়া, তেলিপাড়া, ডোমপাড়া, মুচিপাড়া, যুগীপাড়া, বলদেপাড়া, রামবাগান (আগের নাম রূপোগাছি), ভাল্লুকবাগান (পরবর্তীতে সোনাগাছি)। জীবনে এই প্রথম রামবাগানের নাম শুনলাম। নিষিদ্ধ জগতের দিকে আমার অনুসন্ধিৎসা সবসময়। সত্তর দশকের মাঝামাঝি কলেজে এসে মনের সেই ইচ্ছেগুলোকে চরিতার্থ করি।
ঠাকুমা মাঝে মাঝেই গান গাইতো, — ‘ও গাড়োয়ান ভাড়া যাবি রে/কালীঘাটে পচামরা দেখতে যাব/ও গাড়োয়ান ভাড়া যাবি রে/ভাঙাগাড়ি বেত ঘোঁড়া, তাতে যত রসিক ছোঁড়া/কালীঘাটে পচামরা দেখতে যাব রে/ও গাড়োয়ান ভাড়া যাবি রে’। গানটা, এই বয়সে এসে যতটা মনে করতে পারলাম লিখলাম। তবে রামবাগন স্মৃতিতে খোদাই হয়ে গেল। আমি যখন কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীতে পরি সেইসময় আঙুরবালা ও ইন্দুবালার গানে আকৃষ্ট হয়ে রামবাগানে আসি। এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলে রাখি আমাদের কলেজের ইংরাজির প্রফেসর কল্যান দত্ত ওই পাড়াতে থাকতেন। উনি রমশে দত্ত-র পরিবারের উত্তরপুরুষ। যোগাযোগের সূত্র খানিকটা উনিই। তারপর বেশ সরগর হয়ে গেলাম। প্রায়ই যেতাম, একদিন ইন্দুবালা আমার দিদা হয়েগেল। কিভাবে হলো? সে গল্প আর একদিন। তবে আমি ইন্দুবালাকে পেয়েছিলাম বছর-পাঁচেক তারপর তো উনি চলেগেলেন।
এই ইন্দুবালার বাড়িতেই আমার সঙ্গে বিমান মুখোপাধ্যায়ের প্রথম পরিচয়। দু-জনে একই কলেজের ছাত্র। কল্যানবাবুর নাম শুনে বলেছিলেন, ও তো আমার ইয়ারের ছাত্র। আমরা একসঙ্গে পড়েছি। এরপর থেকে বিমানদার বাড়িতে যাওয়া আসা বেড়ে গেল। সেই বিখ্যাত রাস্তা — গলির মুখে শিবকালী ভট্টাচার্য, মাঝামাঝি বিমান মুখোপাধ্যায় একবারে শেষে রামকুমার চট্টোপাধ্যায়। তারপর একদিন বিমানদার মুখ থেকেই ইন্দুবালার অনেক গল্প শুনি।
বিমানদা প্রায়ই বলতেন জানিস, ইন্দুবালাকে আমি ইন্দু-মা বলতাম। সে কি আজকের কথা, বহুদিন আগেকার কথা। “তখন আমার বয়স ৮/১০ বছর হবে। শীতকাল, বেলা সাড়ে এগারোটা-বারোটা হবে। খেলছিলাম। আমার বাবা হঠাৎ আমায় বললেন, চলো তো, আমার সঙ্গে চলো। বাবা একটা রিক্সা ডেকে আমায় বললেন, ওঠো। বাবাও রিক্সাতে উঠে রিক্সাওয়ালাকে বললেন, চলো রামবাগান চলো। বাপের হাত ধরে, দশ বছরের ছেলে রামবাগানে যাচ্ছে? তখন রামবাগান ছিল বাইজী পল্লী। রিক্সাওয়ালার খটকা লেগেছে। তাই জিজ্ঞাসু চোখে একটু ইতস্তত করছে। বাবা এবার আরও জোরে বললেন, — বললুম তো রামবাগান চলো, রামবাগান। রিক্সাটা লিবার্টি সিনেমার পাশ দিয়ে যখন অদ্বৈত মল্লিক লেনে ঢুকে ইন্দুবালার বাড়ির দিকে যাচ্ছে বাবা তখন বললেন ‘যারা রাস্তায় তোমাকে আমাকে এক রিক্সায় দেখল তারা বলবে-এমন বাপেরও গলায় দড়ি ছেলেরও গলায় দড়ি—বাপ বেটাতে একসঙ্গে রিক্সায় রামবাগানে যাচ্ছে’! একটা বাড়ির সামনে এসে দেখি বাড়ির গায়ে পাথরের ওপর লেখা মিস ইন্দুবালা। আমার এখনো বেশ মনে আছে বাবা রিক্সাওলাকে আট-আনা পয়সা দিয়েছিলেন। বাবা আমায় বললেন, নামো।
দুজনে মিলে ওপরে যেতেই দেখলুম বাড়ির এক মহিলা তটস্থ হয়ে উঠলেন। ইন্দুবালাকে তাঁর বাড়িতে এই প্রথম দেখলুম। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘এ কী আমার সৌভাগ্য, সকাল বেলায় ব্রাহ্মণের পায়ের ধূলো পড়ল আমার বাড়িতে।’ আমার বাবার পায়ে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করলেন। আর তারপর আমায় দেখিয়ে বাবাকে জিজ্ঞাসা করলেন — এটি কে ?
বাবা বললেন, আমার মেজ ছেলে। অমনি ‘তুমি দাঁড়াও তো বাবা’ বলে উনি আমার পায়ে হাত দিতে এসেছেন দেখে, আমি পিছিয়ে সরে যাচ্ছিলুম, উনি আমায় বললেন না বাবা, ব্রাহ্মণ সন্তান, তা তোমার পৈতে হোয়েছে? আমি ঘাড় নেড়ে জানালাম হ্যাঁ আমার পৈতে হয়ে গেছে। আর রোখা গেল না, আমার বাবা বললেন, আরে ওর আবার পায়ের ধূলো কি নেবে? ‘কী যে বলো’, উনি বললেন, ‘না বাব, ওটা আমায় করতেই হবে’। উনি একরকম জোর করেই সেদিন আমার পায়ের ধূলো নিলেন। আমি লজ্জায় সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছি। তখনকার যুগে ওঁরা খুব ধর্মভীরু ছিলেন, আর ব্রাহ্মণদের খুব মানতেন। তাছাড়া আমাদের বাড়িতে গোপীনাথ মন্দিরের দৌলতে আমাদের ওপর ভক্তি-টক্তিগুলো খুব দেখাতেন সবাই। ওই গান শোনার জন্য গানের গল্প শোনার জন্য, ওই বয়স থেকে আমি ইন্দুবালার বাড়ি গিয়েছি।”
শিশুকাল থেকে, উত্তর কলকাতার যে অঞ্চলে একটু একটু করে বড় হয়েছিলেন, যে অঞ্চল সাক্ষী ছিল তাঁর জীবনের সমস্ত সুদিন, দুর্দিনের, সেই রামবাগানেই জীবনের শেষদিন পর্যন্ত থেকেছিলেন তিনি। অধিক স্বাচ্ছন্দ্যের আশায় কিংবা সমাজের মূলস্রোতে প্রবেশ করার প্রলোভনে অতীতকে অস্বীকার করেননি কোনও দিন। গভীর ভালবাসায়, মমত্ববোধে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন সমাজপরিত্যক্তাদের, এগিয়ে এসেছিলেন নানা উপায়ে তাঁদের স্বনির্ভর করে তোলার ব্রতে; অকুতোভয়ে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁদের ওপর শোষণ, অত্যাচারের বিরুদ্ধে। রামবাগান ইন্দুবালার সংগ্রামের সাক্ষী।
দুই
এক দিকে খ্যাতির আলো, অন্য দিকে রামবাগানের নিষিদ্ধপল্লির অন্ধকার। এই দুয়ের মাঝেই সুর, নাটকের আকাশে, চলচিত্রে তিনি ছিলেন উজ্জ্বল এক তারা। বারবার সগর্বে বলেছেন “আমি রামবাগানের মেয়ে, ইন্দুবালা”। নিষিদ্ধ পল্লীতে বড় হয়েছেন, কোনও দিন সেই সত্যকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন নি। দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে বাঙালির ঘরে ঘরে বাজত ইন্দুবালার গান।
ইন্দুবালা শৈশবে মায়ের কাছে কিছুটা গান শিখেছিলেন। মা ছাড়া তাঁর সঙ্গীতগুরু ছিলেন গৌরীশঙ্কর মিশ্র, কালীপ্রসাদ মিশ্র, ইলাহি বক্স এবং সেকালের প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী গহরজান। আরও পরে তিনি গিরীন চক্রবর্তী, কমল দাশগুপ্ত, সুবল দাশগুপ্ত, জামিরুদ্দিন খান এবং কাজী নজরুল ইসলামের সান্নিধ্যে আসেন। বাঁধন সেনগুপ্ত ইন্দুবালার অনুরোধেই তাঁর হয়ে ইন্দুবালার আত্মজীবনী ‘ইন্দুবালা’ গ্রন্থ রচনা করেন। এই আত্মজীবনী গ্রন্থের এক জায়গায় ইন্দুবালা বলছেন, “গৌরীশঙ্কর মিশ্রের জোড়াসাঁকোর বাড়িতে প্রতি বছর জন্মাষ্টমী উপলক্ষে বসত গানের আসর। সেখানে কলকাতার তো বটেই, কাশীর শ্রেষ্ঠ কলাকারেরাও আসতেন। গুরুজী গৌরীশঙ্করের অনুরোধে আগ্রহী শ্রোতা হয়ে আমিও গেছি গান শুনতে। গিয়ে দেখি আসর আলো করে বসে আছেন গহরজান, আগ্রেওয়ালি মালকা, চুলবুল্লেওয়ালি মালকা, লখনউওয়ালি বেচুয়াবাঈ, জানকীবাঈ, সরমাবাঈ, কিরণবাঈ, যাদুমণি, শ্বেতাঙ্গিনী, কৃষ্ণভামিনী, কেরামতুল্লা খাঁ, ঠুংরির বিখ্যাত ওস্তাদ মৈজুদ্দিন প্রমুখ। মুগ্ধ হয়ে দেশখ্যাত গুণীদের গান শুনছি। হঠাৎ গুরু কালীপ্রসাদ মিশ্র কানের কাছে মুখ নামিয়ে চুপি চুপি প্রশ্ন করলেন, ‘গাইবে?’ … কি মনে হলো — রাজি হয়ে গেলাম। কিন্তু গাইব কী? চারপাশে যাঁরা বসে আছেন তাঁরা কেউ হেঁজিপেজি নন। ভয়ে ভয়ে গুরুর শেখানো ইমন খেয়াল শুরু করলাম, গান শেষ হতে শুধু যে বাহবাই পেলাম তা নয়, অনেকে মিলে আরও গাইতে অনুরোধ করলেন। ইমন-এর পর ঠুমরি শেষ করে ওঠার উদ্যোগ করছি, গহরজানের আদেশে থেকে যেতে হলো। তিনি আরও গান শোনাবার ফরমায়েশ করলেন। ভয়ে আনন্দে আরও দু’খানা গান পরপর গাইলাম।”
এরপর কালীপ্রসাদ মিশ্রের কাছে শিক্ষা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই তাঁর সম্মতিক্রমে গহরজানের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন ইন্দুবালা। কালী ওস্তাদের সামনেই ইন্দুর হাতে নাড়া বেঁধে দিয়েছিলেন গহর, তাঁর ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের বাড়িতে। সেদিনই শিখিয়েছিলেন ভূপালিতে টপ্পা ‘আ মিলা ম্যাহরাম ইয়ার’। পরে গহরজানের কাছে বিভিন্ন রাগের ঠুংরি, দাদরা, গজল, ইত্যাদি শিখেছিলেন ইন্দুবালা। শিখেছিলেন নাচ, আর আসরের নানান আদবকায়দা। তাঁরই কথায়, “অত বড় গাইয়ে (গহরজান), কত সাধ্যসাধনা করে কত পয়সা খরচ করে তবে তাঁর শিষ্যত্ব লাভ করা যায়। আর আমায় না বলতেই অমন করে কাছে টেনে নিলেন। অবাক হব বইকি! এ কি কম সৌভাগ্যের কথা!”
১৯১৬ সালে গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে প্রকাশিত হয় ইন্দুবালার প্রথম রেকর্ড। গান দু’টি ছিল ‘আশা ফুরায়ে গেল’ ও ‘আর মুখে বলে কী হবে’। শুরুর দিকে গান গেয়ে তিনি কোনও অর্থ নিতেন না। রেকর্ডে নামের পাশে লেখা থাকত অ্যামেচার। তবে গ্রামোফোনের ৭৮ আরপিএম স্পিডে ঘুরতে ঘুরতে রেকর্ডের গানের শেষে শোনা যেত শিল্পীর ঘোষণা। সে যুগের মহিলা শিল্পীরা রেকর্ডে নিজের নাম ঘোষণা করতেন। এক দিকে খেয়াল, দাদরা, ঠুমরি কিংবা ভজন। অন্য দিকে কাজী সাহেবের গান, ভক্তিগীতি, নাটকের গান কিংবা সিনেমার গান।
বাংলা ও হিন্দি গান ছাড়াও তিনি গাইতেন উর্দু, ওড়িয়া, পঞ্জাবি ইত্যাদি ভাষায়। দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে বাঙালির ঘরে ঘরে বাজত ইন্দুবালার গান। ‘অঞ্জলি লহ মোর সঙ্গীতে’, ‘আজ বাদল ঝরে’, ‘বউ কথা কও’, ‘মোর ঘুমঘোরে এলে মনোহর’ কিংবা হিন্দি গানের মধ্যে ‘মোহে পনঘট পর নন্দলাল’ ছিল শিল্পীর গাওয়া ‘অলটাইম গ্রেটস’ গানগুলির অন্যতম। গানে গানে ইন্দুবালা যেমন মেহফিলের রসিকদের প্রাণ ছুঁয়েছিলেন, ছুঁয়েছিলেন রেকর্ড-শ্রোতাদের প্রাণ, তেমনই সুরে সুরে স্পর্শ করেছিলেন বেতারের শ্রোতাদের। ১৯২৭ সালে ১ নং গার্স্টিন প্লেসে কলকাতা বেতারকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার ঠিক পরদিন থেকেই ইন্দুবালা ছিলেন বেতারের শিল্পী। পরবর্তী ৫০ বছর ধরে তিনি কলকাতা বেতারের নিয়মিত শিল্পী ছিলেন।
বিশের দশকের শেষভাগে প্রকাশিত কাফি রাগে ‘জগ ঝুঠা সারা সৈয়াঁ’ আর মান্দ-এ ‘বিষয় বাত মম’ গানদুটি ইন্দুবালারই প্রথম হিন্দি গানের রেকর্ড নয়, বাঙালি শিল্পীর রেকর্ড করা প্রথম অ-বাংলা গান। এই রেকর্ডটির হাত ধরেই বাঙালি শিল্পীর দক্ষতার পরিচয় পৌঁছয় বাংলার ভৌগোলিক সীমার বাইরে। একে একে বাংলার অন্যান্য গুণী শিল্পীরাও পেতে থাকেন বিভিন্ন ভাষায় গান করার সুযোগ। এরপর বহু হিন্দি ও উর্দু ঠুংরি, দাদরা, চৈতি, গজল, নাৎ প্রভৃতি রেকর্ড করেছিলেন ইন্দুবালা। আবার বহুশ্রুত ‘মোমের পুতুল মমির দেশের মেয়ে নেচে যায়’, ‘দূর দ্বীপবাসিনী, চিনি তোমারে চিনি’, ‘মোর ঘুমঘোরে এলে মনোহর, নমো নমো’ গান তিনটির সুর কাজী নজরুল ইসলাম আহরণ করেছিলেন ইন্দুবালা-গীত বিখ্যাত তিনটি গান যথাক্রমে ‘বাঁকি রসিলি নঈ পনহারি পনঘট পর জল ভরনেকো যায়’, ‘শ্যাম গিরিধারি তোসে কৈসে ম্যায় মিলুঁ’ ও উর্দু নাত ‘যব নূর-এ-খুদা হামকো দুবারা নজর আয়া’-র থেকে!
গত শতকের তৃতীয় দশকের শেষদিকে, গ্রামোফোন কোম্পানির প্রধান প্রশিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত হন কাজী নজরুল ইসলাম। বাংলা গজলের পথিকৃৎ কাজী নজরুল তখনই গজল-অঙ্গের গান তুলে দিয়েছিলেন ইন্দুবালার কণ্ঠে — ‘রুমুঝুম রুমুঝুম কে এলে নূপুর পায়ে’। এ গানের মধ্য দিয়েই ইন্দুবালার নজরুলগীতি রেকর্ড করার সূচনা। তখন ১৯২৯ সাল। এরপর একে একে ‘কেন আনো ফুলডোর আজি বিদায়বেলা’, ‘এ আঁখিজল মোছো প্রিয়া, ভোলো ভোলো আমারে’, ‘মোর ঘুমঘোরে এলে মনোহর, নমো নমো’, ‘কেউ ভোলে না কেউ ভোলে অতীত দিনের স্মৃতি’, ‘হারানো হিয়ার নিকুঞ্জপথে কুড়াই ঝরাফুল’, ‘নিরজনে সখি বলো বঁধূয়ারে’, প্রভৃতি নজরুল-সৃষ্ট গজল অঙ্গের গান প্রকাশিত হয় শিল্পীর কণ্ঠে। এক সময় ইন্দুবালার অনন্য পরিবেশনে বিখ্যাত হয়েছিল তিলং রাগাশ্রিত ঠুংরি ‘এ সজন তুম কাহেকো নেহা লগায়ে’। একই অঙ্গে ও রাগে, ওঁর জন্য কাজী নজরুল রচনা করেন ‘অঞ্জলি লহ মোর সঙ্গীতে’, যা সে সময়ে জনপ্রিয় হয়েছিল তো বটেই, আজও বহুশ্রুত। ইন্দুবালা লিখেছিলেন, “কাজীদার গানের মধ্যে যে বৈশিষ্ট্যগুলি আমার সবচেয়ে ভালো লাগত তা হল, গানে ঠুংরির ঢং আর গানের লয়কারি। হিন্দি গানের ভাঙা সুরও চমৎকারভাবে গানে জুড়ে দিতেন কাজীদা। এ ছাড়া গজলের মত শায়র-ঢঙে সুর রচনা করে তিনি গায়ক ও শ্রোতাকে মাতিয়ে তুলতেন। ফলে আমরা যারা খেয়াল ও ঠুংরির গানের জগৎ থেকে বাংলা গানের আসরে এসেছিলাম তারা কাজীদার গানের মধ্যে বেশ রগড় আর সুরের মজা পেয়ে গেলাম।”
সময়টা ১৯৩৬ সাল। মৈসোরের দরবারে, জীবনের অন্তিম পর্বে সভাগায়িকা হয়েছিলেন গহরজান। পরবর্তীকালে তাঁরই সুযোগ্যা শিষ্যা ইন্দুবালা মহীশূরের রাজ গায়িকা হিসাবে মাসিক আড়াইশো টাকা মাইনেতে এগারোটা বছর তাঁর কেটেছিল। ১৯৪৬ সালে দেশ স্বাধীন হবার সময় পর্যন্ত এই ব্যবস্থায় কোন বিঘ্ন হয় নি। সুরের রাজ্য মৈসোরের তৎকালীন রাজা চতুর্থ কৃষ্ণরাও ওডেয়ার ছিলেন ইন্দুবালার সঙ্গীতের বিশেষ অনুরাগী। শিল্পীর স্মৃতিতে উজ্জ্বল ছিল মৈসোরের দরবারে সঙ্গীত পরিবেশনের প্রথম স্মৃতি। তাঁরই বয়ানে, “যথাসময়ে রাজদরবারে নিয়ে যাওয়া হল। যেমন সেখানে জাঁকজমক তেমন লোকজনের ভিড়। যে সে লোক নয় সব রাজ-রাজড়ার ভিড়। তাছাড়া গাইয়ে বাজিয়েদের দল তো রয়েইছে। চোখে যেন ধোঁয়া দেখলাম। কিন্তু তখন তো আর ফেরার উপায় নেই। অতএব কাঁপতে কাঁপতেই শুরু করে দিলাম গান। গান শেষ হতে অবশ্য সাহস গেল বেড়ে, কেননা চারিধারেই শুনি তারিফ আর বাহবা।” তবে পাকাপাকিভাবে ব্যস্ত শিল্পীকে কখনওই থাকতে হয়নি মৈসোরে। প্রতি বছর দশেরার উৎসবের সময় আর মহারাজার জন্মদিনে মৈসোরের দরবারে সঙ্গীত পরিশনের আমন্ত্রণ পেতেন তিনি। সেখানে পরিবেশিত বিভিন্ন গান রিলে হত ব্যাঙ্গালোর, মাদ্রাজ, প্রভৃতি শহরে। এভাবেই দক্ষিণভারতে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছিলেন ইন্দুবালা। কালক্রমে নিজাম মীর ওসমান আলি খাঁয়ে’র আমলে হায়দ্রাবাদের দরবারে, দ্বিতীয় বীর সিংহের আমলে টিকমগড়ের দরবারে, রাজা দ্বিতীয় মান সিংহের আমলে জয়পুরের দরবারে গান গেয়ে হয়েছিলেন সম্মানিতা। সেকালের প্রায় সমস্ত অভিজাত সঙ্গীতাসরেই ইন্দুবালার ছিল উজ্জ্বল উপস্থিতি। সমগ্র ভারতের সুররসিকদের কাছে ছিল বিশেষ আদর।
তিন
তিন ভাইবোন—মতিবালা, তিনকড়ি আর রাজবালা। উনিশ শতকের কলকাতায় ‘রূপোগাছি’ (প্রাচীন রামবাগান অঞ্চলকে তখন বলা হতো ‘রূপোগাছি’। পাশেই হাতিবাগান এবং অদূরে ভাল্লুকবাগান। ভাল্লুকবাগান পরে লোকমুখে ‘সোনাগাছি’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।) নামে পরিচিত রামবাগান এলাকার এক অসহায় বিধবা পুঁটিরানির সন্তান। মায়ের মৃত্যুর পর আশ্রয়ের জন্য ঘুরতে ঘুরতে তিনজনেই যোগ দিল এক সার্কাসের দলে। বাঙালির সার্কাস হিসেবে এ দলটি সেকালে বেশ সুনাম অর্জন করেছিল। নাম ‘দ্য গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস’, এর প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক মতিলাল বসু। তাঁর নাম অনুসারে ‘বোসে’স সার্কাস’ বলেও পরিচিত ছিল দলটি।
কবি মনমোহন বসুর ছেলে মতিলাল বসু। উনিশ শতকের ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত এই মানুষটির ধ্যানজ্ঞান ছিল সার্কাস। নানা জায়গায় ঘুরে ঘুরে খেলা দেখাত তাঁর দল। সার্কাসের জন্য মেয়ে খুঁজতে গিয়েই এগারো বছরের রাজবালার সঙ্গে তাঁর আলাপ। সার্কাসে ভারসাম্যের খেলা দেখিয়ে সবাইকে অবাক করে দিত সেই মেয়ে। যেমন সুন্দরী তেমনই খেলায় পারদর্শী। তার প্রতি এক অদ্ভুত আকর্ষণে জড়িয়ে পড়লেন চল্লিশ বছর বয়সী মতিলাল। সার্কাসের দল তখন উজ্জয়িনীতে। সেটা ১৯৯৮ সাল। সেখানে এক বাঙালি পুরোহিতের সাহায্যে, স্থানীয় মন্দিরে গিয়ে বিয়ে করলেন রাজবালাকে। ১৮৯৯ নভেম্বর মাসের গোড়ায় (১৮ কার্তিক ১৩০৫ বুধবার) রাজবালার একটি কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। এই মেয়েই পরবর্তীকালের বিখ্যাত অভিনেত্রী-সঙ্গীতশিল্পী ইন্দুবালা দেবী। জন্ম হয়েছিল অমৃতসরে। নবজাত সন্তান নিয়ে সার্কাসের দলের সঙ্গে এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ানো এক সমস্যা, তাই স্ত্রী ও কন্যাকে মতিলাল রামবাগানে ২১ নম্বর দয়াল মিত্র লেন-এর একটি বাড়িতে রাখার ব্যবস্থা করলেন। সম্পর্কিত ভাই জীবনকৃষ্ণ ঘোষকে দায়িত্ব দেন তাঁর অনুপস্থিতিতে এই পরিবারের দেখাশোনা করার। তাঁর বাড়ি ছিল ২৪ নম্বরে। এভাবে স্ত্রী-কন্যার ভরণপোষণের একটা ব্যবস্থা হলেও, মানসিক দূরত্ব আটকানো গেল না। দু-তিন বছরের মধ্যেই মতিলালও যেন রাজবালার প্রতি সব আকর্ষণ হারিয়ে ফেলেন। রাজবালার সুখের সংসার বেশি দিন টিকল না। এর পরে শুরু হয় রাজবালার জীবনসংগ্রাম।
রাজবালা চেয়েছিলেন তাঁর মেয়ের জীবন হোক আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতো। জীবনযুদ্ধে নেমে হাতিয়ার করলেন সঙ্গীতকেই। রামবাগানের দয়াল মিত্র লেন-এর বাড়িতে ওস্তাদ ডেকে এনে আরও গভীরভাবে গানের তালিম নিতে মন দিলেন রাজবালা। বাদ্যযন্ত্রে সঙ্গত করতে আসতেন সেকালের নামকরা পাখোয়াজ বাদক দুলী ভট্টাচার্য। পরবর্তীকালে যখন সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে তাঁর সুনাম ছড়িয়েছে, বাড়িতেই বসাতেন নিয়মিত গানের আসর। সেই আসরে আসতেন গোবিন্দপ্রসাদ মিশ্র, লছমীপ্রসাদ সিংহ, সাতকড়ি ওস্তাদ প্রমুখ সেকালের নামী সঙ্গীতজ্ঞরা। কয়েক বছর পর রাজবালা যোগ দিলেন পেশাদাররঙ্গমঞ্চে, অভিনেত্রীহিসেবে। গিরিশচন্দ্র ঘোষ তখন ‘শঙ্করাচার্য’ (১৯০৯) নাটক লিখেছেন, প্রথমবার তা মঞ্চস্থ হয়েছিল মিনার্ভা থিয়েটারে। ‘চৈতন্যলীলা’র মত প্রবল উন্মাদনা সৃষ্টি করতে না পারলেও, এ নাটকটিও যথেষ্ট জনপ্রিয়তা ও সমাদর লাভ করেছিল। ‘বঙ্গবাসী’তে নাটকের সমালোচনায় বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছিল ‘জগন্নাথ’ ও ‘মহামায়া’ চরিত্রের উপস্থাপনা, আর এই মহামায়ার ভূমিকায় নেমেছিলেন রাজবালা। তাঁর অভিনীত দ্বিতীয় মঞ্চসফল নাটক ‘তপোবল’ (১৯১১), এটিও গিরিশচন্দ্রের রচনা — এখানে রাজবালা নেমেছিলেন ‘অদৃশ্যন্তী’ চরিত্রে। তবে মূলত সঙ্গীতশিল্পী হিসেবেই তাঁর সুনাম ছিল।
রাজবালা প্রাথমিক ভাবে চেয়েছিলেন, মেয়ে পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখুক। তাই তাঁকে স্কুলে পড়তে পাঠিয়েছিলেন। সেকালের হিসেবে সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছিলেন ইন্দুবালা। এরপর মেয়েকে তিনি পাঠিয়েছিলেন পটলডাঙার একটি হাসপাতালে, শিক্ষানবিশ নার্স হিসেবে। তবে এ কাজ ইন্দুবালার ভাল না লাগায় তিনি হাসপাতাল থেকে পালিয়ে আসেন, শেষপর্যন্ত গানকেই জীবিকা হিসেবে বেছে নেন। কয়েক বছর পর ইন্দুবালা নিজেকে সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলে, মা রাজবালা তাঁর সঙ্গে বিভিন্ন আসরে যেতেন। মেয়ের সঙ্গীতজীবনকে এগিয়ে দিতে, তাঁর জন্য সময় ও সাহচর্য দিতে গিয়ে তিনি নিজে আস্তে আস্তে পেশাদার মঞ্চ থেকে সরে আসেন।
চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন রাজবালা। ১৯৩৫ সালে প্রযোজক বজরঙ্গলাল খেমকার অনুরোধে ‘রাতকানা’ নামে একটি দ্বিভাষিক ছবিতে তিনি অভিনয় করেন (হিন্দিতে ‘রাত আন্ধি’)। ততদিনে ইন্দুবালা রীতিমত প্রতিষ্ঠিত সঙ্গীতশিল্পী। তাই এ ছবিতে রাজবালার পরিচিতি ছিল ‘ইন্দুবালার মা’ হিসেবে। কাগজেও লেখা হয়, “কালো বউ-এর ভূমিকায় ইন্দুবালার মা ভাল।” ছবিটি সাফল্য পেলেও রাজবালা এর পর আর অভিনয়ে আগ্রহী হন নি। প্রকাশ্যে সঙ্গীত পরিবেশনও ছেড়ে দেন আস্তে আস্তে। পূর্বসূরি বিনোদিনী দাসীর মত শেষ বয়সে নিজেকে সরিয়ে নেন অন্তরালে। মেয়ের অভিভাবিকা হিসেবেই তাঁর সঙ্গে ছিলেন আমৃত্যু। বিরাশি বছর বয়সে একমাত্র কন্যা ইন্দুবালাকে একা ফেলে রেখে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন রাজবালা। তারিখটা ছিল বাংলা ১৩৭৫ সনের ২৭ ভাদ্র। শ্মশানযাত্রা থেকে ফিরে, পরের দিন ইন্দুবালা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে মায়ের স্মৃতিতর্পণ করেছিলেন স্বরচিত একটি কবিতার মাধ্যমে—“আকাশে তখন নক্ষত্রেরা/ নিস্তব্ধ শিশির লগ্নে/ আঁখিতে অশ্রুর স্রোত বয়/ বিষণ্ণ পথটি এসে/ শেষ হয় নিদ্রিত শ্মশানে।… তুলে ধরি তাপপ্রসূঅগ্নিশিখা/ জননীর মুখে।”
বিমান মুখোপাধ্যায় একবার গল্পর ছলে আমাকে বলেছিল, “জানিস জ্যোতি সালটা ১৯৮৪ সালের ৩০ নভেম্বর, শীতকাল। সকালে উঠেই খবর পেলাম মধ্যকলকাতার একটা নার্সিংহোমে রাধাকান্ত নন্দী মারা গেছেন। মনটা বড় খারাপ হয়ে গেল। আমি, শ্রীরামকুমার চট্টোপাধ্যায় নার্সিংহোমে গেলুম। অনেক শিল্পীরা এসেছেন। ওখানে খানিকক্ষণ রইলাম, যেটুকু যা করণীয় তা করে বাড়ি ফিরে এলুম। বাড়িতে ঢুকে সবে জুতোটা খুলে জামাটা ছাড়তে যাচ্ছি এমন সময় রামকুমার বাবুর বাড়ি থেকে একজন লোক এল। রামকুমার বাবু বলে পাঠিয়েছেন, নন্টুকে বলো জামাকাপড় ছাড়তে হবে না, এক্ষুণি বেরিয়ে আসতে, ইন্দু-মা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। সেদিন নিমতলা মহাশ্মশানে সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। দুটো চিতা এক সঙ্গে জ্বলছে — একটা রাধাকান্ত নন্দীর আর একটা ইন্দুবালার। রাধাকান্ত নন্দীর বাবা রোহিণী নন্দী ইন্দুবালার সঙ্গে এককালে বাজিয়েছেন। ইন্দুবালাও রাধাকান্তকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। কি যোগাযোগ, দুজনের চিতা একই সময়ে জ্বলছে। রাধাকান্ত নন্দীর পাশে সেদিন বিশেষ কোন শিল্পী ছিলেন না। শুধু মান্না দে-কে দেখেছি শোকার্ত হয়ে অনেকক্ষণ সেখানে থাকতে।”
“দেখ, দেহপট সনে নট যেমন সকলি হারায় তেমনি কণ্ঠ সনে গায়ক সকলি হারায়। তাই ইন্দুবালার চিতার পাশেও সেদিন সেরকম কিন্তু ভিড় ছিল না। আমি, রামকুমার বাবু যে, সেখানে শেষ পর্যন্ত উপস্থিত ছিলুম সে যে আমাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের সূত্রে, সে কথা না বললেও চলে। পরে রামকুমারের চেষ্টায় কিছু অর্থসংগ্রহ করে ইন্দুবালার স্মৃতিতে নিমতলা শ্মশানে একটা পাথরের ফলক স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। আমিও এদের সঙ্গে ছিলুম। সেইখানেই বাঙলা গানের ভুবনে, ইন্দুবালার কায়িক অন্তর্ধান।”
“তবে ইন্দুবালার এই প্রয়াণ প্রসঙ্গে আমার কেমন একটা আলাদা অনুভূতি হয়। দুই সমসাময়িক দুর্দান্ত শিল্পীর মধ্যে ১৯৮৪ সালের গোড়ায়, ৭ই জানুয়ারিতে চলে গেলেন আঙ্গুরবালা আর একই বছরের প্রায় শেষের দিকে ৩০ শে নভেম্বরে যে অন্যজন ইন্দুবালাও চলে গেলেন—এর মধ্যে কি কোনও ভাবসূত্রের যোগ আছে বলে মনে হয়? ইন্দুবালার প্রয়াণের পর যে স্মৃতি-ফলকের কথা উল্লেখ করেছি সেই ফলকে শেষ পর্যন্ত যে, ইন্দুবালার নিজের লেখা একটা দারুণ কবিতা উৎকীর্ণ হয়েছিল তা যেমন যথার্থ হয়েছিল তেমনি আরো আশ্চর্য লাগে যে ওই কবিতাটাকে প্রথমে গান হিসাবে রেকর্ডে গেয়েছিলেন ওই আঙ্গুরবালা এবং পরবর্তী কালে রামকুমার চট্টোপাধ্যায়, যিনি ইন্দুবালার খুব ঘনিষ্ঠই ছিলেন। তিনি এই গানটা আবার রেকর্ড করেছিলেন। সব মিলিয়ে যেন একটা বিনিসুতোর মালা।”
ঋণ : অমিত মৈত্র, বিমান মুখাপাধ্যায়, বাঁধন সেনগুপ্ত
পেজফোরনিউজ শারদ সংখ্যা ২০২৫ প্রকাশিত