জীবনানন্দ দাশ জীবনের শেষ বছরটিতে উদ্ভ্রান্ত হয়ে যাঁকে তিন-তিনটি চিঠি লিখেছিলেন একটি চাকরির জন্যে, তিনি তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষাসচিব হুমায়ুন কবির। তিনি কেন জীবনানন্দকে কোনও সাহায্য করতে পারেননি, সেটি অন্য প্রশ্ন, তবে সরকারের উপরমহলে তাঁর গুরুত্ব কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। বাঙালির সাহিত্যসংস্কৃতি কাম রাজনীতির এক অনন্য মনীষী এই হুমায়ুন কবির। শিক্ষাজগতের এক দিকপাল হিসেবে তিনি বাঙালিকে গর্বিত করেছিলেন। শিক্ষাবিদ, লেখক,দার্শনিক, সাহিত্যিক, কবি, রাজনীতিবিদ প্রভৃতি বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন তিনি। সাতচল্লিশের দেশভাগের বিমূঢ়তা এতটুকুও বিভ্রান্ত করতে পারেনি তাঁকে। বিশ্বাসে অটল থেকে তিনি ঢাকার হাতছানি উপেক্ষা করে থেকে যান এপার বাংলায়। দেশ ও জাতি গঠনের লক্ষ্যে সংযুক্ত হন প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে।
তাঁর জন্ম ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯০৬ সালে, অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুরের কোমরপুর গ্রামে।বর্তমানে সেটি বাংলাদেশে অবস্থিত। তাঁর প্রকৃত নাম হুমায়ুন জহিরউদ্দিন আমির-ই-কবির। পিতা কবিরউদ্দিন আহমদ ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। হুমায়ুন কবিরের পিতা ও পিতামহ দুজনেই ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে ‘খান বাহাদুর’ উপাধি পেয়েছিলেন। তিনি নওগাঁর কে.ডি স্কুল থেকে১৯২২ সালে ম্যট্রিক, ১৯২৪ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট ও ১৯২৬ সালে ইংরেজিতে বিএ অনার্স পরীক্ষায় পাস করেন। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ইংরেজিতে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। শিক্ষান্তে সরকারি চাকরির সুযোগ থাকলেও উচ্চশিক্ষা আহরণের আগ্রহ তাঁকে সেই হাতছানিকে উপেক্ষা করতে প্রবুদ্ধ করে। তাই হুমায়ুন কবির ১৯২৮ সালে বৃত্তি নিয়ে অক্সফোর্ড যান। সেখানে একসেটার কলেজে ‘মডার্ন গ্রেটস’ অর্থাৎ দর্শন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতিতে বিএ (অনার্স) পরীক্ষাতেও তিনি অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেন। অধ্যয়নের পাশাপাশি তিনি নিজেকে একজন তুখোড় ছাত্রনেতা ও বাগ্মিরূপে প্রতিষ্ঠিত করেন।
১৯৩২ সালে রাধাকৃষ্ণনের আমন্ত্রণে হুমায়ুন কবির অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনের অধ্যাপকরূপে যোগদান করেন। এক বছর পরে তিনি চলে আসেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে অধ্যাপনার পাশাপাশি তিনি সাহিত্যচর্চা ও ট্রেড ইউনিয়ন রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। শুরু করেন সমাজ ও দেশ গঠনের কাজ। এই সময়ে সাহিত্য চর্চা দর্পণ হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠা করে চতুরঙ্গ পত্রিকা।
জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল তাঁর হিসেবী। উদ্দেশ্য ছিল সাফল্যের সোপান বেয়ে শিখরে পৌঁছানো। তাঁর সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য। লেখার জগতে প্রবেশ করে তিনি এক আকর্ষণীয় ভাষাভঙ্গি আয়ত্ত করেন। লেখকরূপে আত্মপ্রকাশের আগে তিনি বেশ কিছুদিন সম্পাদনার কাজ করেন। নওগাঁ কে.ডি হাইস্কুলের ম্যাগাজিন (১৯২০), প্রেসিডেন্সি কলেজ ম্যাগাজিন (১৯২৬), অক্সফোর্ডে Sis ও Cherwell নামক দুটি পত্রিকা এবং অক্সফোর্ড থেকে দেশে ফিরে ১৯৩২ সালে বারোমাসি নামে একটি মাসিক পত্রিকা তিনি সম্পাদনা করেন। তবে বাংলা সাময়িক পত্রের ইতিহাসে তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন তাঁর সম্পাদিত অতি উঁচুমানের চতুরঙ্গ (১৯৩৯-৬৯) ত্রৈমাসিকের জন্য। এছাড়া দেশি-বিদেশি বহু প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে তিনি রিপোর্ট ও গ্রন্থাদি সম্পাদনা করেছেন। এ প্রসঙ্গে ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত বাংলা গল্প ও কবিতার সংকলন গ্রিন অ্যান্ড গোল্ড বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
সাহিত্যক্ষেত্রে প্রথমত কবি হিসেবেই হুমায়ুন কবিরের আত্মপ্রকাশ ঘটে। তিনটি কাব্যগ্রন্থ স্বপ্নসাধ (১৯২৮), সাথী (১৯৩০) ও অষ্টাদশী (১৯৩৮) প্রকৃতি। ১৯৪৩ সালে উর্দু থেকে মসদ্দসে হার্লী-র বাংলা অনুবাদ তাঁর অন্যতম কৃতিত্ব। খুবই সংক্ষিপ্ত হলেও হুমায়ুন কবিরকে কথাসাহিত্যের জগতেও লেখক হিসেবে দেখা যায়। তিরিশের দশকে তাঁর লেখা কয়েকটি ছোটগল্প স্বনামে ও বেনামে প্রকাশিত হয়। ১৯৪৫ সালে তাঁর নদী ও নারী উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় এবং একই বছর Men and Rivers নামে এর একটি ইংরেজি সংস্করণ ও প্রকাশিত হয়। ১৯৬৫ সালে ঢাকায় উপন্যাসটি চলচ্চিত্রায়িত হয়। একথা অবশ্য অনস্বীকার্য যে, হুমায়ুন কবিরের প্রধান পরিচিতি একজন প্রবন্ধকার রূপে। ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষায় তিনি দর্শন, সাহিত্য, শিক্ষানীতি ও সমাজতত্ত্ব বিষয়ে মৌলিক প্রবন্ধ রচনা করেছেন। তাঁর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো: ইমানুয়েল কান্ট (১৯৩৬), শরৎ সাহিত্যের মূলতত্ত্ব (১৯৪২), বাংলার কাব্য (১৯৪৫), মার্কসবাদ (১৯৫১), নয়া ভারতের শিক্ষা (১৯৫৫), শিক্ষক ও শিক্ষার্থী (১৯৫৭), মিরজা আবু তালিব খান (১৯৬১), দিল্লী-ওয়াশিংটন-মস্কো (১৯৬৪), Kant on Philosophy in General (১৯৩৫), Poetry, Monads and Society (১৯৪১), Muslim Politics in Bengal (১৯৪৩), Rabindranath Tagore (১৯৪৫), The Indian Heritage (১৯৪৬, ১৯৬০), Science, Democracy and Islam (১৯৫৫), Education in India (১৯৫৬), Studies in Bengali Poetry (১৯৬৪), The Bengali Novel (১৯৬৮), Education for Tomorrow (১৯৬৮), Minorities in Democracy (১৯৬৯) ইত্যাদি। প্রথম জীবনে হুমায়ুন কয়েকটি নাটকও রচনা করেছিলেন যেগুলি অভিনীত হয়েছিল, কিন্তু মুদ্রিত হয়নি। তাঁর রচিত গ্রন্থসংখ্যা মোট ৪৫টি।
রাজনীতির অধ্যায়ের জীবনও ছিল চমকপ্রদ। এ.কে ফজলুল হকের কৃষক-প্রজা পার্টির পক্ষ থেকে তিনি ১৯৩৭ থেকে দীর্ঘ দশ বছর বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য ছিলেন। কৃষক-শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষার একজন শক্তিশালী প্রবক্তা ছিলেন । ভারতের তিনটি বড় বড় ট্রেড ইউনিয়নের তিনি সভাপতি হয়েছিলেন। মাওলানা আবুল কালাম আজাদের আমন্ত্রণে১৯৪৬ সালে জাতীয় কংগ্রেসে যোগদান করেন । দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে তিনি প্রত্যক্ষ ভাবে যুক্ত হয়েছিলেন।মাওলানা আবুল কালাম আজাদ শিক্ষামন্ত্রী থাকাকালে তিনি পর্যায়ক্রমে যুগ্ম শিক্ষা উপদেষ্টা, শিক্ষাসচিব ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সভাপতির পদে অধিষ্ঠিত হন।
১৯৫৬ সালে তিনি ভারতীয় রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচিত হন। প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু তাঁকে কেন্দ্রীয় সিভিল এভিয়েশনের প্রতিমন্ত্রী নিযুক্ত করেন এবং ১৯৫৮ সালে মাওলানা আজাদের মৃত্যুর পর তাঁকে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব দেন। তিনি দুই দফায় ভারতের শিক্ষা মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। প্রথম দফায় জওহরলাল নেহেরুর এবং পরবর্তীকালে লালবাহাদূর শাস্ত্রী মন্ত্রিসভায়। এছাড়া তিনি বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। শাস্ত্রীর মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে মাদ্রাজের গভর্নর-পদ দিতে চাইলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। ১৯৫৭ থেকে ১৯৬৯ সালে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি পশ্চিমবঙ্গের বসিরহাট থেকে লোকসভার নির্বাচিত সদস্য ছিলেন।
সুবক্তা হিসেবে সুনামের অধিকারী হুমায়ুন কবির দেশে-বিদেশে বহু বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন। অক্সফোর্ডে আইনস্টাইন ও রাসেলের ওপর তিনি হার্বার্ট স্পেন্সার বক্তৃতা দিয়েছেন। প্রথম এশীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁর এই কৃতিত্ব। ১৯৫৭ সালে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী আহূত কাগমারি সম্মেলনে তিনি ভারতীয় প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন। সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি আলীগড় (১৯৫৮), আন্নামালাই (১৯৫৯), খয়রাগড় (মধ্যপ্রদেশ, ১৯৬১), বিশ্বভারতী, মহীশূর ও এথেন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডি.লিট বা সমপর্যায়ের ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৯ সালের ১৮ আগস্ট হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি প্রয়াত হন।
বর্তমান সময়ে তাঁর স্মৃতিচারণ করতে আমি অন্তত কাউকে দেখিনি। তিনি যেন এক বিস্মৃতপ্রায় মনীষী। জানি না এবছর ১৮ আগস্টও তার ব্যত্যয় হবে কিনা। তবে দুঃসময়ে জীবনানন্দের চাকরির ব্যবস্থা তিনি করতে না পারলেও ১৯৫৫ সালে তাঁর মরণোত্তর সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পাওয়ার নেপথ্যকারিগর ছিলেন তিনি।