Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বাগ্মী কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী হুমায়ুন কবিরকে কি বাঙালি ভুলে গেল : অসিত দাস পূর্বিতা পুরকায়স্থ-র ছোটগল্প ‘প্রান্তিক’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ উই দ্য পিপল অব ইণ্ডিয়া : দিলীপ মজুমদার সিনে সেন্ট্রালের লুসোফন চলচ্চিত্র উৎসবে পর্তুগিজ ছবি — ফ্লাইট অফ ক্রোকোডাইল : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মুখার্জিবাড়ি — জিরাট ও রসা রোড : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার বাংলাদেশেকে লুক ইস্ট পলিসি বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হবে : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

পূর্বিতা পুরকায়স্থ-র ছোটগল্প ‘প্রান্তিক’

পূর্বিতা পুরকায়স্থ / ৪৩ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬

মা! ওরা ছোটুকে মেরে ফেলছে। আমি দেখলাম, রাস্তার মোড়ে প্রচন্ড মারছে লাঠি দিয়ে। ও আর বাঁচবে না মা! আমি বাধা দিতে গেলে বলল, আমি খেতে দিই বলে ও গলিতে পটি করে। আমাকে সরে যেতে বলল। আমি পিয়ালদাকে ডেকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ওকে বাড়িতে পেলাম না। আমি বেরোচ্ছি।

মলির কান্নার ঢেউ এ আছড়ে পড়া কথা নয়, ওর হৃদয় নিংড়ানো যন্ত্রনা শুক্তিকে নিস্পন্দ করে দিল। একটা তড়িৎপ্রবাহ যেন মাথা থেকে পা অব্দি খেলে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই মলিকে ব্যাগ টা কাঁধ থেকে নামিয়ে রেখে দৌড়ে বেরিয়ে যেতে দেখে নিজেকে সামলে নিয়ে ‘মলি, কোথায় যাচ্ছিস? কোথায় যাচ্ছিস?’ বলতে বলতে ওর পিছু নিলেন। মলি পিছন ফিরে শুধু একবার বলল, ‘প্রথমে ভেট এর কাছে তারপর থানায়’। শুক্তির মনে হোল মেয়েটা একটা খাপ খোলা তলোয়ারের মত এগিয়ে যাচ্ছে। ভয় নেই। দ্বিধা নেই। শুধুমাত্র ভালবাসার জোরে ছুটছে একবগ্গা ঘোড়ার মত। শুক্তি জানেন, এইরকম মানসিক স্থিতিতে চারদিকটা একেবারে অস্পষ্ট হয়ে যায়। থাকে শুধু আমি আর আমার বিশ্বাস আর সর্বোপরি ভালবাসা।

মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে শুক্তির মনে হোল, মলি নয় যেন উনি ছুটে যাচ্ছেন। ঠিক এই রকমই তো একটা ঘটনা ঘটেছিল ক’দিন আগে। পিয়ালের বাবা যেদিন তিল তিল করে জমিয়ে রাখা ক্রোধ, ঘেন্না ও হতাশা নিয়ে পিয়ালের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ওর লুকিয়ে রাখা টপ, স্কার্ফ, মালা, ইয়ার রিং সব একঝটকায় টান মেরে দরজার বাইরে ফেলে দিচ্ছিল। সেদিন লোকটার চীৎকার শুনে ও তো এই খাপ খোলা তলোয়ারের মতই এক দৌড়ে ফ্ল্যাট থেকে বেড়িয়ে কেয়ারটেকারের কোয়ার্টারে এসে লাফিয়ে পড়েছিল বাবা ও ছেলের মাঝখানে এবং ততোধিক চীৎকার করে বলেছিল, আর একবার যদি ওকে মেরেছ, আমি পুলিশ ডাকব। শুক্তিকে ঐ ভাবে দেখে লোকটা হতচকিত হয়ে লাঠি ফেলে তক্ষুণি ঘর থেকে বেড়িয়ে গিয়েছিল। আর অপমানিত ও লাঞ্ছিত পিয়াল পরম মমতায় একমনে ওর জিনিসগুলো কুড়োতে লেগেছিল। সেই দেখে মনে হচ্ছিল জিনিস নয়, ও যেন ওর ছড়িয়ে পড়া অস্তিত্বের টুকরো গুলোকে কুড়োচ্ছে।

শুক্তি আহত পিয়ালকে নিয়ে তক্ষুণি ডাক্তারখানায় গিয়েছিলেন এবং মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলেন ওখান থেকে থানায় গিয়ে নালিশ জানাবেন। কিন্তু পিয়াল রাজী হয় নি। ও বলেছিল, ছেড়ে দাও কাকীমা। কি হবে আর কাদা ঘেঁটে? শুক্তি সেদিন খুব কাছ থেকে পিয়ালকে দেখেছিলেন। বুঝেছিলেন ওর অস্তিত্ব টাই ওর যন্ত্রনার কারন। সেই যন্ত্রনা এতটাই ব্যাপক যে শরীরের তীব্র যন্ত্রনাকেও খাটো করে রাখে ।

পিয়ালের মনে কারুর ওপর কোন অভিযোগ বাসা বাঁধে না। ওর জীবনের যাবতীয় অসংলগ্নতা ও অস্বাভাবিকতার জন্য ও নিজেকেই দায়ী করে। আর যেহেতু ওর মনে হয় ও সবার মত নয় এবং সবার সাথে মিশে যেতে পারে না তাই গ্লানি ও হীনমন্যতা ওকে শুধু পালিয়ে নিয়ে বেড়ায়। ও নিজেকে নিয়ে এতটাই বিব্রত যে এই বিরাট পৃথিবীর কোথায় যে নিজেকে গুঁজে দেবে ভেবে পায় না।

শুক্তি দেখেন পিয়ালের দু’ চোখ জুড়ে বিষন্ন সন্ধ্যার ঘন ছায়া। ভোরের আলো কিংবা দুপুরের প্রখর রোদ ওকে কখনো অনুগ্রহ করে নি। ঠিক যেভাবে ওর আশেপাশের লোকেরা ওকে গ্রহণ করে নি। উপরন্তু কেন গ্রহণ করে নি তা বারংবার অনেক যত্ন করে বুঝিয়ে দিয়েছে। বারবার একটা কথাই বলতে চেয়েছে, তুমি আমাদের মত নও তাই তুমি তফাত যাও।

তবে যতদিন পিয়ালের মা বেঁচে ছিল এইসব নিষ্ঠুরতা থেকে ওকে আগলে আগলে রাখত । মাঝেমাঝেই বলত, দিদি আমার ছেলেটার যে কি হয়েছে বুঝতে পারি না। শরীরে তো কোন ক্ষুত নেই। শুধু মেয়েদের কাপড়জামা পড়তে চায় আর একটু মেয়েদের মত করে কথা বলে। এতেই সবাই ওকে নিয়ে হাসাহাসি করে। গায়ে হাত দিয়ে অসভ্যতা করে। ছেলেটা কোথাও যেতে পারে না। কেউ ওর সাথে মেশে না। আর অন্যকে কী দোষ দেব দিদি নিজের বাবা যেখানে ছেলেকে ঘেন্না করে… এইটুকু বলে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলত। কিছুটা থেমে আবার বলত, কি করে যে ওকে আগলে রাখি বলতো দিদি? ইচ্ছে করে আবার ওকে আমার গভ্ভে লুকিয়ে রেখে দিই! ঠিক যেমনটি ছিল জন্মের আগে। কেউ দেখতে পাবে না!

সেই মায়ের চলে যাবার পর পিয়াল আর ঘরে থাকতে পারে না। ঘরটা তখন ওর কাছে হয়ে উঠেছিল ইট বালি সিমেন্টের একটা খোপ মাত্র। আর বাবাকে তো ওর বরাবর বাইরের লোক বলেই মনে হয়েছে। ওঁর টাকায় যে খেতে পড়তে হয় সেটাও পিয়ালের আরেকটা যন্ত্রনা। মা থাকাকালীন সেই অনুভূতিটা হতো না। কারন মা ও তো খেটে টাকা আনত বাড়িতে। পড়াশোনার খরচাটা তখন মা দিত। মা চলে যাবার পর বাবা সে ব্যাপারে কোন উচ্চবাচ্চ করল না। যেন বাবা জানেই না ও পড়াশোনা করে! ও তখন ভেবেছিল বাচ্চাদের পড়িয়ে নিজের পড়ার খরচ চালিয়ে নেবে। চেষ্টা করেছে অনেক। এক দু’জন ছাড়া কেউ ওর কাছে বাচ্চাকে পড়তে দিতে রাজী হয় নি। পিয়াল তখন মানুষের মনের তলানিটা দেখতে পেয়েছিল। গেদ গেদে কাদার মধ্যে অসংখ্য কৃমি ওখানে কিলবিল করে।

ঠিক তখন থেকে শরীর ও মনের টানাপোড়েনের বাইরে শুরু হোল টিকে থাকার আর এক সংগ্রাম। পথ চলতে চলতে ওর সামনে ভেসে উঠছিল মানুষের মনের মরচে পড়া কিছু বন্ধ দরজা ও জানালা যার হদিস তারা নিজেরাও জানে না।

দু-তিনটে টিউশনি ও আবাসনের কিছু লোকের ফাইফরমাস খেটে উপার্জিত কিছু টাকা, এই পিয়ালের সম্বল। ও বোঝে ওর বাবা মনে প্রাণে চায় ও বাড়ি থেকে চলে যাক। তাই এই এক কামরার ঘর টাকে ওর নিজের বলে মনেই হয় না। ওর ও মনে হয় সরে পরে এখান থেকে। বাবার চোখের সামনে থেকে। কিন্তু যাবে যে, কোথায় যাবে? কেউ তো কাজ দেবে না। খাবে কী আর থাকবে কোথায়? এই ভাবনায় পিয়ালের দমবন্ধ হয়ে আসে। ওর চারদিকে তখন যেন শ্যাওলা ধরা উঁচু উঁচু দেয়াল উঠে যায় এবং তার গায়ে বিভিন্ন আকারের শামুক লেগে থাকে।

পিয়ালের আজকাল অবসর কাটে পার্কে, চায়ের দোকানের বেঞ্চে। ঘরের বাইরে বেশিরভাগ সময় কাটাতে কাটাতে লোকের চাউনি, ফিসফাস সব গা সওয়া হয়ে গিয়েছে ওর। রাস্তায় ওর সঙ্গী কুকুর বেড়াল। নিজের খরচ চালিয়ে যে টাকা হাতে থাকে তা দিয়ে এদের খাবার ও ওষুধ কিনে দেয়।

এরকমই এক দিন পিয়াল দেখে ড্রেনে একটা কুকুরের বাচ্চা পড়ে আছে। ও বাচ্চাটাকে তুলে এনে সোজা চলে এসেছিল শুক্তিদের ফ্ল্যাটে। কারন পুরো পাড়ায় একমাত্র ওখানেই ওর আদর আছে। মলি তো কুকুর টাকে দেখে প্রচন্ড উত্তেজিত। কুকুরটা ভয়ে ও ঠান্ডায় তখনো কাঁপছিল। তারপর দুজনে মিলে শুশ্রূষা করে সারিয়ে তুলে ওকে রাস্তায় ওর মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেয়। মলি বাচ্চাটার নাম রেখেছিল ছোটু। সেই থেকে কুকুর বেড়াল দের কাজে মলি হোল পিয়ালের সাকরেদ। দুজনে মিলে পাড়া ও পাড়ার আশেপাশের সব কুকুর, বেড়াল ও পাখিদের ভাল রাখে। ওরা নিজেরাও আনন্দে থাকে।

একটানা ভাবতে ভাবতে রাস্তার মোড়ে পৌঁছে গেলেন শুক্তি। এখন বাঁদিক ডানদিক কোন দিকেই তাকানোর সাহস নেই ওঁর। ছোটু কেমন করে কি অবস্থায় পড়ে আছে কে জানে! সহ্য করতে পারবেন না উনি। অথচ মলিকে খুঁজতে হলে ডাইনে বাঁয়ে তাকাতেই হবে! প্রথমে বাঁদিকে তাকাতেই দেখলেন ছোটুর পাশে মলি মাথা নীচু করে বসে আছে আর ক্রমাগত গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে যাচ্ছে। নিশ্চয়ই ছোটুকে আর ভেটের কাছে নিয়ে যাবার দরকার নেই। এই মানুষদের স্বঘোষিত পৃথিবী থেকে ও নীরবে বিদায় নিয়েছে। উনি মনে মনে বললেন, মানুষদের তুই ক্ষমা করিস না ছোটু! কক্ষনো ক্ষমা করিস না। কূল ছাপিয়ে জল এল শুক্তির চোখে।

ওভাবে ছোটুর পাশে বসে মলি নিশ্চয়ই কাঁদছে। শুক্তি গিয়ে কাঁধে হাত রাখতেই ও ঘুরে তাকাল। মারা গেছে মা! আমি ওদের কিছুতেই ছাড়ব না। এই বলে নিজেকে সামলে উঠে দাঁড়িয়ে থানার দিকে হাঁটা শুরু করল মলি।

একটা FIR হবে।

কি ব্যাপারে?

আমাদের পাড়ায় মোড়ের মাথায়, কিছু ছেলে একটা কুকুরকে পিটিয়ে মেরেছে।

FIR করতে হবে না। আমরা দেখে নেব।

প্রিভেনশন অব ক্রুয়েল্টি টু এনিমেল এক্টের সেকশন ১১ ও বি এন এস ধারা অনুযায়ী FIR করতে এসেছি।

মলির কথা শুনে ওসির পাশ থেকে একজন পুলিশ ব্যঙ্গ করে বলল, মানুষের কেস সামলে ওঠা যায় না তো কুকুর!

মলি কোন কথা না বলে একবার লোকটার চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। লোকটা তক্ষুণি চোখ নামিয়ে নিয়ে চুপ করে গেল।

ওসি ঢোঁক গিলে ঘটনার বিস্তারিত শুনলেন ও FIR নিলেন কিন্তু মুখে বললেন, কিছুই হবে না। পঞ্চাশ টাকা ফাইন দিলেই কেস খতম।

মলি গম্ভীর ভাবে বলল, কিন্তু এক্টে তো শাস্তির কথা বলা আছে।

ঘটনার কোন সাক্ষী আছে?

আমি নিজেই সাক্ষী।

কোন ছবি?

একটা স্টীল ছবি আছে। দেখাব?

হু। এই ছেলেগুলোর নাম জানেন?

রাহুল, সঞ্জয় আর দীপক।

ছবিটা যত্নে রাখবেন। ভবিষ্যতে কাজে লাগতে পারে।

ফের কবে আসতে হবে?

কালকের মধ্যে এরেষ্ট হয়ে যাবে। তারপর জানাব।

থানা থেকে বেরিয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়ালো ওরা। মোড়ের মাথায় দেখা হয়ে গেল পিয়ালের সাথে। পিয়ালদা, এদিকে এস বলে মলি ওকে ছোটুর কাছে নিয়ে গেল। বলল, সঞ্জয়রা ওকে মেরে ফেলেছে পিটিয়ে। বলে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। পিয়ালের চোখে মেঘ ঘনালো না শুধু আকাশের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে চোখ বন্ধ করল। নালিশ জানালো না কি শক্তি অর্জন করল? শুক্তি বললেন, আমরা থানা থেকে ফিরছি। ওরা FIR নিয়েছে। পিয়াল কোন উত্তর না করে গভীর মমতায় ছোটুর গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, চলে গেল। আমি আসার আগেই চলে গেল। কি যে ওর অপরাধ সে তো বুঝতেও পারল না। মলি, ওকে পাকাপাকি ভাবে কোথায় শুতে দিই বলতো? প্রতিরাতে তো আমার পাশে গিয়ে শুত। আর তো আমি ওকে রাখতে পারব না।

পিয়ালের কথা শুনে মলি ডুকরে ডুকরে কেঁদে ওঠে। ওর কান্নার ঢেউ এর ভার রাতের অন্ধকার শুষে নিতে পারে না। বিধাতার কাছে অভিমানে মোড়া অভিযোগ হিসেবে তা জেগে থাকে।

পিয়ালের বরাবরের মত এবারও কারুর প্রতি কোন অভিযোগ নেই। যেন এমনটা তো হবারই ছিল। এই পৃথিবীতে দূর্বলের ওপর সবলেরা চিরকাল আগ্রাসন দেখিয়ে এসেছে। ভবিষ্যতেও দেখাবে। ছোটুর সাথে যা হয়েছে সেটা ওর সাথেও হতে পারত। ছোটু ভালবেসে ওর প্রক্সি দিয়ে গেছে।

ছোটু চলে যাবার পর পিয়াল আগের মত আর আত্মগ্লানিতে কষ্ট পায় না। মাথা উঁচু করে নিজের মত করে বাঁচে। যাদের মতো ও নয় বলে এতকাল কষ্ট পেয়ে এসেছে তাদেরকে ওর আজকাল বড্ড ছোট বলে মনে হয়। ভাইরাসের চেয়ে ভাল কিছু মনে হয় না এদের। এরা দূর্বল দেখলেই ঘাড়ে চেপে বসে আর তারপর বিধাতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তাঁর সৃষ্টির সাথে যথেচ্ছাচার করে। মনে মনে পায়েল চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয় ঐ ভাইরাসদের দিকে। এত সুন্দর পৃথিবীতে যদি এই ভাইরাসেরা ওদের মত করে বেঁচে বর্তে থাকতে পারে তবে ও কেন পারবে না? পৃথিবীটা কারুর বাপের সম্পত্তি নয়। ও চিবিয়ে চিবিয়ে উচ্চারণ করে। ঠিক তখনই দেখতে পায় রাহুল আর সঞ্জয় কে সাইকেলে চেপে পার্কের চারদিকে গোল গোল করে ঘুরছে। আর বেঞ্চে বসে থাকা পিয়ালের দিকে তাকাচ্ছে ঠোঁটে একটা ব্যঙ্গের হাসি ঝুলিয়ে। যেন বলতে চাইছে, খুব তো FIR করেছিলি, কি করতে পারলি? আমাদের চুল ও বাঁকা করতে পারবি না।

পিয়াল ফের উচ্চারণ করল, পৃথিবীটা সত্যিই ভাইরাসদের জমিদারি!

মলি সঞ্জয়দের ছাড়া পাবার খবরটা শুনে খুব হতাশ ও দুঃখিত হোল। বলল, এর একটা বিহিত করতে হবে। পিয়াল বলল, কি করতে পারবে তুমি? System এর বিরুদ্ধে কি করে যাবে? থানার বাইরে আমরা দুজনে মিলে ধর্ণা দেব? মিলির রাগ ও উত্তেজনার উপর যেন হতাশার বরফ শীতল জল পড়ল।

পিয়াল দৃষ্টিটাকে যতদূর যায় ছড়িয়ে দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল, এই আমাদের নিয়তি মিলি। ভালবাসার দায় অনেক। আমরা থাকব, ছোটুরা থাকবে আর ঐ সঞ্জয়রাও। তবে যাই হয়ে যাক, এমনকি অসম্ভব প্রলয় হলেও শেষে শুধু জেগে থাকবে কৃতজ্ঞতায় ভরা দুটো চোখ ও খুশিতে দুলতে থাকা ল্যাজ। ঐখানেই আমাদের ছোটুরা জিতে যায়। আমাদের ও জিতিয়ে দেয়।


আপনার মতামত লিখুন :

One response to “পূর্বিতা পুরকায়স্থ-র ছোটগল্প ‘প্রান্তিক’”

  1. Biswajit Mandal says:

    biswajitkabi16@gmail.com
    ভালো লাগলো গল্পটা। গল্পকারকে অভিনন্দন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন