
৫৭. পেশাদার ফটোগ্রাফির জনক লক্ষ্মীনারায়ণ রায়চৌধুরী
বাহওয়ালপুরের (বর্তমানে পাকিস্তানের অন্তর্গত) আমিরের প্রতিনিধি কলকাতায় এসেছেন। কলকাতার ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দেখা ও আলাপ-আলোচনা করতে চান। সেই সময়ে এক বাঙালি যুবকের সঙ্গে পরিচয় হয় আমিরের প্রতিনিধির। তিনি জানতে পারেন যে সেই বাঙালি যুবক ছবি আঁকেন। যুবকের আঁকা কয়েকটি প্রতিকৃতি দেখে মুগ্ধ আমিরের প্রতিনিধি। তাঁর মনে হল এই বাঙালি যুবককে বাহওয়ালপুরে নিয়ে গেলে কেমন হয়! রাজপরিবারের সদস্যদের ছবি আঁকবেন তিনি। সেকথা শুনে বাঙালি যুবকটি রাজি হয়ে গেলেন। মাস ছয়েক পরে তিনি সস্ত্রীক চলে গেলেন বাহওয়ালপুরে। আঁকলেন রাজপরিবারের সদস্যদের ছবি। খুব খুশি রাজপরিবারের লোকেরা। পারিশ্রমিক পেলেন, শংসাপত্র পেলেন। দুটি ডাক টিকেটের ড্রইং আঁকলেন। চিত্রাল, হুনজা, ফুলরা, মাকরান প্রভৃতি রাজপরিবারের ছবি আঁকার ছাড়পত্র পেলেন।
যুবকের নাম লক্ষ্মীনারায়ণ রায়চৌধুরী (১৮৬৬-১৯৩৩)।
হুগলির উত্তরপাড়ার রত্নেশ্বর রায়চৌধুরীর পরিবারে। উত্তরপাড়ার রায়চৌধুরী পরিবারটি ছিল জমিদার সাবর্ন রায়চৌধুরীদের একটি শাখা। লক্ষ্মীনারায়ণের মা-বাবা হলেন মাতঙ্গিনী দেবী ও যদুনাথ রায়চৌধুরী। যখন লক্ষ্মীনারায়ণের বয়েস ষোলো, তখন তাঁর বিয়ে হল তেরো বছর বয়েসী অপূর্বময়ীর সঙ্গে। অপূর্বময়ী কলকাতার পটলডাঙার মুখোপাধ্যায়ের কন্যা। সে পরিবার ব্রাহ্ম পরিবার। সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চা ছিল সেখানে। লেখক ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় ছিলেন অপূর্বময়ীর জ্যাঠামশায়ের ছেলে। লক্ষ্মীনারায়ণের ছবি আঁকার প্রেরণা এই শ্বশুরবাড়ির পরিবার।
আর বাহওয়ালের রাজপরিবার এই চিত্রশিল্পীর গতিপথকে বিস্তৃত করে দেন। বাইরের দেশে গেলে ভাষা একটা বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু লক্ষ্মীনারায়ণের সে বাধা ছিল না। তিনি ইংরেজি, আরবি, ফারসি ভাষা চমৎকারভাবে রপ্ত করেছিলেন। প্রতিকৃতি আাঁকার জন্য তিনি নানা দেশ ঘুরে বেড়ান। তারপর ফিরে আসেন লাহোরে। সেখানকার মেয়ো কলেজের কলা বিভাগের ডিন হন।
আর এই কলেজেই পরিচয় হয় জন উড কিপলিংএর সঙ্গে। কে এই জন উড কিপলিং? ইনি বিখ্যাত লেখক রুডইয়ার্ড কিপলিংএর বাবা। জন উড কিপলিংএর ফটোগ্রাফির নেশা ছিল। স্টুডিয়ো ছিল। সেখানে যাতায়াত শুরু করলেন লক্ষ্মীনারায়ণ। ফটোগ্রাফির নেশা ধরল তাঁর।
বেলো লেন্স ক্যামেরা কিনলেন। ভাড়াবাড়ির একটা ঘরকে বানালেন ডার্করুম। প্রতিষ্ঠা করলেন ‘রায়চৌধুরী অ্যাণ্ড কোম্পানি—ফটোগ্রাফার অ্যাণ্ড আর্টিস্ট’। হ্যাঁ, এটি বাঙালির প্রথম পেশাদার ফটোগ্রাফির প্রতিষ্ঠান। লক্ষ্মীনারায়ণের নাতি, হাংরি আন্দোলনের অন্যতম নায়ক মলয় রায়চৌধুরী স্মৃতিচারণায় লিখেছেন :
‘জন লক উড কিপলিংএর বাড়িতে ও দফতরে কাজ করার সময়ে লক্ষ্মীনারায়ণ পরিচিত হন নতুন উদ্ভাবিত ফটো তোলার ক্যামেরার সঙ্গে। ১৮৩০ সালে লুই ড্যাগোরো ক্যামেরা আবিষ্কার করেছিলেন। কিন্তু সেটিতে একেবারে কেবল একটিই ফটো তোলা যেত, সেই ফটোকে নুনজলে চুবিয়ে স্থায়িত্ব দেওয়া হত। কিন্তু কিছুকাল পরে তা হলদেটে হয়ে যেত। ১৮৪১ সালে ফক্স ট্যালবট আবিষ্কার করেন ক্যালোটাইপ প্রক্রিয়া। ক্যালোটাইপের মাধ্যমে একাধিক ফটো প্রিন্ট করা সম্ভব হতে লাগল, কিন্তু তখনও কাগজে। ১৮৮০ সাল নাগাদ ভারতে জিলেটিন প্রক্রিয়ায় ফটো তোলার কৌশল এসে পৌঁছায় প্রধানত ব্রিটিশ ফটোগ্রাফারদের মাধ্যমে। এই প্রক্রিয়ায় কোলেডিয়ান প্রক্রিয়ার বদলে জিলেটিনের শুকনো প্লেট ব্যবহার করা হত—কাচের প্লেটের উপর লাগানো সিলভার হ্যালিডেসের ফটোর রসায়ন। নতুন বেলোলেন্স ক্যামেরাও এই সময়ে আবিষ্কার হয়। হারমোনিয়মের যেমন বেলো হয়, বেলোলেন্স ক্যামেরাতেও তেমন বন্ধ আর খোলার ব্যবস্থা ছিল।
‘দাদু ফোটোগ্রাফি শিখতে লাগলেন। কিন্তু নতুন কাজের জন্য ডার্করুমের দরকার পড়ল। লক্ষ্মীনারায়ণ একটি বেলোলেন্স ক্যামেরা, ক্যামেরার তিন-ঠেঙে স্ট্যাণ্ড কিনে ১৮৮৬ সালে লাহোরে স্থায়ী ব্যবসা আরম্ভ করলেন।’
জীবনের শেষপর্বে লক্ষ্মীনারায়ণ ফিরে এসেছিলেন উত্তরপাড়ায়। ফটোগ্রাফির ব্যবসা শুরু করেছিলেন নিজের দেশে। কিন্তু একদিন দ্বারভাঙার মহারাজের ডাক এল। সপরিবারে পাটনা এলেন তিনি। কিন্তু আর ফিরে যেতে পারলেন না। হৃদরোগে মৃত্যু হল তাঁর।
আক্ষেপ করে মলয় রায়চৌধুরী লিখেছেন :
‘রাজা দীন দয়াল ও ব্রিটিশ ফোটোগ্রাফারদের যে ইতিহাসবোধ ছিল, তা দাদুর ছিল না। তিনি কিছুই সংরক্ষণ করা প্রয়োজন মনে করেন নি। দাদুর সম্পর্কে তাই কোন উল্লেখ পাওয়া যায় না দীপালি দেওয়ান, ডেবোরা হাটন, জুডিথ গিটম্যান, নরেন্দ্র লুথার, সিদ্ধার্থ ঘোষ প্রমুখের বইতে।’