Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রথ নিয়ে বাংলা প্রবাদ ও তার সামাজিক তাৎপর্য : অসিত দাস মৌসুমী মিত্র ভট্টাচার্য্য-র ছোটগল্প ‘গোধূলির চিতায়’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ এনকাউন্টার : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘ফুলমনির মাঠ’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শুনুন নেতাজি সুভাষ, শুনছেন — : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলতলার ঝগড়ার ‘কলতলা’ ছিল জলের কল আসার অনেক আগেই : অসিত দাস মাড়ির অসুখ থেকে সাবধান সুগার ও প্রেগন্যান্সিরা! হতে পারে ক্যান্সার : ডাঃ পিয়ালী চট্টোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘সাড়ে তিন হাত বারান্দা’ গুণ্ডা দমন, মন উচাটন, আসছে শমন, বাপ রে বাপ : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ‘একা এক নারী’র জয়, পরাজয় এবং… : দিলীপ মজুমদার ভরতমুনির নাটকের ডিম ও ঘোড়ার ডিম : অসিত দাস পাণিহাটির মহোৎসব : স্বামী সারদানন্দ শিবশঙ্করের জীবনানন্দ দর্শন : জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ব্যক্তিস্বাধীনতা পগার পার, বললেন বিচারক জামদার : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মঙ্গল কাব্যে কারিগরি পণ্য এবং হাতিয়ার : ড. ললিতা ঘোষ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শতবার্ষিকী মুক্তি পত্রিকা ও জাতীয় মুক্তি আন্দোলন : ড. দয়াময় রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘রাত পাহারা’
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

বারপুজো, বাঙালীয়ানা এবং বহমানতা : যীশু নন্দী

যীশু নন্দী / ১২৭৯ জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৪

বাংলা নববর্ষ ১৪৩১ বিশেষ সংখ্যার লেখা।

কলকাতা ময়দানে শুধু ফুটবল-ক্রিকেট-হকিই খেলা হয়না, সেখানে জুড়ে থাকে বাঙালীয়ানা। ভাঁড়ের চা দিয়ে শুরু হয় ময়দানের সকাল, শেষ হয় বিকেলের লেবু চায়ে। ঠোঙাবাদাম, ফুটবল, ক্রিকেট ছাড়াও ময়দানি জৌলুসকে রঙীন করে রেখেছে পয়লা বৈশাখের বারপুজো। পয়লা বৈশাখ প্রায় সম্মুখ দ্বারে উপস্থিত, ময়দানের ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান, মহামেডান, ভবানীপুরের মতো ক্লাবগুলোতে বারপুজোর প্রস্তুতি তুঙ্গে। গেলোবার বারপুজোর দিন মোহনবাগান ক্লাবে চুনী গোস্বামী নামাঙ্কিত গেট উদ্বোধন করা হয়। উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং সুনীল গাভাস্কার। তার আগের বছরেও বেশ জাঁকজমক ভাবেই ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান ক্লাবে অনুষ্ঠিত হয়েছিলো বারপুজো।

বারপুজো সম্বন্ধে জানতে গেলে প্রথমেই জানতে হবে বারপুজো ঠিক কী। প্রতি বছর পয়লা বৈশাখ ময়দানের ক্লাবগুলিতে ক্রসবারকে ফুল দিয়ে সাজিয়ে এবং কখনও একটি ফুটবলকে সামনে রেখে পুজো করা হয়। বিশ্বাস করা হয় পুজো করলে সামনের মরশুম ক্লাবগুলির জন্য ভালো হবে এবং গোল করার ক্ষেত্রে বারপোস্ট অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবেনা; একেই ময়দানি ভাষায় বারপুজো বলা হয়। ঠিক কবে থেকে এই বারপুজোর শুরু হয়েছিলো তা বলা মুশকিল। তবু আন্দাজ করা যায় ষাটের দশকের শেষের দিকে সম্ভবত এই বারপুজোর প্রচলন।

সত্তর দশকে বারপুজোর জাঁকজমকতা ছিলো চোখে পড়ার মতো। আশির দশকেও তা ছিলো বর্তমান। মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে বারপুজো বললেই যে দুই প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্বের নাম না নিলে হয়না, তাঁরা হলেন — ধীরেন দে এবং জ্যোতিষ গুহ। ধীরেন দে ছিলেন প্রবল ব্যক্তিত্বের অধিকারী, বেশীরভাগ সময়ই পরনে থাকতো কোট-প্যান্ট। কিন্তু বারপুজোর দিন গরদের ধুতি পরে ক্লাবে আসতেন তিনি। ধুতি আর অঙ্গবস্ত্র পরে মোহনবাগান ক্লাবে সংকল্প করতেন ধীরেন দে আর পুজো শেষে ক্লাবের একমুঠো অর্থ মালিদের হাতে তুলে দিতেন। তাঁর সঙ্গে থাকতো চার আনা, আট আনার কয়েন। ঐদিন তিনি ফুটবলারদের চার আনা আর আট আনার কয়েন দিতেন স্মারক হিসাবে, কাছের ফুটবলারদের দিতেন রূপোর কয়েন। তাঁর হাত থেকে কয়েন পাওয়া মানে ছিলো এক বিশাল ব্যাপার। এ ব্যাপারে প্রখ্যাত ফুটবলার মানস ভট্টাচার্যের কিছু কথা তুলে ধরা যাক— “আমরা তখন হাঁ করে বসে থাকতাম কবে পয়লা বৈশাখ আসবে। আবার নিজেদের মাঠে বল নিয়ে নামব। বারপুজো হয়ে গেলে আমরা ফুটবলাররা দুটো দলে ভাগ হয়ে ম্যাচ খেলতাম। সভ্য-সমর্থক মিলিয়ে প্রচুর দর্শক হত। একেবারে হাড্ডাহাড্ডি ম্যাচ। রেফারি হতেন কোচ। খুব মজা হত সেই ম্যাচে। আসলে মন ভাল করা সকালে সবকিছুই ভীষণ ভাল লাগত সেদিন।”

উলটো দিকে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে বেশ জাঁকজমক করে বারপুজো করতেন জ্যোতিষ গুহ। পরবর্তীকালে নৃপেন দাস, পল্টু দাসেরাও সেই ধারা অক্ষুণ্ণ রেখেছিলেন। বারপুজো হতো মহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবেও। এমনকি ময়দানের কিছু ছোটো ক্লাব, যেমন — খিদিরপুর ক্লাব, উয়ারী ক্লাবও নিজেদের সাধ্যমতো বারপুজো করতো। খিদিরপুর ক্লাবের পাশেই ছিলো বিড়লা ক্লাব। সেখানে আড্ডা দিতেন একসময়ের গোলকিপার তৈরীর কারিগর পটা গুপ্ত ও তার ভাই বুড়ো গুপ্তো। পটা গুপ্ত সারাবছর হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের স্টাইলে হাফ হাতা শার্ট আর ধুতি পরতেন। সকালে শুধু জামাটা খুলে ধুতি পরেই গোলকিপিংয়ের নানা টেকনিক শেখাতেন। সেখানেও পয়লা বৈশাখ কালীঘাট মন্দিরে পুজো দিয়ে আসা হতো। বিড়লা তাঁবুর বাইরে রান্না হতো। পটাদা নিজেই রান্না করতেন। কাঁটা চচ্চড়ি, মাংস, ভাত-সহ বিভিন্ন বাঙালী পদ থাকতো সেখানে। পুরুষ ও মহিলা ফুটবলারেরা একসাথে খাওয়া দাওয়া করতেন। ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে আবার বারপুজোয় খাওয়ানো হতো রসগোল্লা আর শরবত। মোহনবাগান ক্লাবে তো রীতিমতো ভিয়েন বসতো। থাকতো লুচি, আলুরদম, পান্তুয়া, দরবেশ প্রভৃতি। ছয়ের দশকে লিগের প্রথম ম্যাচ শুরু হতো ৯ বা ১০ ই মে তে। এপ্রিলের মধ্যেই মরশুম শেষ হয়ে যেতো। আগের মরশুমের বারপোস্ট তুলে রাখা হতো। সেই বারপোস্টে সাদা রঙ করে প্রস্তুত করা হতো বারপুজোর জন্য। সেসময় চৈত্র মাসের মধ্যেই সমস্ত ফুটবলারদের সই করিয়ে নিতো ক্লাবগুলো। পয়লা বৈশাখ ফুটবলার, কর্মকর্তা, মাঠের পরিচারক এবং মালিরা মিলে সবাই উপস্থিত হতেন ক্লাবে। ফুল দিয়ে সাজানো বারপোস্টকে ঘিরে থাকতেন কিছু রক্ষী, পাছে কেউ বারপোস্ট টপকে যেতে না পারে। মনে করা হতো বারপোস্ট টপকে যাওয়া ক্লাবের জন্য অমঙ্গল। কালীঘাট থেকে পুরোহিত আনা হতো। তবে বারপুজোর দিন ঠিক কোন দেবতা বা দেবীর পুজো হতো তা নিয়ে দ্বিমত আছে। পুজো শেষ হলে মাঠের দুইদিকে ক্রসবার প্রোথিত হতো। শুধু কর্মকর্তা নয়, বারপুজো উপলক্ষে ব্যস্ত থাকতেন মাঠের মালিরাও। এপ্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে ইস্টবেঙ্গলের শঙ্কর মালির কথা। খেলোয়াড়দের কাছে শঙ্কর মালি ছিলেন পিতৃসম। খেলোয়াড়দের নিজের ছেলের মতো আগলে রাখতেন শঙ্কর মালী। খেলোয়াড়েরাও তাঁকে ডাকতেন “বাবা” বলে। এই শঙ্কর মালিও অতীব ব্যস্ত থাকতেন বারপুজোর আগে।

মোহনবাগানে ৭৭’ সালের বারপুজো ছিলো বেশ জমকালো, ঐ বছর গৌতম সরকার, শ্যাম থাপারা ক্লাবে যোগ দিয়েছিলেন কিনা। তাদের দেখার জন্য ক্লাবে জমা হয়েছিলো উপচে পড়া মানুষের ভিড়। এমনকি ৭৯’ সালেও জেভিয়ার পায়াস যেবছর মোহনবাগানে এলেন, সেই বছরেও বারপুজোর সময় প্রচুর সমর্থকের সমাগম হয়েছিলো ক্লাবে। অন্যদিকে ১৯৮০ সালে ইস্টবেঙ্গলের বারপুজোয় সভ্য সমর্থকেরা তুমুল ভিড় করে, আর সেই ভিড়ের মধ্যমণি ছিলেন সদ্য ক্লাবে যোগ দেওয়া সুদর্শন, সুঠাম দেহগঠনের এক ইরানিয়ান বিশ্বকাপার, ময়দান যাকে আজও সমীহ করে — মজিদ বাসকার। ঐ বছর আরেক ইরানিয়ান ফুটবলার জামশিদ নাসিরিও ইস্টবেঙ্গলে যোগদান করেন, চারবছর মোহনবাগানে কাটিয়ে ইস্টবেঙ্গলে সেবার প্রত্যাবর্তন করেন কোচ পিকে ব্যানার্জি, ফুটবলার মহম্মদ হাবিব।

ষাট-সত্তর-আশি দশকের বারপুজো নিয়ে এখনও নস্টালজিক হয়ে পড়েন ময়দানের প্রাক্তন ফুটবলারেরা। এ প্রসঙ্গে ময়দানের দুই বিখ্যাত ফুটবলারের স্মৃতিচারণ তুলে ধরবো। প্রথম জন ভারতবিখ্যাত খেলোয়াড় সুকুমার সমাজপতির—”আমি তো এদিন ধুতি-পাঞ্জাবি পরে যেতাম। মোহনবাগানে আসার আগে এক বছর আমি এরিয়ানে খেলেছি। সেখানে এত জাঁকজমক করে বারপুজো হতো না। কিন্তু বড় ক্লাবগুলোতে খেলোয়াড়দের উপস্থিতি ছিল অবশ্যকর্তব্য। এরিয়ান থেকে যাই মোহনবাগানে, তখন তো এজমালি মাঠ—একই মাঠে মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল। মাঠের উত্তরদিকটা ছিল মোহনবাগানের আর দক্ষিণদিক অর্থাৎ ফোর্ট উইলিয়ামের দিকটা ইস্টবেঙ্গলের। মনে আছে, মোহনবাগানে তখন পুরুতঠাকুর ছিলেন বেশ নাদুসনুদুস চেহারার, ফরসা গায়ের রং। পুজোর পর আমরা সবাই মিলে পোস্টটাকে তুলে সোজা করে পুঁততাম। এরপর শুরু হতো খাওয়া-দাওয়া, মিষ্টির একেবারে ছড়াছড়ি! মনে আছে, ভিয়েন বসত। সে যে কত রকমের মিষ্টি! তবে দুই প্রধান ছাড়াও ভবানীপুর এবং সাদার্ন সমিতিতে বারপুজো বেশ হতো। এই দিন ময়দানি ঝগড়ার কোনো রেশ থাকত না—যদিও আমাদের দুটো ক্লাবের মাঝখানে একটা কাঁটাতারের বেড়া ছিল। ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের ফুটবল সেক্রেটারি তখন মন্টু ঘোষ। মোহনবাগান ক্লাবের ফুটবল সেক্রেটারি ছিলেন বাগবাজার সেনবাড়ির ছেলে কেষ্ট সেন। উনিই এরিয়ানে আমার খেলা দেখে মোহনবাগানে নিয়ে আসেন। এরিয়ানে আমি কিছু খেলায় দর্শক থেকে কর্মকর্তা অনেকেরই চোখে পড়েছিলাম। সেসময়ে কলকাতা লিগ শুরু হয়ে যেত মে মাসের প্রথম সপ্তাহে। আমাদের খেলা পড়ত সাধারণত প্রথম সপ্তাহের শেষের দিকে বা দ্বিতীয় সপ্তাহের শুরুতে। এই কদিনের প্র্যাকটিসে স্বাভাবিকভাবেই লিগ খেলা যায় না। সে-কারণে আমাদের ‘আনঅফিশিয়ালি প্র্যাকটিস’ শুরু হতো এপ্রিলের শুরুর দিকে…।”

আর দ্বিতীয় জন ‘ময়দানের বেকেনবাওয়ার’ খ্যাত গৌতম সরকারের —”বারপুজো মানেই দারুণ স্মৃতি। সেসব দিন আর কোথায়! ধীরেন দে এই দিনে সকলকে স্মারক হিসাবে ২৫ পয়সা নগদ উপহার দিতেন। আমি সেই সমস্ত পয়সা যত্ন সহকারে এখনও রেখে দিয়েছি। ওঁর মত ক্লাব কর্তা আর আসবে না।”

নব্বই দশকে জাতীয় লিগ শুরু হবার পর ময়দানের মরশুম শুরু হতো বর্ষাকালে। বারপুজোর জৌলুসও কমতে থাকে। আর এখন হয়তো বারপুজো ঘিরে সভ্য সমর্থকদের উন্মাদনা আগের মতো নেই, কিন্তু তবুও নববর্ষের দিনে বেশ হইহই করেই বারপুজো হয় ময়দানের ক্লাবগুলিতে। আমাদের কৈশোর জীবনে দেখতাম ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে বারপুজোর দিন হাজির হতেন মেহতাব, নবি, সৌমিকরা, অপরদিকে ওডাফা, শিল্টনেরাও মোহনবাগান তাঁবুতে হাজির হতেন বইকি। ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে পালা করে অধিনায়কের নাম ঘোষণা করা হতো বারপুজোর দিন। করোনার সময় দুই ক্লাবে বারপুজো হয়নি তেমনভাবে। তবে অতিমারি কাটিয়ে উঠে দুই ক্লাবেই বেশ জমকালো করে বারপুজোর আয়োজন হয়েছিলো। ২০২২ সালে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে বারপুজো শুরু হয়েছিলো সকাল ৭টা ৫০এ, মোহনবাগান ক্লাবে সকাল ৯ টায়, ছিলো খাবারের এলাহি ব্যবস্থা। মোহনবাগান তাঁবুতে আয়োজন করা হয়েছিলো গানের আসর,কবিতা পাঠ, প্রাক্তনীদের সপরিবারে মিলনমেলা। ২০২৩ এও দুই ক্লাবে জমকালোভাবে বারপুজো হয়। ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, মোহনবাগান ক্লাবে এসেছিলেন স্বয়ং সুনীল গাভাস্কার, ছিলেন মোহনবাগানপ্রেমী বাবুল সুপ্রিয়। সত্তর দশকে একবার বোধহয় বারপুজোর আগে পুরোহিতকেও হাইজ্যাক করা হয়েছিলো, সেই থেকে বারপুজোর সময় পুরোহিতের নাম সম্ভবত আগে থেকে কাউকে জানানো হয়না। নেতা, অভিনেতা, ফুটবলার, সমর্থক, কর্মকর্তা, মাঠের পরিচারক-পরিচারিকাগণ — সবাইকে মিলিয়ে দেয় যে অনুষ্ঠান, তার নামই ‘বারপুজো’।

অধুনা ভারতীয় ফুটবলে কর্পোরেট কালচারের আগমনেও বারপুজোর পরম্পরা একেবারেই কিন্তু নিভে যায়নি। আসলে আধুনিকতা আর বনেদিয়ানা একে অপরের হাত ধরে চললে আট থেকে আশি সবাই তাকে সাদরে গ্রহণ করে।ইংলিশ ক্লাব আর্সেনালে শুনেছি এখনও নাকি তাদের অধিনায়ক ঠিক করে দেন বাকী খেলোয়াড়েরা ম্যাচের দিন ফুলস্লিভ জার্সি পরবে না হাফ স্লিভ। বায়ার্ন মিউনিখ নাকি এখনও তাদের কোনো খেলোয়াড়কে ১২ নম্বর জার্সি দেয়না কারণ তারা মনে করে তাদের ১২ নম্বর খেলোয়াড় সমর্থকেরাই। টটেনহাম হটস্পার হয়তো এখনও মাঠে নামার আগে ক্লাবের সংগীত গেয়ে মাঠে নামে,এসি মিলান হয়তো এখনও জার্সিতে কালো ব্যান্ড আর তাতে ক্লাবের ক্রেস্ট লাগিয়ে মাঠে নামে।আমাদের ময়দানেও তো একসময় বিদেশি খেলানোর চল ছিলোনা। সেই বহুযুগ আগে ইস্টবেঙ্গল বার্মা রিফিউজি পাগসলেকে খেলায়, মোহনবাগান খেলায় নাইজেরিয়ান চিমাকে, ট্র‍্যাডিশনের আধুনিকীকরণ এটাও নয় কি!

হুগলি শ্রীরামপুর-এর একটি ক্লাবের বারপুজো

নিয়ম ভেঙে যায়। নিয়ম এসেও যায়। ভাঙাগড়ার খেলা চলতেই থাকে। কিন্তু সব খেলাকে বুকে জড়িয়ে আজও কলকাতা ময়দান, সাগরের মতো উন্মুক্ত। ঐতিহ্যকে মেনে চলতে তার কোনো বাধা নেই। আধুনিকতাকে গ্রহণ করতেও তার আপত্তি নেই। আর তাই বোধহয় ময়দান আজও শাশ্বত। কর্পোরেটাইজেশন চলতে থাকুক, নূতন ইনফ্রাস্ট্রাকচারে ছেয়ে যাক ময়দানি ক্লাব কিন্তু সে যেন ভুলে না যায় তার পরম্পরাকে, তার ঐতিহ্যকে, তার বারপুজোকে। বারপুজো ময়দানি সংস্কৃতির এক বহমানতা। প্রতিবছর বারপুজো বোধহয় নতুন করে আঁকড়ে ধরতে শেখায় ট্র‍্যাডিশনকে, স্প্যানিশ-ফ্রেঞ্চ-অজি-আফ্রিকানদেরও খানিকটা বাঙালী করে দেয় বইকি!

তথ্যঋণ — (১) শান্তিরায়চৌধুরীর লেখা আর্টিকেল, (২) দেবাশিস সেনগুপ্তের লেখা আর্টিকেল, (৩) বিবিধ অনলাইন পোর্টাল।


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন