
হাওরের বিশাল জলরাশির বুকে জেগে থাকা ছোট্ট শান্ত এক গ্রাম গিরিধরপুর। বর্ষায় যখন চারদিক অথৈ পানিতে ডুবে যায়, তখন দূর থেকে গ্রামটিকে মনে হয় যেন অগাধ সাগরে ভাসমান এক টুকরো সবুজ দ্বীপ। সেখানে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামের দূরত্ব মাইলের পর মাইল। যোগাযোগের একমাত্র অবলম্বন বলতে শুধুই কাঠের ডিঙি নৌকা। প্রাকৃতিক এই বিচ্ছিন্নতার মাঝেই গ্রামের একদল শিক্ষানুরাগী মানুষ মিলে গড়ে তুলেছিলেন একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। সবুজ দ্বীপের মতো গ্রামটিতে অবস্থিত এই বিদ্যালয়টির সানবাঁধানো ঘাটে বর্ষায় হাওরের জলের ঢেউ এসে ছুঁয়ে যায়, আর শুষ্ক মৌসুমে চারপাশ রূপ নেয় এক স্নিগ্ধ উর্বর সবুজ মাঠে। বিদ্যালয়ের চত্বরে রয়েছে পুরোনো আম, কাঁঠাল ও কৃষ্ণচূড়া গাছ। আশপাশের দশ গ্রামের মধ্যে কাছাকাছি কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় না থাকায়, বর্ষাকালে ডিঙিনৌকায় চড়ে এবং শুষ্ক মৌসুমে ছোট ছোট বাঁশের সাঁকো ও মেঠোপথ পেরিয়ে বহু দূর থেকে আসা শিক্ষার্থীদের কলকাকলিতে মুখরিত থাকে গাছের ছায়ায় ঘেরা এই স্কুল। এখানেই খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন বিকাশ নামে এক তরুণ। সদ্য এমএ পাস করা বিকাশের চোখে খেলা করে একরাশ স্বপ্ন আর আচরণে এক অদ্ভুত মায়াবী নম্রতা। বিকাশের বিনয়ী ব্যক্তিত্ব খুব দ্রুতই ছাত্র-ছাত্রীদের মন জয় করে নিল।
এই স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্রী মিতালি। রূপের চেয়েও তার চোখে ছিল এক স্নিগ্ধ মায়াবী হরিণীর চপলতা। বিকাশের ক্লাসে মিতালি যখন একদৃষ্টিতে ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে তাকিয়ে থাকত, তখন তার চোখের কোণে পড়াশোনার চেয়ে শিক্ষক বিকাশের প্রতি মুগ্ধতাই প্রকাশ পেত বেশি। বিকাশের মনও যে মিতালির দিকে টানেনি, তা নয়। শরতের শিউলিঝরা সকালের মতো এক পবিত্রময় প্রণয় জন্ম হয়েছিল বিকাশের বুকেও। কিন্তু লোকলজ্জা আর শিক্ষকের মর্যাদার দেয়ালে কেউ কারও মনের ভাব প্রকাশ করতে পারছিলেন না। অবশেষে সেই নীরবতার অবসান ঘটে বিকাশের লজিং বাড়ির এক মাঝবয়সী ভদ্রমহিলার মাধ্যমে। ঘটকালি নয়, বরং দুজনের মনের অব্যক্ত ভাষা বুঝতে পেরে তিনি হয়ে উঠলেন তাদের নীরব পাহারাদার। এরপর থেকে লজিং বাড়ির সেই নিভৃত কোণে চলত দুজনের লুকিয়ে দেখা করা। কখনো পড়ন্ত বিকেলে, কখনো গোধূলির আলো-ছায়ার খেলায় পাশাপাশি বসে হাতে হাত রেখে কেটে যেত ঘণ্টা। একদিন নিটোল আনন্দের এক দুপুরে মিতালির ঘন কালো রেশমি চুলগুলো পরম মমতায় বেণি করে দিলেন বিকাশ। মিতালির লজ্জাবনত লাল হয়ে ওঠা মুখে নিজের হাতে তুলে দিলেন দু-মুঠো অন্ন। সেই ক্ষণে বিকাশ মিতালির চোখে চোখ রেখে বলেছিলেন, “মিতু, অন্য একটা বড় স্কুলে আমার চাকরি হয়ে যাবে। আমি হয়তো চলে যাব এই গ্রাম ছেড়ে। কিন্তু তুমি আমার জন্য অপেক্ষা কোরো। ফিরে এসে আমি তোমাকে নিজের করে নিয়ে এক সুখের সংসার গড়ব।” মিতালি কোনো কথা বলেনি, শুধু চোখের ভাষায় সঁপে দিয়েছিল নিজের অস্তিত্ব।
এরপর মিতালি বেশ কিছুদিন স্কুলে এলো না। ঠিক সেই অনুপস্থিতির দিনগুলোতেই বিকাশের চাকরি হয়ে গেল শহরের এক নামী স্কুলে। সুযোগ-সুবিধা অনেক ভালো, ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। মিতালির সাথে দেখা করার তীব্র আকুলতা থাকলেও সময়ের অভাবে আর দেখা হলো না। যাওয়ার আগে বিকাশ লজিং বাড়ির ভদ্রমহিলার কাছে নিজের শহরের ঠিকানা রেখে গেলেন। আর বলে গেলেন, “কয়েকটা মাস পরেই আমি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসব। মিতালিকে বলবেন সে যেন ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে।”
কেটে গেল অনেকগুলো মাস। শহুরে জীবনের ব্যস্ততা আর দীর্ঘ টিউশনির ক্লান্তিতে মিতালির সাথে কোনো যোগাযোগ করতে পারেননি বিকাশ। দিন-রাত এক করে টিউশনির প্রতিটি পয়সা জমিয়েছেন শুধু একটি লক্ষ্যে — রূপবতী মিতালিকে ঘরের লক্ষ্মী করে আনবেন। একসময় অপেক্ষার অবসান হলো। হেমন্তের কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে, সোনালি ধানের গন্ধ মাখা মেঠোপথ ধরে পায়ে হেঁটে দীর্ঘ রাস্তা পাড়ি দিয়ে বিকাশ পৌঁছালেন তার পুরোনো কর্মস্থল গিরিধরপুর স্কুলে। প্রতিটি মুহূর্ত বুক ঢিপঢিপ করছে আনন্দের আতিশয্যে। উল্লাসিত হয়ে স্কুলের কেরানির ঘরে ঢুকে সরাসরি জানতে চাইলেন, “ভাই, মিতালির ঠিকানাটা দিন! আমি ওকে বিয়ের প্রস্তাব দিতে এসেছি।” বিকাশের উচ্ছ্বাসমাখা কথা শুনে কেরানিবাবু থমকে গেলেন। ঘরের ভেতরের কলরবের মাঝে এক নিরেট নীরবতা নেমে এলো। বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কেরানি বললেন, “আপনি আর মিতালিকে খুঁজতে যাইয়েন না স্যার। ওর বিয়ে হয়ে গেছে। সে এখন অন্য ঘরে… ভালোই আছে।” কথাটা যেন তপ্ত শেলের মতো বিকাশের বুকে বিঁধল। চোখের কোণ বেয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ল। কিন্তু সেই কান্নার জল মুহূর্তেই রূপ নিল তীব্র রাগে আর ক্ষোভে। অভিমানে অন্ধ হয়ে মিতালিকে মনে মনে অভিশাপ দিতে দিতে স্কুল থেকে বেরিয়ে রওনা দিলেন পুরোনো লজিং বাড়ির উদ্দেশ্যে।
দুপুরের চড়চড়ে রোদে গ্রামের চারপাশ যেন এক মায়াবী স্তব্ধতায় থমকে আছে। বহুদূর থেকে ভেসে আসা রাখালের বাঁশির করুণ সুর যেন বিকাশের বুকে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসেরই প্রতিধ্বনি, যা মিতালির অসীম শূন্যতাকে আরও ভারী ও অসহ্য করে তুলেছে। খুব বেশি দূরে নয়, তবুও রাস্তা দীর্ঘ মনে হচ্ছে। লজিং বাড়ির ভদ্রমহিলা মাটির বারান্দায় মাদুর পেতে মধ্যাহ্নভোজ করছেন। বাড়িতে প্রবেশ করলেন বিকাশ। দীর্ঘদিন পর প্রিয় বিকাশকে দেখে ভাতের থালা হাতেই হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে গেলেন তিনি। কিন্তু দূর থেকেই বিরহকাতর বিকাশ কান্নাভেজা, ভাঙা গলায় চিৎকার করে বললেন, “মাসিমা, এটাই আমার শেষ আসা, আমি আর কোনো দিন আসব না! আমার সব স্বপ্ন ধুলোয় মিশে গেছে। মিতালি একটা বেইমান! ও আমার কথা রাখেনি, অন্য কোথাও বিয়ে করে নিয়েছে!” বিকাশের মুখের এই কথা শুনে ভদ্রমহিলার হাত থেকে ভাতের থালাটি ঝনঝন করে মাটিতে পড়ে গেল, অন্নগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেল ধুলোয়। আকুল হয়ে বললেন, “বিকাশ, বাবা ঘরে আয়, শোন…” কিন্তু বিকাশ ততক্ষণে পেছন ফিরেছেন। ভেজা চোখ, ভাঙা মন নিয়ে গিরিধরপুর ছাড়লেন।
সময়ের চাকা ঘুরতে ঘুরতে পার হয়ে গেল সুদীর্ঘ বছর। বিকাশ মাস্টারের বয়স ষাট ছুঁইছুঁই। মাথার চুল আধা-পাকা, কপাল আর চোখের কোণে বয়সের গভীর ভাঁজ। জীবনের সব রং হারিয়ে তিনি এখন বৃদ্ধ। শীতের সকাল, বাসার পাশে এক চায়ের দোকানে বসলেন বিকাশ। গায়ে জরাজীর্ণ চাদর, ঠোঁটে জ্বলন্ত সিগারেট। সিগারেটের ধোঁয়া ওড়াতে ওড়াতে পাশে বসা অপরিচিত এক ভদ্রলোকের সাথে আলাপ জমল। কথার পিঠে কথা ওঠার একপর্যায়ে ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন, “গিরিধরপুর চেনেন? মিতালি নামের কাউকে চিনতেন আপনি?” ‘মিতালি’ নামটা শোনা মাত্রই বিকাশ মাস্টারের বুকের ভেতর যেন ভূমিকম্প হয়ে গেল। হাত কাঁপতে কাঁপতে মুখ থেকে সিগারেটটা পড়ে গেল মাটিতে। বৃদ্ধ বিকাশের চোখ নিমেষেই অশ্রুতে টলমল করে উঠল। কয়েক দশকের জমাট বাঁধা ক্ষোভ উগরে ভেজা কণ্ঠে বললেন, “চিনব না? ও একটা বেইমান! আমাকে ঠকিয়ে অন্য কাউকে বিয়ে করেছে। ও কোথায় আছে? আমি ওর মুখোমুখি হতে চাই। জানতে চাই — কেন বেইমানি করেছিল?”
বিকাশ মাস্টারের কথা শুনে সেই অপরিচিত ভদ্রলোক স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তারপর এক বুক বিষাদ নিয়ে বললেন, “ভুল বুঝে আছেন মাস্টার মশাই। মিতালি আমার পাশের বাড়ির। সে বেইমান নয়। আপনি গিরিধরপুর ছাড়ার পর মিতালি কীটনাশক খেয়ে আত্মহত্যা করেছে!” কথা শুনে বিকাশ মাস্টার পাথরের মতো জমে গেলেন। ভদ্রলোক বলতে থাকলেন, “থানা-পুলিশ আর কলঙ্কের ভয়ে গ্রামের লোকজন রটিয়ে দিয়েছিল মিতালির দূরে কোথাও বিয়ে হয়ে গেছে, সে ভালো আছে। কিন্তু আত্মহত্যা করা মিতালির নিথর দেহের মুঠো করা হাতে একটা চিরকুট পাওয়া গিয়েছিল। সেখানে লেখা ছিল —‘বাবা, সে শহরের একটা স্কুলে চাকরি পেয়েছে। ফিরে আসলে বলে দিও — আমি তার জন্য অপেক্ষা করতে পারলাম না।’ গ্রামের অনেকেই তখন সেই চিরকুট পড়েছিল। সেই সূত্রেই আপনাকে চিনি।” ভদ্রলোক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “একমাত্র মেয়ে মিতালির শোক সইতে না পেরে তার বাবা-মা গ্রাম ছেড়ে নিরুদ্দেশ হয়েছেন। কেউ জানে না তারা কোথায়। যে মাটির বুকে মিতালি চিরনিদ্রায় ঘুমিয়ে ছিল, কয়েক বছর আগের প্রলয়ংকরী নদীভাঙনে জায়গাটুকুও নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে। আজ তার কোনো চিহ্নও অবশিষ্ট নেই।”
সুদীর্ঘ বছর পর পরম সত্যটা জানতে পেরে বিকাশ মাস্টার ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন শূন্যতার দিকে। মুখে কোনো কথা নেই, প্রকাশের কোনো ভাষা নেই। তার কোটরাগত চোখ বেয়ে প্রবীণ অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়তে লাগল।
লিখেছেন : ফারুকুর রহমান চৌধুরী, গীতিকার, বাংলাদেশ বেতার।