| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১০০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ হেদুয়া ছিল ঘোড়াদের স্নান করানোর পুকুর তথা হয়দহ : অসিত দাস SIR — গণতন্ত্র হরণ? চুপ! আদালত চলছে : সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘সাঁজালের আগুন’ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘রঙিন ছাতার রহস্য’ বর্ণ বিদ্বেষ, হেনস্থা, উত্তর-পূর্বে ক্ষোভ : পান্নালাল রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ জয়ন্ত দে-র ছোটগল্প ‘সংসারযাত্রা’ রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের লক্ষ্যে কার্যকরী উদ্যোগ : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৭/২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পাষাণকন্যার পুনরুত্থান — পৌরাণিক অহল্যা ও বর্তমান সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি : রিঙ্কি সামন্ত শিল্পী সোমনাথ হোর : যোগেন চৌধুরী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৭/১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মহাবিশ্বের ব্ল্যাকহোলের সন্ধানে দুই বাঙালি পদার্থবিজ্ঞানী : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার বিস্মৃতপ্রায় শিশুসাহিত্যিক যোগীন্দ্রনাথ সরকার : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৫/৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ফ্রানস বালথাজার সলভিনস ও উত্তর কলকাতার ঘোড়ার সহিস : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৫/২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার জনসংযোগের বিপণনে দুর্গোৎসব : পান্নালাল রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৫/১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আকাশ প্রদীপ — পুরাণ, ভক্তি ও বিশ্বাস : যশোবন্ত রায় ৮১ বছরে জাতিসংঘ: সবার প্রত্যাশা পূরণে কতটা সক্ষম? : নিকোলাস বিশ্বাস বোধিসত্ত্ব সঞ্জয়-এর ছোটগল্প ‘স্যার’ কুমারটুলির সহিসমহল্লা ও দেবী দুর্গার বাহন ঘোটকমুখী সিংহ : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই কোজাগরী লক্ষ্মী পূর্ণিমার আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com, আমাদের পোর্টালের কিছু ছবি বাদে প্রায় সব ছবিই অন্তর্জাল থেকে সংগ্রহ করা হয়। কারুর যদি কপিরাইট থাকে জানাবেন। আমরা সেই ছবি পোর্টাল থেকে ডিলিট করে দেব।

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১০০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গা / ১২৩ Views জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬

সম্পাদক আর পাঠকের ভালবাসায় ১০০ তম কিস্তি আজ প্রকাশ পাচ্ছে। সঙ্গে থাকার জন্য প্রত্যেককে কৃতজ্ঞতা।

[সংক্ষিপ্তসার — গ্রান্ট এখানে কেফিয়ত ফৌজদারান-এর অধীনে রংপুর, রাজমহল, চট্টগ্রাম ও হস্তান্তরিত ভূখণ্ডের (সিডেড ল্যান্ড) রাজস্ব বৃদ্ধির হিসাব দিয়েছেন। রংপুর (ফকিররকুন্ডি)- কোচবিহারের প্রত্যন্ত সীমান্ত অঞ্চল — ২,৬৭৯ বর্গমাইল। কুন্ডি পরগনা যুক্ত হওয়ার পর খালসা তুমারি জমা ছিল ২,৮৬,৪৮৫ টাকা; সুবাদারি কর ৬৩,২৩৩ টাকা। অধীনস্থ মুসলিম প্রতিনিধিরা এই অর্থ আটকে রেখেছিল; কাসিম আলীর হস্তবুদ তদন্তে কোষাগারে উদ্বৃত্ত জমা পড়ল ১,৫১,৪৯৩ সিক্কা টাকা। রাজমহল (কাঁকজোল)- বাংলার সুবার সীমান্ত অঞ্চল — সিকলাগড়ি [সকড়িগলি] আর তেলিয়াগড়ির গিরিপথ নিয়ন্ত্রণ করত। আয়তন ২,২১৭ বর্গমাইল। ১৭২২ সালে আসল তুমারি ৭৪,৩১৭ টাকা; সম্প্রসারণের পর ২,৬৬,৮২৬ টাকা; সুবাদারি কর ৩১,৬২৫ টাকা। কেফায়ত আনুমানিক ৪২,৭৫৭ টাকা। হস্তান্তরিত ভূখণ্ড – ১৭৬০ সালে কাসিম আলী, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে যে ভূখণ্ড দেন — সেগুলোর রাজস্বের হার জাফর খানের মূল হার অনুযায়ী ছিল। কিন্তু গ্রান্ট সতর্ক করেন — এই জেলাগুলো অতিরিক্ত সুবাদারি রাজস্ব থেকে মুক্ত ছিল না; দাতা কাসিম আলী প্রকৃত মূল্য উল্লেখ করতে অবহেলা করেননি, এবং দেওয়ান-কানুনগোরা হস্তবুদ লিপিবদ্ধ করেছিলেন। চট্টগ্রাম (ইসলামাবাদ)- আয়তন ২,৯৮৭ বর্গমাইল — পাহাড় ও জঙ্গলে ঘ্বেঘেরায়া; এক-তৃতীয়াংশেরও কম চাষযোগ্য জমি। কফি, গোলমরিচ আর মসলা চাষের জন্য উপযুক্ত; বঙ্গোপসাগরের বন্দর হিসেবে সামরিক ঘাঁটি। জাফর খানের সময় আসল জমা ১,৭৬,৭৯৫ টাকা; অতিরিক্ত কর মাত্র ১,৫৮,৩৪০ টাকা — যা মুদ্রার মান পরিবর্তনের তুলনায় কম। গ্রান্ট এই অঞ্চলগুলোর রাজস্ব বৃদ্ধির তথ্য দিলেও, স্থানীয় প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে প্রতারণা আর অর্থ আটকে রাখার অভিযোগ এনেছেন।]

(৩য়) রংপুর বা ফকিররকুন্ডি; কোচবিহারের প্রত্যন্ত সীমান্ত অঞ্চল। এই অঞ্চল অধিকাংশ সময়ে আলাদা ফৌজদারি প্রশাসনে ছিল এবং এখানে তামাকের (পশ্চিম গোলার্ধ থেকে বিভিন্ন প্রজাতির তামাক আসার অনেক আগে থেকেই এখানে এর চাষ হতো) মতো প্রধান ফসলের জন্য বিখ্যাত ২,৬৭৯ বর্গমাইলের উর্বর ভূখণ্ড থেকে গোপনে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করা হচ্ছিল। সেখান থেকে রাজকোষে নতুন এক উদ্বৃত্ত রাজস্ব জমা পড়েছিল। এই অঞ্চল আফিম উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের (যার ব্যাপক উন্নয়নের সম্ভাবনা ছিল) মাধ্যমে এবং অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পণ্য চালের প্রাচুর্যের ফলে সার্বভৌমর কাছে অধিকতর মূল্যবান ছিল। কুন্ডি (Koondy) পরগনা অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর এবং পরবর্তীতে মাত্র ৬৩,২৩৩ টাকার সুবাদারি কর ধার্য হওয়ার পরেও, খালসা তুমারি জমা (রাজস্বের মূল হিসাব) ছিল ২,৮৬,৪৮৫ টাকা; কিন্তু অধীনস্থ মুসলিম প্রতিনিধিরা এতদিন প্রতারণা করে এর অংশ সরকারি কোষাগারে জমা দিত না। এখন সেই লাভজনক ভাড়া বা কর আদায়ে কোষাগারে ১,৫১,৪৯৩ সিক্কা টাকা (Sa। Rs।) উদ্বৃত্ত রাজস্ব জমা পড়ে।

(৪র্থ) রাজমহল বা কাঁকজোল (Cankjole) — একইভাবে বাংলার সুবার সীমান্ত অঞ্চল ছিল (তখন বিহার থেকে আলাদা ছিল)। পশ্চিমের পাহাড় ও গঙ্গা নদীর মধ্যবর্তী সকড়িগড়ি আর তেলিয়াগড়ির মতো গুরুত্বপূর্ণ গিরিপথগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখত। শক্তিশালী শাসকেরা এই অঞ্চলের উন্নয়ন করেছেন — যেমন অপেক্ষাকৃত অসভ্য হিন্দু বাসিন্দাদের সভ্য করা এবং বন-জঙ্গলে ঢাকা পাহাড়, উপত্যকায় (প্রদেশের মোট আয়তনের অর্ধেক) কৃষিকাজের প্রসার ঘটানো। যদিও এর আয়তন মাত্র ২,২১৭ বর্গমাইল, তবুও গঙ্গার পূর্ব তীরে সমতল ভূমির পাশের বেশ কয়েকটা জমিদারির অন্তর্ভুক্তির ফলে এটা তার বর্তমান গুরুত্বপূর্ণ আয়তন ও গুরুত্ব লাভ করেছিল। ১৭২২-এ আসল তুমারি (মূল রাজস্ব) মাত্র ৭৪,৩১৭ টাকা; কিন্তু পরে সম্প্রসারণে এবং একই রাজকীয় মানদণ্ড অনুযায়ী (খালসা ও জায়গির মিলিয়ে) উৎপাদন ও রাজস্ব দাঁড়িয়েছিল ২,৬৬,৮২৬ টাকায়। এর সাথে পরে মাত্র ৩১,৬২৫ টাকার অতিরিক্ত সুবাদারি কর যুক্ত হল; ফলে স্বাভাবিকভাবেই কেফিয়ত বা উদ্বৃত্ত আয়ের হিসাব বেরিয়ে আসে মোটামুটিভাবে আনুমানিক ৪২,৭৫৭ টাকা

একটি প্রচলিত ভুল বিশ্বাস, মীর কাসিমের আমলে বাংলার দেওয়ানি অঞ্চলে রাজকীয় রাজস্ব বৃদ্ধির হিসাবে কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া হস্তান্তরিত ভূখণ্ডের (ceded territory) রাজস্ব বাদ দেওয়া হয়। এই ভূমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া তাঁর শাসনকালের গোড়ায় সম্পন্ন হয়েছিল। হিন্দুস্তানে রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব এবং ভূ-সম্পত্তির স্বত্বাধিকার পৃথিবীর অন্য যেকোনো অঞ্চলের মতোই পরম মর্যাদাপূর্ণ বিষয় হিসেবে গণ্য হতো; ফলে কোনো মুসলিম অধিপতিই সেই অধিকার এমনভাবে হাতছাড়া করতেন না, যাতে ভবিষ্যতে সুযোগ এলে বা ক্ষমতার জোরে সেটা নতুন করে আপন নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে নেওয়ার গোপন অভিপ্রায় বা মানসিক আকাঙ্ক্ষা জিইয়ে না থাকে। ফলত, সামরিক বলপ্রয়োগে কিংবা কূটকৌশলের কারণে বাস্তব কর্তৃত্ব ত্যাগ করতে বাধ্য হলেও, নামমাত্র শ্রেষ্ঠত্ব বা খাস মালিকানার দাবি খুব কমই বা কখনোই পুরোপুরি বিসর্জন দেওয়া হতো না। ঠিক যেভাবে তৈমুর বংশের সম্রাটরা তাঁদের সরকারি মহাফেজখানায় এক বিশাল আর বিচ্ছিন্ন সাম্রাজ্যের যাবতীয় রাজস্বের বিবরণ নিখুঁতভাবে ধরে রাখতেন, ঠিক তেমনি মুঘল প্রশাসনিক কাঠামোয় ইংরেজদের আশ্রয়ে নিযুক্ত নায়েব সুবাদারের পক্ষেও সেই সর্বোচ্চ ক্ষমতার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করাটাই ছিল স্বাভাবিক ছিল — সেটা দৃশ্যত যতই ধৃষ্টতাপূর্ণ মনে হোক না কেন। তাছাড়া, যদিও ভূখণ্ড হস্তান্তরের আইনি দলিল বা শাহী ফরমান সবসময় সাম্রাজ্যের বিভিন্ন সুবায় চালু ঐতিহ্যবাহী ‘জমা-ই-তুমারি’-র (jumma toomary) আদর্শ পরিমাপ বা নির্ধারিত হার মেনেই প্রস্তুত করা হতো; তবুও ভাবা ভুল হবে যে, হস্তান্তরিত সেই ভূ-সম্পত্তির প্রকৃত, বাস্তব ও আপেক্ষিক মূল্যমান সম্পর্কে উভয় পক্ষের পূর্ণাঙ্গ পারস্পরিক বোঝাপড়া ছাড়াই এ ধরণের বড় ছাড় দেওয়া হয়। সেই নিয়মানুযায়ী, ১৭৬০-এ মীর কাসিম ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে যে জমি, যা ইতিহাসে সিডেড ল্যান্ড নামে বিখ্যাত — দান করেন, সেসবের ক্ষেত্রে ‘জিম্ন’তে (Zymn বা তফসিল বিবরণী) নথিভুক্ত রাজস্বের হার মুর্শিদকুলি খানের আমলের মূল হারের ভিত্তিতেই মাপা করা হয়েছিল, তাছাটা একথা ভাবা অন্যায় হবে, বাংলার বাকি জেলার তুলনায় এই অঞ্চল সে সময়ে অতিরিক্ত সুবাদারি কিংবা ফৌজদারি রাজস্ব চাপ-মুক্ত ছিল; অথবা হস্তান্তরের ক্রান্তিকালে নবাবের আসল মূল্য প্রকাশ করতে কিংবা পরবর্তী সময়ে সুবার কানুনগো ও দেওয়ানরা তাঁদের দপ্তরে সেই সময়কার নির্ণীত ‘হস্তবুদ’ (প্রকৃত জমিন-আয়) লিপিবদ্ধ করতে অবহেলা করেন। পূর্ব-স্বীকৃত মালিকানা বা দখলের অধিকারের অনুপাতে — কম-বেশি অনিচ্ছার সঙ্গেই, স্পষ্ট সমমূল্যের প্রাপ্তি ব্যতিরেকে — এই বর্ধিত মূল্যমান মেনে নেওয়া হয়েছিল বলে ধরে নেওয়া যুক্তিসঙ্গত। ‘কেফিয়ত’ বা অতিরিক্ত রাজস্বের অংশ হিসেবে মূল্যায়িত বাকি দুটো হস্তান্তরিত প্রদেশের ক্ষেত্রেও অবিকল একই প্রশাসনিক পরিস্থিতি বিদ্যমান ছিল।

(৫ম) চট্টগ্রাম বা ইসলামাবাদ — প্রায় ২,৯৮৭ বর্গমাইল বিস্তৃত এই ভূখণ্ড মূলত গহীন অরণ্য, পাহাড়ি কান্তারে ঘেরা; এক-তৃতীয়াংশেরও কম ভূমি কৃষিকার্য উপযোগী। এই সীমিত কৃষিজমিই কফি, গোলমরিচ, নানাবিধ দুর্লভ মসলা চাষে সমগ্র ভারত উপমহাদেশের যেকোনো অঞ্চলের চেয়ে ঢের বেশি উর্বর, সম্ভাবনাময়। আরাকানের মগ সীমান্ত এবং লোনা সমুদ্রের কোল ঘেঁষে বাংলার এই দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তসীমা বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় বণিকদের জন্য বারো মাসই নিরাপদ ও সুবিধাজনক পোতাশ্রয়ের চমৎকার সুযোগ। ফলে, অতি স্বাভাবিক নিয়মেই এটি সুবার নৌবহর এবং স্থায়ী পদাতিক বাহিনীর এক অপরিহার্য সীমান্ত ঘাঁটি হল। এই কৌশলগত গুরুত্বেই মুঘল শাসনের শুরু থেকেই ১৭৫৭-র ঐতিহাসিক পলাশী বিপ্লব পর্যন্ত এই প্রদেশের সিংহভাগ জমি ‘জাগির-ই-আহশম’ বা দুর্গে নিয়োজিত সীমান্তরক্ষী সৈন্যদের ভরণপোষণে বরাদ্দ ছিল। যেহেতু এই অঞ্চল স্বাধীন ফৌজদারি প্রশাসনের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হতো, তাই কালের পরিক্রমায় এর ওপর আরোপিত রাজস্বের হারও বিশেষ বিবর্তনে পরিমার্জিত হয়েছিল — যা রাজস্বের পরিভাষায় ‘তওফির’ (towfeer) । সরকারি খাস বা খালসা জমির উদ্বৃত্ত আয় তথা ‘কেফিয়ত/কৈফিয়ত’ (keffyet) থেকে এই বিশেষ সামরিক রাজস্ব পৃথকভাবে চিহ্নিত করতেই এই নামকরণ — যদিও ১৭৬০-এ সম্পদ বিভাজনের সন্ধিক্ষণে এই দুই রাজস্ব-পরিভাষার সূক্ষ্ম পার্থক্য গুলিয়ে ফেলার স্পষ্ট প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। তবে গত দুই শতাব্দী আন্তর্জাতিক বাজারে মুদ্রার আপেক্ষিক মূল্যে যে বিপুল রূপান্তর ঘটেছে, সেই তুলনায় চট্টগ্রামের এই রাজস্ব বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল প্রত্যাশার চেয়ে বেশ খানিকটা কম। কারণ নবাব জাফর খানের (মুর্শিদকুলি খান) আমলে নির্ধারিত ১,৭৬,৭৯৫ টাকার সেই ঐতিহাসিক ‘আসল জমা’ বা মূল করের ওপর পরবর্তীকালে যে সমস্ত অতিরিক্ত উপ-কর বা আবওয়াব চাপানো হয়েছিল, তার সর্বমোট পরিমাণ ছিল মাত্র ১,৫৮,৩৪০ টাকা।

টীকা ১

১। কৈফিয়ত — হিসাবের ভারসাম্য বা রাজস্বের উদ্বৃত্ত (surplus/savings) পরিমাণ। সহজ কথায়, মুঘল আমলে দেওয়ান বা রাজস্ব কর্তারা অঞ্চলের মূল আদায়ি রাজস্ব (বা হাসিল), নির্ধারিত রাজস্বর (বা জমা) হিসাব মেলাতে খরচের পর যে লাভ বা অতিরিক্ত অর্থ অবশিষ্ট হিসেবে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা পড়ত, সেটাই কৈফিয়ত – গ্রান্টের ভাষায় কেফিয়ত। সুবার দেওয়ানরা কেন্দ্রীয় সরকারে হিসেবপত্র (তুুমার) পাঠানোর সময় আয়ের হিসাবের ভারসাম্য বোঝাতে কৈফিয়ত ব্যবহার করতেন। অঞ্চলের সুশাসনে কর আদায় বাড়লে কিংবা প্রশাসনিক খরচ কমিয়ে অর্থ সাশ্রয় হলে, সেই উদ্বৃত্ত অংশ কৈফিয়ত হেডে নথিবদ্ধ হতো। বাংলার নবাব-দেওয়ান মুর্শিদকুলি খানের রাজস্ব সংস্কারের ইতিহাসে কৈফিয়ত শব্দ বিশেষভাবে পরিচিত। তিনি কঠোর প্রশাসনিক তদারকিতে রাজস্ব আদায় বাড়ান, হিসাবের গরমিল দূর করে বিপুল পরিমাণ অর্থ কৈফিয়ত, উদ্বৃত্ত হিসেবে দিল্লির কেন্দ্রীয় কোষাগারে পাঠাতেন।

১.১। কেফিয়ত ফৌজদারান – ফৌজদারদের অতিরিক্ত আয় — সীমান্ত প্রদেশগুলোয় আদায় করা হতো।

২। তুমারি জমা- নির্ধারিত রাজস্ব-তালিকা — যা টোডরমল ১৫৮২ সালে নির্ধারণ করেন।

৩। খালসা– সরাসরি সরকারি ব্যবস্থাপনাধীন ভূমি।

৪। হস্তবুদ– জমির প্রকৃত আয়-ব্যয় ও উৎপাদন ক্ষমতা সংক্রান্ত জরিপ।

৫। কুন্ডি– রংপুরের পরগনা — যা পরে যুক্ত হয়।

৬। সিকলাগড়ি ও তেলিয়াগড়ি- রাজমহলের গুরুত্বপূর্ণ গিরিপথ — যা বাংলার প্রবেশদ্বার।

৭। জিম্ন– মূলত পরগনা বা নির্দিষ্ট অঞ্চলের সরকারি রাজস্বের হার বা মূল্যের তালিকা – দস্তুর-উল-আমল বা রায়। এটা প্রতিটি অঞ্চলে ফসলের ধরন অনুযায়ী রাজস্ব নির্ধারণের প্রমিত নির্দেশিকা। সম্রাট আকবরের আমলে অর্থমন্ত্রী রাজা টোডরমলের ‘আইন-ই-দহশাল’ (দশশালা) ব্যবস্থায় এই রাজস্ব কাঠামো পূর্ণতা পায়। চাষাবাদ করা ফসলের প্রকারভেদ (যেমন: রবি শস্য ও খরিফ শস্য) এবং জমির উর্বরতার ওপর ভিত্তি করে রাজস্বের হার আলাদাভাবে তালিকাভুক্ত করা থাকত। ফসলের সরকারি ভাগের মূল্য স্থানীয় বাজারের বিগত ১০ বছরের গড় দাম ভিত্তি করে নগদ অর্থে (দস্তুর) রূপান্তর করে এই তফসিলে লিপিবদ্ধ করা হতো। এই বিবরণী বা তফসিল জিলাদার, আমিন এবং পাটোয়ারীদের মতো রাজস্ব কর্তাদের নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করত, যাতে তারা কৃষকদের থেকে অতিরিক্ত কর আদায় করতে না পারে। এই তালিকা হল মুঘল আমলের অফিসিয়াল ট্যাক্স রেট চার্ট, যা দেখে নির্দিষ্ট এলাকার কৃষকদের থেকে নির্দিষ্ট ফসলের জন্য কত রাজস্ব নেওয়া হবে তা নির্ধারণ করা হতো।

৮। তওফির– জায়গিরের অতিরিক্ত মুনাফা।

৯। ইসলামাবাদ– চট্টগ্রামের মুঘল নাম।

১০। সিডেড ল্যান্ড- ১৭৬০-এ কোম্পানি প্রধান ভ্যান্সিটার্ট মীর জাফরকে উচ্ছেদ করে জামাই মীর কাসিমকে বাংলার নবাব বানায়। বিনিময়ে মীর কাসিম এবং তৎকালীন গভর্নর হেনরি ভ্যানসিটার্টের মধ্যে গোপন চুক্তি তে ঠিক হয় মীর কাসিম ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর খরচ বহন এবং কোম্পানির বকেয়া ঋণ পরিশোধের জন্য বর্ধমান, মেদিনীপুর ও চট্টগ্রামের জমিদারী বা রাজস্ব আদায়ের পূর্ণ অধিকার কোম্পানির হাতে তুলে দেন। ইতিহাসে এই অঞ্চলগুলোই ‘সিডেড ডিস্ট্রিক্টস’ বা ‘সিডেড ল্যান্ড’। এই হস্তান্তরে বাংলার সবচেয়ে উর্বর ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোয় ব্রিটিশদের সরাসরি আর্থিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়, যা পরে পূর্ণ রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের পথ সুগম করে।

১১। বাঙ্গা – বিশেষ জাতের তুলা — মসলিন কাপড়ে সূক্ষ্ম ডোরাকাটা নকশা তৈরির জন্য অপরিহার্য ছিল।

টিকা ২

‘জিম্ন’ (Zimn)

মুঘল আমলে জমি বা রাজস্বের অধিকার (যেমন- কোনো জমিদারি বা জাগির) দেওয়ার সময় মূল সনদের পিঠে বা তার সাথে জোড়া দলিলে সেই অনুদানের সুনির্দিষ্ট বিবরণ (কোন কোন পরগনা বা জেলা দেওয়া হলো এবং সেখান থেকে কত রাজস্ব আদায় হবে) লিখে দেওয়া হতো। এই বিবরণী বা তালিকাকেই বলা হতো ‘জিম্ন’ (Zimn)। আরবি শব্দ ‘জিম্ন’ (ضمن)-এর আভিধানিক অর্থ কোনো কিছুর ‘অভ্যন্তর’, ‘অন্তর্ভুক্ত বিষয়’ বা ‘বিষয়বস্তু’ (Contents)। রাজস্ব প্রশাসনের পরিভাষায় এর অর্থ — জমি হস্তান্তরের সনদের সাথে থাকা সুনির্দিষ্ট জমির বিবরণী, তালিকা বা তফসিল (Inventory or Schedule)। মুঘল দরবারে অনুদান অনুমোদনের সময় উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সনদের ওপর লিখতেন জিম্ন নবীসন্দ (Zimn navisand), যার অর্থ — বিস্তারিত বিবরণ বা সারাংশটি লিখে নেওয়া হোক। এটা দেখে অধস্তন কর্মচারীরা মূল দলিলের পেছনে বিস্তারিত তফসিল তৈরি করত। জেমস গ্রান্ট জিম্ন সূত্রে বোঝাতে চেয়েছেন, কাগজে-কলমে (বা জিম্ন বিবরণী সূত্রে) জমির মূল্য মুর্শিদকুলি খানের আমলের পুরনো হারে কম করে দেখানো হলেও, বাস্তবে এই জেলাগুলো নবাবী আমলের বিভিন্ন উপ-কর বা অতিরিক্ত কর Additional burthens থেকে মুক্ত ছিল না।

টিকা ৩

এবারে তামাক।

স্বয়ং গ্রান্ট লিখেছেন “…long undoubtedly before the [293] introduction of different species of that plant from the western hemisphere, after the discovery of America…” – সেটা ধুম্রপানের তামাক না অন্যধরণের তামাক বলেন নি। তবু ১৮ শতকের ব্রিটিশ রাজস্ব নথির বক্তব্য স্পষ্ট, আমেরিকা আবিষ্কার সূত্রে তামাকের Nicotiana tabacum দক্ষিণ এশিয়ায় আসার অনেক আগেই তামাকের স্থানীয় প্রজাতির চাষ হতো। ব্রিটিশ উপনিবেশিক কর্মকর্তারা স্থানীয় চাষী ও প্রাচীন ইতিহাস পর্যালোচনা করেই নথিতে এই মন্তব্য যুক্ত করেছিলেন – যদিও ধূম্রপানের তামাক বাণিজ্যকভাবে চাষ হত এটা জানা কিন্তু অন্য প্রজাতির তামাক বাণিজ্যিকভাবে চাষ হিত কি না, সে সম্পর্কে মন্তব্য নেই। https-//www.tobaccoinduceddiseases.org/Beyond-the-colonial-cigarette-A-short-history-of-the-major-indigenous-tobacco-products,206528,0,2.html সূত্র বলছে, পর্তুগিজরা ভারতে যে তামাক এনেছিল তা ছিল মিষ্টি ও বড় পাতার মার্কিন জাত Nicotiana tabacum। কিন্তু এর অনেক আগে থেকেই এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে হিমালয়ের পাদদেশ ও উত্তরবঙ্গ (রংপুর, কোচবিহার) সংলগ্ন এলাকায় ‘নিকোটিয়ানা রাস্টিকা’ Nicotiana rustica বা এই জাতীয় তীব্র ঝাঁঝালো বন্য পাতার অস্তিত্ব ছিল। স্থানীয় মানুষ একে ওষুধ, পোকামাকড় তাড়াতে কিংবা আদিম উপায়ে চিবিয়ে বা ধোঁয়া পানের কাজে ব্যবহার করত। বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম কমরেড বন্ধু মহম্মদ নাহিদ হাসান বলছেন ছোটবেলায় দাদু চাষ করতেন নাম তাঙ্কু। কিছু বিক্রি করতেন আর কিছু বাড়িতে হুকায় ভরে টানতেন। বিড়ির চেয়ে হুকা দেখেছি বেশি। গোয়ালঘরে, কাছারিতে হুকা ঝুলানো থাকত। নারকেলের খোলে বানানো হুকা। যদি তামাক সম্পূর্ণ নতুন একটি জিনিস হতো, তবে এর নাম কেবল পর্তুগিজ ‘Tobacco’ বা স্প্যানিশ অনুকরণেই হতো। কিন্তু রংপুর ও উত্তরবঙ্গের লোকসংস্কৃতিতে তামাককে আঞ্চলিক ভাষায় ‘হামাক’, ‘পোকা’ বা ‘চুটা’ বলা হতো। তামাকের আদিম রূপ যেমন — পাতা শুকিয়ে সরাসরি চিবানো বা প্রাচীন মাটির পাত্রে রেখে ধোঁয়া টানার রেওয়াজ এই অঞ্চলে পর্তুগিজদের আগমনের আগে থেকেই উপজাতীয় বা স্থানীয় দেশজ সংস্কৃতির অংশ ছিল। পর্তুগিজরা আসার শত শত বছর আগে প্রাচীন ভারতে ‘ধূমপান’ বা ওষধি পাতার ধোঁয়া নেওয়ার প্রথা চালু ছিল। চরক সংহতি এবং সুশ্রুত সংহিতায় বিভিন্ন গাছের ওষধি পাতা পুড়িয়ে নল দিয়ে তার ধোঁয়া শ্বাসের সাথে নেওয়ার (যাকে ‘ধূমপান’ বলা হতো) বিধান রয়েছে। রংপুর অঞ্চলের উর্বর মাটিতে জন্ম নেওয়া বিশেষ কিছু কটু বা ঝাঁঝালো পাতা স্থানীয় বৈদ্য বা সাধারণ মানুষ একই উপায়ে ব্যবহার করত, যা পরবর্তীতে পর্তুগিজদের আনা বাণিজ্যিক তামাকের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় (https-//iris.who.int/bitstreams/e1c8573a-5e2d-4430-aebe-efce29b1b073/download)।

টিকা ৪

সুপুরির ব্যবসা

গভর্নর হেনরি ভ্যান্সিটার্ট (Henry Vansittart) তিন খণ্ডের “A Narrative of the Transactions in Bengal” (1766)-এ স্পষ্ট নথিপত্রসহ দেখিয়েছেন যে, ক্লাইভের ১৭৬৫-র ‘সোসাইটি ফর ট্রেড’ গঠনের আগেই — পলাশী যুদ্ধের (১৭৫৭) পর থেকেই — কোম্পানির ব্যক্তিগত ইংরেজ ব্যবসায়ীরা বাংলায় লবণ, তামাক এবং সুপুরির (Betel nut) অভ্যন্তরীণ বাজার সম্পূর্ণ নিজেদের কব্জায় নেওয়া শুরু করেছিল। এই একচেটিয়া ব্যবসার লোভ এবং মুঘল রাজকীয় ‘দস্তক’-এর চরম অপব্যবহারই ছিল মীর কাসিমের সাথে ইংরেজদের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মূল কারণ। এই ঐতিহাসিক সত্যের আলোতেই জেমস গ্রান্টের সুপুরি ব্যবসার উল্লেখ এবং ভ্যান্সিটার্টের বিবরণের সংযোগ আলোচনা করা গেলো।

ভ্যান্সিটার্ট বইতে ১৭৬২ সালের মার্চে মীর কাসিমের বিখ্যাত চিঠি উদ্ধৃত করেছেন। নবাব তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন যে, কোম্পানির গোমস্তারা বাংলার প্রতি গ্রামে ঢুকে জোরকরে লবণ, তামাক এবং সুপুরি (Betel nut) নামমাত্র মূল্যে কিনছে, বাজারে কৃত্রিম একচেটিয়া রাজত্ব কায়েম করেছে। মীর কাসিম এই অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে ইংরেজদের কর ফাঁকি দেওয়া বন্ধ করতে চাইলে কাউন্সিল তাঁর বিরোধিতা করে। নিরুপায় নবাব যখন দেশীয় বণিকদের বাঁচাতে সব ধরনের অভ্যন্তরীণ শুল্ক বা কর মওকুফ করে দেন, তখন ইংরেজদের একচেটিয়া ব্যবসার মুনাফায় আঘাত লাগে, যা পরবর্তীতে বক্সারের যুদ্ধের (১৭৬৪) পথ সুগম করে।

জেমস গ্রান্ট Analysis of the Finances of Bengal-এ চট্টগ্রাম (ইসলামাবাদ), ঢাকা বা বাকেরগঞ্জের মতো উর্বর অঞ্চলের রাজস্ব নথিতে ‘তওফির’ বা ‘কেফিয়ত’ (অতিরিক্ত কর)-এর হিসাব দিতে গিয়ে সুপুরি বা লবণের মতো অর্থকরী বাণিজ্যে মুঘল, নবাবী আমলের রাজস্ব কাঠামো উল্লেখ করেন।

গ্রান্ট সুপুরি বা লবণের বাণিজ্যের কথা এনেছিলেন মূলত উপনিবেশিক চালাকি থেকে। গ্রান্ট দেখাতে চেয়েছিলেন যে, এই সমস্ত লাভজনক পণ্য থেকে মুঘল আমলেই নবাবরা প্রচুর ‘আবওয়াব’ বা অতিরিক্ত কর আদায় করতেন। সুতরাং কোম্পানির সেই কর হার আরও বাড়িয়ে দেওয়া অন্যায় নয়। গ্রান্টের উদ্দেশ্য ছিল প্রমাণ করা যে, মীর কাসিম বা তাঁর পূর্বসূরিরা এই সুপারি ও লবণের বাণিজ্য থেকে অন্যায়ভাবে অর্থ উপার্জন করতেন, যা কার্যত ব্রিটিশরা বন্ধ করে একটি ‘নিয়মতান্ত্রিক’ রাজস্ব কাঠামো গড়ে তুলছে।

১৭৬৫-র রবার্ট ক্লাইভের ‘সোসাইটি ফর ট্রেড’ ছিল পলাশী-পরবর্তী সময়ে ইংরেজদের চালানো সেই অবৈধ ও অরাজক সুপুরি-লবণের ব্যক্তিগত ব্যবসাকে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা। হেনরি ভ্যান্সিটার্টের নথিপত্র প্রমাণ করে যে, এই ব্যবসা নিয়ে মীর কাসিমের স্বাধীনচেতা মনোভাবই ইংরেজদের সাথে তাঁর যুদ্ধের প্রধান কারণ ছিল, আর জেমস গ্রান্ট পরবর্তীতে সেই সুপুরি উৎপাদক অঞ্চলে বিপুল রাজস্বকে কোম্পানির খেরোখাতায় সর্বোচ্চ মাত্রায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্যই তত্ত্ব খাড়া করেছিলেন।

টিকা ৫

বাঙ্গা তুলো

বাঙ্গা ছোট ও মোটা আঁশের (Short-staple) অত্যন্ত টেকসই পাহাড়ি তুলা। সাধারণ তুলার চেয়ে অনেক বেশি নরম, মজবুত এবং এর শোষণ ক্ষমতা (Absorbency) অনেক বেশি। পাহাড়ের গারো জনগোষ্ঠীর মানুষেরা পাহাড়ি ঢালে জুম চাষে প্রাকৃতিকভাবে এই বিশেষ তুলা উৎপাদন করত। এর সুতো অত্যন্ত মজবুত হতো। সমতলের তাঁতীরা কাপড়ে স্থায়িত্ব আনতে এবং শীতের পোশাক বা উলের সাথে মিশিয়ে চাদর ও বস্ত্র তৈরিতে এই তুলা ব্যবহার করত। এর আধুনিক নাম ‘কুমিল্লা কটন’ (Comilla Cotton)। উপনিবেশ পূর্ব সময়ে কাঁটাতারের সীমানা ছিল না। পাহাড়ের মানুষ এই তুলা নিচে সমতলের হাটে নিয়ে আসত এবং সমতলের মানুষের কাছ থেকে এর বিনিময়ে লবণ ও শুঁটকি মাছ নিয়ে যেত। এটি ছিল সম্পূর্ণ পারস্পরিক বিশ্বাসের উন্মুক্ত ‘বিনিময় বাণিজ্য’। ইংরেজরা এই বাণিজ্যে কঠোর কর এবং একচেটিয়া নিয়ম চাপিয়ে দেয়, যাতে সমস্ত লভ্যাংশ ব্রিটিশদের পকেটে যায়। এর ফলে পাহাড়ের স্বাধীন আদিবাসীদের জীবনযাত্রা ও উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে যায়, যা পরবর্তীতে বিখ্যাত গারো কৃষক বিদ্রোহের জন্ম দিয়েছিল।

সংঘমিত্রা মিশ্র The Long Conquest: Territorialisation, Rebellion and the ‘Tribe’ in Eastern India-য় জেমস গ্রান্টের উল্লেখ করা বাঙ্গা তুলো নিয়ে পূর্ব ভারতীয় সীমান্তের বাণিজ্যের উপনিবেশিক রূপান্তর আলোচনা করেছেন। সংঘমিত্রা মিশ্র দেখিয়েছেন, জেমস গ্রান্ট রাজস্ব মিনিটে রংপুর ও গোয়ালপাড়া অঞ্চলের কর কাঠামো বিশ্লেষণ করার সময় প্রাক-ব্রিটিশ যুগের প্রথাগত তুলা বাণিজ্যকে কোম্পানির সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য, ব্রিটিশ-পূর্ব যুগে গারো পাহাড়ের পাদদেশ ও সমতলের (যেমন গোয়ালপাড়া, মেচপাড়া) মধ্যে তুলা বাণিজ্য নির্দিষ্ট ভূ-রাজস্ব বা কঠোর সীমানার অধীন ছিল না। পাহাড়ের মানুষ ও সমতলের বণিকদের মধ্যকার এই বিনিময় প্রথা ছিল অনানুষ্ঠানিক এবং মূলত শুল্কভিত্তিক সায়ের বা সায়রাত (Sair বা Sairat)। জেমস গ্রান্ট মুঘল আমলের নথিপত্র ঘেঁটে এই অঞ্চলের তুলা বাণিজ্যের সর্বোচ্চ কাগুজে হিসাব বা করের হার সামনে আনেন। গ্রান্টের বক্তব্য স্থানীয় জমিদাররা ‘বাঙ্গা তুলো’ বা তুলা বাণিজ্যের বিপুল উদ্বৃত্ত আয় কোম্পানির থেকে লুকিয়েছে এবং এটা কোম্পানির লাভজনক রাজস্ব উৎস হতে পারে। গ্রান্টের এই তাত্ত্বিক হিসাব ভিত্তি করে কোম্পানি পরবর্তীকালে তুলা বাণিজ্যের প্রথাগত ও নমনীয় বাজারে কঠোর ঔপনিবেশিক আইনি সীমানায় আবদ্ধ করে ফেলে। ফলে মুক্ত বাণিজ্য তার নিজস্ব গতি হারায় এবং জমি-ভিত্তিক বাধ্যতামূলক কর ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয়। কোম্পানি গ্রান্টের নীতি অনুযায়ী এই তুলা বাণিজ্যের ওপর কঠোর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ও কর আরোপ করতে গেলে পাহাড়ের স্বাধীন উৎপাদক গারো জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক অধিকার হারিয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। সঙ্ঘমিত্রা মিশ্রের বিশ্লেষণ — তুলা বাণিজ্যের এই বলপ্রয়োগের উপনিবেশিক রূপান্তরই পরে গারো ও মেচপাড়া অঞ্চলকে দীর্ঘমেয়াদী সশস্ত্র বিদ্রোহের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। জেমস গ্রান্টের “বাঙ্গা তুলো” সংক্রান্ত নথিপত্র কেবল একটি সরল করের হিসাব না; বরং পূর্ব ভারতের তরল, উন্মুক্ত ও প্রথাগত বাণিজ্যকে শোষণের সুবিধার্থে কঠোর উপনিবেশিক ফ্রেমে বন্দি করার প্রশাসনিক প্রয়াস।

চলবে

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

পেজফোরনিউজ-এর নববর্ষ বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Currently Maintained by the2.dev