
দক্ষিণ অঞ্চলের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক বাঁক
আমেরিকার ইতিহাস বেসিক্যালি ইওরোপীয়দের উপনিবেশিক আগ্রাসন, দেশিয়দের ওপর চাপানো পদ্ধতিগত গণহত্যাজাত সেটলার কলোনি। এই ঐতিহাসিক বাস্তবতায় আমেরিকার ২০০ বছরের রাজনীতি, ২০২৬-এর অভূতপূর্ব মিডটার্ম পর্যন্ত দীর্ঘ ক্ষমতার লড়াইয়ের জটিল রূপান্তর।
ইউরোপে উচ্ছেদ — শ্বেতদাস এবং হোয়াইট পশ্চিমা তকমা
১৮০০-র শুরু থেকে প্রায় এক শতাব্দ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ — বিশেষ করে ইংল্যান্ডের এনক্লোজার অ্যাক্ট, আয়ারল্যান্ডের ভয়াবহ আলু দুর্ভিক্ষ, ফ্রান্স, জার্মানির অর্থনৈতিক মন্দায় কয়েক কোটি ইওরোপিয় জমি, জীবিকা হারিয়ে আটলান্টিক পেরিয়ে আমেরিকায় আসেন। বিপুল গণহত্যা চালিয়ে — অন্তত ২০-৩০ কোটি দেশজ মেরে [রেড ইন্ডিয়ান] আমেরিকাকে সেটলার কলোনি বানান।
তখন থেকেই ইওরোপ দুই ভূখণ্ডে দুটো এক্সপেরিমেন্ট চালায় — পশ্চিম ইওরোপে ভদ্রবিত্তদের জন্য রাষ্ট্রের উদ্যোগে সামাজিক নিরাপত্তা জাল [ঘোমটা পরা ফ্যাসিবাদ] আর আমেরিকায় খোলাখুলি ফ্যাসিবাদ, ক্রোনিক্যাপিট্যালিজম আর বিশ্বজুড়ে মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স ভিত্তি করে ঘোমটাপরা ফ্যাসিবাদী যুদ্ধচাপানো।
ইওরোপে উচ্ছেদ হয়ে আমেরিকায় সেটলার কলোনি বানানোদের বড় অংশ বহুকাল মুক্ত নাগরিক ছিলেন না। কৃষ্ণাঙ্গ দাস আমলেও আইরিশ, ইওরোপিয় দরিদ্র অভিবাসী তামাক-তুলো বাগিচায় চুক্তিবদ্ধ সাদা দাস ছিল। ইওরোপে ভিটেমাটি হারিয়ে আমেরিকায় দাস জীবন কাটানোই ভাগ্য হল। বিপুল ট্রমা।
শুরুতে এরা তীব্র বৈষম্য ও ঘৃণার শিকার হতো No Irish Need Apply। ১৭-১৮ শতে শাসক শ্বেত অভিজাত, খ্রিষ্ট চার্চ এদের কালো দাস থেকে আলাদা করতে আইন করে শ্বেত পশ্চিম তকমা দিয়ে নাগরিক সুবিধা দেয়। এর পরই এই সাদারা নিজেদের কৃষ্ণাঙ্গ ও আদিবাসীদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং মার্কিনভূমের আসল নির্মাতা আইডিয়ার জন্ম দেয়।
দক্ষিণের আদিম আইন, ট্রাম্পের মাগা MAGA-র ভিত্তি
আমেরিকার দক্ষিণ বাইবেল বেল্টে ধর্মান্তরিত, পশ্চিম তকমার শ্বেত মেহনতিদের ওপর চার্চের তীব্র প্রভাব, ঐতিহাসিক একাকীত্ব, রক্ষণশীলতা, পুরুষতান্ত্রিকতা, পুরোনো আইনি ফাঁকফোকর, অপ্রাপ্তবয়স্ক বিয়ের মতো প্রথা আজও আছে। এমনকি মরমন সংস্কৃতির প্রভাবে পশ্চিমাঞ্চল ও দক্ষিণের কিছু পকেটে বহুবিবাহও রয়েছে।
মাগা আর অন্ধভক্ত
এরাই ডোনাল্ড ট্রাম্পের মাগা আন্দোলনের স্থায়ী ও কট্টর ভোটব্যাংক, অন্ধভক্ত। এদের আর ভারতের সঙ্ঘ পরিবারের কট্টর সমর্থকদের গভীর মিল। সঙ্ঘের সমর্থকরা মনে করেন হাজার বছরের বিদেশি শাসন সেকু-মাকু রাজনীতি নিজস্ব ভূমিতে বঞ্চিত করেছে; তেমনি মাগা সমর্থকরা মনে করে বিশ্বায়ন, লিবারেল সংস্কৃতি, কৃষ্ণাঙ্গ ও অভিবাসীদের অধিকার তাদের কষ্টার্জিত শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান পরিচয় হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। ট্রাম্প বা ভারতের সঙ্ঘের প্রশ্নাতীত ব্যক্তিপূজা ও অন্ধ আনুগত্য আর মূলধারার লিবারেল মিডিয়াকে শত্রু মনে করে।
ইন্টারেস্টিং হল – দক্ষিণ এশিয়ায় এবং আমেরিকায় অডান রাজনৈতিক দল এই জনগোষ্ঠীর মানসিকতা বুঝতে চেষ্টা করে না। কলকাতার পুজোয় বই ধ্বংসজাত আন্দোলনের তুলনায় হকার-বস্তি উচ্ছেদ, SIR-এ বাদ পড়া মুসলমান, অভদ্রবিত্ত জনগোষ্ঠীর দাবি অনেক পিছনে পড়ে থাকে এবং অনেক বেশি বঙ্গজ সেকু-মাকুদের আকর্ষণের ইস্যু হয়ে ওঠে। আমেরিকাতেও নীলেরা এতদিন ছিল ভদ্রবিত্তকেন্দ্রিক – শিক্ষিত বাম লিবারেলদের ঘাঁটি। ৮এর দশকের পর এশিয়ার উত্থানে বিপুল সাধারণ সাদার চাকরি গেছে – রেগনের পর ক্রমশ সামাজিক নিরাপত্তা ভোগে গেছে – এ সব ইস্যু নিয়ে ডেমোক্রাটেরা যে খুব বেশি মাথা ঘামিয়েছে তা হয়। এবারের ভোটটা তাই আলাদা।

১৮৬০-এর দশকের গৃহযুদ্ধের পর দক্ষিণ শ্বেতরা প্রথমে কট্টর ডেমোক্র্যাট (আগের রক্ষণশীল), ১৯৬০-এর দশকের নাগরিক অধিকার আন্দোলনের পর কট্টর রিপাবলিকান এবং ট্রাম্পের স্থায়ী ভোটার হল।
২০২৬-এর মিডটার্ম — দক্ষিণে ডেমোক্র্যাটদের ঐতিহাসিক জয়। কেন?
১৮০০ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত আমেরিকায় যে দক্ষিণ ছিল রিপাবলিকান আর মাগার দুর্ভেদ্য দুর্গ, ২৬-এর মিডটার্ম নিয়ে এল ঐতিহাসিক ও অভূতপূর্ব রাজনৈতিক ভূমিকম্প। এই প্রথম দক্ষিণের ভোটার দলে দলে ডেমোক্র্যাটদের ঢেলে ভোট দিয়েছেন এবং টেক্সাস, নর্থ ক্যারোলিনা, সাউথ ক্যারোলিনা, জর্জিয়ার মতো কট্টর লাল রিপাবলিকান রাজ্য নীল বা ডেমোক্র্যাটিক ডোমেন হয়েছে।
কেন এই ঐতিহাসিক পরিবর্তন
২০২৪-এর পর ট্রাম্প প্রশাসন চরম সুরক্ষাবাদী শুল্ক নীতি এবং আন্তর্জাতিকরাজনীতিতে আমেরিকার জীবনযাত্রার খরচ আর পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। ওহাও, টেক্সাস, ক্যারোলিনার সাধারণ শ্বেত কর্মজীবী মানুষ বোঝে মাগার অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি তাদের বাস্তব জীবনে কেবল বিপর্যয় ডেকে এনেছে। তাছাড়া ডেমক্রেটেরা কর্পোরেটদের একাধিপত্যে ক্রমশ বিলিন হয়ে যাওয়া গণনিরাপত্তা, পারিবারিক সুরক্ষা জালের ধ্বংসের দাবি জোর দিয়ে তুলছিলেন।
২০২৬-এর মিডটার্মে ৭২ শতাংশ জেনজি ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়েছে — মার্কিন ইতিহাসে রেকর্ড! ট্রাম্পের কট্টরপন্থী ও অনুদার নীতির বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে তরুণ পুরুষরা ব্যাপকভাবে ক্ষুব্ধ হয়ে ব্যালটে জবাব দিয়েছে।
দক্ষিণের জর্জিয়া, মিসিসিপির পুরোনো বাগিচার কৃষ্ণাঙ্গ ভোটার ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে রেকর্ড ৮০ শতাংশের বেশি ভোট দিয়েছেন। টেক্সাসে হিস্পানিক, লাতিনো ভোটারদের ৬২% ডেমোক্র্যাটদের পাশে দাঁড়িয়েছেন; ফলে জিনা হিনোজোসা টেক্সাসের প্রথম হিস্পানিক গভর্নর এবং জেমস টালারিকো সেনেটর হয়ে ইতিহাস তৈরি করেছেন।
দক্ষিণের রাজ্যগুলোতে গর্ভপাত নিষিদ্ধ করা এবং চরম রক্ষণশীল আইনি সংস্কারের বিরুদ্ধে নারীরা দলমত নির্বিশেষে গর্জে উঠেছেন। দক্ষিণ ক্যারোলিনায় দীর্ঘ তিন দশক পর ডেমোক্র্যাট নারী অ্যানি অ্যান্ড্রুজ সেনেট আসনটি জিতে ইতিহাস গড়েছেন।
তারপরেও বলতে হবে আবদুল্লা সৈয়দ [আব্দুল এল-সইদ] মিশিগানের মত মিডওয়েস্ট রাজ্য থেকে জিতেছেন।
১৮০০ শতে ইউরোপ থেকে উচ্ছেদ হয়ে আসা শ্বেত দাস বংশধররা চার্চ সূত্রে সাদা অহংকারে আমেরিকার দক্ষিণকে কট্টর রক্ষণশীলতার আঁতুড়ঘর বানিয়ে ট্রাম্পের অন্ধভক্ত হয়েছিল; ২০২৬-এর মিডটার্ম সেই দুর্গে বড় ধস। তীব্র সংকট, তরুণ প্রজন্মের বিদ্রোহ এবং কৃষ্ণাঙ্গ ও লাতিনোদের ঐতিহাসিক ভোট বিপ্লবে ২০২৬-এ আমেরিকার রাজনীতি এক নতুন মোড়ে দাঁড়িয়েছে।
সেটলার কলোনির ২০০ বছরের পুরোনো বর্ণবাদী, রক্ষণশীল রাজনৈতিক সমীকরণ ভেঙে দক্ষিণের ভোটাররা এবার প্রমাণ করেছেন—অন্ধ আনুগত্যের চেয়ে রুটি-রুজি, ব্যক্তির স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের অস্তিত্ব রক্ষা অনেক বেশি শক্তিশালী চালিকাশক্তি।