
[সংক্ষিপ্তসার — এই কিস্তিতে গ্রান্টের যে বিষয় অনুবাদ করেছি ১১তম আবওয়াব — কেফিয়ত ফৌজদারান — যা আগের হস্তবুদের মতোই একই নীতিতে আদায় করা হতো। এগুলো ছিল মূলত সীমান্ত প্রদেশে আংশিক রাজস্ব-নির্ধারণ — ফৌজদারদের স্বেচ্ছাচারী সামরিক প্রশাসনে ন্যস্ত ছিল। ফৌজদাররা সুবাদারির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে নিজ ভূমির মূল জমার ওপর অননুমোদি অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করতেন। প্রয়োজনের দোহাই দিয়ে এই আচরণের যৌক্তিকতা প্রমাণ করতেন; কিন্তু আদায়করা অর্থের পরিমাণ গোপন করে অর্পিত দায়িত্বে বিশ্বাসঘাতকতা করতেন। এই অর্থ প্রায় তিন দশক ধরে আদায় করা সত্ত্বেও সরকারি কোষাগারে জমা পড়েনি; পুনরুদ্ধারের দৃঢ়তা বা কৌশল জানা ছিল না। মীর কাসিমের শাসনে এই অর্থ কেফায়তের সাধারণ খাতে চূড়ান্ত হিসাবভুক্ত হওয়ার আগে পর্যন্ত জালিয়াতি করে সরকারি হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছিল। এরপর গ্রান্ট দুটো অঞ্চলের বর্ণনা দিচ্ছেন — ১. পূর্ণিয়া (শেরপুর-দলমলপুর)- গঙ্গার ওপারে, বাংলার উত্তর-পশ্চিম সীমানায়; আয়তন ৫,১১৯ বর্গমাইল। উর্বর, সমতল কৃষিপ্রধান — ধান, তেলবীজ, ডাল, গম, আফিম, শোরা ইত্যাদি উৎপাদিত হয়। ১৭২২-এ সাইফ খানের আসল জমা ছিল ২,৭৮,৮৩০ টাকা। ১৭৩২-এ দেরহেমপুর/বারনগর যুক্ত হয় — ৩,৫৫,৭৭৩ টাকা। ১৭৫২ সৌলত জঙ্গকে শাসনভার দেওয়ার সময় মোরং জয়ে নতুন ভূখণ্ড যুক্ত হয় — আয়তন আগের যেকোনো একটার সমান। প্রকৃত সংগৃহীত অর্থ ১৮ লক্ষ টাকারও বেশি; কিন্তু সরকারি হিসাবে তা ছিল মাত্র ৫,৬১,৮৫৭ টাকা। কাসিম আলী হস্তবুদ তদন্তে অতিরিক্ত আয়ের পরিমাণ নির্ধারণ করেন ১৫,২৩,৭২৫ টাকা। ২. ঢাকা (জালালপুর)- দেশের সর্ববৃহৎ ও সর্বাধিক মূল্যবান প্রদেশ; আয়তন ১৫,৩৯৭ বর্গমাইল। বাংলার ধান উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র; সুপারি ও বাঙ্গা তুলা — বিশ্বের সেরা মসলিন তৈরির জন্য অপরিহার্য — উৎপাদিত হতো। জাহাঙ্গীরনগর ছিল মসলিন বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র। শেষ ফৌজদার ছিলেন শহমত জং — আলিবর্দি খানের তৃতীয় ভাগ্নে, জামাতা; তিনি একই সঙ্গে সুবার দেওয়ান আর ঢাকার নবাব নাজিম ছিলেন। তাঁর সম্পদ (রাজবল্লভের হস্তগত হয়) সিরাজ-উদ-দৌলার রোষের কারণ হয়। ১৭২২-এ ঢাকার মূল রাজস্ব ছিল ১৯,২৮,২৯৪ টাকা; সিলেট, কুড়িবাড়ি আর ঘোড়াঘাট যুক্ত হওয়ার পর তা ২,৫৫,৬৯৬ টাকা বৃদ্ধি পায়। খালসার ওপর আবওয়াব ছিল ৩,৭৮,৮৯১ টাকা। জায়গিরের মূল রাজস্ব ছিল ৬,৯৩,৯৩৭ টাকা — যা সরকারি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়; তওফিরও বাজেয়াপ্ত করা হয়। তবুও মীর কাসিম সর্বোচ্চ ১২,০১,৩১৫ টাকা অতিরিক্ত আয় যুক্ত করতে পেরেছিলেন।]
আবওয়াব।
১১তম। — কেফিয়ত ফৌজদারান (Keffyet Foujdaran): এই মুনাফাগুলোও পূর্ববর্তীগুলোর মতোই, যাদেরকে হস্তাবুদ (hustabood) নামে অভিহিত করা হয়, সম্ভবত একই নীতির ভিত্তিতেই আদায় করা হয়েছিল। কারণ প্রকৃতি ও ফলাফলে এগুলো সম্পূর্ণ একই ধরনের ছিল, যা মূলত ফৌজদারদের (foujedars) স্বেচ্ছাচারী সামরিক শাসনের অধীনস্থ অন্যান্য সীমান্ত প্রদেশের ওপর আংশিক মূল্যায়ন (partial assessments) ছিল। তাঁরা তাঁদের সুবাদারি (soubahdarry) প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ঠিক যেমনভাবে অনুকরণ করেছিলেন, তেমনি তাঁদের নিজ নিজ এখতিয়ারভুক্ত ভূমির মূল জুম্মার (original jumma) ওপর আনুষ্ঠানিকভাবে অননুমোদিতভাবে খাজনা বৃদ্ধি করে আদায় করেছিলেন। তাঁরা সর্বতোভাবে প্রয়োজনের অজুহাতে তাঁদের এই আচরণকে সমর্থন করতে পারতেন; কিন্তু এক্ষেত্রে তাঁরা তাঁদের দায়িত্বের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন, কারণ তাঁরা আদায় করা অর্থের পরিমাণ গোপন রেখেছিলেন। কারণ, দিল্লির সম্রাটের ওপর সুবাদারের প্রকৃত নির্ভরতা যতই অস্পষ্ট বা ভিত্তিহীন হোক না কেন — যার ফলে তিনি হয়তো নামমাত্র দায়িত্ব পালনের বাধ্যবাধকতা থেকে নিজেকে মুক্ত মনে করতেন — তবুও সেই কর্তৃপক্ষের প্রতি তাঁদের নাগরিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতা ছিল বাস্তব, অপরিহার্য এবং বাধ্যতামূলক; তা হোক আনুগত্যের অনুভূতি থেকে, সামাজিক প্রথা থেকে, অথবা চাকরদের সঙ্গে নিয়োগকর্তার আরও ব্যক্তিগত চুক্তির কারণে। কিন্তু একজন (সুবাদার) এতটা সৎ ছিলেন না যে তিনি এই বিষয়টি প্রকাশ্যে আনবেন এবং রাষ্ট্রের কৃতিত্বে যোগ করবেন; আর অন্যজনের (কোম্পানির) ততটা শক্তি বা নীতি ছিল না যে তারা এখানে উল্লেখযোগ্য বিপুল পরিমাণ রাজস্বের তহবিল তছরুপের (defalcations) অর্থ পুনরুদ্ধার করতে বাধ্য করবে। এই তহবিলটি প্রায় তিন দশক আগে থেকেই জমিদার বা রায়তদের কাছ থেকে সরকারি নামে এবং আপাতদৃষ্টিতে সরকারের প্রয়োজন মেটানোর অজুহাতে আদায় করা হচ্ছিল বলে সুবিদিত ছিল। এটি আদায় করেছিলেন সীমান্তবর্তী ফৌজদারি জেলাগুলোর অপর্যাপ্তভাবে জরিপকৃত অঞ্চলে নিযুক্ত সরকারের উপযুক্ত মুসলিম প্রতিনিধিরা; যদিও মীর কাসিমের (Meer Cossim) অভাবে জর্জরিত এবং ক্ষমতাবলে সমর্থিত শাসনামলে ‘কেফিয়ত’ বা মুনাফা (profits) শিরোনামে সেই অর্থ চূড়ান্তভাবে হিসাবভুক্ত ও নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তা জনসাধারণের কাছ থেকে প্রতারণার সঙ্গে গোপন রাখা হয়েছিল।
তবে, সংক্ষেপে উল্লিখিত এই আর্থিক সুবিধাগুলোর প্রকৃতি ও আঞ্চলিক বিস্তার সম্পর্কে প্রচলিত একটি ভুল ধারণা আরও সম্পূর্ণভাবে সংশোধন করার জন্য, সুবাহজুড়ে অন্যান্য বর্ধিত মূল্যায়নের মতোই, যে জেলাগুলোতে এই সুবিধাগুলো আদায় করা হয়েছিল, সেগুলোর আপেক্ষিক ভৌগোলিক অবস্থানকে আরও বিশেষভাবে চিহ্নিত ও বর্ণনা করা প্রয়োজন; যাতে সমগ্র দেশ ও জনসাধারণের ওপর তাদের তুলনামূলক বোঝা অনুমান করা যায়।
(১ম) পূর্ণিয়া, বা খালসা নথিতে যাকে সিরপুর-দুলালপুর বলা হয়, বর্ধিত রাজস্বের বড় অংশ ভাগ করে নেওয়ার ক্ষেত্রে সবার আগে আসে। এটি গঙ্গার ওপারে অবস্থিত — একদিকে বাংলার উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত হিসেবে বিহার সুবাহর দিকে, অন্যদিকে মরুং-এর স্বাধীন রাজার দিকে, যা উত্তর তিব্বতীয় পর্বতমালার পাদদেশে অস্বাস্থ্যকর বনভূমির একটি সংকীর্ণ ভূমিস্তর। এর আধুনিক সর্বোচ্চ বিস্তারে এটি ৫,১১৯ বর্গমাইল বিস্তৃত একটি উর্বর, ঘনবসতিপূর্ণ, সুপুষ্ট জলসিক্ত সমতল ভূমি; যা চাল, তেল, ডাল, গম এবং গৃহস্থালি ব্যবহারের প্রায় সব সাধারণ শস্যের প্রাচুর্যে ভরপুর, বিদেশি বাণিজ্যের জন্য মূল্যবান আফিম ও সল্টপিটারের প্রাচুর্যে সমৃদ্ধ, যার সঙ্গে যোগ করা যায় প্রতিবেশী মরুং-এর বন থেকে প্রাপ্ত দেবদারু ও অন্যান্য উপযোগী কাঠ; তবে এটি প্রধানত গরু ও মালবাহী বলদে ভরপুর, সঙ্গে রপ্তানির জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ঘি — যা শ্রেষ্ঠ চারণভূমি থেকে উৎপাদিত এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই করমুক্ত।
তবে এই অঞ্চলের এক-তৃতীয়াংশের বেশি কোনোদিনও ১৭২২ সালে সেই একই প্রাদেশিক নামের অধীনে সেফ খানের ব্যবস্থাপনায় ন্যস্ত ছিল না; তখন খালসা ও জাগির মিলিয়ে মূল জুম্মায় এর মূল্যায়ন ছিল ২,৭৮,৮৩০ রুপি। ১৭৩২ সালে প্রায় একই আয়তনের একটি জেলা — যার নাম দেরহেমপুর বা বেরনগর — বিহারের মঙ্গীর সার্কার থেকে বিচ্ছিন্ন করে কুসা নদীর পশ্চিম তীরের প্রাচীন খাত বরাবর সমস্ত ভূমিসহ সংযুক্ত করা হয়, যার বার্ষিক মূল্যায়িত খাজনা ছিল ৩,৫৫,৭৭৩ রুপি; এই খাজনা গুনদেবাড়া, বোয়ানিপুর, বেরনগর ও নাহ্তপুর — এই চারটি পরগনা উপবিভাগ থেকে আদায় হতো। এরপর ১৭৫২ সালে সেফ খানের মৃত্যু হলে, এই প্রদেশটি আলিবর্দী খানের ভ্রাতুষ্পুত্র ও জামাতা সৌলত জঙ্গকে প্রশাসনিক দায়িত্বে বা বরং উপহারস্বরূপ প্রদান করা হয়। তখন দেখা যায়, প্রয়াত ফৌজদারের অধীনে ত্রিশ বছরের এক দক্ষ প্রশাসনের ধারাবাহিকতায়, মরুং-এর দিকে বিজয় বা উন্নতির মাধ্যমে অঞ্চলটি আরও উর্বর ভূখণ্ড লাভ করেছে — যার আয়তন বা মূল্য পূর্বোক্ত যেকোনো একটি অঞ্চলের সমান। এটি জেলালগড়ের প্রাচীন সীমান্ত থেকে, পূর্ণিয়ার রাজধানী শহরের নিকটবর্তী, বর্তমান সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, যা পঞ্চাশ মাইল দীর্ঘ এক রেখা বরাবর কমপক্ষে ত্রিশ মাইল উত্তরে সরে গেছে। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই তিনটি আঞ্চলিক বিভাগ থেকে প্রকৃতপক্ষে আদায়কৃত অর্থের পরিমাণ ১৮ লক্ষ রুপিরও বেশি ছিল; অথচ রাজকোষের হিসাব অনুযায়ী সেখান থেকে প্রাপ্ত কার্যকর সরকারি রাজস্ব — আসুল ও আবওয়াব মিলিয়ে — সুজা খানের অত্যন্ত অপর্যাপ্ত মূল্যায়নে মাত্র ৫,৬১,৮৫৭ রুপিতে বৃদ্ধি পেয়েছিল। তবে এই অবস্থায় এবং এত হালকা বোঝা নিয়েই সৌলত জঙ্গ সুবাহদারি পদে নিযুক্ত হয়ে শূন্য পদটি দখল করেন; এবং নিজের সম্পদ ও বিবাহে প্রাপ্ত অর্থের প্রসারের মাধ্যমে তিনি নিজেকে এমন অবস্থায় ভাবতে শুরু করেন যে, ১৭৫৬ সালে সিরাজ-উদ-দৌলা বাংলার সিংহাসন দখল করার পর তিনি সমস্ত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিজের স্বাধীনতা দাবি করতে পারেন; ঠিক তেমনিভাবে পরবর্তী মীর জাফরের শাসনামলেও, বৈদেশিক গোলযোগের প্রথম আভাসে, তাঁর পুত্রও একই দাবি তোলেন; শেষ পর্যন্ত তাঁর সহযোগী — বীরভূমের অমান্যকারী জমিদারসহ — ইংরেজ বাহিনীর ত্রাসে তাঁদের যথাযথ আনুগত্যে ফিরিয়ে আনা হয়।
ঠিক সেই সময়েই মীর কাসিম রাষ্ট্রের প্রয়োজনে চাপে পড়ে কার্যত স্বেচ্ছাচারী শাসক হিসেবে নিযুক্ত হয়েও তিনি সম্ভবত প্রকৃত সার্বভৌমত্ব দখলের লোভকে উসকে দিতেই এই ন্যায়পরায়ণতার ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন — তিনি বিশ্বাস করতেন, তিনি নিজের পক্ষেই কাজ করছেন; যা ন্যায় ও নীতি সর্বদা দাবি করে। তাই তিনি নিম্নস্তরের প্রতিনিধিদের — জমিদার এবং রাজস্বের অন্যান্য মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে রায়তদের কাছ থেকে আদায়কৃত দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত খাজনার নিশ্চিত বকেয়া — তদন্ত করে সরকারি হিসাবে আনেন। পূর্ণিয়া প্রদেশে ‘কেফিয়ত’ বা সৌলত জঙ্গ ও অন্যান্য ফৌজদারদের সুবিধা শিরোনামে গোপনে প্রাপ্ত অর্থের অনুমিত হিসাবের ওপর মধ্যপন্থী অনুমানে এই পরিমাণ দাঁড়ায় ১৫,২৩,৭২৫ রুপি।
(২য়) ঢাকা, বা জেলালপুর: ১৭৬০ সালের মতোই এটি এখনও দেশের সর্ববৃহৎ ও সর্বাধিক মূল্যবান প্রদেশ হিসেবে টিকে আছে; যা বহুসংখ্যক ছোট জমিদারিতে বিভক্ত এবং মোট ১৫,৩৯৭ বর্গমাইল বিস্তৃত। হিন্দুস্তানের অন্য সব অঞ্চলের মতোই এই সুবাহকেও চালের ভাণ্ডার হিসেবে গণ্য করা হয়। এর অন্যান্য বিশেষ উৎপাদন প্রায় সম্পূর্ণভাবে মোগল সাম্রাজ্যের এই ক্ষুদ্র অংশেই সীমাবদ্ধ — যেমন সুপারি এবং ‘বাঙ্গা’ নামক এক ধরনের তুলা, যা বিশ্বের কিছু সেরা মসলিন বস্ত্রের ডোরার জন্য অপরিহার্য, যদিও মানের দিক থেকে উচ্চ নয়; আর এই বস্ত্রের সমস্ত প্রকারের জন্য ভাইসরয়ের প্রাক্তন রাজধানী জাহাঙ্গীরনগর শহরকে মহা-বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গণ্য করা যায়। যদিও এর কিছু জেলা দক্ষিণে সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত — দুই মহান উর্বর নদী গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের মোহনায়; অথবা উত্তরে আসামের সীমান্তে গারো পাহাড়ের দুর্ভেদ্য অঞ্চল পর্যন্ত — তবুও অভ্যন্তরীণ অবস্থার অধিকাংশ দিক থেকে এটি অন্য সীমান্ত অঞ্চলগুলো থেকে আলাদা; ব্যতিক্রম শুধু এই যে এটিও একজন মুসলিম ফৌজদারের অধীনে স্বাধীনভাবেই শাসিত হতো। সর্বশেষ কর্মরত এবং আজও পর্যন্ত সবচেয়ে ক্ষমতাধর ছিলেন শাহামত জঙ্গ নওয়াজিশ মোহাম্মদ খান — আলিবর্দীর তৃতীয় ভ্রাতুষ্পুত্র ও জামাতা; যিনি একইসঙ্গে সমগ্র সুবাহর দেওয়ান এবং ঢাকার নবাব নাজিম ছিলেন, পূর্বদিকের সমস্ত প্রদেশসহ। তাঁরই (অথবা তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে রেজা বুলবুলের) সঞ্চিত সম্পদ খুঁজতে গিয়ে — যা তাঁর পুত্র কিশেন দাস কলকাতায় আশ্রয় নেওয়ার সময় গোপন করেছিল বলে ধারণা করা হয় — সিরাজ-উদ-দৌলা দেশকে রক্তে ভাসিয়ে দেন; শেষ পর্যন্ত তিনি স্বৈরাচারের প্রাপ্য শাস্তি হিসেবে নিজের পরিণতির মুখোমুখি হন। ঠিক তেমনিভাবে সেই নিম্নস্তরের প্রতিনিধি, যিনি তাঁর প্রাক্তন প্রভুর এখতিয়ারভুক্ত ধনী কিন্তু অনির্ধারিত রাজনগর জমিদারি নিজের হেফাজতে রেখেছিলেন, মফস্বলের হিসাব বা প্রদেশজুড়ে আদায়কৃত মোট খাজনার প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ করতে অস্বীকার করেন — যা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত মুনাফার জন্য আত্মসাৎ করা হচ্ছিল। এই ঘটনাই পরবর্তীতে মীর কাসিমের ক্রোধের কারণ হয়, যখন তিনি দেশের সমস্ত আর্থিক সম্পদ অনুসন্ধান করে রাজকোষে জমা করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নিযুক্ত ছিলেন।
তা সত্ত্বেও, নিষ্ঠুরতা সাধারণত নিজের উদ্দেশ্যকেই ব্যর্থ করে — তাই ধারণা করা যায়, এবার নবাব সুবাহদারও নিরাশ হয়েছিলেন। কারণ, ১৭২২ সালে জাফর খানের তুমার বন্দোবস্তের পর থেকে ঢাকার সমস্ত মূল ভূমির মূল্য বৃদ্ধি পেলেও তখনকার মূল্যায়ন ছিল ১৯,২৮,২৯৪ রুপি; এরপর প্রতিবেশী সিলেট, কারিবারি ও গোরাঘাট চাকলা থেকে বিচ্ছিন্ন করে উন্নত অঞ্চল সংযুক্তির মাধ্যমে প্রমিত খাজনার পরিমাণ ২,৫৫,৬৯৬ রুপি বৃদ্ধি পায়। খালসা অংশে এই সঞ্চিত জুম্মার ওপর, এবং পূর্বে উল্লিখিত, সমস্ত প্রাক্তন সুবাহদারদের দ্বারা আরোপিত আনুপাতিক আবওয়াবের মোট পরিমাণ পুরনো প্রতিষ্ঠিত রাজকীয় খাজনা ছাড়াও ৩,৭৮,৮৯১ রুপির বেশি ছিল না; বিশেষত আকবরের আমল থেকে জাগিরে থাকা অঞ্চলের বড় ও ধনী অংশ — যা প্রায় সম্পূর্ণভাবে রাজকীয় নৌবাহিনী, গ্যারিসন ও কামান বিভাগের বার্ষিক ব্যয় মেটাতে বরাদ্দ ছিল — আসুল পরিমাণ ৬,৯৩,৯৩৭ রুপির সামান্য কম ছিল, যা সম্পূর্ণভাবে পুনরুদ্ধার করা হয়; সঙ্গে প্রায় দুই শতাব্দী ধরে ধীরে ধীরে সৃষ্ট বিপুল ‘তওফির’ বা মুনাফাও — যা মুদ্রার অসাধারণ প্রবাহ এবং ভূমির উন্নত খাজনার ফলে সৃষ্টি হয়েছিল। তবুও আমরা পুনরায় বলছি, এই সমস্ত অনুকূল পরিস্থিতি সত্ত্বেও, মীর কাসিম সমগ্র প্রদেশের বার্ষিক কার্যকর রাজস্বে সর্বোচ্চ যে ‘কেফিয়ত’ যোগ করেছিলেন বলে মনে হয়, তা ১২,৯১,৩১৫ রুপি-এর বেশি ছিল না।
টীকা ১
১. কেফিয়ত ফৌজদারান- ফৌজদারদের অতিরিক্ত আয় — যা সীমান্ত প্রদেশে আদায় করা হতো।
২. ফৌজদার– মুঘল প্রশাসনিক ও সামরিক কর্মকর্তা — যিনি সীমান্তবর্তী অঞ্চলে শাসন চালাতেন।
৩. আসল জমা- মূল নির্ধারিত রাজস্ব — যা টোডরমল ১৫৮২ সালে নির্ধারণ করেন।
৪. হস্তবুদ– জমির প্রকৃত আয়-ব্যয় ও উৎপাদন ক্ষমতা সংক্রান্ত জরিপ।
৫. কেফায়ত– অতিরিক্ত মুনাফা বা বর্ধিত সংগ্রহ — যা রাজকোষে জমা করা হতো।
৬. সিরপুর-দলমলপুর- খালসা নথিতে পূর্ণিয়ার নাম।
৭. মোরং– উত্তর তিব্বতীয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত স্বাধীন রাজ্য — যা পূর্ণিয়ার সীমান্তে ছিল।
৮. দেরহেমপুর/বারনগর– বিহারের মুঙ্গের সরকারের অন্তর্ভুক্ত অঞ্চল — যা ১৭৩২ সালে পূর্ণিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়।
৯. সৌলত জঙ্গ- আলিবর্দির ভাগ্নে ও জামাতা — যিনি পূর্ণিয়ার শাসনভার লাভ করেন।
১০. শাহামত জং- আলিবর্দির তৃতীয় ভাগ্নে ও জামাতা — যিনি ঢাকার শেষ ফৌজদার ও সুবার দেওয়ান ছিলেন।
১১. রাজবল্লভ– শাহামত জঙ্গের নায়েব — যিনি রাজেনগরের জমিদারি পরিচালনা করতেন এবং বিপুল সম্পদ হস্তগত করেছিলেন।
১২. বাঙ্গা তুলা- এক বিশেষ জাতের তুলা — যা মসলিন কাপড়ের সূক্ষ্ম নকশা তৈরির জন্য অপরিহার্য।
১৩. তওফির– জায়গিরের অতিরিক্ত মুনাফা — যা সরকারি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
১৪. জাহাঙ্গীরনগর– ঢাকার মুঘল নাম — যা মসলিন বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র ছিল।
ফৌজদাররা সীমান্ত প্রদেশে নিজেদের স্বেচ্ছাচারী সামরিক প্রশাসনের অধীনে অতিরিক্ত কর আদায় করতেন — যা প্রায় তিন দশক ধরে সরকারি কোষাগারে জমা পড়েনি। মীর কাসিমের আমলেই এই অর্থ কেফায়তের অধীনে চূড়ান্তভাবে হিসাবভুক্ত হয়। পূর্ণিয়ার প্রকৃত সংগৃহীত অর্থ ছিল ১৮ লক্ষ টাকারও বেশি; কিন্তু সরকারি হিসাবে তা ছিল মাত্র ৫,৬১,৮৫৭ টাকা। এই বিশাল ব্যবধানই প্রমাণ করে স্থানীয় ফৌজদাররা কতটা অর্থ আত্মসাৎ করতেন। ঢাকার মূল রাজস্ব ছিল ১৯,২৮,২৯৪ টাকা; সিলেট, কারিবাড়ি ও ঘোড়াঘাট যুক্ত হওয়ার পর তা ২,৫৫,৬৯৬ টাকা বৃদ্ধি পায়। জায়গিরের মূল রাজস্ব ছিল ৬,৯৩,৯৩৭ টাকা — যা সরকারি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। মীর কাসিমের সাফল্য- সমস্ত অনুকূল পরিস্থিতি সত্ত্বেও মীর কাসিম সর্বোচ্চ ১২,০১,৩১৫ টাকা অতিরিক্ত আয় যুক্ত করতে পেরেছিলেন — যা তাঁর আর্থিক দক্ষতার প্রমাণ। দেওয়ানি লাভ ও আত্মসাৎ — ১৭৬৫ সালে দেওয়ানি লাভের সময় দেশীয় প্রশাসন এই প্রকৃত হিসাব গোপন করে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে রাজস্বের পরিমাণ কমিয়ে দেখায়।
গ্রান্টের পরোক্ষ কুৎসার বিশ্লেষণ
এই অংশেও গ্রান্ট পরোক্ষভাবে মুঘল শাসক ও স্থানীয় কর্মকর্তাদের সম্পর্কে নেতিবাচক বর্ণনা দিচ্ছেন। কয়েকটি উদাহরণ —
১. “তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্বের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা” — ফৌজদারদের বিরুদ্ধে অভিযোগ — তারা আদায়কৃত অর্থের পরিমাণ গোপন করে “বিশ্বাসঘাতকতা” করেছে। কিন্তু গ্রান্ট স্বীকার করেন — সুবাদারদের দুর্বল প্রশাসন ও দিল্লির কর্তৃত্বের অস্পষ্টতার কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
২. “মীর কাসিমের অভাবগ্রস্ত অথচ শক্তিশালী সমর্থক-পরিবেষ্টিত” — মীর কাসিমকে “অভাবগ্রস্ত” বলে চিত্রিত করা — যদিও তিনি ছিলেন স্বাধীন ও দক্ষ শাসক।
৩. “সৌলত জঙ্গ নিজের স্বাধীনতা ঘোষণার কথা ভাবেন” — সৌলত জঙ্গের বিরুদ্ধে অভিযোগ — তিনি “উচ্চতর কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ অস্বীকার করে নিজের স্বাধীনতা ঘোষণা করার কথা ভাবেন”। কিন্তু গ্রান্ট স্বীকার করেন — তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদ ও আত্মবিশ্বাসের কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
৪. “সিরাজ-উদ-দৌলা দেশজুড়ে রক্তগঙ্গা বইয়ের” — সিরাজ-উদ-দৌলাকে “স্বৈরাচারী” ও “নিষ্ঠুর” বলে চিত্রিত করা — যিনি “দেশজুড়ে রক্তগঙ্গা বইয়ের”।
৫. “স্বৈরাচারের উপযুক্ত শাস্তি” — সিরাজ-উদ-দৌলার পতনকে “স্বৈরাচারের উপযুক্ত শাস্তি” বলে অভিহিত করা।
৬. “রাজবল্লভের অনমনীয় গোপনীয়তা” — রাজবল্লভের বিরুদ্ধে অভিযোগ — তিনি “অনমনীয় গোপনীয়তা ও অস্বীকৃতি” দেখিয়েছেন এবং অর্থ “একান্তই ব্যক্তিগত স্বার্থে আত্মসাৎ” করেছেন। আদতে গ্রান্টের এই বর্ণনা নিরপেক্ষ ইতিহাস নয় — উপনিবেশিক জ্ঞানচর্চার হাতিয়ার। তিনি স্থানীয় শাসক ও কর্মকর্তাদের বিশ্বাসঘাতক, স্বৈরাচারী, নিষ্ঠুর ও দুর্নীতিপরায়ণ চিত্রিত করে ব্রিটিশ শাসনকে “উন্নয়ন” ও “শৃঙ্খলা”র একমাত্র উৎস হিসেবে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন।
গ্রান্টের এই অংশটি কেফিয়ত ফৌজদারান, পূর্ণিয়া ও ঢাকার রাজস্ব ইতিহাস এবং উপনিবেশিক জ্ঞানচর্চার কুৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ। তিনি দেখান — ফৌজদাররা সীমান্ত প্রদেশে অতিরিক্ত কর আদায় করতেন; কিন্তু সেই অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা পড়ত না। মীর কাসিম হস্তবুদ তদন্তের মাধ্যমে সেই অর্থ উদ্ধার করেন। তাঁর বক্তব্য — আবওয়াবের পরিমাণ বা অনিয়ম নয়; বরং ফৌজদারদের স্বেচ্ছাচারিতা, সৌলত জঙ্গ ও রাজবল্লভের আত্মসাৎ এবং মুঘল শাসকদের আর্থিক অদক্ষতা — এই তিনটিই ছিল জনগণের অসন্তোষ ও রাজকীয় আয়ের ঘাটতির মূল কারণ। কিন্তু এই বর্ণনা আসলে উপনিবেশিক স্বার্থরক্ষার একটি হাতিয়ার — যা ঐতিহাসিক তথ্য ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে খণ্ডন করা জরুরি।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ