
কলিকাতা দর্পণ’-এর লেখক শ্রদ্ধেয় রাধারমণ মিত্র লিখেছেন, — ‘ইংরেজি নাম Cornwallis Square (কর্নওয়ালিস স্কোয়্যার), বাংলা আটপৌরে নাম হেদো, পোশাকি নাম হেদুয়া। হেদো বা হেদুয়া এসেছে ‘হ্রদ’ শব্দ থেকে। ড. সুকুমার সেন বলেছেন, ‘হেদো’ কথাটির মানে মজাপুকুর। বর্ধমান জেলায় কোনও কোনও গ্রামে এই নামে পুকুর ও দিঘি আছে। তিনি শব্দটির মাত্র অর্থ দিয়েছেন, ব্যুৎপত্তি দেননি। এরও ব্যুৎপত্তি ‘হ্রদ’ শব্দ থেকে, যার মানে পুকুর বা দিঘি।’ দেখা যাচ্ছে, রাধারমণ মিত্র ও ড. সুকুমার সেনের হেদুয়া-ব্যাখ্যা মোটামুটিভাবে একই রাস্তায় হেঁটেছে। দু’জনের কেউই কিন্তু প্রাচীন কলকাতার কোনও অনুষঙ্গ আনতে পারেননি তাঁদের ব্যুৎপত্তি বা ব্যাখ্যায়। কলকাতার হেদুয়া বা হেদো মনে হয় একটু স্বতন্ত্র মনোযোগ দাবি করে।
এ বিষয়ে অনেক খোঁজখবর ও চিন্তাভাবনার পর মনে হল, হেদুয়া বা হেদো শব্দটি এসেছে ‘হয়দহ’ থেকে। ‘হয়’ মানে ঘোড়া, দহ মানে পুকুর বা দীঘি। হয়বদন শব্দের মতো হয়দহ শব্দের অস্তিত্বও ছিল আগে। অর্থাৎ যে দীঘির জলে ঘোড়াদের স্নান করানো হয়, সেই দীঘিটিই ‘হয়দহ’। অপভ্রংশের ফলে ‘হয়দহ’ হয়ে গিয়েছে হেদোয়া বা হেদো। এর সপক্ষে প্রমাণও আছে।
হরিসাধন মুখোপাধ্যায়ের ‘কলিকাতা সেকালের ও একালের’ বইটির এক জায়গায় পাচ্ছি — ‘গভর্নমেন্টের আদেশে ১৭৯০ খ্রিস্টাব্দে ৭ জানুয়ারিতে এই স্থানে (ধর্মতলা) একটি সুবৃহৎ দীর্ঘিকা খননের জন্য কনট্র্যাক্ট দেওয়া হয়। কেবল ধর্মতলার এই পুষ্করিণী নহে, হরিণবাটি জেলের নিকট আরও দুইটি পুষ্করিণী খননের আদেশও এই সময় দেওয়া হয়। এই তিনটি পুকুরের মধ্যে দুইটি কেবল সাহেবদের ও সম্ভ্রান্ত শ্রেণির পানীয় জলের জন্য ব্যবহৃত হত ও অপরটি ঘোড়া ধোয়াইবার নিমিত্ত ব্যবহৃত হইত।’ এখান থেকেই প্রমাণিত হয় ঘোড়াকে স্নান করানোর জন্য বেশ কয়েকটি ছিল দীঘি কলকাতা শহরে। উত্তর কলকাতার হেদুয়া তার মধ্যে অন্যতম।
হেদুয়ায় আজ যেখানে বিশ্রম্ভালাপের পার্ক এবং কলকাতার প্রখ্যাত সাঁতার ক্লাবগুলি অবস্থান করছে, আঠারো শতকের মধ্যভাগেও সেই স্থানটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। এটি মূলত একটি জঙ্গলময় এবং বদ্ধ জলাশয়ে পূর্ণ এলাকা ছিল।
মালিকানার বিবর্তন: ১৭৮৭ সালের আগে এই সম্পূর্ণ অঞ্চলের জমি হাটখোলার বিখ্যাত দত্ত পরিবারের মালিকানাধীন ছিল। পরবর্তীকালে ১৭৮৭ সালে রামকান্ত মিত্র এই জমি ক্রয় করেন। ১৮১৭ সালের দিকে লটারি কমিটির মাধ্যমে কলকাতার নগরোন্নয়ন ও আধুনিকায়নের কাজ শুরু হলে, রামতনু দত্তের মধ্যস্থতায় এই অঞ্চলটি লটারি কমিটির অধীনে চলে আসে।
কর্নেল কর্নওয়ালিস স্কোয়ারের পত্তন: লটারি কমিটি কলকাতার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ দূর করতে এবং আবাসিক এলাকা গড়ে তুলতে এই জলাভূমি সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। তারা জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করে এবং জলাশয়টিকে একটি সুনির্দিষ্ট সুষম দীঘির রূপ দেয়। ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিসের নামানুসারে এই নতুন সুসজ্জিত চত্বরের নাম রাখা হয় ‘কর্নওয়ালিস স্কোয়ার’ (Cornwallis Square)। দীঘির চারপাশ ঘিরে তৈরি করা হয় হাঁটার পথ এবং বসানো হয় রেলিং।
মহারাজা নন্দকুমারের স্মৃতি: কিছু ঐতিহাসিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ওয়ারেন হেস্টিংসের আমলে ব্রিটিশদের দ্বারা বিচার বিভাগীয় হত্যার শিকার হওয়া মহারাজা নন্দকুমারের সম্পত্তি বা বাগানের একটি অংশ এই অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ফলে এই মাটির সঙ্গে কলকাতার আদি ঔপনিবেশিক সংঘাতের ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে।
বিশ শতকের প্রথমার্ধে সমগ্র উত্তর কলকাতার মতো হেদুয়াও হয়ে উঠেছিল ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের এক অন্যতম প্রধান চারণভূমি। অনুশীলন সমিতি এবং যুগান্তর দলের বিপ্লবীরা পার্শ্ববর্তী সিমলা ও মানিকতলার আখড়াগুলির পাশাপাশি হেদুয়া পার্কের বিস্তৃতিকেও গোপন বৈঠক ও শারীরিক কসরতের জায়গা হিসেবে ব্যবহার করতেন।
১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর, ব্রিটিশ রাজের ঔপনিবেশিক চিহ্ন মুছে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর গঠিত ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’-এর অসামান্য বীরত্ব ও আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কর্নওয়ালিস স্কোয়ারের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘আজাদহিন্দ বাগ’। স্বাধীনোত্তর কালে এটি কলকাতার রাজনৈতিক জনসভা এবং সামাজিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ভেনু হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
প্রশ্ন হচ্ছে কুমারটুলি, শোভাবাজার, পাথুরিয়াঘাটা, বাগবাজারের সম্ভ্রান্ত বনেদি বাড়ির ঘোড়ার গাড়ির ঘোড়াদের স্নান করানো হত কোথায়? গঙ্গার ঘাটে স্নান করানোর ঝুঁকি কেউ নিত না। যদিও প্রিন্সেপ ঘাট ও বাবুঘাটে ঘোড়াদের স্নান করানোর কথা জানা যায়। তবু সেটা ছিল চোরাগোপ্তাভাবে, কারণ জোয়ারের জলে ঘোড়াদের ভেসে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকত। তাই চৌবাচ্চা বা পুকুর বা জলাশয়েই ঘোড়াদের স্নান করানো হত বেশি।
শোভাবাজারের রাজা নবকৃষ্ণদেবের ঘোড়াই বলুন, বা কুমারটুলির নন্দরাম সেন, গোবিন্দরাম মিত্র ও অভয়চরণ মিত্রের আস্তাবলের ঘোড়ারাই বলুন, বা পাথুরিয়াঘাটার মল্লিকবাড়ির রাজেন মল্লিকের ঘোড়াই বলুন, সব ঘোড়াই স্নান করত পুকুর বা দীঘিতে। বাংলাদেশে আছে ঘোড়াদহ বলে এক জায়গা। উত্তর কলকাতায় হয়দহ ওরফে হেদুয়া ঘোড়াদের স্নানের জলাশয় ছিল একদা।
এখন চতুষ্পদ প্রাণীর স্নান নিষিদ্ধ সেখানে। গৃহিনীদের অলস বিকেলের অবসর যাপনের সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চাদের সাঁতার শেখানোর ঘোড়ারোগ সেখানে।