
পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর চলাকালীন ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’, ভূ-ভারতে কোথাও হয় নি। এতদিন বাদে সর্বোচ্চ আদালত পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, যে, ওই লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি ব্যবহারের যে অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, সেটা শুধুমাত্র অন্তর্বর্তীকালীন। এর আইনি বৈধতা সম্পর্কে আদালত এখনও কোনো চূড়ান্ত রায় দেয়নি। লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি হয়ে গেল, লাখ-লাখ নাম বাদ গেল, কিন্তু যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হল তার নাকি আইনী বৈধতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সম্মতি শীর্ষ আদালতের ছিল না। তাহলে করতে দেওয়া হল কেন? আইনের বৈধতা বিচার যেখানে হল না, সেই আইনের নাম করে লাখ লাখ মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগ স্থগিত করা হল, এটা কেমন আইনি ব্যবস্থা?
গোটা ব্যাপারটা কীভাবে কে করল, এখন কেউ তার দায়িত্ব নিচ্ছে না। দেশব্যাপী আন্দোলনের পর আরটিআই করে নির্বাচন কমিশনকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, এসআইআর করা হয়েছিল কোন সফটওয়্যার ব্যবহার করে? উত্তর এসেছে, বলা যাবেনা, কারণ ওটা ট্রেড সিক্রেট। কেন বলা যাবে না? মানুষের নাম কাটা হবে, মানুষ কেন জানতে পারবে না কী কারণে কাটা হল? বিচারতিদের সম্মতি সত্ত্বেও ৬০ লাখ মানুষের নাম কাটতে দেওয়া হয়, এবং সেটা সাংবিধানিকভাবে যারা অধিকারী তাদের সম্মতি ছাড়াই। এত বড় কান্ড ঘটালো কে? কেন? কোন উদ্দেশ্যে?
এসআইআর মিটে যাবার পরেও ১৬ লক্ষ লোককে বাতিল করার জন্য আপিল হয়েছে। কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন বলেছে, ওটা করা হয়েছিল মনোজ আগরওয়ালের দপ্তর থেকে, এবং কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন এর বিন্দুবিসর্গ জানতনা। মনোজ আগরওয়ালের দপ্তর নীরবতা পালন করছেন, তাহলে রাজ্য নির্বাচনের মুখ্য আধিকারিক নাম কাটল কার নির্দেশে? কেন? আশ্চর্যের ব্যাপার, এতটা স্পষ্ট হওয়ার পরেও সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বেঞ্চ কেন মনোজ আগরওয়াল এবং নির্বাচন কমিশনকে এর জন্য হলফনামা দিয়ে এসব কান্ড ঘটানোর দায় নিতে বলছেন না? কেন এর জন্য দায়ী কে চিহ্নিত করে শাস্তি দিতে শীর্ষ আদালত এখনোও দেখছে আর ভাবছে?
সকলেই বুঝতেই পারছেন,তাহলে এইভাবে গণতন্ত্রের অপহরণ কিংবা হত্যা করা হয়েছে দেখেও তাহলে বাংলার ২০৩৬ এর বিধানসভা ভোট বাতিল করা হবে?
রাজ্যগুলিকে বিরোধী শূন্য করতেই কি SIR? বাংলার অভিজ্ঞতা এবং কিছু অভিযোগ ও অমীমাংসিত প্রশ্ন:
অভিযোগ ও প্রশ্ন ১ :
সাবিধানিকভাবে দেশের জন প্রতিনিধি আইনে ভোটার তালিকায় নাম সংযোজন, সংশোধন এবং বিয়োজনের সর্বোচ্চ ক্ষমতা একজন Election Registration Officer বা ERO র উপর অর্পণ করা হয়েছে। তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। তাহলে ডকুমেন্টস খতিয়ে দেখে শুনানির পর যে নামগুলোকে চূড়ান্ত করে ভোটার তালিকায় আর
ERO রা ভোটার তালিকায় রেখে দিয়েছেন, সে সব নামকে বিচারাধীন তালিকায় কি করে ফের পাঠানো যায়? কে এমন বেআইনি কাজ করল? নির্বাচন কমিশনকে এর জবাব দিতেই হবে।
পশ্চিমবঙ্গে ২১ শে ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ SIR শুনানীর শেষ হয়। মোট ১ কোটি ৫১ লক্ষ ৯২ হাজার ৬৩৪ জন নোটিশ পেয়েছিল। তার মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৩১ লক্ষ ৪৫ হাজার ১০৯ জনের জন্য শুনানি শেষ হয়। তাঁদের চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় । প্রায় ১১ লাখ ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ রাখা হয়েছিল ভালো করে খুঁটিয়ে দেখার জন্য। আর প্রায় ৮ লাখ ভোটারের নাম অমীমাংসিত ছিল। ২৮ শে ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ তারিখ যখন চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হলো তখন দেখা গেল ৬০ লক্ষ ৬ হাজার ৬৭৫ জন ভোটার Under Adjudication। এর মধ্যে ERO দের রায়ে প্রায় ৫১ লক্ষ ভোটারকে ভোট দেওয়ার অনুমতি পায়।অবাক কাণ্ড এরপর তাঁরাও বিচারাধীন হয়ে গেলেন এবং ভোট দিতে পারলেন না। ERO দের কাছে অমীমাংসিত মামলা ছিল ৮.৯ লক্ষ আর বিচারাধীন হলো ৬০ লক্ষ — পিছন থেকে কলকাঠি নেড়ে এই জঘন্য কাজ কে করলো?
অভিযোগ ও প্রশ্ন ২ :
পরবর্তীতে ERO দের পোর্টালে ঢোকার একসেস বন্ধ করে দিল কেন নির্বাচন কমিশন? তাঁদের কাছ থেকে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে নাম সংযোজন, বিয়োজন এবং সংশোধন এর ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হলো। নির্বাচন কমিশন এটা করতে পারেন না। এটা সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক কাজ।
অভিযোগ ও প্রশ্ন ৩ :
২৪ শে জুন, ২০২৫ তারিখ SIR এর সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিল কমিশন তা জানাতে পারেনি এবং এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার কোনো ডকুমেন্ট নির্বাচন কমিশন আদালতে জমা করতে পারেনি।
অভিযোগ ও প্রশ্ন ৪ :
ফর্ম ৬ পরিবর্তন কার নির্দেশে করা হয়েছিল কেউ তা জানেনা – সুপ্রিম কোর্ট জানেনা, জ্ঞানেশ কুমার জানেনা, CEO অফিস জানেনা। এর জবাব কমিশনকে দিতে হবে।
অভিযোগ ও প্রশ্ন ৫ :
পশ্চিমবঙ্গে ১৬ লাখ ১০ হাজার নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ কে দিয়েছিল কেউ তা জানেনা। শেষে CEC এই দায় CEO র অফিসের উপর চাপিয়ে মুক্তি পেতে চাইছেন। এক মিনিটে এতো ভোটার বাদ দেওয়ার কৃতিত্ব কোন অফিসারের? এর বিচার কে করবে?
অভিযোগ ও প্রশ্ন ৬ :
সংবিধানের কোন ধারায় লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি চালু করা হয়? কেন? কেউ তা জানেনা।
অভিযোগ ও প্রশ্ন ৭ :
ফর্ম ৬ শুধুমাত্র নতুন ভোটারদের প্রথম বারে ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য। এবং সেখানে একটি ডিক্লেরেশন রয়েছে যে আবেদনকারী আগে কখনও ভোট দেননি। তাহলে যাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছিলো, তাঁদের ফর্ম ৬ ফিলাপ করতে বলছে কেন? এই অপরাধে তাঁদের এক বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে।
অভিযোগ ও প্রশ্ন ৮ :
ফর্ম ৭ কখনও বাল্ক আকারে জমা করা যায় না।কিন্তু সেটাই হয়েছে। তাহলে কমিশনের আধিকারিকরা সেটা গ্রহণ করলেন কেন? এটাই প্রমাণ করে গোটা ব্যাপারটা ঘটানো হয় অন্তরালে এক বৃহদ শক্তির নেতৃত্বে। ভোটের আগে নিয়ম হলো কোনো ভোটারের নাম বাদ দিতে হলে ঐ বুথের একজন ভোটারকে ফর্ম ৭ এর মাধ্যমে আবেদন করতে হয়। দেখা গেল বহু ক্ষেত্রে আধিকারিকরা নিজেরাই এই ফর্ম জমা করেছে। আইনকে কমিশন বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে দিয়ে এত বেআইনি ঘটনা ঘটালো যে বা যারা ,তার বিচার হবে কবে?
অভিযোগ ও প্রশ্ন ৯ :
ফর্ম ৮ হলো নাম বা তথ্য সংশোধন করার জন্য। SIR সম্পন্ন হওয়ার পর কিভাবে ফর্ম ৮ সাবমিট করা হয়? কোনো ব্যক্তি ফর্ম ৮ ফিলাপ না করা সত্ত্বেও তার তথ্য কিভাবে পরিবর্তিত হলো?
এসব কোনো প্রশ্নের উত্তর কিন্তু কমিশন দিতে পারেনি। সুপ্রিম কোর্টে এখনও শুনানী চলছে।দেশবাসী অপেক্ষায়।ইতিমধ্যে ফের আরেক বিরোধী দল শাসিত কর্নাটকে প্রায় এক কোটি নাগরিকের নাম কেটে দেওয়া হল।দিল্লিতে কাটা হয়েছিল ৩৫% এর বেশি। সব রাজ্যগুলিকে বিরোধী শূন্য করে তোলার লক্ষ্যে কি এই SIR? নিশ্চয়ই আদালত এসব ব্যাপার লক্ষ্য রাখছেন।