
বৃষ্টির সকাল
বর্ষার সকাল। টিপটিপ করে টানা বৃষ্টি পড়ছে। আকাশ ভরা কালো মেঘ, বাতাসে কাঁচা মাটির গন্ধ। রাস্তার ধারের গর্ত গুলোয় জল কাদা জমে গেছে।
টুকাই জানলার পাশে দাঁড়িয়ে। হাতে স্কুল ব্যাগ, পরনে নীল স্কুলড্রেস। কিন্তু আজ তার মুখটা কেমন গম্ভীর।
কারণ? আজ অঙ্কের টেস্ট। ভোরবেলা থেকে খাতায় খাতায় যোগ-বিয়োগ করছিল সে। আবার স্কুলে যেতেও হবে। কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো — তার রঙিন ছাতাটা কোথাও খুঁজে পাচ্ছে না।
বিশেষ ছাতাটা
টুকাইয়ের ছাতাটা সাধারণ নয়। সেটি নীল, লাল, সবুজ আর হলুদ রঙে সাজানো। বাবা একদিন মেলা থেকে কিনে দিয়েছিলেন।
প্রথমে টুকাই ভেবেছিল, কেবল সুন্দর দেখানোর জন্যই ছাতা। কিন্তু একদিন বৃষ্টিতে হেঁটে যেতে যেতে হঠাৎ ছাতাটা খুলতেই চারপাশে অদ্ভুত আলো ছড়িয়ে পড়ল।
বৃষ্টির ফোঁটা গুনগুন করে গাইতে শুরু করল, পাখিরা কিচিরমিচির সুর তুলল, আর চারদিক ভরে গেল আনন্দে। সেদিন থেকেই টুকাই বুঝে গেল — এটা জাদুর ছাতা।
ছাতা হারানো
আজ সকালে সেই ছাতাই উধাও। খুঁজে খুঁজে হিমশিম খাচ্ছে টুকাই।
বিছানার পাশে নেই, পড়ার টেবিলে নেই, এমনকি বারান্দার কোণেও নেই।
— আহা! আজ যদি ছাতা না পাই, স্কুলে ভিজে একেবারে কাক হয়ে যাব! — বিড়বিড় করল টুকাই।
ঠিক তখনই পাশের গলির ছোট্ট কুকুরছানা পুচকি ছুটে এলো। মুখে টুকাইয়ের ছাতাটা ধরে রেখেছে!
— আরে! এটা তো আমার ছাতা! কোথায় পেলে? — চেঁচিয়ে উঠল টুকাই।
পুচকি খুশি খুশি ঘেউ ঘেউ করে ছাতাটা নামিয়ে দিল। তারপর দৌড়ে গেল পুকুরের দিকের মাঠে। কৌতূহলী টুকাই ছাতাটা নিয়ে তার পিছু নিল।
পুকুরের জাদু
মাঠের মাঝখানে বড় একটা পুকুর। বৃষ্টির জল ভরে টলটল করছে।
টুকাই ছাতাটা মাথার ওপর ধরতেই আশ্চর্য দৃশ্য দেখা গেল। রঙিন আলো পুকুরের জলে পড়তেই ছোট ছোট রঙিন মাছ ভেসে উঠল। যেন হাজার জোনাকি পুকুরের মধ্যে নেচে বেড়াচ্ছে।
পুচকি খুশিতে লাফিয়ে জলে পড়ে খেলতে শুরু করল। টুকাই মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।
— এ তো সত্যিই জাদুর ছাতা! — বলল সে।
অঙ্কের জাদু
কয়েকদিন পর টুকাই নতুন রহস্য আবিষ্কার করল।
একদিন অঙ্কের হোমওয়ার্ক করতে বসেছে। বড় বড় যোগ আর গুণ দেখে মাথা ঘুরছে। হঠাৎ সে ছাতাটা খুলে টেবিলের পাশে রাখল।
দেখা গেল, খাতার ওপর রঙিন আলো পড়তেই সংখ্যাগুলো একে একে সাজতে শুরু করল। অঙ্কের উত্তর যেন চোখের সামনে নিজেই স্পষ্ট হয়ে উঠল।
টুকাই অবাক হয়ে গেল। এবার বুঝল — ছাতাটা শুধু বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচায় না, পড়াশোনাতেও সাহায্য করে।
পরের দিন টেস্টে টুকাই পুরো ক্লাসে প্রথম হলো। সবাই বিস্মিত!
বন্ধুরা পেল উপকার
এরপর থেকে টুকাই ছাতাটা কে শুধুমাত্র নিজের কাজের জন্য রাখল না। বন্ধুরাও যখন পড়াশোনায় সমস্যায় পড়ত, সে ছাতার নিচে তাদের বসতে দিত।
জাদুর আলোয় অঙ্ক সহজ মনে হতো, কবিতার লাইন মুখস্থ হয়ে যেত, বিজ্ঞানের ছবি চোখের সামনে ফুটে উঠত।
— টুকাই, তোর ছাতার নিচে বসা মানে যেন যাদুকরী ক্লাসরুমে বসা! — হেসে বলল সবাই।
বন্ধুরা সবাই টুকাইয়ের ভরসা হয়ে উঠল।
বিপদের দিনে
একদিন হঠাৎ বিকেল বেলায় ঝড়-বৃষ্টি নামল। স্কুল ছুটি হয়ে গেছে, কিন্তু অনেক ছোট্ট বাচ্চা বাড়ি ফিরতে পারছে না। রাস্তায় হাঁটু জল, বাতাসে উড়ছে টিনের চাঙড়।
টুকাই ছাতাটা খুলতেই আশ্চর্য সব ঘটনা ঘটল। ছাতার আলোয় রাস্তায় জমা জল আস্তে আস্তে নেমে যেতে লাগল। ভিজে যাওয়া বাচ্চাদের জামাকাপড় গুলো শুকিয়ে গেল। সবাই নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারল।
পাড়ার মানুষ তখন বলল, — এই ছাতাটা শুধু টুকাইয়ের নয়, আমাদের সবার ভরসা।
বইমেলা রক্ষা
কিছুদিন পর স্কুলে ছোট করে বইমেলা হলো। বৃষ্টির কারণে বই ভিজে যাওয়ার ভয় ছিল।
টুকাই এগিয়ে এসে ছাতাটা খুলে বইয়ের একটা টেবিলের ওপরে ধরল। সাথে সাথে সমস্ত টেবিলের বই শুকিয়ে গেল, রঙিন আলোয় ঝলমল করতে লাগল।
প্রধান শিক্ষক খুশি হয়ে বললেন, — টুকাই, তোর ছাতাটা কেবল বৃষ্টি আটকায় না, আমাদের মধ্যে জ্ঞানের আলোও ছড়িয়ে দিয়েছে।
টুকাইয়ের ভয়
সবাই টুকাইকে নিয়ে গর্ব করতে লাগল। কেউ তাকে বলত “রঙিন ছাতার ছেলে”, কেউ বলত “জাদুর টুকাই”।
কিন্তু টুকাইয়ের মনে একটা ভয় গোপনে কুরে কুরে খাচ্ছিল।
— যদি কেউ ছাতাটা চুরি করে নেয়? যদি খারাপ লোকেরা এই ছাতার শক্তি কে খারাপ কাজে ব্যবহার করে তাহলে কি হবে?
রাতে ঘুমোতে গেলেও তার মনে হতো — হয়তো কাল ছাতাটা নেই হয়ে যাবে।
সমাধান
একদিন রাতে টুকাই স্বপ্ন দেখল। রঙিন আলোয় ভেসে আসলেন এক বৃদ্ধ, তিনি যেন ছাতার আসল রক্ষক।
বৃদ্ধ হেসে বললেন, — ভয় পেয়ো না, টুকাই। এই ছাতার আসল জাদু লুকিয়ে আছে তোমার মনেই। যতদিন তুমি জ্ঞান ভাগ করবে, মানুষের পাশে দাঁড়াবে, আর খুশি ছড়াবে — ছাতাটা ততদিন তোমার কাছেই নিরাপদ থাকবে। কেউ এটা চুরি করতে পারবে না।
টুকাই জেগে উঠে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল — “আমি এই ছাতার আলো শুধু সৎ কাজেই ব্যবহার করব।”
সমাপ্তি
আজ যখনই কেউ টুকাইকে দেখে, শুধু একটা সাধারণ স্কুলের ছেলে বলে না। তারা বলে
“ওই যে রঙিন ছাতার ছেলে, যে আলো আর হাসি নিয়ে আসে সবার জীবনে।”
আর টুকাই জানে — যতদিন তার হৃদয়ে সৎ ইচ্ছে গুলো থাকবে, মিথ্যে কথা বলবে না কাউকে ধোকা দেবে না ঠকাবে না ততদিন টুকাই এর কাছে ছাতার সুবিধাগুলো নিরাপদে থাকবে।