
[সংক্ষিপ্তসার — গ্রান্ট এই কিস্তিতে বীরভূম ও দিনাজপুর — দুটি বড় জমিদারির রাজস্ব ও প্রশাসনিক অবস্থা আলোচনা করেছেন — কাসিম আলির আমলে হস্তবুদ তদন্তে অতিরিক্ত রাজস্বের হিসাব দিয়েছেন। বীরভূম জমিদারি- রেনেলের হিসেবে আয়তন ৩,৮৫৮ বর্গমাইল। বাংলার চতুর্থ বৃহত্তম জমিদারি। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা জঙ্গলময়, অনাবাদী বা সারহাট (ফারসি সরহদ = সীমানা)। জমির একটা বড় অংশ মূলত বরকন্দাজ, বন্দুকচি, হিন্দুস্তানি মিলিশিয়ার ভরণপোষণে বরাদ্দ ছিল। দক্ষিণ বিহারের বন্য রাজ্য (পালামৌ, রামগড়, কুরিকডিয়া) থেকে বীরভূমের সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব ছিল এই বাহিনীর। রাজস্বের উৎস অঞ্চলের অবশিষ্ট অংশ — আসল জমা তুমারি, খালসা ও জায়গির মিলিয়ে ৩,৭৭,৬৪৫ টাকা। জমিদার পাঠান বংশোদ্ভূত মুসলমান — মুঘল সাম্রাজ্যের বিশৃঙ্খলার সুযোগে স্বাধীনতা ঘোষণা করে মারাঠা বর্গিদের বাংলায় প্রবেশে সহায়তা করেন। আলিবর্দির আমলে এই অঞ্চল পুনরুদ্ধার করে আবওয়াব, খাস-নভিসি ও চৌথ বাবদ ৬৮,২২৩ টাকা রাজস্ব বৃদ্ধি হয়। কাসিম আলীর আমলে মিলিশিয়া ছাঁটাই করে বহু জমি সরকারি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়; হস্তবুদ তদন্তে অতিরিক্ত আয় দেখানো হয়েছে ৮,৯৬,২৭৫ টাকা। দিনাজপুর জমিদারি- আয়তন ৩,৫১৯ বর্গমাইল — আয়তন বীরভূমের পরেই। জমিদার, রামনাথ কায়স্থ — আর্থিক সহায়তার ভান করে হস্তবুদ তদন্ত এড়াতেন। কোচবিহারের সীমান্তবর্তী হওয়ায় রাজস্ব কম দিতে হত। সন্তোষ পরগনা যুক্ত হওয়ার পরেও আসল তুমারি ছিল মাত্র ৭,৫৪,২২৫ টাকা; আবওয়াব ৩,৩১,৮২৩ টাকা। জমিদারির বর্তমান আয়তনের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ ছিল বিদেশি সীমান্তের দিকে সম্প্রসারিত; তওফির ও মুদ্রার মান হ্রাসের প্রভাব বিবেচনায় অতিরিক্ত কেফায়তের পরিমাণ অনেকটাই কম, মন্তব্য করেছেন গ্রান্ট — ৫,৭৬,৩২৪ টাকা। মোট- কাসিম আলীর আমলে হস্তবুদ তদন্তের ফলে প্রাপ্ত সুবিধা ১৪,৭২,৫৯৯ টাকা]
১৭৬০-র তথ্যানুযায়ী বীরভূমের আয়তন ও সীমানা সম্পর্কে সাধারণ ধারণা পাওয়া যায়। রেনেলের মতে, আয়তন ৩,৮৫৮ ব্রিটিশ বর্গমাইল। আয়তনের দিক থেকে বাংলার সমস্ত একক জমিদারির মধ্যে চতুর্থ বৃহত্তম; বর্ধমানের পরেই সবচেয়ে বড় এলাকা। এই আয়তনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ (যার মধ্যে রাজধানী নগরের পশ্চিমে পাহাড়ঘেরা অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং বড় অংশ ছিল জঙ্গলময়, অনাবাদী বা সারহাট নামে পরিচিত — যা সম্ভবত ফারসি শব্দ সরহদ বা সীমানার অপভ্রংশ) নির্দিষ্ট কিছু কাজের জন্য বরাদ্দ ছিল। টোডরমলের প্রাথমিক আর্থিক বন্দোবস্ত এবং পরে জাফর খানের সংস্কারে এই জমিগুলো কয়েক হাজার বরকন্দাজ, ম্যাচলকধারী (বন্দুকচি) দেশীয় হিন্দুস্তানি মিলিশিয়া বাহিনীর ভরণপোষণের জন্য বরাদ্দ হয়। দক্ষিণ বিহারের বন্য ও অবাধ্য রাজ্যগুলোর (পালামৌ, রামগড় ও কুরিকডিয়ার অরণ্যময় অঞ্চলের) দিক থেকে সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব ছিল এই বাহিনীর। অঞ্চলের অবশিষ্ট অংশ কেবল বার্ষিক রাজস্বের উৎস ছিল — যা আসল জমা তুমারি, খালসা ও জাগির খাত মিলিয়ে ৩,৭৭,৬৪৫ টাকা। এই হিসাবে মফস্বলের যাবতীয় খরচ এবং রাজস্ব আদায়ের প্রয়োজনে সরকার-নিযুক্ত সাধারণ কর্মচারী, ভৃত্য বা গ্রাম্য পিয়নদের (চাকরান) রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় ছিল না। কিন্তু যুদ্ধপ্রিয় ও প্রবাদতুল্য বিশ্বাসঘাতক পাঠান বংশোদ্ভূত সেই মুসলমান জমিদার — মুঘল সাম্রাজ্যের বিশৃঙ্খলার সুযোগে নিজের অবস্থানের গুরুত্ব এবং তা থেকে পাওয়া রাজকীয় স্বাধীনতার সম্ভাবনা শীঘ্রই অনুধাবন করে ক্ষমতা-দখলকারী সুবাদারদের দুর্বল আর বিভক্ত প্রশাসনের সুবাদে অবৈধ উচ্চাকাঙ্ক্ষার সুপ্ত বাসনা জেগে উঠেছিল। তাঁর নিজস্ব গোত্রের সৈন্য নিয়ে ধীরে ধীরে মিলিশিয়া বাহিনী গড়ে তুললেন; নিজ সর্দারের প্রতি বিশ্বস্ততার ক্ষেত্রে এরা বিশ্বস্ততা বিচ্যুত হতো না — যদিও ভিন্ন বা বহিরাগত নেতাদের অধীনে তাদের আচরণ ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। বিশাল আয়তনের জনবলে, অর্থ সম্পদে ধনী দুর্গম ও অনাবিষ্কৃত সীমান্তবর্তী প্রদেশে ব্যক্তিগত আনুগত্য এবং ভাড়াটে সৈন্যদের সাধারণ স্বার্থপরতা — দুই নীতি ভিত্তি করে গড়ে ওঠা সামন্ত-বাহিনী নিয়ন্ত্রণে পেয়ে নিজেকে শক্তিশালী শক্তির অধিপতি হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেন। এই প্রদেশ এমন এক প্রতিনিধির দুর্বল শাসনাধীন ছিল, যিনি নিজেই সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শনের নজির সৃষ্টি করেছিলেন। এমতাবস্থায়, বীরভূমের ভূমি-ইজারাদার বা জমিদারের বৈধ শাসকের প্রতি আনুগত্য প্রত্যাহারের চেষ্টা ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক; আর জাফর খানের মৃত্যুর পর সেই কাজ সহজও হয়ে যায়। ফলে রাজস্বের ক্ষতি হয়েছিল ঠিকই, তার চেয়েও বড় সমস্যা ছিল ভূখণ্ডের বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার রাজনৈতিক কুফল। কারণ, সীমান্তবর্তী স্বাধীন দেশগুলো থেকে মূল ভূখণ্ডে প্রবেশের প্রধান গিরিপথে এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ছিল; আলিবর্দি খানের শাসনামলে অবাধ্য জমিদারের বিশ্বাসঘাতকতায় মারাঠারা এই জেলা দিয়েই বাংলায় প্রবেশ করে। তাই যুদ্ধ অবসানের পরপরই এই অঞ্চল নতুন করে মূল শাসনের অধীনে আনা অত্যন্ত জরুরি ছিল। বলিষ্ঠ প্রশাসনের অধীনে সেই লক্ষ্য শীঘ্রই আংশিকভাবে অর্জিত হয় এবং প্রচলিত বা প্রাচীন জমার (রাজস্ব) অতিরিক্ত হিসেবে আবওয়াব, খাস-নভিসি ও চৌথ বাবদ ৬৮,২২৩ টাকা রাজস্ব বাড়ে। তাঁর স্বাধীন থাকারকালে বিদেশি মুসলমান সৈন্য নিয়ে কৃষক ও কারিগর শ্রেণির নিরীহ দেশীয় হিন্দুর ওপর চরম অত্যাচার চালানো বিদ্রোহী তদারককারী জমিদার সম্পূর্ণ দমনের কাজ কাসিম আলির সুবাদারির আমলেই সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। নিজের জরুরি প্রয়োজনে এবং ইংরেজ শক্তির সমর্থনে বলীয়ান হয়ে, ক্ষুদ্র ও অত্যাচারী জবরদখলকারীর থেকে সার্বভৌম অধিকার কেড়ে নেওয়া এবং মুঘল সাম্রাজ্যের দীর্ঘস্থায়ী ও পরিমিত নিয়মনীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে অভ্যন্তরীণ আর্থিক শৃঙ্খলা ও প্রাদেশিক আনুগত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা — এই মৌলিক আর অপরিহার্য পদক্ষেপ গ্রহণ না করার পেছনে অক্ষমতা বা চরম দুর্নীতি ছাড়া অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে না। সেই অনুযায়ী, স্থানীয় সামরিক বাহিনী বা মিলিশিয়া ব্যবস্থার বড় অংশ ছাঁটাই করা হয় এবং জমিগুলো নতুন করে সরকারি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়; পাশাপাশি জেলার অন্য অংশের রায়তদের থেকে পাওয়া বার্ষিক রাজস্ব স্থানীয় যাচাই-বাছাইয় করে সুবাদার সমগ্র অঞ্চলের ভবিষ্যৎ কর-নির্ধারণের ন্যায্য মানদণ্ড তৈরি করেন। এই বন্দোবস্ত ছিল যথাযথ বন্দোবস্তের সেই সুনির্দিষ্ট ও একমাত্র নির্ভরযোগ্য ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত, যাকে রাজস্ব আদায়ের পরিভাষায় হস্তবুদ (hustabood) বলা হয় — রাজস্বের পূর্ববর্তী ও বর্তমান উৎসের তুলনামূলক চিত্র। প্রাচ্যের শাসননীতির অন্যতম প্রধান ও অপরিহার্য লক্ষ্য — সামরিক ক্ষমতার ওপর একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। এই সংস্কার প্রক্রিয়ায় ঘাটতি দেখা যাওয়ার কালে মনে রাখা উচিত, বীরভূম একই রাজ্যের সীমান্তবর্তী জমিদারির অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এর আপেক্ষিক অবস্থানের আমূল পরিবর্তন ঘটেনি; বরং পশ্চিমে বিহার সুবার সীমান্তবর্তী অধীনস্থ অঞ্চল ব্রিটিশ বাহিনীর হাতে আসার আগে পর্যন্ত এই অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। পুরানো রাজস্ব-নির্ধারণ করা জমি থেকে বার্ষিক আয়ের আরও বড় বৃদ্ধির প্রত্যাশা করা যেতে পারত — মূলত সেগুলোর প্রমাণিত অধিকতর মূল্যের জন্য, অথবা আংশিকভাবে এই অঞ্চলের বিশেষ কিছু মূল্যবান পণ্য (যেমন — লোহা, কয়লা এবং এক বিশেষ ধরনের রেশম) ও বাংলার অন্য সাধারণ উৎপাদনের জন্য — তবুও আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রথমোক্ত দুটো পণ্য মূলত মাটির উপরিভাগেই পাওয়া যায় এবং শেষোক্ত পণ্য (রেশম) তুঁতগাছের পরিবর্তে বের (bere) ও শাল (saul) পাতা খেয়ে বেঁচে থাকা এক ধরনের শুঁয়োপোকার মাধ্যমে বনাঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত হয়; আর এসব বিষয় মাটির সাধারণ অনুর্বরতা কিংবা অন্ততপক্ষে চাষাবাদের অনুন্নত অবস্থারই জোরালো প্রমাণ বহন করে। যা-ই হোক, আলোচ্য জেলায় কাসিম আলীর যাবতীয় আর্থিক কার্যক্রমের ফলে সরকারি কোষাগারে যে নিট অতিরিক্ত রাজস্ব জমা হয়েছিল — এবং যা সরকারি নথিতে কেফায়ত হস্তবুদ (keffyet hustabood) বা অতিরিক্ত আয় হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়েছিল — তার পরিমাণ ৮,৯৬,২৭৫ টাকার বেশি ছিল না।
দিনাজপুর অন্যতম বড় একক জমিদারী — আয়তন ৩,৫১৯ বর্গমাইল এবং আয়তনে বীরভূমের ঠিক পরেই। ভিন্নতর পরিস্থিতি হলেও, রাজস্ব নির্ধারণ করা হয়েছিল ঠিক একই নীতি অনুসরণ করে — অর্থাৎ সরকারের নামে ও পক্ষে জমিদারের আদায় করা বার্ষিক রাজস্বের হস্তবুদ (বাস্তব আয়-সংক্রান্ত) মূল্যায়নের ভিত্তিতে; যদিও সংগৃহীত অর্থের সিংহভাগই প্রতারণা করে নিজের কাছে রাখতেন। রাজস্ব আদায়ের প্রকৃত পরিমাণ নিয়ে কঠোর স্থানীয় তদন্ত এড়াতে রামনাথ অতীতে অনুসৃত কৌশল ও দুর্নীতি — সরকারি দাবির আগেই স্বেচ্ছায় আর্থিক সহায়তা প্রদানের ভান করা — সেই পদ্ধতি এখন আর কার্যকর হচ্ছিল না। অঞ্চল মূলত কোচবিহারের (তৎকালীন বিজিত-অবহিত রাজ্য, যার একাংশ পরবর্তীতে রংপুর নাম হয়) সীমান্তবর্তী হওয়ায় এটা সম্পর্কে খুব জানা ছিল না এবং এর রাজস্বও কম ধার্য হয়েছিল। এমনকি সংলগ্ন এলাকার অন্য ছোট অংশের সাথে সমৃদ্ধ সন্তোষ পরগনা যুক্ত হওয়ার পরেও, সমগ্র এখতিয়ারভুক্ত জায়গির ও খালসা জমির আসল তুমারি (মূল রাজস্ব তালিকাভুক্ত আয়) ছিল মাত্র ৭,৫৪,২২৫ টাকা; আর সেই মূল রাজস্বে (জমা) ধার্যকরা ও সরকারি হিসাবে জমা হওয়া আবওয়াবের (অতিরিক্ত কর) পরিমাণও আলোচ্য সময়কাল পর্যন্ত ৩,৩১,৮২৩ টাকার বেশি ছিল না। সুতরাং, বিদেশি সীমান্তের দিকে ভূখণ্ডের যে বিশাল ও অলক্ষ্যে সম্প্রসারণ ঘটেছিল, সেটা সাম্প্রতিক ও সুপরিচিত অর্জিত অঞ্চলগুলোর বাইরেও জমিদারীর বর্তমান আয়তনের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ; এবং জায়গির জমির একাংশ থেকে উদ্ভূত তওফির বা অতিরিক্ত মুনাফা সরকারের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনার ফলে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ দৃশ্যমান উন্নতির (তা চাষাবাদ বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রকৃত উন্নতিই হোক কিংবা মুদ্রার মান হ্রাসের ফলে সৃষ্ট কাল্পনিক উন্নতিই হোক) প্রভাব বিবেচনা করলে — সেই সময়ে সুবাহর তহবিলে জমা অতিরিক্ত কফিয়ত বা রাজস্বের পরিমাণ — যে পরিমান আগে সংশ্লিষ্ট জমিদার গোপনে আত্মসাৎ করতেন — অত্যন্ত পরিমিত বা কম বলেই মনে হতে পারে; যার অঙ্ক — টাকা ৫,৭৬,৩২৪
কাসিম আলীর শাসনকালে যথাযথ হস্তবুদ (রাজস্ব-সম্ভাবনা বিষয়ক) তদন্তের ফলে পাওয়া মোট রাজস্ব ১৪,৭২,৫৯৯ টাকা
টীকা
১. হস্তবুদ (Hustabood) — ফারসি “হস্ত-ও-বুদ” (যা আছে ও যা ছিল) — জমির প্রকৃত আয়-ব্যয় আর উৎপাদন ক্ষমতার জরিপ।
২. সারহাট- ফারসি “সরহদ” (সীমানা) অপভ্রংশ — সীমান্তবর্তী জঙ্গলময় ও অনাবাদী অঞ্চল। ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নথিপত্র ও আঠারো শতকের রাজস্ব নথিতে এটি রূপান্তরিত হয়ে ‘সারহাট’, ‘সরহাট’ বা ‘সারহাদ’ (Surhat /Sarhad) দেখা যায়। মুঘল ও পলাশীপূর্ব যুগের প্রশাসনিক কাঠামোতে রাজ্যের প্রান্তবর্তী বা সীমান্ত জেলাগুলোকে ‘সারহাট’ বা সীমান্ত অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হতো।
সারহাট জমা/সারহাট চৌকি — সীমান্ত এলাকা পাহারা দেওয়ার জন্য এবং সীমান্ত পারাপারের বাণিজ্যের ওপর শুল্ক সংগ্রহের জন্য নির্দিষ্ট যে রাজস্ব বা চৌকি নির্ধারণ করা হতো, তাকে ফারসিতে ‘সারহাট জমা’ বা সীমান্ত রাজস্ব বলা হতো। ১৭৮৬-এ রাজস্ব প্রস্তাবে গ্রান্ট ‘সারহাট’ রাজ্য বা জেলার ‘সীমান্ত’ বা ‘সীমান্তবর্তী অঞ্চলকে’ নির্দেশ করেছেন।
৩. বরকন্দাজ — মুঘল আমলের স্থানীয় মিলিশিয়া বা রক্ষীবাহিনী। ‘বরকন্দাজ’ (Barkandaz) ফারসি শব্দ (বর্ক-আন্দাজ), আক্ষরিক অর্থ ‘বজ্র ছোঁড়া’। মুঘল-ব্রিটিশ আমলে বন্দুকধারী রক্ষী, সশস্ত্র প্রহরী বা লাঠিয়াল বাহিনীই বরকন্দাজ। গ্রান্টের অভিযোগ জমিদাররা প্রশাসনিক ব্যয় এবং সুরক্ষার নামে বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ দেখাত, যার মধ্যে অন্যতম ছিল এই বরকন্দাজ বা পাইক-পেয়াদা পোষার খরচ।
৪. বন্দুকচি — বন্দুকচি’ শব্দের সাধারণ অর্থ বন্দুকধারী সৈনিক বা রক্ষী (Musketeer)। মুঘল আর নবাবী আমলে বন্দুক চালাতে দক্ষ সেনা দলের বর্গ নাম বন্দুকচি। উপনিবেশপূর্ব সময়ে রাজস্বের একাংশ বন্দুকচি বা সশস্ত্র রক্ষী বাহিনীর রক্ষণাবেক্ষণ ও বেতনে খরচ হতো মূলত রাজস্বের দাপ্তরিক হিসাবে “নেজামত” বা সামরিক-প্রশাসনিক ব্যয় খাত থেকে। জেমস গ্রান্ট দেখান কীভাবে পূর্ববর্তী নবাবরা যেমন — মুর্শিদকুলি খান বা আলিবর্দি খান এই খাতগুলোর ব্যয় হিসাব করে প্রকৃত রাজস্ব নির্ধারণ করতেন।
৫. আসল জমা তুমারি — মূল নির্ধারিত রাজস্ব-তালিকা — যা টোডরমল ১৫৮২ সালে নির্ধারণ করেন। বিশদ আগে আলোচনা করেছি।
৬. খাসনভিসি — জমিদারদের বার্ষিক ইজারা নবায়নের সময় আদায়কৃত রসুম — একমাত্র স্বীকৃত স্থায়ী অতিরিক্ত কর। বিশদ আগে আলোচনা করেছি।
৭. চৌথ — মারাঠাদের দাবি করা কর — যা আলিবর্দি বাংলায় চালু করেন। বিশদ আগে আলোচনা করেছি।
৮. পাঠান বংশোদ্ভূত জমিদার- বীরভূমের জমিদার — মুঘল সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সুযোগে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং মারাঠাদের সহায়তা করেন।
৯. কেফায়ত হস্তবুদ — হস্তবুদ জরিপের মাধ্যমে পাওয়া অতিরিক্ত আয় — যা সরকারি কোষাগারে জমা হতো। বিশদ আগে আলোচনা করেছি।
১০. তওফির — জায়গির জমির অতিরিক্ত মুনাফা — বা লুকানো উদ্বৃত্ত রাজস্বের পুনরুদ্ধার বা অতিরিক্ত কর আদায় (Resumption of concealed surplus) । আগে আলোচনা করেছি।
১১. সন্তোষ পরগনা — মুঘল ও উপনিবেশী শুরুর আমলে ‘পরগনা’ ছিল রাজস্ব আদায়ের প্রধান আঞ্চলিক একক। গ্রান্টের বিবরণে সন্তোষ পরগনা মূলত বৃহত্তর মোমেনশাহী (ময়মনসিংহ) অঞ্চলের অংশ ছিল, বর্তমানে বাংলাদেশের টাঙ্গাইল জেলার অন্তর্গত সন্তোষ (বর্তমানে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় অবস্থিত) এবং সংলগ্ন এলাকা। জেমস গ্রান্ট মুঘল আমল (বিশেষ করে মুর্শিদকুলী খানের সময়কার ‘জমা কামিল তুমরী’) থেকে শুরু করে কোম্পানি আমল পর্যন্ত বাংলার রাজস্বের ঐতিহাসিক মূল্যায়ন বা খতিয়ান তৈরি করেছিলেন। তিনি বলছেন সন্তোষ পরগনাকে নির্দিষ্ট রাজস্ব জোন হিসেবে দেখিয়ে বার্ষিক রাজস্ব বা ‘জমা’ নির্ধারণ করা হয় (মুর্শিদকুলী খানের বন্দোবস্তে সন্তোষ পরগনার জমা ছিল প্রায় ৯৪,৮০৭ টাকা)। ১৭৮০-র দশকে বাংলায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের আগে লর্ড কর্নওয়ালিস, জন শোর এবং জেমস গ্রান্টের মধ্যে তীব্র বিতর্ক হয়। জন শোর মনে করতেন জমিদারেরা জমির মালিক, জেমস গ্রান্টের বক্তব্য — জমির প্রকৃত মালিক রাষ্ট্র বা সরকার, জমিদারেরা কেবল রাজস্ব আদায়ের এজেন্ট। সন্তোষ পরগনার মতো সুনির্দিষ্ট অঞ্চলের নথিপত্র ঘেঁটে গ্রান্ট প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন, এই সমস্ত পরগনার রাজস্বে ব্রিটিশ সরকারের পূর্ণ অধিকার বর্তমান এবং এই ভূখণ্ড মুঘল আমল থেকেই রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে ছিল। সন্তোষ পরগনা অত্যন্ত উর্বর কৃষিপ্রধান অঞ্চল হওয়ায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি একে গুরুত্বপূর্ণ রাজস্বের উৎস হিসেবে গণ্য করত। গ্রান্ট দেখান কীভাবে অতীতে এই পরগনা থেকে রাজস্ব আদায় হতো এবং কোম্পানির আমলে সেখানে কতটা রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে বা অনাদায়ী রয়েছে। ১৭৮৬-র রাজস্ব প্রস্তাবে গ্রান্টের ‘সন্তোষ পরগনা’ বলার মানে হলো — বাংলার রাজস্বের ইতিহাস বিশ্লেষণে টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ অঞ্চলের এই নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক এলাকাকে আদর্শ উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন বাংলায় জমির চূড়ান্ত মালিকানা জমিদারের নয়, বরং রাষ্ট্রের।
১২. কোচবিহার — উত্তর বাংলার রাজ্য — ১৭৭৩-এ চুক্তিবলে ব্রিটিশ অধীনে আসে। ১৭৮৬-তে জেমস গ্রান্ট রাজস্ব বিবরণীতে দেখান, কোচবিহার মুঘল আমল থেকেই এক ধরনের স্বায়ত্তশাসন ভোগ করত এবং পুরোপুরি মুঘল খাস জমিনভুক্ত ছিল না। রিচার্ড ইটন ইসলাম ইন বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ারে দেখিয়েছেন, বাংলার সীমান্ত কেবল একদেহী রাজনৈতিক রেখা ছিল না, ছিল পরিবর্তনশীল ‘ইসলামিক ও কৃষিভিত্তিক সীমান্ত’ (Agrarian and Islamic Frontier)। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে মুঘলরা এবং পরে ব্রিটিশরা কোচবিহার, কামরূপ এবং আসামের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে এসেছিল এবং এই অঞ্চলগুলো দখল করার পেছনে কেবল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল না, বরং বনাঞ্চল পরিষ্কার করে কৃষিজমির বিস্তার ও রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির একটি দীর্ঘমেয়াদী উপনিবেশিক পরিকল্পনা কাজ করেছিল। গ্রান্টের মতো ঐতিহাসিক উপাত্ত ব্যবহার করেই ইটন প্রমাণ করেন কীভাবে এই সীমান্ত অঞ্চলটি মূল বাংলার অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল।
টিকা ২
এই কিস্তিতেও গ্রান্ট পরোক্ষভাবে মুঘল শাসক ও স্থানীয় জমিদারদের সম্পর্কে নেতিবাচক বর্ণনা দিচ্ছেন।
“যুদ্ধপ্রিয় ও প্রবাদতুল্য বিশ্বাসঘাতক পাঠান বংশোদ্ভূত এক মুসলমান” — বীরভূমের জমিদারকে “বিশ্বাসঘাতক” বলে চিত্রিত করা — যিনি মুঘল সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সুযোগে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। কিন্তু গ্রান্ট স্বীকার করেন — “ক্ষমতা-দখলকারী সুবাদারদের দুর্বল ও বিভক্ত প্রশাসনের কারণে” এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। অর্থাৎ, দোষটি মূলত সুবাদারদের — যারা নিজেরাই সাংবিধানিক কর্তৃত্বের প্রতি অশ্রদ্ধা দেখিয়েছিলেন। “নিরীহ দেশীয় হিন্দুদের ওপর চরম অত্যাচার”- জমিদারের বিরুদ্ধে অভিযোগ — তিনি বিদেশি মুসলমান সৈন্যদের সহায়তায় হিন্দু কৃষক ও কারিগরদের ওপর অত্যাচার চালিয়েছিলেন। গ্রান্ট এখানে “বিদেশি মুসলমান” ও “নিরীহ হিন্দু” — এই দ্বৈততা তৈরি করে সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে উস্কে দিচ্ছেন। “অক্ষমতা বা চরম দুর্নীতি ছাড়া অন্য কোনো কারণ থাকতে পারত না”- কাসিম আলীর সমালোচনা করে গ্রান্ট বলছেন — তিনি জমিদারকে দমন করতে পারেননি। কিন্তু গ্রান্ট স্বীকার করেন — কাসিম আলী ইংরেজ শক্তির সমর্থনে বলীয়ান হয়ে এই কাজ করেছিলেন। অর্থাৎ, কাসিম আলীর সীমাবদ্ধতা ছিল ইংরেজদের উপর নির্ভরতা — যা গ্রান্ট নিজেই স্বীকার করেছেন। “মুদ্রার মান হ্রাসের ফলে সৃষ্ট কাল্পনিক উন্নতি”- গ্রান্ট স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নকে “কাল্পনিক” বলে খাটো করছেন — যদিও তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন — আমেরিকার সোনা-রুপার প্রবাহে মুদ্রার মান কমছিল এবং রাজস্ব বাড়ানো প্রয়োজন ছিল। “প্রতারণামূলকভাবে নিজের কাছে রেখে দিতেন”- দিনাজপুরের রামনাথের বিরুদ্ধে অভিযোগ — তিনি রাজস্বের সিংহভাগ আত্মসাৎ করতেন। কিন্তু গ্রান্ট স্বীকার করেন — রামনাথ “নিয়মিত রাজস্বের বাইরে মোটা অঙ্কের উপঢৌকন” দিয়ে অভ্যন্তরীণ শাসনের বিশেষ সুবিধা ভোগ করতেন — যা মুঘল প্রশাসনিক ব্যবস্থারই অংশ ছিল।
আমরা যেন ভুলে না যাই গ্রান্টের এই বর্ণনা কেবল অনিরপেক্ষ ইতিহাসই নয় — এগুলো উপনিবেশিক জ্ঞানচর্চা যাকে অমিয় কুমার বাগচী বলবেন স্ট্রাকচারাল এডজাস্টমেন্ট, সেটা আদতে উপনিবেশের হাতিয়ার। তিনি স্থানীয় শাসক ও জমিদারদের বিশ্বাসঘাতক, অত্যাচারী, দুর্নীতিপরায়ণ আর অদক্ষ বলে চিত্রিত করে ব্রিটিশ শাসনকে “উন্নয়ন” ও “শৃঙ্খলা”র একমাত্র উৎস হিসেবে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন। কিন্তু ঐতিহাসিক তথ্য সাক্ষ্য দেয় — গ্রান্ট যখন এই গল্প লিখছেন, তখন ভারতের জিডিপি ছিল বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ (ম্যাডিসন), আর ব্রিটেনের শিল্পবিপ্লবের অর্থায়নই এসেছিল ভারত থেকে লুঠ হয়ে যাওয়া সম্পদ থেকে (উৎসা পট্টনায়েক, অমিয় কুমার বাগচী সূত্রে)। গ্রান্টের এই অংশ বীরভূম, দিনাজপুরের রাজস্ব ইতিহাস, হস্তবুদ তদন্তের গুরুত্ব এবং উপনিবেশিক জ্ঞানচর্চার কুৎসার গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ। তিনি দেখান — কাসিম আলী হস্তবুদ তদন্তে করে বিপুল অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করেছিলেন; কিন্তু সেই সাফল্যের কৃতিত্ব গ্রান্ট স্থানীয় শাসকদের দেননি — বরং তাদের অদক্ষ, দুর্নীতিপরায়ণ বলেছেন। গ্রান্টের বক্তব্য — আবওয়াবের পরিমাণ বা অনিয়ম নয়; বরং জমিদারদের অতিরিক্ত আদায়, হস্তবুদ তদন্তের অপব্যবহার এবং মুঘল শাসকদের আর্থিক অদক্ষতা — এই তিনটেই ছিল জনগণের অসন্তোষ ও রাজকীয় আয়ের ঘাটতির মূল কারণ। কিন্তু এই বর্ণনা আসলে উপনিবেশিক স্বার্থরক্ষার একটি হাতিয়ার — যা ঐতিহাসিক তথ্য ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে খণ্ডন করা জরুরি।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ