| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার বিস্মৃতপ্রায় শিশুসাহিত্যিক যোগীন্দ্রনাথ সরকার : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৫/৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ফ্রানস বালথাজার সলভিনস ও উত্তর কলকাতার ঘোড়ার সহিস : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৫/২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার জনসংযোগের বিপণনে দুর্গোৎসব : পান্নালাল রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৫/১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আকাশ প্রদীপ — পুরাণ, ভক্তি ও বিশ্বাস : যশোবন্ত রায় ৮১ বছরে জাতিসংঘ: সবার প্রত্যাশা পূরণে কতটা সক্ষম? : নিকোলাস বিশ্বাস বোধিসত্ত্ব সঞ্জয়-এর ছোটগল্প ‘স্যার’ কুমারটুলির সহিসমহল্লা ও দেবী দুর্গার বাহন ঘোটকমুখী সিংহ : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার বিজয়াদশমীর ভাঙ-সিদ্ধি : অসিত দাস কলকাতায় এমন দুর্গাপুজো দেখিনি তো আগে : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘ওঝা’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘নিখোঁজের দর্শক সংখ্যা’ নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘সর্বংসহা’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯১/২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাজারাজড়া ও বণিকের দুর্গাপূজায় নিম্নবর্গ ছিল রবাহূত : অসিত দাস প্রজনন অধিকার নিশ্চিত হলেই সুস্থ্য বাংলাদেশ গড়া সম্ভব : নিকোলাস বিশ্বাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯১/১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘জলের অক্ষর’ কতো বড়ো বড়ো পুজোরে বাবা… : জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই কোজাগরী লক্ষ্মী পূর্ণিমার আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com, আমাদের পোর্টালের কিছু ছবি বাদে প্রায় সব ছবিই অন্তর্জাল থেকে সংগ্রহ করা হয়। কারুর যদি কপিরাইট থাকে জানাবেন। আমরা সেই ছবি পোর্টাল থেকে ডিলিট করে দেব।

বিস্মৃতপ্রায় শিশুসাহিত্যিক যোগীন্দ্রনাথ সরকার : যশোবন্ত রায়

Reporter
যশোবন্ত রায় / ৮৯ Views জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬

‘অ-য়ে অজগর আসছে তেড়ে,

 আমটি আমি খাবো পেড়ে।

 ইঁদুরছানা ভয়ে মরে,

 ঈগল পাখি পাছে ধরে।’

বাংলা ভাষাভাষী কয়েক প্রজন্মের শৈশবের সঙ্গে মিশে থাকা এই ছড়ার পঙ্‌ক্তিগুলি উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে অক্ষর শেখার সেই আনন্দময় দিনগুলি। অক্ষর তখন কেবল বইয়ের পাতায় আঁকা কিছু চিহ্ন নয়; তার সঙ্গে জুড়ে যাচ্ছে অজগর, আম, ইঁদুর, ঈগল, ভয়, বিস্ময় আর কল্পনার এক ছোট্ট পৃথিবী। শেখা আর খেলা একাকার হয়ে যাচ্ছে। আর এই সহজ অথচ অসাধারণ কাজটির অন্যতম কারিগর ছিলেন শিশু সাহিত্যিক যোগীন্দ্রনাথ সরকার।

একদিন তাঁর ছড়া, হাসি, কৌতুক ও কল্পনার জগৎ বাংলা শিশুমনের একান্ত আপন ছিল। সময়ের স্রোতে আজ তাঁর নাম অনেকটাই বিস্মৃতির আড়ালে। অথচ বাংলা শিশুসাহিত্যের বিকাশের ইতিহাসে তাঁর অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর মন শুধু নীতিকথা কিংবা শিক্ষার ভার বহন করার জন্য নয় — তাকে আনন্দ দিতে হয়, বিস্মিত করতে হয়, তার কল্পনাকে উসকে দিতে হয় — এই সত্যটি তিনি তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে বই যদি শিশুর মনে ভয়ের সঞ্চার করে, তবে পড়াশোনা তার কাছে আনন্দের বদলে বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু বই যখন হয়ে ওঠে আনন্দ, কৌতূহল আর কল্পনার সঙ্গী, তখন শেখার সঙ্গে গড়ে ওঠে এক গভীর ভালবাসার সম্পর্ক। বাংলা শিশুসাহিত্যের পথিকৃৎ যোগীন্দ্রনাথ সরকার তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে শিশুদের মনে সেই ভালোবাসার বীজই বপন করেছিলেন।

একসময় ছোটদের বই মানেই ছিল মূলত অক্ষর শেখা, পাঠ মুখস্থ করা, নীতিকথা জানা কিংবা নৈতিক শিক্ষা গ্রহণ। শিশুর হাসি, কৌতূহল, দুষ্টুমি ও কল্পনার জন্য সেখানে খুব বেশি জায়গা ছিল না। যোগীন্দ্রনাথ এই চেনা ধারণাটিকে অনেকটাই বদলে দিয়েছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, শিশুকে অক্ষরের কাছে নিয়ে যাওয়ার আগে তার মন জয় করতে হয়। তাকে হাসাতে হয়, বিস্মিত করতে হয় এবং তার নিজের জগতের সঙ্গে বইয়ের জগতের একটি সেতু তৈরি করতে হয়। সেই সেতু তিনি তৈরি করেছিলেন ছড়া, ছবি, সহজ ভাষা, হাস্যরস ও কল্পনার সাহায্যে।

১৮৬৬ সালের ২৮ অক্টোবর দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার নেতড়াতে যোগীন্দ্রনাথ সরকারের জন্ম। তাঁর পিতার নাম ছিল নন্দলাল সরকার। তিনি পরবর্তীকালে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার জয়নগরে থাকতে আরম্ভ করেন। যোগীন্দ্রনাথ জয়নগরে প্রাথমিক শিক্ষার পর দেওঘর উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কলকাতায় এসে সিটি কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু প্রথাগত শিক্ষায় তাঁর কোনো আগ্রহ না থাকায় তিনি কলেজ জীবন শেষ করতে পারেননি। এরপর তিনি সিটি কলেজিয়েট স্কুলে শিক্ষকতা করতে আরম্ভ করেন।

শিক্ষকতাই তাঁর সাহিত্যিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে। শ্রেণিকক্ষে শিশুদের খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। কোন শব্দে শিশুর চোখ জ্বলে ওঠে, কোন কথায় তারা হেসে ওঠে, কোন বিষয় তাদের মনে থাকে — এসব তিনি লক্ষ করতেন। ফলে শিশুর জন্য তাঁর লেখা ছিল শুধু কল্পনা থেকে তৈরি নয়; তার সঙ্গে মিশে ছিল প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা।

১৮৯১ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর ‘হাসি ও খেলা’। এরপর ১৮৯৭ সালে প্রকাশিত হয় ‘হাসিখুশি’-র প্রথম ভাগ এবং ১৯০৪ সালে দ্বিতীয় ভাগ। নামগুলির মধ্যেই যেন তাঁর সাহিত্যভাবনার পরিচয় রয়েছে। হাসি ও খেলার মধ্য দিয়ে শিশুকে শেখানো — এটাই ছিল তাঁর সৃষ্টির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

‘হাসিখুশি’-র অক্ষর শেখানোর ছড়াগুলি তার উজ্জ্বল উদাহরণ —

‘অ-য়ে অজগরটি আসছে তেড়ে,

 আমটি আমি খাবো পেড়ে।

 ইঁদুরছানা ভয়ে মরে,

 ঈগল পাখি পাছে ধরে।’

অক্ষর এখানে নিছক একটি চিহ্ন নয়। প্রতিটি অক্ষরের সঙ্গে রয়েছে একটি ছবি, একটি ঘটনা, একটি শব্দ এবং একটি ছন্দ। শিশুকে বলা হচ্ছে না — ‘এটি অ’, ‘এটি আ’; বরং তাকে এমন একটি দৃশ্যের মধ্যে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, যেখানে অক্ষর নিজেই একটি গল্পের অংশ। অক্ষর শেখা তাই নিছক মুখস্থ করার বিষয় থাকে না; তা হয়ে ওঠে দেখার, শোনার ও কল্পনা করার আনন্দ।

সংখ্যা শেখানোর ক্ষেত্রেও তাঁর সৃষ্টিশীলতার পরিচয় মেলে ‘হারাধনের দশটি ছেলে’ ছড়ায় —

 ‘হারাধনের দশটি ছেলে

 ঘোরে পাড়াময়,

 একটি কোথা হারিয়ে গেল

 রইল বাকি নয়।’

এরপর একে একে সংখ্যা কমতে থাকে। গল্পের মধ্য দিয়েই শিশুর সংখ্যাবোধ তৈরি হয়। অঙ্কের খাতা খুলে বসতে হয় না; গল্পের আনন্দেই শেখা হয়ে যায়। আজ আমরা ‘খেলার মাধ্যমে শিক্ষা’ বা ‘আনন্দময় শিক্ষা’র কথা বলি। যোগীন্দ্রনাথ তাত্ত্বিক ভাষায় এই শিক্ষাদর্শ ব্যাখ্যা করেননি, কিন্তু তাঁর সাহিত্য যেন সেই ধারণারই প্রাণবন্ত রূপ।

শিশুর সাহিত্যের সঙ্গে প্রথম পরিচয় অনেক সময় গল্প দিয়ে নয়, ছড়া দিয়ে। মায়ের মুখে শোনা কয়েকটি ছন্দময় শব্দ, দিদা বা ঠাম্মার বলা কোনো আজগুবি গল্প কিংবা খেলতে খেলতে মুখে মুখে ফিরে আসা কোনো পঙ্‌ক্তির মধ্য দিয়েই ভাষার সঙ্গে শিশুর প্রথম সখ্য তৈরি হয়। শব্দের অর্থের চেয়ে তখন বড় হয়ে ওঠে তার সুর, পুনরাবৃত্তি ও ছন্দ। যোগীন্দ্রনাথ এই ছন্দের শক্তিকে অসাধারণ দক্ষতায় ব্যবহার করেছিলেন। ১৮৯৯ সালে প্রকাশিত ‘খুকুমণির ছড়া’ তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। বাংলার ঘরে ঘরে প্রচলিত ছড়ার মৌখিক ঐতিহ্যকে তিনি মুদ্রিত শিশুসাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন।

‘তোতা পাখি’ ছড়ায় যেমন দেখা যায় —

 ‘আতা গাছে তোতা পাখি

 ডালিম গাছে মউ,

 এত ডাকি তবু কথা

 কও না কেন বউ?

 কথা কব কী ছলে,

 কথা কইতে গা জ্বলে!’

পরিচিত শব্দ, পরিচিত দৃশ্য, পুনরাবৃত্তি ও ছন্দ — এই সামান্য উপকরণেই কীভাবে শিশুর মুখে মুখে ফেরার মতো ছড়া তৈরি করা যায়, তার সুন্দর উদাহরণ এটি।

আবার ‘একানোড়ে’ ছড়ায় বাস্তবের সঙ্গে কল্পনার এমন মিশেল তৈরি হয়েছে যে, শিশুর চোখে এক অদ্ভুত প্রাণী যেন সত্যিই জীবন্ত হয়ে ওঠে —

‘এক যে আছে একানোড়ে,

 সে থাকে তালগাছে চড়ে।

 দাঁত দুটো তার মূলোর মত,

 পিঠখানা তার কুলোর মত,

 কান দুটো তার নোটা নোটা,

 চোখ দুটো আগুনের ভাঁটা!’

এই কল্পনা নিছক হাসির জন্য নয়। শিশুকে ‘এমন হয় না’ বলার পরিবর্তে তিনি তাকে ভাবতে দিয়েছেন — ‘এমন হলে কেমন হতো?’ এই প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে আছে কল্পনার স্বাধীনতা।

তাঁর রচনায় পশুপাখিরাও তাই মানুষের জগতের অংশ হয়ে ওঠে। বিড়াল, ইঁদুর, শেয়াল, বাঘ, কুমির, ছাগল কিংবা নানা পাখি কথা বলে, বুদ্ধি খাটায়, রাগ করে, ভয় পায়, অন্যকে ঠকায় এবং নিজেরাও ঠকে যায়। শক্তিশালী সবসময় জয়ী হয় না; ছোট কেউ বুদ্ধির জোরে বড় প্রতিপক্ষকে হারিয়ে দিতে পারে। শিশুর কাছে এই কল্পনার জগৎ তাকে নিজের মতো করে ভাবার স্বাধীনতা দেয়।

তাঁর ভাষাও ছিল তাঁর সাফল্যের অন্যতম কারণ। কঠিন ও অপরিচিত শব্দের পরিবর্তে ব্যবহার করেছেন সহজ, পরিচিত এবং মুখের ভাষার কাছাকাছি শব্দ। ছন্দ, পুনরাবৃত্তি, শব্দের খেলা ও কথ্যভঙ্গিকে তিনি সাহিত্যের উপাদানে পরিণত করেছিলেন। ফলে তাঁর লেখা পড়লে মনে হয় না, কেউ দূর থেকে শিশুকে শিক্ষা দিচ্ছে; বরং মনে হয়, একজন আপন মানুষ পাশে বসে গল্প বলছে।

তাঁর রচনায় সমকালীন সমাজজীবনের নানা চিহ্নও ছড়িয়ে আছে — খাবার, পোশাক, পারিবারিক সম্পর্ক, গ্রামীণ জীবন, পেশা, উৎসব কিংবা অভাব। কিন্তু এসব নিয়ে তিনি শিশুকে বক্তৃতা দেননি। হাসি, গল্প ও ছন্দের মধ্যেই সেগুলিকে স্বাভাবিকভাবে জায়গা দিয়েছেন। ‘খুকুমণির ছড়া’-র ‘বেজায় ফলার’ ছড়াটির কথাই ধরা যাক —

‘এক সের ধানের খই ভেজে

 বসিয়েছি এক ডোল,

 এবার লোকের বড় গোল।

 তিন সের ধানের চিড়ে কুট্লেম

 মেয়ের কাজেতে,

 তা খেলে বাজে লোকেতে।

 ময়দার কারণ,

 কিছু নুচির আয়োজন।

 তেল দিয়ে ভাজব নুচি,

 মিশাল দেব ঘি,

 তোমরা খাবে না ত কি!’

খই, চিড়ে, ময়দা, নুচি, তেল, ঘি — খাবারের এই উপকরণগুলির মধ্য দিয়ে একসময়ের বাঙালি ঘরসংসার ও আপ্যায়নের একটি জীবন্ত ছবি ফুটে ওঠে। শিশুর কাছে এটি মজার ছড়া, কিন্তু একটু গভীরভাবে পড়লে এর মধ্যে ধরা পড়ে সেই সময়ের খাদ্যসংস্কৃতি, গৃহস্থালির কাজ এবং সামাজিক জীবনের টুকরো টুকরো ছবি। এইভাবেই যোগীন্দ্রনাথের ছড়ায় জীবন ও সাহিত্য পাশাপাশি হাঁটে।

যোগীন্দ্রনাথের অবদান শুধু লেখালেখির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৮৯৬ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘সিটি বুক সোসাইটি’। এই প্রকাশনা সংস্থা থেকে তাঁর নিজের বইয়ের পাশাপাশি সমকালীন বহু লেখকের বইও প্রকাশিত হয়। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীসহ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ শিশুসাহিত্যিকের রচনাও এই প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত ছিল। ফলে তিনি ছিলেন শুধু লেখক নন, শিশুসাহিত্যের এক সক্রিয় সংগঠক ও পৃষ্ঠপোষকও।

তাঁর রচনার পরিধিও ছিল বিস্তৃত। ‘খেলার সাথী’, ‘খুকুমণির ছড়া’, ‘হাসিরাশি’, ‘আষাঢ়ে স্বপ্ন’, ‘লঙ্কাকাণ্ড’, ‘পশুপক্ষী’, ‘ছেলেদের কবিতা’, ‘হিজিবিজি’, ‘হাসির গল্প’ প্রভৃতি বইয়ের পাশাপাশি শিশুদের জন্য পুরাণ ও মহাকাব্যের কাহিনিও সহজ করে লিখেছেন। ‘কুরুক্ষেত্র’, ‘শকুন্তলা’, ‘সাবিত্রী সত্যবান’, ‘ধ্রুব’, ‘ছোটদের রামায়ণ’, ‘ছোটদের মহাভারত’ প্রভৃতি গ্রন্থ তাঁর সেই প্রচেষ্টার পরিচয় বহন করে।

জীবনের শেষ পর্বে শারীরিক অসুস্থতাও তাঁর সৃষ্টিশীলতাকে থামাতে পারেনি। ১৯২৩ সালে গুরুতর অসুস্থতার ফলে তাঁর শরীরের ডান দিক পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়। কখনও মুখে বলে অন্যের সাহায্যে লিখিয়েছেন, পরে বাম হাত দিয়ে নিজেও লিখেছেন, প্রুফ সংশোধন করেছেন। প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁর সৃষ্টিশীলতা শেষ পর্যন্ত জেগে ছিল। ১৯৩৭ সালের ২৬ জুন, একাত্তর বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান হয়।

তারপর কেটে গেছে বহু দশক। শিশুর পৃথিবীও আমূল বদলে গেছে। মাঠের জায়গায় এসেছে বহুতল, ঘুড়ির পাশে এসেছে ডিজিটাল পর্দা, মুখে মুখে গল্প বলার পাশাপাশি এসেছে অ্যানিমেশন, ভিডিও ও নানা ধরনের অনলাইন বিনোদন। স্মার্টফোন, ট্যাব ও অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যম আজ শিশুর দৈনন্দিন জীবনের অংশ। ফলে বইয়ের পাতায় দীর্ঘ সময় মন দেওয়ার অভ্যাস নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে। তবু শিশুমনের কিছু মৌলিক আকাঙ্ক্ষা বদলায়নি। শিশু এখনও ছন্দ ভালোবাসে, অদ্ভুত শব্দে হাসে, একটি ছবির মধ্যে গল্প খুঁজে পায় এবং অসম্ভবকে সম্ভব ভাবতে ভালোবাসে। সে এখনও জানতে চায় — ‘এমন হলে কেমন হতো?’ এই কারণেই যোগীন্দ্রনাথ সরকার আজও প্রাসঙ্গিক।

প্রযুক্তির এই সময়ে তাঁর সাহিত্যকে ফিরিয়ে আনার অর্থ প্রযুক্তিকে অস্বীকার করা নয়। বরং ডিজিটাল পর্দার পাশাপাশি শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়া, তাকে ছড়ার সুর শোনানো, গল্পের ভেতর দিয়ে কল্পনা করতে শেখানো এবং পড়ার আনন্দের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। যে শিশু একদিকে অ্যানিমেশনের রঙিন পৃথিবী দেখছে, অন্যদিকে যদি বইয়ের পাতায় নিজের কল্পনার পৃথিবীও তৈরি করতে শেখে, তবে তার সৃজনশীলতার পরিসর আরও বিস্তৃত হতে পারে।

যোগীন্দ্রনাথ আমাদের শিখিয়েছেন, শিশুকে শেখানোর আগে তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে হয়। অক্ষরের সঙ্গে ছড়া, সংখ্যার সঙ্গে গল্প, ছবির সঙ্গে কল্পনা এবং শিক্ষার সঙ্গে আনন্দকে মিলিয়ে দিতে হয়। কারণ শিশুর হাতে জ্ঞান তুলে দেওয়া সহজ, কিন্তু জ্ঞানের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব তৈরি করা কঠিন। এই বন্ধুত্ব তৈরির কাজটিই যোগীন্দ্রনাথ করেছিলেন অসাধারণ দক্ষতায়।

শিশুকে শেখানো — কিন্তু তার আনন্দটুকু অক্ষুণ্ণ রেখে। এই সহজ অথচ গভীর কাজটির জন্যই বাংলা শিশুসাহিত্যের ইতিহাসে যোগীন্দ্রনাথ সরকার আজও স্মরণীয়। বিস্মৃতির আড়াল থেকে তাঁকে ফিরে দেখা তাই কেবল একজন সাহিত্যিককে স্মরণ করা নয়; এটি আমাদের শৈশবের এক নির্মল আনন্দভুবনকে নতুন প্রজন্মের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ারও এক আন্তরিক প্রয়াস।

আজ শিশু সাহিত্যিক যোগীন্দ্রনাথ সরকারের জন্মদিন।

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

পেজফোরনিউজ-এর নববর্ষ বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Currently Maintained by the2.dev