| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার বিজয়াদশমীর ভাঙ-সিদ্ধি : অসিত দাস কলকাতায় এমন দুর্গাপুজো দেখিনি তো আগে : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘ওঝা’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘নিখোঁজের দর্শক সংখ্যা’ নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘সর্বংসহা’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯১/২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাজারাজড়া ও বণিকের দুর্গাপূজায় নিম্নবর্গ ছিল রবাহূত : অসিত দাস প্রজনন অধিকার নিশ্চিত হলেই সুস্থ্য বাংলাদেশ গড়া সম্ভব : নিকোলাস বিশ্বাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯১/১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘জলের অক্ষর’ কতো বড়ো বড়ো পুজোরে বাবা… : জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নবপত্রিকা: দুর্গাপূজার অন্তরালে শস্যদেবী ও প্রকৃতির আরাধনা : যশোবন্ত রায় মন্ত্র ভুল বললেও কোনও অসুবিধে নেই… নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী : জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সিংহবাহিনী দুর্গা মৃগবাহিনীও : শ্যামলকান্তি চক্রবর্তী দেবদেবীর পূজায় দুর্বার প্রয়োজন কেন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সাহিত্যে নোবেলজয়ী অ্যান কারসন-এর শব্দের ব্যুৎপত্তির ধারণা : অসিত দাস মিয়ানমার সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই পিতৃ পক্ষের শেষ, মাতৃপক্ষের সূচনা শুভ মহালয়ার আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com, আমাদের পোর্টালের কিছু ছবি বাদে প্রায় সব ছবিই অন্তর্জাল থেকে সংগ্রহ করা হয়। কারুর যদি কপিরাইট থাকে জানাবেন। আমরা সেই ছবি পোর্টাল থেকে ডিলিট করে দেব।

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গা / ৭৯ Views জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬

[সংক্ষিপ্তসার — গ্রান্ট আবওয়াবের শেষ দুই খাত — আহুক ও নজরানা মনসুরগঞ্জ — এবং আলিবর্দি খানের শাসনামলের চূড়ান্ত রাজস্ব হিসাব উপস্থাপন করেছেন। আহুক (Ahuk) প্রান্তিক জেলায় আংশিক হারে ধার্য সামান্য অতিরিক্ত কর। এর অজুহাত মুর্শিদাবাদের কেল্লা মেরামতে সিলেট থেকে চুন ক্রয় ও পরিবহনের ব্যয় নির্বাহ। একই প্রকৃতির আরেকটি কর ছিল কিমত-খেশত-গৌর — প্রাচীন গৌড় বা লখনৌতির ধ্বংসাবশেষ ভেঙে এনামেলকরা (মীনাকারি করা) ইট সংগ্রহের ব্যয় মেটাত। আহুকের প্রায় তিন-পঞ্চমাংশ রাজশাহী, দিনাজপুর ও নদীয়ার জমিদারি থেকে আদায় হতো — বার্ষিক ১,৮৪,১৪০ টাকা; গৌড়ের ইট পরিবহনের কর ছিল ৮,০০০ টাকা। মোট ১,৯২,১১৪ টাকা। নজরানা মনসুরগঞ্জ- স্বেচ্ছাচারী কর — যা আসল জমা ও জমির মূল্যবৃদ্ধির অনুপাতে ধার্য করা হতো। মূলত রাজশাহীর বড় জমিদারিতে সীমাবদ্ধ; মোট করের অন্তত এক-পঞ্চমাংশ রাজশাহীর ওপর ন্যস্ত ছিল। এর উৎপত্তি হয়েছিল সিরাজ-উদ-দৌলার ঔদ্ধত্যে — হীরাঝিল- ব্যয়বহুল অট্টালিকা নির্মাণ করে আলিবর্দিকে সাজানো বন্দিদশায় আটকে রেখে মুক্তিপণ হিসেবে জমিদারদের থেকে অর্থ আদায় করেন। মুক্তির পর আলিবর্দি তাঁকে মনসুরগঞ্জ (বিজয়ীর ভাণ্ডার) নামে একটি গঞ্জ বা বাজারের অধিকার দেন — যা থেকে সায়ের রাজস্ব আদায় হত। স্থায়ীভাবে নির্ধারিত এই কর অন্য ৫,০১,৫৯৭ টাকার কর-নির্ধারণের সঙ্গে একীভূত করা হয়। আলিবর্দির শাসনকালে চাপানো আবওয়াবের মোট পরিমাণ ২২,২৫,৫৫৪ টাকা; মোট বার্ষিক রাজস্ব হওয়ার কথা ছিল ১,৮৬,৪৪,০৬৭ টাকা। কিন্তু সুজা খানের আমলে তাশখিস-জমাবন্দি প্রথায় জমির আদর্শ মূল্যায়ন কমিয়ে আনার সুযোগ সৃষ্টি হয় — যা পরে রাজকীয় আয়ের বিশাল ঘাটতি তৈরি করে। ৩০ বছরেরও কম সময়ে খালসা অংশের বার্ষিক রাজস্ব বন্দোবস্তে প্রায় দশ লক্ষ টাকা কম হয় — যা আগে এক কোটি নয় লক্ষ টাকা ছিল। গ্রান্টের মতে — আলিবর্দির প্রকৃত আয় ছিল দুই কোটি পনেরো লক্ষ টাকা; এবং তিনি তাঁর উত্তরাধিকারের জন্য আড়াই কোটি সিক্কা রুপির বেশি সম্পদ রেখে যাননি।]

আবওয়াব

৭ম। আহুক (Ahuk) ইত্যাদি। অন্যান্য সুবাদারি করের মতোই মূলত একই নীতিতে জেলাগুলোর ওপর এই সামান্য অতিরিক্ত কর আংশিক হারে ধার্য করা হয়েছিল। তবে রাজকীয় বিশেষ অধিকারের এই অন্যায্য প্রয়োগের বিষয়টি রাজদরবার ও জনগণের কাছে গোপন রাখার উদ্দেশ্যে, এটাকে প্রাথমিকভাবে জনকল্যাণমূলক কাজের অজুহাতে প্রবর্তন করা হয়েছিল — যার লক্ষ্য ছিল মুর্শিদাবাদের কেল্লা বা দুর্গ মেরামতের জন্য সিলেট থেকে চুন (chunam) ক্রয় বা পরিবহনের ব্যয় নির্বাহ করা। আমরা এই শিরোনামের অধীনে একই প্রকৃতির আরেকটি নগণ্য করকেও অন্তর্ভুক্ত করেছি, যা নিজামত দপ্তরে কিমত-খেশত-গৌর (Kimut Kheshtgour) নামে পৃথকভাবে চিহ্নিত ছিল। প্রাচীন শহর গৌড় বা লখনৌতির (নিঃসন্দেহে গ্রিকদের বর্ণিত প্যালিবোথরা এবং একসময় বাংলা ও সমগ্র হিন্দুস্তানের বৃহত্তর অংশের রাজধানী ছিল) সেই শ্রদ্ধেয় ধ্বংসাবশেষ বর্বরভাবে ভাঙার খরচ মেটানোতে এটা ছিল কঠোর ও অন্যায্য আদায়-ব্যবস্থা; এর মাধ্যমে সেখান থেকে বিশেষ এক ধরণের এনামেলকরা (মীনাকরা) ইট সংগ্রহ করা হতো, যার গঠনশৈলী ও গুণমান বর্তমান স্থানীয় বাসিন্দাদের অনুকরণ-দক্ষতাকেও ছাড়িয়ে যেত।

প্রথম প্রধান খাতটি ছিল আহুক বা চুন সংক্রান্ত; এর প্রায় তিন-পঞ্চমাংশই রাজসাহী, দিনাজপুর ও নদীয়ার জমিদারীগুলো থেকে আদায় করা হতো এবং এর বার্ষিক পরিমাণ ছিল ১,৮৪,১৪০ টাকা।

দ্বিতীয় খাতটি ছিল গৌড়ের ইট পরিবহনের জন্য ধার্যকরা এক স্থায়ী কর; এটা পার্শ্ববর্তী কয়েকটি জমিদারীর ভৌগোলিক সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এবং এর বার্ষিক নির্ধারিত পরিমাণ ছিল ৮,০০০ টাকা।

উভয় মিলিয়ে সরকারের জন্য মোট আয়ের পরিমাণ দাঁড়াত ১,৯২,১১৪ টাকা।

আবওয়াব।

৮ম। নজরানা মনসুরগঞ্জ — ত্রুটিপূর্ণ পদ্ধতি আর নীতির স্বেচ্ছাচারী কর, কিন্তু অর্থের পরিমাণ অত্যন্ত সামান্য। আসল জমা (মূল রাজস্ব) এবং সংশ্লিষ্ট জমির আর্থিক মূল্যবৃদ্ধির অনুপাতে এই কর ধার্য করা হত। বর্তমানে বড় আকারের প্রান্তিক জমিদারীতে — বিশেষ করে রাজসাহীতে সীমাবদ্ধ; মোট করের এক-পঞ্চমাংশ ভার রাজসাহী জমিদারীর ওপরই ন্যস্ত ছিল। আলিবর্দির বার্ধক্যকালে প্রিয় পোষ্য উত্তরাধিকারী ও পৌত্র — কুখ্যাত ও অত্যাচারী শাসক সিরাজ-উদ-দৌলার — অসংযত ও বোকামিপূর্ণ আবদারে নতিস্বীকারে এর উৎপত্তি। এই চতুর ও উচ্ছৃঙ্খল যুবক সকল নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে চরম ও বিকৃত ভোগবিলাসে মত্ত হওয়ার উদ্দেশ্যে — পারিবারিক নজরদারির আওতার বাইরে সুবিধাজনক দূরত্বে — ব্যয়বহুল অট্টালিকা নির্মাণ করেছিল এবং তার কাজ প্রায় শেষও করে ফেলেছিল; অট্টালিকাটি কৃত্রিম খাল বা জলাশয় দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল, যার নাম দেওয়া হয়েছিল হীরাঝিল বা হীরার হ্রদ। ভবনটির নির্মাণকাজ যখন প্রায় সমাপ্তির পথে, তখন সেই বৃদ্ধ নবাবকে কাঠামো পরিদর্শনের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হলো। উভয় পক্ষের কোনো পূর্বপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই হোক কিংবা কেবল সেই যুবকের চরম ঔদ্ধত্যের বশেই হোক — তিনি নিজেকে ভবনের কক্ষে আবদ্ধ হতে দিলেন; কক্ষটি এমনভাবে অবস্থিত ছিল যে বাইরে থেকে তাঁর কর্মকর্তা ও অনুচররা — যাদের মধ্যে কয়েকজন প্রধান জমিদারের উকিলও ছিলেন — তাঁকে সহজেই দেখতে পাচ্ছিলেন। এরপর এমন এক পরিস্থিতির অবতারণা করা হলো যেন তাঁকে মুক্ত করার একমাত্র শর্ত হলো সংশ্লিষ্ট জেলা থেকে অর্থ আদায় — যে অর্থ প্রদানের জন্য তারাই কেবল সম্মত হতে পারত, যারা এক স্বৈরাচারী শাসককে এক সাজানো বন্দিদশা থেকে মুক্ত করতে অথবা সিংহাসনের ভাবী উত্তরাধিকারীর খেয়াল-খুশিকে দাসসুলভ আনুগত্যের মাধ্যমে তুষ্ট করে ভবিষ্যতে তাঁর অনুগ্রহ লাভের আশায় আগ্রহী ছিল। বস্তুত, সরকারের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের বাইরে সাধারণ কৃষকের ওপর গোপনে করের বোঝা বাড়ানোর অনুকূল সুযোগ পেলেই ভারতের ভূস্বামীরা — প্রকৃতিগত অসৎ প্রবৃত্তি, নিপীড়নের আকাঙ্ক্ষা কিংবা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির বাইরে — অন্য উদ্দীপনার প্রয়োজন বোধ করতেন না। সম্ভবত এই ঘটনাই ছিল তাঁদের অভিপ্রায় ও আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত; তাই তাঁরা অত্যন্ত আগ্রহ ও তৎপরতার সাথে এটা লুফে নিয়েছিলেন। সুবাদারকে মুক্তি দেওয়া হলো এবং জোরকরে আদায় করা সেই সুবিধার পাশাপাশি, তাঁর নাতিকে তাঁর নতুন বাসস্থানের (যার নাম দেওয়া হলো মনসুরগঞ্জ বা বিজয়ীর ভাণ্ডার — সিরাজ-উদ-দৌলার উপাধি এবং সেই চতুর কৌতুকপূর্ণ কৌশলের স্মারক হিসেবে, যার মাধ্যমে তিনি বয়োজ্যেষ্ঠ ও অভিজ্ঞদের ধূর্ততাকে পরাস্ত করেছিলেন বলে মনে করা হয়) সন্নিকটে গঞ্জ বা শস্যের বাজার ও গুদাম স্থাপনের অধিকার স্বেচ্ছায় প্রদান করা হলো, যা থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সায়ের (বাণিজ্যিক) রাজস্ব আদায়ের সুযোগ তৈরি হলো। নির্দিষ্ট জমিদারিতে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত এবং অন্য মূল্যায়নের সাথে একত্রিত করা ভূমি খাজনার এই অতিরিক্ত বৃদ্ধির গড় পরিমাণ … … … ৫,০১,৫৯৭ রুপি।

এটা ছিল আলিবর্দির শেষ আর্থিক পদক্ষেপ, যার ফলে ১৭৫৬ সালে তাঁর জীবনাবসানের পর তাঁর শাসনকালে চাপানো আবওয়াব বা অতিরিক্ত করের মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ২২,২৫,৫৫৪ টাকায়। পূর্বের সুবাদারি আমলে অন্য আদায় — যা আসিল তুমারি বাদশাহি (জাগির-সহ মূল রাজকীয় রাজস্ব-নির্ধারণ)-এর প্রায় সমপরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ ছিল — মোট বার্ষিক রাজস্বের পরিমাণ দাঁড়ানোর কথা ছিল ১,৮৬,৪৪,০৬৭ টাকা। কিন্তু সুজা খানের শাসনামলে তশখিস-জমাবন্দি (teshkhees-jummabundy) নামক বিপজ্জনক প্রথা চালু করা হয়েছিল, যার মাধ্যমে সাম্রাজ্যের প্রাচীন নিয়ম লঙ্ঘন করে জমির মূল বা আদর্শ মূল্যায়নের পরিমাণ কমানোর সুযোগ তৈরি হল। যদিও শুরুতে বিষয়টি খুব গুরুত্ব পাওয়ার মতো ছিল না, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে রাজকীয় আয়ের ক্ষেত্রে বিশাল ঘাটতি ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়; রাজস্ব হ্রাসের কারণগুলোর মধ্যে আংশিক যৌক্তিক ভিত্তি ছিল আলাদা হওয়া অঞ্চল — যেমন মারাঠাদের হাতে তুলে দেওয়া উদয়পুর বা ত্রিপুরার সরকার এবং বন্দর বালেশ্বরের চাকলা — অথবা এমন কিছু এলাকা যা আগে মূল্যবান হিসেবে গণ্য হলেও পরে পতিত বা অনুৎপাদনশীল হয়ে পড়েছিল। তবে এই ঘাটতির মূল কারণ ছিল মধ্যস্বত্বভোগী ও নিম্নস্তরের কর্মচারীদের কারসাজি ও মিথ্যা অজুহাত; এ দেশে তাদের স্বভাবই হলো সামান্যতম বিবেচনামূলক সুযোগ পেলেই প্রভুর স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করে নিজেদের দায়িত্বের অপব্যবহার করা এবং নীতি বা পদ্ধতির সমস্ত সুনির্দিষ্ট ও প্রতিষ্ঠিত নিয়ম লঙ্ঘন করা — যে নিয়মগুলোই কেবল তাদের অর্থ আত্মসাতের স্বাভাবিক প্রবণতাকে রুখে রাখার মতো কঠিন ও দুর্লঙ্ঘ্য বাধা হিসেবে কাজ করত। তুমর জমা (নির্ধারিত রাজস্বের হিসাব)-তে তথাকথিত প্রয়োজনীয় সংশোধনের ব্যবস্থা প্রবর্তনের ৩০ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে, খালসা (সরাসরি সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন) অংশের বার্ষিক রাজস্ব বন্দোবস্তে প্রায় দশ লক্ষ টাকা হ্রাস করা হয়েছিল — অথচ এর আগে তা আনুষ্ঠানিকভাবে এক কোটি নয় লক্ষ টাকা নির্ধারিত ছিল। এর বাইরেও জমিদার ও অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য বার্ষিক হিসাব নিষ্পত্তির সময় মস্কুরাত (বিবিধ ব্যয়)-এর খাতে এক লক্ষ ছিয়াত্তর হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হতো। সুতরাং, আলোচ্য সময়ের সুবাদারি রাজস্বের উপযুক্ত হিসাব করতে হলে আলি-বর্দী খানকে বরাদ্দকরা মোট অর্থ থেকে এই পরিমাণগুলো বাদ দেওয়ার কথা ছিল; কিন্তু এক বছরের রাজস্ব আদায়ের বিবরণ এবং জমিদারি সনদের অনুমোদনের সময় পাওয়া প্রথাগত নজরানা-র বিষয়টি বিবেচনা করলে মনে হয়, শেষ পাঁচ বছরে তাঁর প্রকৃত আয় উল্লিখিত অর্থের চেয়ে খুব কম ছিল না। এর সাথে যদি আমরা তাঁর ভাগ্নে ও জমাতা শাহামত জং ও সৌলত জং-এর অর্জিত কেফায়ত বা অতিরিক্ত মুনাফার বিষয়টি যোগ করি — যা ঢাকা ও পূর্ণিয়ার সমৃদ্ধ ফৌজদারি এলাকাগুলোর বর্ধিত রাজস্ব থেকে আসত এবং যা সরকারি কোষাগারের প্রথাগত পাওনার বাইরে কোনো জনকল্যাণমূলক প্রয়োজনে নয়, বরং তাঁদের ব্যক্তিগত ভরণপোষণের উদ্দেশ্যেই বরাদ্দ করা হয়েছিল — তবে আমরা সমগ্র বাংলা সুবার নিট ভূ-রাজস্বের পরিমাণ ন্যায্য ও পরিমিতভাবে দুই কোটি পনেরো লক্ষ টাকা হিসেবে ধরতে পারি। পরিশেষে, সেই অবৈধ শাসনকালের সমাপ্তি-লগ্নে সম্ভাব্য যে বিপুল অর্থভাণ্ডার বা সম্পদ সঞ্চিত হয়েছিল, তার বিষয়টি বিবেচনা করা যাক। মারাঠাদের বিরুদ্ধে প্রায় দশ বছরব্যাপী যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট অত্যধিক ব্যয় এবং সেই সুবাদে গঙ্গার পশ্চিমদিকের কিছু জেলা থেকে পাওয়া রাজস্বের পরিমাণ হ্রাস পাওয়ার বিষয়টি এখানে প্রণিধানযোগ্য। যদিও দিল্লির দরবারে অর্থ পাঠানো সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল — এমনকি শান্তির শেষ পাঁচ বছরেও — তবুও বিশাল আকারের সামরিক বাহিনীর রক্ষণাবেক্ষণেই সেই অর্থের প্রায় সমপরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়ে গিয়েছিল (যা আগে নিয়মিত কর বা নজরানা হিসেবে সেখানে পাঠানো হতো); ফলে সেই অর্থ কেবল প্রাদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার বৃদ্ধি কিংবা অভ্যন্তরীণ লেনদেন ও অর্থের আদান-প্রদানকে ত্বরান্বিত করার কাজেই ব্যবহৃত হয়েছিল; বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজনৈতিকভাবে যতটা নিশ্চিত হওয়া সম্ভব, তার ওপর ভিত্তি করে অনুমান করা যেতে পারে যে, ক্ষমতা দখলকারী ব্যক্তি তাঁর পরবর্তী উত্তরাধিকারীর জন্য যে প্রকৃত সম্পদ রেখে গিয়েছিলেন, তার পরিমাণ আড়াই কোটি সিক্কা রুপির বেশি ছিল না।

টীকা ১

১. আহুক (Ahuk) — চুন সংক্রান্ত কর — যা মুর্শিদাবাদের কেল্লা মেরামতের ব্যয় নির্বাহের জন্য ধার্য করা হয়।

২. কিমত-খেশত-গৌর — গৌড়ের ইট পরিবহনের কর — যা প্রাচীন গৌড়ের ধ্বংসাবশেষ ভেঙে এনামেল-যুক্ত ইট সংগ্রহের ব্যয় মেটাত।

৩. গৌড় বা লখনৌতি — প্রাচীন বাংলার রাজধানী — যা গ্রিকদের বর্ণিত প্যালিবোথ্রা নামে পরিচিত। এর ধ্বংসাবশেষ থেকে মীনাকরা ইট সংগ্রহ করা হতো।

৪. নজরানা মনসুরগঞ্জ — সিরাজ-উদ-দৌলার ঔদ্ধত্যের ফলে প্রবর্তিত স্বেচ্ছাচারী কর — যা মূলত রাজশাহীর জমিদারিতে সীমাবদ্ধ ছিল।

৫. হীরাঝিল — সিরাজ-উদ-দৌলার নির্মিত ব্যয়বহুল অট্টালিকা — যা কৃত্রিম খাল বা জলাশয় দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল।

৬. মনসুরগঞ্জ — সিরাজ-উদ-দৌলার উপাধি ও বিজয়ের স্মারক — যেখানে একটি গঞ্জ বা বাজারের অধিকার দেওয়া হয়।

৭. সায়ের — রাজস্বের অতিরিক্ত উৎস — বাজার, শুল্ক, টোল ইত্যাদি।

৮. তশখিস-জমাবন্দি — সুজা খানের আমলে প্রবর্তিত বিপজ্জনক প্রথা — যার মাধ্যমে জমির আদর্শ মূল্যায়ন কমিয়ে আনার সুযোগ সৃষ্টি হয়।

৯. খালসা — সরাসরি সরকারি ব্যবস্থাপনাধীন ভূমি।

১০. মস্কুরাত — বিবিধ ব্যয় — যা জমিদার ও কর্মকর্তাদের বার্ষিক হিসাব নিষ্পত্তির সময় বরাদ্দ রাখা হতো।

১১. কেফায়ত — অতিরিক্ত মুনাফা — যা ঢাকা ও পূর্ণিয়ার ফৌজদারি এলাকা থেকে আদায় করা হতো।

১২. শাহামত জং ও সৌলত জং — আলিবর্দির ভাগ্নে ও জামাতা — যারা ঢাকা ও পূর্ণিয়ার ফৌজদারি এলাকা শাসন করতেন।

১৩. আসিল তুমারি বাদশাহি — মূল রাজকীয় রাজস্ব-নির্ধারণ — যা জায়গিরসহ গণনা করা হতো।

১৪. উদয়পুর বা ত্রিপুরা — মারাঠাদের হাতে হস্তান্তরিত অঞ্চল — যা রাজস্ব হ্রাসের একটি কারণ।

১৫. বন্দর বালেশ্বরের চাকলা — রাজস্ব হ্রাসের আরেকটি কারণ — যা মারাঠাদের হাতে চলে যায়।

১৬. ২২,২৫,৫৫৪ টাকা — আলিবর্দির শাসনকালে চাপানো আবওয়াবের মোট পরিমাণ।

১৭. ১,৮৬,৪৪,০৬৭ টাকা — আলিবর্দির আমলে মোট বার্ষিক রাজস্ব হওয়ার কথা ছিল।

১৮. আড়াই কোটি সিক্কা রুপি — অনুমান আলিবর্দি তাঁর উত্তরাধিকারের জন্য সর্বোচ্চ যে সম্পদ রেখে যান — ।

বাংলার রাজস্ব ইতিহাস নিয়ে গ্রান্টের বিশ্লেষণ —

১. আহুক ছিল চুন সংগ্রহের কর; গৌড়ের ইট পরিবহনের কর ছিল আরেকটি খাত। এই দুটোই প্রমাণ করে — আবওয়াবের অজুহাত কখনো জনকল্যাণমূলক, কখনো সৌন্দর্যায়নমূলক ছিল; কিন্তু প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল রাজস্ব বৃদ্ধি।

২. নজরানা মনসুরগঞ্জ ছিল সিরাজ-উদ-দৌলার ঔদ্ধত্য ও আলিবর্দির সাজানো বন্দিদশা প্রমাণ করে জমিদাররা কৃষকদের ওপর গোপনে কর চাপানোর সুযোগ পেলেই তা লুফে নিতেন। মুক্তির পর আলিবর্দি সিরাজকে মনসুরগঞ্জের অধিকার দেন — যা থেকে সায়ের রাজস্ব আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়।

৩. সুজা খানের আমলে প্রবর্তিত তশখিস-জমাবন্দি প্রথা রাজকীয় আয়ের বিশাল ঘাটতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ৩০ বছরেরও কম সময়ে খালসা অংশের বার্ষিক রাজস্ব বন্দোবস্তে প্রায় দশ লক্ষ টাকা হ্রাস করা হয়।

৪. গ্রান্ট বলছেন, আলিবর্দির প্রকৃত আয় ছিল দুই কোটি পনেরো লক্ষ টাকা; এবং তিনি তাঁর উত্তরাধিকারের জন্য আড়াই কোটি সিক্কা রুপির বেশি সম্পদ রেখে যাননি।

৫. প্রায় দশ বছরব্যাপী মারাঠা হাঙ্গামায় অত্যধিক ব্যয় এবং গঙ্গার পশ্চিমদিকের কিছু জেলা থেকে রাজস্ব কমা — এই দুটোই আলিবর্দির আয় কমিয়ে দেয়। দিল্লিতে অর্থ পাঠানো সম্পূর্ণ বন্ধ হল — এমনকি শান্তির শেষ পাঁচ বছরেও।

৬. গ্রান্টের দাবি ১৭৬৫-তে দেওয়ানি লাভের সময় দেশীয় প্রশাসন এই প্রকৃত হিসাব গোপন করে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে রাজস্বের পরিমাণ কমিয়ে দেখায়। আলিবর্দির আমলেই আবওয়াব স্থায়ী রূপ পায় — যা পরবর্তীতে জমিদারদের অতিরিক্ত আদায় ও কৃষক শোষণের মূল উৎস হয়ে ওঠে।

টিকা ২

“কিন্তু সুজা খানের শাসনামলে তাশখিস-জমাবন্দি (teshkhees-jummabundy) নামক বিপজ্জনক প্রথা চালু করা হয়েছিল, যার মাধ্যমে সাম্রাজ্যের প্রাচীন নিয়ম লঙ্ঘন করে জমির মূল বা আদর্শ মূল্যায়নের পরিমাণ কমিয়ে আনার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছিল।”

গ্রান্টের বক্তব্য তশখিস-জমাবন্দি (Teshkhees Jummabundy) মোগল আমলের এমন এক রাজস্ব নির্ধারণী প্রক্রিয়া, যেখানে জমির প্রাচীন ও স্থায়ী আদর্শ মূল্যায়ন পরিবর্তন করে বিগত কয়েক বছরের প্রকৃত আদায়ের ওপর ভিত্তি করে সংশোধিত বা নিট রাজস্ব কাঠামো নির্ধারণ করা হতো। ফারসি ‘তশখিস’ শব্দের অর্থ ‘যাচাইকরণ’ বা ‘নির্দিষ্টকরণ’। নবাব সুজা-উদ-দিন মুহাম্মদ খানের (১৭২৭-১৭৩৯) শাসনে এই প্রথা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। মোগল সাম্রাজ্যের আদি নিয়ম ছিল রাজা তোডরমল, শাহ সুজার ‘আসল জমা’, জমির স্থায়ী ও আদর্শ মূল্যায়ন। তশখিস প্রথা এই প্রাচীন নিয়ম বা আদর্শ ভেঙে ফেলে। এই প্রথায় স্থানীয় জমিদার এবং কানুনগোরা (রাজস্ব রেকর্ড রক্ষক) যোগসাজশ করে কেন্দ্রীয় সরকারের খাতায় জমির প্রকৃত উৎপাদন ক্ষমতা বা মূল্য কাগজে কলমে কমিয়ে দেখানোর সুযোগ পেতেন। জমির মূল মূল্যায়ন বা আদর্শ রাজস্বের পরিমাণ কমিয়ে আনা হলে নবাবরা তাঁদের রাজকোষের ঘাটতি মেটাতে মূল কর বৃদ্ধির পরিবর্তে ‘আবওয়াব’ বা বিশেষ অতিরিক্ত সেস/লেভি চাপানো শুরু করেন। একটি স্থায়ী ও নিয়মতান্ত্রিক কর কাঠামোর পরিবর্তে রাজস্ব ব্যবস্থাটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও সাময়িক দরকষাকষির বিষয়ে পরিণত হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে বাংলার কৃষি অর্থনীতির ক্ষতি করেছিল।

জেমস গ্রান্ট কেন একে ‘বিপজ্জনক’ বলেছেন? জেমস গ্রান্টের মতে, মুর্শিদকুলি খানের কঠোর ও বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থার পর সুজা খানের এই শিথিল নীতি মোগল রাজস্ব প্রশাসনের মূল ভিত্তিটি দুর্বল করে দিয়েছিল। জমির আদর্শ মূল্য কাগজে-কলমে কমিয়ে রাখায় এবং সমান্তরালভাবে অতিরিক্ত উপ-কর বা ‘আবওয়াব’ চাপানোর ফলে প্রজাদের ওপর প্রকৃত করের বোঝা অপরিসীম বেড়ে যায়, অথচ সরকারি নথিতে রাজস্বের প্রকৃত চিত্রটি সম্পূর্ণ আড়ালে চলে যায়। এই অস্বচ্ছতার কারণে পরবর্তীকালে ব্রিটিশদের পক্ষেও বাংলার জমির প্রকৃত রাজস্ব ক্ষমতা বা মূল্য নির্ধারণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছিল।

জেমস গ্রান্ট একে বিপজ্জনক’ বলেছেন। তার ভাবনা কি ঐতিহাসিকভাবে ঠিক? ইতিহাসবিদ ইরফান হাবিব, The Agrarian System of Mughal India; যদুনাথ সরকার, History of Bengal (Vol. II); সিরাজুল ইসলাম The Permanent Settlement in Bengal: A Study of Its Operation 1790-1819), গ্রান্টের এই বক্তব্যকে নিখাদ ঐতিহাসিক সত্য বলছেন না। গ্রান্ট দাবি করেছিলেন তোডরমল বা শাহ সুজার ‘আসল জমা’ ছিল অলঙ্ঘনীয় ও স্থায়ী। তিন ইতিহাসবিদ দেখিয়েছেন, মোগল রাজস্ব ব্যবস্থা কখনোই স্থবির ছিল না। উৎপাদন ও বাজারের পরিবর্তনের সাথে সাথে রাজস্বের পরিমাপে সংশোধন বা ‘তশখিস’ করা অত্যন্ত স্বাভাবিক ও নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ছিল। গ্রান্টের মতে, এই প্রথা জমিদারদের কর ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল। সুজা খান জমিদারদের অবাধ ছাড় দেননি। তিনি বাংলাকে কতগুলো ‘চাকলায়’ ভাগ করে কঠোর প্রশাসনিক নজরদারির মধ্যে এনেছিলেন, যাতে জমিদাররা কর ফাঁকি দিতে না পারে।

তাহলে গ্রান্ট কেন একে বিপজ্জনক দাগিয়েছেন? প্রথমত কোম্পানির রাজস্ব বৃদ্ধির তত্ত্বকে বৈধতা দেওয়া ছিল প্রধান উদ্দেশ্য। কোম্পানির চিফ সেরেস্তাদার জেমস গ্রান্ট প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে, বাংলার জমির প্রকৃত কর দেওয়ার ক্ষমতা নথিতে দেখানো হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি। তিনি নবাব সুজা খানের আমলকে ‘শিথিল’ বা ‘বিপজ্জনক’ হিসেবে চিত্রায়িত করে কোম্পানির নীতিনির্ধারকদের এই বার্তা দিতে চেয়েছিলেন যে — নথিতে জমির মূল্য যাই কমানো হোক না কেন, কোম্পানি চাইলে মুঘল আমলের প্রাচীন নিয়ম বা আদর্শ মূল্যায়নের দোহাই দিয়ে আরও বিপুল পরিমাণ কর আদায় করতে পারে। দ্বিতীয়ত আরও একটা বড় কারন ছিল ভবিষ্যৎ জমিদার-বিরোধী নীতির ভিত্তি তৈরি করা (পরে শোরের সাথে বিতর্কের রূপ নেয়)। গ্রান্টের মূল দাবি ছিল বাংলার জমির একমাত্র মালিক রাষ্ট্র (কোম্পানি) এবং জমিদাররা কেবল অস্থায়ী কর আদায়কারী কর্মচারী মাত্র। সুজা খানের ‘তাশখিস’ প্রথাকে ‘বিপজ্জনক ফাঁদ’ এবং জমিদারদের জালিয়াতির হাতিয়ার হিসেবে প্রমাণ করতে পারলে গ্রান্টের পক্ষে জমিদারদের স্বত্ব বা অধিকার খর্ব করার নীতিগত সুপারিশ করা সহজ হতো। গ্রান্টের ১৭৮৬ সালের এই আক্রমণাত্মক মিনিটটিই মূলত ব্রিটিশ প্রশাসনে জমিদারদের অধিকার ও করের হার নিয়ে সেই ঐতিহাসিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল, যার জবাবে পরবর্তীতে ১৭৮৯ সালে জন শোর তাঁর বিখ্যাত পাল্টা মিনিটগুলো পেশ করেন।

আমরা যেন ভুলে না যাই ঐতিহাসিকভাবে, সুজা খানের ‘তশখিস-জমাবন্দি’ বিপজ্জনক বা ধ্বংসাত্মক প্রথা ছিল না; বরং পরিবর্তিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে রাজস্ব ব্যবস্থা সচল রাখার কৌশল। জেমস গ্রান্ট মূলত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সর্বোচ্চ কর আদায়ের নীতি বৈধতা দিতে এবং জমিদারদের জমির মালিকানা থেকে বঞ্চিত করতে এই প্রথাটিকে একটি ‘বিপজ্জনক ফাঁদ’ হিসেবে চিত্রায়িত করেছিলেন।

চলবে

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

পেজফোরনিউজ-এর নববর্ষ বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Currently Maintained by the2.dev