| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সাহিত্যে নোবেলজয়ী অ্যান কারসন-এর শব্দের ব্যুৎপত্তির ধারণা : অসিত দাস মিয়ানমার সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন কানাডার কবি অ্যান কারসন : অসিত দাস পেজফোরনিউজ-এর শারদোৎসব বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ প্রকাশিত হল ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ একটি অব্যক্তিগত বয়ান : তপোধীর ভট্টাচার্য মহালয়ার প্রার্থনা : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘এক টুকরো ভোর’ আশ্বিনের শারদপ্রাতে : যশোবন্ত রায় আমার ছেলেবেলার মহালয়ার সকাল : পীযূষ কান্তি দাস পর্দার দাপুটে নায়ক, বাস্তব জীবনে মানবতাবাদী — নানা পাটেকরের জীবন ও অবিনশ্বর কীর্তি : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সসীমকুমার বাড়ৈ-এর ছোটগল্প ‘প্রকৃতি বিভাজন খেলা’ মিরকাশিমের বীরকুল, হেস্টিংসের ব্রাইটন, জন ফ্র্যাঙ্ক স্নেইথ-এর দীঘা : সুব্রত গুহ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ SIR-এর ফাঁসে জ্ঞানেশ কুমার, কমিশনের অন্দরে অশান্তি (শেষ কিস্তি) : দিলীপ মজুমদার রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে পাঁচ দফা কৌশল বাস্তবায়নের রোডম্যাপ : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন কলকাতার নব্য কাজিয়ার দুর্গা : অসিত দাস SIR-এর ফাঁসে জ্ঞানেশ কুমার, কমিশনের অন্দরে অশান্তি (সপ্তম কিস্তি) : দিলীপ মজুমদার আমাদের নিখোঁজ শিশুরা: সংখ্যার বাইরে যে প্রশ্নগুলো জরুরি : নিকোলাস বিশ্বাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মানুষকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে নয়া পুঁজিবাদ : সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় SIR-এর ফাঁসে জ্ঞানেশ কুমার, কমিশনের অন্দরে অশান্তি (ষষ্ঠ কিস্তি) : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ SIR-এর ফাঁসে জ্ঞানেশ কুমার, কমিশনের অন্দরে অশান্তি (পঞ্চম কিস্তি) : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই পিতৃ পক্ষের শেষ, মাতৃপক্ষের সূচনা শুভ মহালয়ার আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com, আমাদের পোর্টালের কিছু ছবি বাদে প্রায় সব ছবিই অন্তর্জাল থেকে সংগ্রহ করা হয়। কারুর যদি কপিরাইট থাকে জানাবেন। আমরা সেই ছবি পোর্টাল থেকে ডিলিট করে দেব।

সাহিত্যে নোবেলজয়ী অ্যান কারসন-এর শব্দের ব্যুৎপত্তির ধারণা : অসিত দাস

Reporter
অসিত দাস / ৭৪ Views জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬

২০২৬ সালের সাহিত্য নোবেলজয়ী কানাডিয়ান কবি, অনুবাদক ও ধ্রুপদী সাহিত্যের পণ্ডিত অ্যান কার্সন (Anne Carson) আধুনিক বিশ্বসাহিত্যে এক অনন্য নাম। তাঁর সাহিত্যিক সৃষ্টিশীলতা ঐতিহ্যবাহী কবিতার সীমারেখা অতিক্রম করে এক নতুন ধারার জন্ম দিয়েছে। কার্সনের লেখার অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি হলো শব্দের ব্যুৎপত্তি বা ‘এটিমোলজি’ (Etymology)। ভাষা ও ব্যাকরণের সুনির্দিষ্ট উৎসসন্ধান কেবল তাঁর শাস্ত্রীয় গবেষণার অংশ নয়; এটি তাঁর সৃজনশীলতার মূল চালিকাশক্তি। তিনি স্বয়ং স্বীকার করেছেন যে, তাঁর বহু সাহিত্যকর্মের যাত্রা শুরু হয় কোনো নির্দিষ্ট শব্দের ব্যুৎপত্তি অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে।

১. ব্যুৎপত্তিগত ভাবনার প্রেক্ষাপট ও ক্লাসিক্যাল ফিলোলজি

অ্যান কার্সন পেশায় ছিলেন ধ্রুপদী গ্রিক ও লাতিন ভাষার অধ্যাপক। তাঁর এই প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা তাঁর কাব্যভাবনায় এক গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক মাত্রা এনে দিয়েছে। গ্রিক ও লাতিন শব্দের উৎস বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি মূল ভাষার ইতিহাস ও দর্শনের সাথে আধুনিক চেতনাকে যুক্ত করেছেন। প্রাচীন গ্রিক ভাষার গঠন সম্পর্কে কার্সনের বিখ্যাত মন্তব্য হলো — এটি যেন “ভাষার প্রভাতবেলা” (morning of language)।

কার্সন শব্দকে কেবল ভাব প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে দেখেন না; বরং প্রতিটি শব্দকে দেখেন এক একটি ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে। একটি শব্দ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কীভাবে রূপান্তরিত হয়েছে, তার আদি অর্থ কী ছিল এবং সময়ের সাথে সাথে তা কীভাবে নতুন ভাব প্রকাশ করছে — এসব অনুসন্ধানই তাঁর লিখনশৈলীকে এক আলাদা উচ্চতা প্রদান করে।

২. শূন্যতা, বিরহ ও ইচ্ছার ব্যুৎপত্তিগত বিশ্লেষণ : Eros the Bittersweet

অ্যান কার্সনের প্রথম বিখ্যাত গ্রন্থ Eros the Bittersweet (১৯৮৬)-এ ব্যুৎপত্তিগত পদ্ধতির নিখুঁত প্রয়োগ দেখা যায়। কবি স্যাফো (Sappho) প্রেম ও কামনার অনুভূতি বোঝাতে একটি গ্রিক শব্দ ব্যবহার করেছিলেন — glukupikron (মিষ্টি-তিক্ত)। কার্সন এই একটিমাত্র শব্দের ব্যুৎপত্তি ও ব্যাকরণগত গঠনকে উন্মোচন করে কামনার এক সম্পূর্ণ নতুন দর্শন দাঁড় করিয়েছেন।

“Desire moves. Eros is a verb.” — অ্যান কার্সন

কার্সন দেখিয়েছেন যে, glukupikron শব্দটি কেবল দুটি বিপরীত অনুভূতির সমাহার নয়, বরং এটি প্রেমিক, প্রেমাস্পদ এবং তাদের মধ্যবর্তী ‘দূরত্ব’ বা ফাঁকা স্থানকে চিহ্নিত করে। শব্দটির ব্যুৎপত্তি ব্যাখ্যা করার মাধ্যমে কার্সন আমাদের বোঝান, প্রেম বা আকাঙ্ক্ষা বেঁচে থাকে সেই অমীমাংসিত ফাঁকা স্থানেই। ব্যুৎপত্তিভিত্তিক এই বিশ্লেষণ কার্সনের গদ্য ও কবিতাকে প্রথাগত ভাবালুতা থেকে মুক্ত করে এক নিবিড় দার্শনিক রূপ দেয়।

৩. শোক প্রকাশে অভিধান ও ব্যুৎপত্তির ব্যবহার : Nox

কার্সনের শৈল্পিক ও ব্যক্তিগত জীবনের অন্যতম সেরা সৃষ্টি তাঁর সংকলন Nox (২০১০)। ভাই মাইকেলের অকালপ্রয়াণে শোকাতুর কার্সন প্রাচীন রোমান কবি কাতুলুসের (Catullus) ১০১ নম্বর শোককবিতাকে ভিত্তি করে বইটি রচনা করেন।

বইটিতে কার্সন কাতুলুসের লাতিন কবিতার প্রতিটি শব্দের জন্য স্বতন্ত্র ডিকশনারি বা অভিধানগত ব্যুৎপত্তি প্রদান করেছেন।

যেমন — ‘Autopsy’ শব্দটির আধুনিক অর্থ ময়নাতদন্ত হলেও, কার্সন এর গ্রিক মূল — autopsia (যার অর্থ “নিজের চোখে দেখা”) উন্মোচিত করেছেন।

তিনি দেখিয়েছেন, ভাইয়ের মৃত্যুকে বোঝার চেষ্টা করাও এক ধরনের ‘অটোপসি’ বা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করা।

এখানে শব্দের ইতিহাস ও উৎস অনুসন্ধান কেবল ভাষার কৌতূহল মেটায় না, বরং প্রিয়জনকে হারানোর শোক ও শূন্যতা ব্যক্ত করার এক শক্তিশালী শৈল্পিক উপায়ে পরিণত হয়।

৪. প্রাচীন রূপক ও আধুনিকতার মেলবন্ধন : Autobiography of Red

অ্যান কার্সনের কাব্য-উপন্যাস Autobiography of Red (১৯৯৮)-এ গ্রিক পুরাণের ডানাযুক্ত দানব জেরিওন (Geryon)-এর চরিত্রটিকে আধুনিক প্রেক্ষাপটে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। কার্সন এখানে প্রাচীন গ্রিক কবি স্তেসিখোরসের (Stesichoros) টিকে থাকা কবিতার ভগ্নাংশ ও শব্দাবলির ব্যুৎপত্তি বিশ্লেষণ করে লাল রঙ, রক্ত ও যন্ত্রণার নানা মাত্রা তুলে ধরেছেন।

পুরাণ ও ভাষার জট ছাড়াতে কার্সন দেখান যে, কীভাবে শব্দের আদি অর্থ ও আধুনিক প্রয়োগের মধ্যে দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক রয়েছে। শব্দকে তার প্রাচীন ব্যুৎপত্তিতে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে তিনি আধুনিক যুগের বিচ্ছিন্নতা, সমকামিতা ও মানসিক আঘাতের মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলোকে গভীরভাবে প্রকাশ করেছেন।

৫. প্রথাগত সাহিত্যধারায় ব্যুৎপত্তির বৈপ্লবিক ভূমিকাসাধারণত সাহিত্যে ব্যাকরণ বা ব্যুৎপত্তিকে শুষ্ক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিষয় বলে মনে করা হয়। কিন্তু কার্সনের হাত ধরে এটি পরিণত হয়েছে অনুভূতির অন্যতম গভীরতম বাহনে। তিনি প্রমাণ করেছেন, একটি শব্দের আভিধানিক বা ঐতিহাসিক শিকড় জানলে তার কাব্যিক ক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যায়। শব্দের পেছনের গল্পটি জানলে পাঠকের চেতনা কেবল কবিতার ভাববস্তুতেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং ভাষার নিজস্ব সৌন্দর্যের সাথেও পরিচিত হয়।

কার্সনের মতে, শব্দ কোনো স্থির বা মৃত বস্তু নয়; শব্দ হলো একটি জীবন্ত সত্তা, যার রয়েছে অতীত, স্মৃতি এবং একাধিক অর্থের স্তর। ব্যুৎপত্তি অনুসন্ধানের মাধ্যমে তিনি শব্দের সেই লুকিয়ে থাকা অতীতকে জাগিয়ে তোলেন।

অ্যান কার্সন নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো তাঁর সাহিত্যিক মৌলিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানের অপূর্ব সমন্বয়। তিনি ক্লাসিক্যাল ফিলোলজি বা ভাষাভাষ্যকে কেবল গবেষণাগারে আটকে না রেখে তাকে আধুনিক কাব্যের রক্তমাংসের অঙ্গ বানিয়ে তুলেছেন। শব্দের ব্যুৎপত্তি বা ‘এটিমোলজি’ কেবল তাঁর লিখনশৈলীর একটি উপাদান নয়, বরং এটিই তাঁর কাব্যদর্শনের হৃদয়স্পন্দন। শব্দের ইতিহাস ও আভিধানিক গভীরে প্রবেশ করে তিনি যেভাবে জীবনের প্রেম, শোক, বিরহ ও অস্তিত্বকে ব্যাখ্যা করেছেন, তা বিশ্বসাহিত্যে নিঃসন্দেহে বিরল ও অতুলনীয়।

অ্যান কারসনের এই ধারা অনুসরণ করেই একসময় আমি লিখেছিলাম আমার বই ‘শব্দকল্পদ্রুম’। সেখানে কোনও শব্দের প্রচলিত ব্যুৎপত্তির বাইরেও যে অন্য ব্যুৎপত্তি হতে পারে, তা দেখিয়েছি।’ উজবুক’ ও ‘ছিনাল’ শব্দদুটি কীভাবে বিশ্লেষণ করেছিলাম, তার উল্লেখ করা অসমীচীন হবে না এখানে।

১. উজবুক — দাবার বিশ্বমঞ্চে নতুন ইতিহাস তৈরি করেছেন উজবেকিস্তানের বিস্ময় প্রতিভা জাভোখির সিন্দারভ (Javokhir Sindarov)। মাত্র ১৯ বছর বয়সে জিতেছেন ফিডে ওয়ার্ল্ড কাপ (FIDE World Cup 2025); এ যাবৎকালের সর্বকনিষ্ঠ চ্যাম্পিয়ন! গোয়ার মঞ্চে চীনের ওয়ে ই-কে (Wei Yi) টানটান টাইব্রেকারে হারিয়ে সিন্দারভ শুধু শিরোপাই জিতলেন না, আধুনিক দাবায় নবপ্রজন্মের পদধ্বনিকে আরও জোরালো করলেন। তিনিই দাবার ক্ল্যাশ ও টাইটানস বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপে ভারতের ডোম্মারাজু গুকেশের চ্যালেঞ্জার।

শুধু দাবাতেই নয় ফুটবল, কুস্তি, বক্সিং, ভারোত্তলনেও যথেষ্ট পারদর্শী উজবেকরা। উজবেকদের গড় আই কিউ কিন্তু ভারতীয়দের থেকে বেশি।

‘উজবুক’ শব্দটি শুনলে অনেকেই পূর্বের তাতার দেশ বা ভেঙে যাওয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি দেশ উজবেকিস্তানের (বর্তমানে স্বাধীন রাষ্ট্র) অধিবাসীদের কথা ভেবে নেবেন। সেটাই তো স্বাভাবিক। আমাদের প্রণম্য অভিধানপ্রণেতাগণ তো সকলেই একবাক্যে উজবেকিস্তান থেকে আসা আকাট মূর্খ সৈন্যদের থেকেই এই ‘উজবুক’ কথাটির সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছেন। আভিধানিক মত হল, ইসলামি শাসনের সময় বঙ্গে নাকি উজবেকিস্তান থেকে ভাড়াটে সৈন্য আমদানি করা হত। দৈহিক মাপকাটিতে বেশ বড়সড় হলে কী হয়, বুদ্ধিতে তারা ছিল খাটো। তাই বোকা, আহাম্মক বলে তাদের দেগে দেওয়া হয়েছিল। সেই থেকেই উজবুক মানে মাথামোটা, আহাম্মক, বোকা বোঝায়।

অথচ ২০২০-র অলিম্পিকে আমরা উজবেকিস্তানের প্রতিদ্বন্দ্বীর হাতেই ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারতে দেখলাম কুস্তিতে। দাবা অলিম্পিয়াডেও ওদের কাছে হারতে হয়। ফুটবলে তাদের কাছে পাঁচ গোল খাওয়ার নজিরও আছে। তাদের মগজ যে নেহাত ফেলনা নয়, তা বেশ বোঝা যায় বিভিন্ন মুহূর্তে মস্তিষ্কের প্রয়োগ দেখে। গড় আই কিউ বা বুদ্ধ্যঙ্কের খতিয়ান দেখে তো চক্ষু চড়কগাছ! উজবেকরা এগিয়ে আছে ভারতীয়দের থেকে। অ্যাভারেজ ভারতীয়র আই কিউ যখন ৮১, তখন উজবেকদের ৮৬! তাহলে বোকা কারা? বাঙালি তো নিজেই ‘উজবুক’ বনে গেল।

ব্যুৎপত্তি ও অর্থের ব্যাপারে আসা এবার। জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের ‘বাঙ্গালা ভাষার অভিধান’-এ উজবুক, উজবক এন্ট্রিতে লেখা হয়েছে, [তুর্কী=উজবক্=তাতারদিগের একজাতি। উচ্চারণবিকারে উজবেগ্। বি, তাতারীয় জাতিবিশেষ। ২. উজবকজাতীয় সৈন্য।

উদ্ধৃতি দিয়েছেন, ‘যবন কিরাত শক আগুদলে উজবক, খোরাসানি মোগল পাঠান (কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তী)। ৩. বিশেষণ, তাদের মত অশিক্ষিত এবং আড়বুজো; নির্বোধ; আহাম্মক।

সুভাষ ভট্টাচার্য সম্পাদিত সংসদ বাংলা অভিধানে পাচ্ছি, উজবুক, (অপ্র) উজবক বিণ. মূর্খ; আহাম্মক; [উজবুকের মত আবরণ (মুদ্রণপ্রমাদ, আচরণ হবে)]। তুর উজবেগ।

সংসদ অভিধানে কীভাবে যে সংস্করণের পর সংস্করণে আবরণ থেকে যাচ্ছে আচরণের জায়গায়, তা প্রকাশক বলতে পারবেন।

অশোক মুখোপাধ্যায় প্রণীত ‘সমার্থ শব্দকোষ’-এ উজবুক এর প্রতিশব্দগুলি হল, ‘অজবুক, বোকা, নির্বোধ, অবুদ্ধি, অবুদ্ধিমান, অবিচক্ষণ, নির্বুদ্ধি, বুদ্ধিহীন, মতিহীন, আহাম্মক, অচতুর, অকাট, আকাট, অগা, গবেট, নিরেট, বোকারাম, বোকাকান্ত, অগারাম, অগাচণ্ডী, অগামারা, হাঁদারাম, হাঁদাগঙ্গারাম, মাথামোটা, মোটামাথা, স্থূলবুদ্ধি, ভোঁতাবুদ্ধি, ডাব, ভেড়ুয়া, ভোঁদা, ভোম, ভোমা, ভেকুয়া, গাবর, গালোড়িত, নাবড়, নাদান, ল্যালা; অলবড্ডে।’

তাহলে বোঝা যাচ্ছে, কারোর বুদ্ধিহীনতা মানুষকে কতখানি বিরক্ত করে, গাদা গাদা চোখা চোখা শব্দ সেই হাঁদামক্কাল তথা বোকার দিকে ধাবিত হয়!

সুশীল কুমার দের ‘বাংলা প্রবাদ’ বইয়ে উজবুক দিয়ে কোনও প্রবাদ নেই। শব্দটি যে বাংলা বাগধারায় ধর্তব্যের মধ্যেই আসেনি, এটা ভেবেই অবাক হতে হয়। তাহলে কি ‘উজবুক’-এর শিকড় প্রবাদের ততটা গভীরে বিস্তৃত নয়?

রাজশেখর বসুর চলন্তিকায় পাচ্ছি উজবুক। যথারীতি বলা হয়েছে তুর্কী উজবেক থেকে আসছে, উজবেক বোঝাতে তাতারজাতির উল্লেখ করা হয়েছে।

জামিল চৌধুরী সম্পাদিত বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান জানাচ্ছে, শব্দটির ব্যুৎপত্তি তুর্কী ‘উজবেক’ থেকে।

বস্তুত কোনও প্রামাণ্য অভিধানেই উজবুক শব্দটি তুর্কী ‘উজবেক’ থেকে আগত বলা ছাড়া আর কোনও ব্যুৎপত্তি দেওয়া হয়নি।

হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’-এ পাই উজবুক এবং অজবুক, এই দুটি এন্ট্রি। উজবুক বিষয়ে লেখা হয়েছে, [তুর্কী উজবক্; English uzbeg, usbeg (Century Dictionary); uzbeg — a member of the Turkish family of Tartars in Turkistan &–Davidson] ১. তাতারের জাতিবিশেষ, তজ্জাতীয় সৈন্য, ‘যবন কিরাত শক, আগুদলে উজবক” (কবিকঙ্কণ) ২. (সাদৃশ্যে) অসভ্য, মূর্খ, আনাড়ী, উজবুক।

‘অজবুক’ বিষয়ে লেখা হয়েছে, বিং [তুর্কী উজবক্] মূর্খ, আনাড়ী, বেকুফ। “ওরা যে আমাদের অসভ্য অজবুক মনে করে যাবে” (ঘরে বাইরে-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)। “তোর সোয়ামী নাকি অজবুক হয়েছেন, তাই এমন কাজ ছেড়ে দিচ্ছেন” (সাবাস আটাশ — অমৃত গ্রন্থাবলী)।

সুবলচন্দ্র মিত্র তাঁর ‘সরল বাঙ্গালা অভিধান’-এ কিন্তু গতানুগতিক রাস্তায় হাঁটেননি। ‘উজবুক’ শব্দটির ব্যুৎপত্তিতে তিনি উজবেকিস্তানের তত্ত্ব দেননি। শব্দটিকে ‘বাংলা প্রচলিত’ বলে উল্লেখ করেছেন।

অজবুক শব্দটি অশোক মুখোপাধ্যায়ের সমার্থ শব্দকোষ ও হরিচরণ মুখোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’-এ উল্লিখিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘ঘরেবাইরে’ উপন্যাসে অজবুক শব্দটিই ব্যবহার করেছেন, উজবুক নয়।

উজবুক শব্দটি কি আদতে ছিল অজবুক? এই অজবুক নিয়ে ভাবতে ভাবতে ‘অজমূর্খ’ শব্দটি মনে স্ট্রাইক করল। তাহলে অজমূর্খ কি কোনও সময় ‘অজবোকা’ হয়ে গিয়েছিল? মানে নিরেট বোকা, আসল বোকা! অজ শব্দটি তো আদ্য থেকে জাত। বঙ্গীয় শব্দকোষে পাই, সং আদ্য > প্রা. অজ্জ > বা অজ। মানে আদি, আদৎ, খাঁটি, আসল। প্রয়োগ দৃষ্টান্ত,

অজ পাড়া-গাঁ, অজ চাষা, অজ বঞ্জর(পতিত জমি), অজ মূর্খ ইত্যাদি।

অজবোকা > অজবুকা > অজবুক > উজবুক?

এইভাবেই এসেছিল উজবুক?

এবং তাকেই আমরা উচ্চারণ সাদৃশ্যের জন্যে ‘উজবেক’ থেকে আগত বলে ভেবেছি এতদিন? হতেই পারে। অভিধানকাররা যা-ই বলুন না কেন এতদিন।

অজবোকা শব্দটি অভিধানে পাইনি। কিন্তু সাহিত্যে প্রয়োগ আছে। আমি অন্তত দু’জায়গায় পেয়েছি ‘অজবোকা’ শব্দটি।

১৩৪৪ সালে প্রবাসী পত্রিকায় বিভূতিভূষণ গুপ্ত রচিত ‘অভাবনীয়’ নামক ছোটগল্পে ‘অজবোকা’ শব্দটি পাওয়া গেছে। চলিত ভাষায় লিখিত এই সাবলীল গল্পটি থেকে একটু উদ্ধৃতি দেওয়া অপ্রাসঙ্গিক হবে না।

“লক্ষ্মী একটু উষ্ণ হয়ে উঠল, ‘ওকে নিয়ে কোথাও যেতে আমাদের লজ্জা করে। না-আছে কথার ছিরি, না-আছে চলবার ছিরি, একেবারে অজবোকা। মিথ্যে ওকে নিয়ে ঝঞ্ঝাট বাড়াবেন না’।

তাহলে, বাংলাভাষায় ‘অজবোকা’ শব্দটি একসময় চালু শব্দ ছিল। অজমূর্খ শব্দটি ব্যবহৃত হয় বিভিন্ন লেখকের লেখায়, ‘অজবোকা’ কিন্তু আর ব্যবহার হতে দেখি না। সে জায়গাটি দখল করেছে উজবুক শব্দটি।

শুধু বিভূতিভূষণ গুপ্তের ছোটগল্পেই নয়, অজবোকা শব্দটি পাই ১২৮৬ সালে রচিত দুর্গাচরণ রায়ের ‘পাশকরা ছেলে’ নাটকে। সেখানে দেখি একটি চরিত্রের মুখে সংলাপ, ‘… দেশের সব লোকগুলাই বোকা, অজবোকা।…’

তাহলে সত্তর-আশি বছর আগেও অজবোকা বাংলায় চালু শব্দ ছিল। তারপর কোনও একসময় অজবোকা অজবুক হয়ে উজবুক-এ পরিণত হল। আমরাও উজবুকের মত শব্দটিকে উজবেকিস্তানের অধিবাসী উজবেক-এর সঙ্গে গুলিয়ে ফেললাম। সুবলচন্দ্র মিত্র ছাড়া কোনও অভিধানপ্রণেতাই অন্য কিছু বলার সাহস পাননি। যদিও তিনিও মিসিং লিঙ্কটা ধরতে পারেননি।

বাঙালি অভিধানপ্রণেতাদের নাকানিচোবানি খাইয়ে ছেড়েছে ‘উজবুক’ শব্দটি। তবে ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করলে ‘অজবোকা’ শব্দটি ধরতে পারতেন তাঁরা, কেননা অজমূর্খ শব্দটি হাতের কাছেই ছিল। কিন্তু গালভরা উজবেক-তত্ত্বকে তাঁরা উপেক্ষা করতে পারেননি। তাই সকলেই একসুরে আজগুবি উজবেক-এর জয়গান গেয়েছেন।

দাবাড়ু সিন্দারভ যেন সিন্ধাবাদ নাবিকের মতো নতুন দেশ আবিষ্কারের দিশারী। উজবেকরা যে হদ্দ বোকা নয়, তা সিন্দারভের দাবায় বিশ্বজয় থেকেই প্রমাণিত হচ্ছে। কেউ আর উজবেকিস্তানের লোককে বোকার বেহদ্দ বলে দুয়ো দিতে পারবে না।

২. ছিনাল — অর্থ সকলেরই জানা, ব্যভিচারিণী। বঙ্গীয় শব্দকোষ ব্যুৎপত্তি দিয়েছে, [সং ছিন্না; ‘ছিণ্ন, ছিণ্ণাল’–জার, ‘ছিণ্ণা, ছিণ্ণালী’–জারস্ত্রী (দেশী); ছিণ্ণাল (অভিধান-রাজেন্দ্র, জৈন প্রাকৃতকোষ); হি ছিনাল; ঠ ছিনাল (পুরুষ, স্ত্রী); গু ছিনাল]।

প্রয়োগদৃষ্টান্ত, ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর লিখেছেন, ‘ডাকাত ছিনার (ছিনাল) চোর’। দ্বিজ বংশীদাস লিখেছেন, ‘চুরি ছিনালির দায়, দুই কান চিরা’।

জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের অভিধানে ব্যুৎপত্তি আছে, [সং ছিন্না, প্রাকৃত-ছিন্নাল; ছিনাল (বেশ্যা)। “ছিন্নালিয়া পুত্তো (মৃচ্ছকটিক)। হিন্দি ছিনার]।

বি, বেশ্যা, ব্যভিচারিণী স্ত্রী, কুলটা, ভ্রষ্টা।

প্রয়োগদৃষ্টান্ত, ‘ডাকাত ছিনার চোর হাজার হাজার’।

বিশ্বকোষও জানাচ্ছে, ব্যুৎপত্তি সংস্কৃত ‘ছিন্না’ থেকে।

সংসদ বাংলা অভিধান ব্যুৎপত্তি দিচ্ছে, [প্রাকৃত-ছিন্নাল]। অর্থ, ভ্রষ্টা নারী, কুলটা, ব্যভিচারিণী স্ত্রীলোক।

গোলাম রসুল সম্পাদিত (সহসম্পাদক স্বরোচিষ সরকার) বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধানে ছিনাল শব্দটির ব্যুৎপত্তিতে সংস্কৃত ছিন্না শব্দের কথাই বলা হয়েছে। ১৯৭৩ সালে লেখা আল মাহমুদের কবিতা থেকে উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে, — ‘সে কানেট পরে আছে হয়তো বা চোরের ছিনাল’।

বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ কর্তৃক প্রকাশিত পত্রিকার পুরনো একটি সংখ্যায় দেখা যাচ্ছে, ছিনাল শব্দটিকে সেখানে দেশি বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

যে প্রশ্নটি মনে জাগছে, বারবার চোরডাকাতের সঙ্গেই ছিনাল তথা ছিনার শব্দটিকে একাসনে বসানো হচ্ছে কেন? তথাকথিত কুলটা, বেশ্যাদের সঙ্গে চোরডাকাতের এই সহাবস্থান অবাক করে। তাহলে কি কুলটা, গণিকাদের থেকে ছিনার বা ছিনাল একটু আলাদা?

সুশীল কুমার দের ‘বাংলা প্রবাদ’ বইয়ে ছিনাল নিয়ে অনেকগুলি প্রবাদ আছে।

১. চোর, ছিনাল, চোপায় দড়, আগে যায় শীতলার মাড়।

২. চোরের না, ছিনালের মা।

৩. চোরের মন ভাঙা বেড়ায়, ছিনালের মন আড়ায়-পাড়ায়।

এখানেও দেখা যাচ্ছে চোরের সঙ্গে ছিনালের সহাবস্থান। চোর, ডাকাত, ছিনতাইকারীর কমন ফ্যাক্টর ছিনিয়ে নেওয়া। ছিনাল তথা ছিনারও কি কিছু ছিনিয়ে নেয়! বেশি ভাবতে হবে না। ঘরের বউয়ের হাত থেকে পতিদেবতাকে ছিনিয়ে নিতে ওস্তাদ ছিনার-নারীরা বাবুকালচারের যুগে বহুআলোচিত, বহুচর্চিত বিষয়।

অমন যে দোর্দণ্ডপ্রতাপ জমিদার তথা জাহাজ-কয়লার ব্যবসায়ী প্রিন্স দ্বারকানাথ, তাঁর হাতেই তো ছিল শহর কলকাতার ছেচল্লিশটি ব্রথেলের মালিকানা। পতিদেবতাদের দিনরাতের মোচ্ছবের নিভৃতনিকেতন। বাড়ির যুবক-প্রৌঢ়দের নিয়েই তো স্বৈরিণীদের স্বর্গরাজ্য রচিত হয়েছিল সেখানে। ছিনিয়ে না নিলে চলবে কী করে তাদের? ছিনিয়ে নেওয়াই তো দস্তুর তাদের কাছে!

কাদম্বরী দেবীর সুযোগ্য স্বামী জ্যোতিরিন্দ্রনাথের পাঞ্জাবির পকেট থেকে কোন বারাঙ্গনার চিঠিচিরকুট পাওয়া গিয়েছিল যেন?

রাজা রামমোহন রায়ের বাড়ির নৃত্যগীতে কারা যেন নাচাগানা করত? দেশিবিদেশি কোন বাইজিরা? হৃদয় ছিনিয়ে, অর্থ ছিনিয়ে কারা নিজেদের বিত্তশালী করে তুলত?

ছিনিয়ে নেওয়াই যেন ছিনার তথা ছিনালের অভ্যাস তথা পেশা। এই ছিনানো ক্রিয়াপদটির মূলেও বঙ্গীয় শব্দকোষ ‘ছিন্ন’-কে টেনে এনেছে। জ্ঞানেন্দ্রমোহনও তাই। সংসদ বাংলা অভিধান একটু ভিন্ন পথে হেঁটেছেন, ছিনানো-র ব্যুৎপত্তি দেওয়া হয়েছে, [বাং √ছিনা–তু হি. ছীন]।

তাহলে সংসদ অভিধান ছিনানো-কে দেশি (দ্রাবিড়-অস্ট্রিক গোত্রের) শব্দই ভেবেছেন।

আমার মতে এই ছিনানো ক্রিয়াপদটিই ছিনাল শব্দের মূলে আছে। চোর ডাকাত যেমন গৃহস্থের বা পথিকের কাছ থেকে সবকিছু ছিনিয়ে নেয়, ছিনার তথা ছিনালও অন্য নারীর প্রাণাধিক ধনকে ছিনিয়ে নেয়। এই ছিনিয়ে নেওয়া বা পরস্বাপহরণ অতিশয় নিন্দনীয় ব্যাপার। তাই সমাজরক্ষকরা চোরেদের যে চোখে দেখেন, ছিনালদেরও সেই চোখেই দেখেন, হেয়জ্ঞান করেন।

মনোজ বসুর নিশিকুটুম্ব উপন্যাসে চোর-বাবাজীবন রাতে গৃহস্থের বাড়িতে এন্ট্রি নিয়ে ঘরণীর সঙ্গে সোয়ামীর ভূমিকায় অভিনয় করে তার সব কিছু হাতিয়ে নিয়েছিল। এই ধরনের চোরের দেখা পাওয়া আজকাল অতীব দুষ্কর। কালেভদ্রে এজাতীয় পুণ্যবান চোরের দেখা মেলে।

সংসার সীমান্তে সিনেমায় (মূল কাহিনী — প্রেমেন্দ্র মিত্র) সিঁদেল চোর অঘোরের কীর্তিকাহিনীর কথাও আমরা জানি। তার প্রেমিকাও ছিল তথাকথিত ছিনাল। তারা দুজন শেষমেশ ঘর বাঁধতে পেরেছিল কিনা জানা যায়নি। তবে সমাজ তাদের সেই পরিসরটুকু দেয়নি বলেই মনে হয়।

অনেক লেখকের লেখাতেই ছিনাল শব্দটি জ্বলজ্বল করছে। তবে কে কোথায় লিখে গেছেন, এই মুহূর্তে সব মনে পড়ছে না। রবীন্দ্রনাথ না লিখলেও তাঁর পূর্ববর্তী সাহিত্যকরা ছিনাল লিখেছেন। দীনবন্ধু মিত্র নবীন তপস্বিনীতে লিখেছেন, ‘আমি আর ছেনালের কথা ভুলিনে’।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রো’ প্রহসনে লিখেছেন, ‘ছুঁড়ীর কি চমৎকার রূপ গা, আর একটু ছেনালীও আছে।’

রবীন্দ্রোত্তর পর্বে শরৎচন্দ্র, তারাশঙ্কর, মানিক লিখতে পারেন। জীবনানন্দ দাশও। কবিতায় নয়, উপন্যাসে, গল্পে। নবারুণ ভট্টাচার্য লিখেছেন হয়তো। মনে পড়ছে না।

সমরেশ বসু তাঁর ‘অভয়ের বিয়ে’ উপন্যাসে সদ্যবিবাহিতা বধূ নিমি-র মুখে বসিয়েছেন ছিনাল শব্দটি।

‘… পশুশক্তি নিষ্পিষ্ট করতে চাইছে এই শরীর।

নিমির ভয়, তবু বিদ্রূপ হেসেই বলল, একে থেটারি ঢং বলে না তো আর কী বলে?

অভয় বলল, তাই বুঝি, তবে বলো, শুনি আর কী বলবে?

নিমিও যেন শক্ত হতে চাইল। আবার কি? ওই ছিনাল খুড়ির বাড়িতে —

কী?

— হ্যাঁ, ওখেনে আর ভাসুর-পো-গিরি করতে যাওয়া চলবে না।’

যাহোক, ধান ভানতে শিবের গীত গেয়ে লাভ নেই, ছিনাল শব্দটির ব্যুৎপত্তিতেই ফিরে আসা যাক।

ছিন্ন (ছিন্না) থেকে হোক বা প্রাকৃত ছিন্নাল থেকেই হোক, এটাই পাঠকের মাথায় গাঁট্টা মেরে অভিধানগুলিতে বোঝানো হয়েছে যে, সমাজ-সংসার থেকে ছিন্ন বা পতিত হয়েই এদের নীচ পেশায় গমন। তাই এরা ছিনাল, পতিতা, কুলটা। কিন্তু অপরের পুরুষধন ছিনিয়ে নেওয়ার জন্যেও যে ছিনকার, ছিনার বা ছিনাল শব্দের উৎপত্তি হতে পারে, তা কেউ ভেবে দেখেননি।

আসলে, ছিনকার (ছিনতাইকারী) > ছিনআর (প্রাকৃত) > ছিনার > ছিনাল (অপভ্রংশ)

ছিনাল পেশাগতভাবে কুলটা, গণিকা, বেশ্যা, বারবণিতার সঙ্গে একগোত্রে থেকেও একটু আলাদা। স্বভাবে পরকীয়াবৃত্তি বেশি থাকা রমণীদের ক্ষেত্রে এই বিশেষ শব্দটি ব্যবহৃত হয়।

অ্যান কারসন মনে পড়িয়ে দেন সম্প্রতি-প্রয়াত সাহিত্যিক কেতকী কুশারী ডাইসনের একটি বাক্য। তিনি একদশক আগে এবিপি আনন্দের সেরার সেরা বাঙালি হওয়ার পরে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘এ বঙ্গের সাহিত্যে সমস্ত কিছুরই চর্চা হয়, কেবলমাত্র জ্ঞানের চর্চা হয় না’।

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

পেজফোরনিউজ-এর নববর্ষ বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Currently Maintained by the2.dev