
৭১. গঙস য়ুলে গোয়েন্দা — অভিযাত্রী শরচ্চন্দ্র দাশ
গঙস য়ুল? সে আবার কি? কোন ভাষার শব্দ? তিব্বতি ভাষার শব্দ। ‘গঙস’-এর অর্থ তুষার, আর ‘য়ুল’এর অর্থ দেশ। এই তুষার দেশ হল তিব্বত। ভারতের প্রাচীন সাহিত্যে যে দেশকে ‘ভোটদেশ’ বলা হয়েছে। লাসা যার রাজধানী, সেই তিব্বত ছিল এক নিষিদ্ধ দেশ। দীর্ঘ আট মাস বরফে ঢাকা এই দেশের প্রাকৃতিক অবস্থান একে দুর্গম করে তুলেছিল। বাইরের জগত থেকে যেন বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল দেশটিকে। এখানকার বৌদ্ধ পুরোহিত, যাঁদের বলা হয় লামা, তাঁরা চাইতেন না বাইরের ধর্ম আর সংস্কৃতির স্রোত প্রবাহিত হোক তিব্বতে। নিজেদের সংস্কৃতি ও ধর্মীয় অনুশানকে তাঁরা কঠোরভাবে রক্ষা করতেন। রাজনৈতিক কারণও একটা আছে। উনিশ শতকে সেখানকার সরকার বিদেশি প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলেন।
এই গঙস য়ুলে, এই নিষিদ্ধ দেশে ঢুকতে পেরেছিলেন এক বাঙালি। নাম যাঁর শরচ্চন্দ্র দাশ (১৮৪৯-১৯১৭)। বোধ হয় আধুনিককালের তিনিই প্রথম বাঙালি, যিনি সফল হয়েছিলেন দুর্গম অভিযানে। তাই শরচ্চন্দ্রের অভিযানের আলোচনা করতে গিয়ে বাঙালি সম্বন্ধে একটা চিরাচরিত অপবাদ খণ্ডন করতেই হয় আমাদের। বাঙালি যে কেবল তৈলমাখা স্নিগ্ধতনু নিদ্রারসে ভরা নয় শরচ্চন্দ্রের মতো মানুষেরাই তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ।
চট্টগ্রামের আলমপুরে এক বৈদ্য পরিবারে জন্ম তাঁর। পিতা দীনদয়াল ওরফে মাগনদাস। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে শিক্ষালাভ। তিনি প্রথাগত জীবনে আবদ্ধ না হয়ে চলে যান দার্জিলিং। সেখানকার ভুটিয়া বোডিং স্কুলে প্রধান শিক্ষকের আসন লাভ করেন। সেই সুযোগে শিখে নেন তিব্বতি ভাষা। উগ্যেন গ্যাৎসোর কাছে। পরবর্তী জীবনে যা খুব কাজে লেগেছিল। এই স্কুল তাঁর পরবর্তী জীবনের গতিপথ বদলে দেয়।
ভারতের ব্রিটিশ সরকার তখন তিব্বতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরির কাজে ব্যস্ত ছিলেন। পথ খুঁজছিলেন তাঁরা। এমন একজন মানুষকে অভিযাত্রী হিসেবে পাঠাতে হবে, যিনি তাদের ভাযায় কথা বলতে পারেন, সেখানকার সংস্কৃতি ও ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান আছে যাঁর, যে মানুষকে দেখে সেখানকার মানুষ সন্দেহ করবে না গুপ্তচর বলে।
হ্যাঁ, শরচ্চন্দ্রই সেই মানুষ। জ্ঞানী, বিনয়ী, নম্র ও স্নিগ্ধ ও সহিষ্ণু।
বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশে, ‘রতন প্রধান’ নাম নিয়ে শরচ্চন্দ্র চললেন নিষিদ্ধ দেশ তিব্বতে। দুর্গম পথ। তীব্র শীত। তার উপর তিব্বতি প্রহরীদের নজর। এই সব বাধা অতিক্রম করে প্রথম বার তিনি তিব্বতে গেলেন ১৮৭৯ সালে। তার দু’বছর পরে আবার একবার।
গোয়েন্দাগিরি করতে গিয়েছিলেন তিনি, কিন্তু সাধারণ গোয়েন্দার সঙ্গে পার্থক্য ছিল। দীপঙ্কর পাড়ুই সে গোয়েন্দাগিরির চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন :
‘শরচ্চন্দ্রের গোয়েন্দাগিরি ছিল অত্যন্ত শৈল্পিক। তিনি জপমালার প্রতিটি দানা ব্যবহার করতেন পথ মাপার জন্য। সাধারণ জপমালায় ১০৮টি দানা থাকলেও তাঁর মালায় ছিল ১০০টি দানা। প্রতি ১০০ কদম হাঁটার পর তিনি একটি করে দানা সরাতেন। তাঁর প্রার্থনাচক্র বা জপযন্ত্রের ভেতরে পবিত্র মন্ত্রের বদলে লুকানো থাকত কম্পাস এবং জরিপের মানচিত্র। এমন কি তাঁর লাঠির খোপে লুকানো থাকত থার্মোমিটার যা দিয়ে তিনি বিভিন্ন মঠ ও গিরিপথের উচ্চতা মাপতেন।’
তিব্বতি ভাষা এবং বৌদ্ধধর্ম সম্বন্ধে তাঁর গভীর জ্ঞানে মুগ্ধ হন তিব্বতের লামারা। শরচ্চন্দ্রকে তাঁরা পণ্ডিতমশাইএর সম্মান দেন। তিনি সংগ্রহ করেন প্রাচীন পুঁথিপত্র, হিমালয় ও তিব্বতের অজানা নানা ভৌগোলিক তথ্য। তিব্বতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, পাহাড়ের গোপন পথ, মঠের পরিচালনা –এইসব তথ্য ব্রিটিশরা লাভ করেন তাঁর কাছ থেকেই। তবে এর জন্য মূল্য দিতে হয় শরচ্চন্দ্রকে। তিব্বতে তাঁর বিশেষ বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন সেনচেন লামা। শরচ্চন্দ্রের কাজে বিশেষ সাহায্য করেছিলেন। কিন্তু তিব্বতের প্রশাসকরা ব্রিটিশের চর সন্দেহ করে সানচেন লামাকে মৃত্যুদণ্ড দিলে শরচ্চন্দ্র যন্ত্রণাদগ্ধ হয়েছিলেন।
রাজনৈতিক স্বার্থে ব্রিটিশ শাসকরা ব্যবহার করেছিলেন শরচ্চন্দ্রকে। কিন্তু এ কথাও অনস্বীকার্য যে শরচ্চন্দ্র গোয়েন্দাগিরির বাইরে গিয়ে ভালোবেসেছিলেন তিব্বত আর তার মানুষজনকে। তিনি তিব্বত ও ভারতের হাজার বছরের সৌহার্দ্য, ভারতের প্রতি তিব্বতিদের শ্রদ্ধা তুলে ধরেছিলেন তাঁর বইতে। দেখিয়েছিলেন যে তিব্বতের সংস্কৃতি আসলে প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতিরই প্রসারিত রূপ, সামিয়ে মঠের নকশা ভারতের ওদন্তপুরী বিহারের অনুকরণেই তৈরি। তাঁর ‘Journey to Lhasa and Central Tibet’, Indian Pandits in the land of Snow’, ‘Autobiography of a Buddhist Indian’ –বইগুলি তার প্রমাণ।
আর একটা বিরাট কাজ করেছিলেন শরচ্চন্দ্র দাশ।
সেটি হল তিব্বতি ভাষার প্রতিটি শব্দের সংস্কৃত ও ইংরেজি প্রতিশব্দ চয়ন। সে বইএর নাম : ‘ A Tibetan- English Dictionary with Sanskrit Synonyms’ . ভোটবিদ্যা বা তিব্বত বিদ্যা নিয়ে যাঁরা কাজ করতে চান, এই বই তাঁদের কাছে অপরিহার্য। এর সঙ্গে তিনি তিব্বতি ভাষার ব্যাকরণচর্চাও করেছেন নিরলস অধ্যবসায়ে। তাঁর সেই বইএর নাম : An Introduction to the Grammar of the Tibetan Language’ .