
যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং অধিকার (Sexual and Reproductive Health and Rights-SRHR) মানবিক মর্যাদা, জেন্ডার সমতা ও টেকসই উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি। বাংলাদেশে পরিবার পরিকল্পনা ও মাতৃস্বাস্থ্যে অগ্রগতি হলেও লাখ লাখ নারী, কিশোরী ও তরুণ-তরুণী এখনো সঠিক তথ্য, সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা এবং নিজেদের প্রজননসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত। সামাজিক কুসংস্কার, বাল্যবিবাহ ও নীতিগত সীমাবদ্ধতা এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তাই SRHR কেবল স্বাস্থ্যগত বিষয় নয়; এটি মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার ও উন্নয়নের প্রশ্ন।
বাংলাদেশে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং অধিকার (SRHR) সেবাগুলো সরকারি প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক সংস্থা, বেসরকারি সংস্থা (NGO) এবং বেসরকারি খাতের অংশীদারদের একটি বহুমাত্রিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রদান করা হয়।
SRHR: অধিকার, মর্যাদা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা
SRHR বলতে যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য বিষয়ে বৈষম্য, জবরদস্তি ও সহিংসতামুক্ত পরিবেশে প্রত্যেক ব্যক্তির সচেতন ও স্বেচ্ছামূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারকে বোঝায়। এর চারটি প্রধান দিক হলো—যৌনস্বাস্থ্য, প্রজননস্বাস্থ্য, যৌন অধিকার এবং প্রজনন অধিকার। এর মধ্যে রয়েছে পরিবার পরিকল্পনা, গর্ভনিরোধ, নিরাপদ সন্তান প্রসব, মাতৃস্বাস্থ্যসেবা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, শারীরিক স্বায়ত্তশাসন এবং কখন, কতটি সন্তান নেওয়া হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা।
বাংলাদেশে নারী ও কিশোরীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, মাতৃমৃত্যু হ্রাস, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ কমানো এবং জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা মোকাবিলায় SRHR বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
মাতৃস্বাস্থ্য: প্রতিটি নারীর জন্য সেবা
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর নমুনা জীবন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রতি এক লাখ জীবিত জন্মে মাতৃমৃত্যুর অনুপাত ছিল ১৩৬, যা ২০২২ সালের ১৫৩ থেকে কম। তবু অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, অল্প বয়সে গর্ভধারণ এবং দক্ষ প্রসবসেবাদাতার অভাব মাতৃস্বাস্থ্যের বড় চ্যালেঞ্জ। গ্রামীণ ও দরিদ্র নারীরা দূরবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্র, চিকিৎসার ব্যয়, প্রশিক্ষিত কর্মীর স্বল্পতা এবং জরুরি সেবা পেতে বিলম্বের কারণে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
মাতৃমৃত্যু কমাতে মানসম্মত গর্ভকালীন ও প্রসব-পরবর্তী সেবা, জরুরি প্রসূতিসেবা, কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা এবং গর্ভপাত-পরবর্তী চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। এসব সেবা হতে হবে সাশ্রয়ী, গোপনীয়-নীতিসম্মত ও বৈষম্যহীন।
বাল্যবিবাহ ও কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য
মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (MICS) অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০-২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭.২ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে; প্রায় ১৩ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছরের আগেই। দারিদ্র্য, জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি, সামাজিক সুরক্ষার দুর্বলতা এবং ক্ষতিকর সামাজিক রীতিনীতি এ সমস্যাকে তীব্র করে।
অল্প বয়সে বিয়ে ও গর্ভধারণ কিশোরীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং নিজেদের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা সীমিত করে। অথচ বয়ঃসন্ধি, সম্মতি, গর্ভনিরোধ ও যৌনবাহিত সংক্রমণ বিষয়ে উপযুক্ত শিক্ষার সুযোগ এখনো সীমিত। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে বয়সোপযোগী, বিজ্ঞানসম্মত এবং সাংস্কৃতিকভাবে সংবেদনশীল তথ্য নিশ্চিত করতে হবে। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের (SDG) ৫.৩ লক্ষ্য অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে বাল্যবিবাহ বন্ধে সরকারি অঙ্গীকারের পাশাপাশি কার্যকর প্রয়োগ ও সামাজিক অংশগ্রহণ জরুরি।
পরিবার পরিকল্পনা: পছন্দের স্বাধীনতা
বাংলাদেশে আধুনিক গর্ভনিরোধক ব্যবহারের হার প্রায় ৬২ শতাংশ হলেও অগ্রগতি স্থবির এবং অঞ্চলভেদে বৈষম্য রয়েছে। বড়ির ব্যবহার বেশি; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী পদ্ধতির ব্যবহার তুলনামূলক কম।
২০২৫–২০৩০ সালের জাতীয় পরিবার পরিকল্পনা কৌশল জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে অধিকারভিত্তিক ক্ষমতায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। ২০২৬ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে বছরব্যাপী বাড়ি বাড়ি সেবা কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। এর সাফল্য নির্ভর করবে প্রশিক্ষিত মাঠ পরিদর্শক, বিভিন্ন গর্ভনিরোধক পদ্ধতির প্রাপ্যতা এবং চাপমুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগের ওপর। পরিবার পরিকল্পনার মূল কথা হলো — কখন ও কতটি সন্তান নেওয়া হবে, তা নির্ধারণের স্বাধীনতা।
মাসিক নিয়মিতকরণ ও গর্ভপাত-পরবর্তী সেবা
বাংলাদেশে মাসিক নিয়মিতকরণ (MR) পরিবার পরিকল্পনা সেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে ম্যানুয়াল ভ্যাকুয়াম অ্যাসপিরেশন অথবা ওষুধের মাধ্যমে এ সেবা দেওয়া হয়। তবে প্রশিক্ষিত সেবাদাতার অভাব, সামাজিক কলঙ্ক ও তথ্যের ঘাটতির কারণে অনেকে অনিরাপদ সেবার দিকে ঝুঁকছেন। ফলে রক্তক্ষরণসহ বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে।
অনুমোদিত মাসিক নিয়মিতকরণ, মানবিক ও বিচারহীন গর্ভপাত-পরবর্তী চিকিৎসা এবং স্বেচ্ছামূলক গর্ভনিরোধক সেবা জোরদার করতে হবে। সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ও বাড়ানো প্রয়োজন।
যৌনবাহিত সংক্রমণ ও নীতিগত সীমাবদ্ধতা
বাংলাদেশে সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে HIV-এর প্রকোপ কম হলেও গনোরিয়া, সিফিলিসসহ অন্যান্য যৌনবাহিত সংক্রমণ জনস্বাস্থ্যের উদ্বেগ। যৌনকর্মী, পুরুষের সঙ্গে যৌনসম্পর্কে লিপ্ত পুরুষ, ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি এবং মাদক ইনজেকশনের মাধ্যমে গ্রহণকারীরা তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। সংক্রমণ পরীক্ষা ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে গোপনীয়তা, সাশ্রয়ী ব্যয় এবং বৈষম্যহীনতা নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশে এখনো সমন্বিত জাতীয় SRHR নীতিকাঠামোর অভাব রয়েছে। বিদ্যমান নীতিমালার বিভিন্ন অংশে বিষয়গুলো ছড়িয়ে আছে। অবিবাহিত কিশোর-কিশোরীদের সেবাপ্রাপ্তিতে সীমাবদ্ধতা, মানসিক ও যৌনস্বাস্থ্যে অপর্যাপ্ত গুরুত্ব, পুরুষদের সীমিত অংশগ্রহণ এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, যৌন ও জেন্ডার সংখ্যালঘু ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর উপযোগী সেবার ঘাটতি উল্লেখযোগ্য সমস্যা। স্কুলের জীবনদক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাও সামাজিক বাধা ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের অভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
করণীয়: মর্যাদা ও উন্নয়নের অঙ্গীকার
বাংলাদেশের প্রয়োজন একটি সমন্বিত, অধিকারভিত্তিক SRHR নীতিকাঠামো, যা মাতৃস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, কিশোরস্বাস্থ্য, মাসিক নিয়মিতকরণ, যৌনবাহিত সংক্রমণ প্রতিরোধ, সহিংসতা মোকাবিলা ও স্বাস্থ্যশিক্ষাকে একসূত্রে যুক্ত করবে। এ জন্য পাঁচটি পদক্ষেপ জরুরি :
১. প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় মানসম্মত মাতৃ ও প্রজননস্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ।
২. বিদ্যালয়, পরিবার, কমিউনিটি ও নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল মাধ্যমে বয়সোপযোগী স্বাস্থ্যশিক্ষা নিশ্চিত করা।
৩. বাল্যবিবাহ ও জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে আইন প্রয়োগ এবং সামাজিক উদ্যোগ জোরদার করা।
৪. গর্ভনিরোধ, মাসিক নিয়মিতকরণ, গর্ভপাত-পরবর্তী চিকিৎসা ও যৌনবাহিত সংক্রমণের গোপনীয়তাসম্মত সেবা বৈষম্য ছাড়াই নিশ্চিত করা।
৫. নীতি ও কর্মসূচি প্রণয়নে নারী, কিশোর-কিশোরী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
সরকার, নাগরিক সমাজ, জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গ-সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয় এবং টেকসই অর্থায়ন-এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
পাঁচটি পদক্ষেপ জরুরি: প্রথমত, পিছিয়ে থাকা এলাকায় মাতৃ ও প্রজননস্বাস্থ্যসেবা জোরদার; দ্বিতীয়ত, বিদ্যালয়, কমিউনিটি ও নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল মাধ্যমে বয়সোপযোগী স্বাস্থ্যশিক্ষা; তৃতীয়ত, বাল্যবিবাহ ও জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ; চতুর্থত, বৈষম্য ছাড়া গর্ভনিরোধ, মাসিক নিয়মিতকরণ, গর্ভপাত-পরবর্তী সেবা ও গোপনীয় যৌনবাহিত সংক্রমণ চিকিৎসা; পঞ্চমত, কর্মসূচির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে নারী, কিশোর-কিশোরী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ।
উপসংহার: মর্যাদা ও উন্নয়নের জন্য এখনই পদক্ষেপ জরুরি
বাংলাদেশের উন্নয়নকে শুধু জাতীয় পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করলে চলবে না; দেখতে হবে, দরিদ্রতম নারী কিংবা সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষটি প্রয়োজনের সময় সেবা পাচ্ছেন কি না। প্রতিরোধযোগ্য কারণে নারীর মৃত্যু এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বাল্যবিবাহ অব্যাহত রেখে টেকসই উন্নয়ন অর্জন সম্ভব নয়। প্রয়োজন শুধু আরও স্বাস্থ্যকেন্দ্র নির্মাণ নয়, বরং এমন সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে সঠিক তথ্য সহজলভ্য, সেবা সাশ্রয়ী, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সুরক্ষিত এবং প্রজননসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে নেওয়া যায়। নারীর স্বাস্থ্য, কিশোরীর ভবিষ্যৎ ও প্রত্যেক মানুষের প্রজননস্বাধীনতা কোনো বিশেষ সুযোগ নয় — বরং এগুলো তাদের মৌলিক অধিকার এবং এটা নিশ্চিত করা সরকার তথা সকলের দায়িত্ব।
লেখক: নিকোলাস বিশ্বাস একজন গণমাধ্যমকর্মী ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত। যোগাযোগের ইমেইল: gonomaddzam@gmail.com
এ সব কি সম্ভব? ওখানে কোরান হাদিস আগে।