| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন কানাডার কবি অ্যান কারসন : অসিত দাস পেজফোরনিউজ-এর শারদোৎসব বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ প্রকাশিত হল ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ একটি অব্যক্তিগত বয়ান : তপোধীর ভট্টাচার্য মহালয়ার প্রার্থনা : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘এক টুকরো ভোর’ আশ্বিনের শারদপ্রাতে : যশোবন্ত রায় আমার ছেলেবেলার মহালয়ার সকাল : পীযূষ কান্তি দাস পর্দার দাপুটে নায়ক, বাস্তব জীবনে মানবতাবাদী — নানা পাটেকরের জীবন ও অবিনশ্বর কীর্তি : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সসীমকুমার বাড়ৈ-এর ছোটগল্প ‘প্রকৃতি বিভাজন খেলা’ মিরকাশিমের বীরকুল, হেস্টিংসের ব্রাইটন, জন ফ্র্যাঙ্ক স্নেইথ-এর দীঘা : সুব্রত গুহ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ SIR-এর ফাঁসে জ্ঞানেশ কুমার, কমিশনের অন্দরে অশান্তি (শেষ কিস্তি) : দিলীপ মজুমদার রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে পাঁচ দফা কৌশল বাস্তবায়নের রোডম্যাপ : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন কলকাতার নব্য কাজিয়ার দুর্গা : অসিত দাস SIR-এর ফাঁসে জ্ঞানেশ কুমার, কমিশনের অন্দরে অশান্তি (সপ্তম কিস্তি) : দিলীপ মজুমদার আমাদের নিখোঁজ শিশুরা: সংখ্যার বাইরে যে প্রশ্নগুলো জরুরি : নিকোলাস বিশ্বাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মানুষকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে নয়া পুঁজিবাদ : সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় SIR-এর ফাঁসে জ্ঞানেশ কুমার, কমিশনের অন্দরে অশান্তি (ষষ্ঠ কিস্তি) : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ SIR-এর ফাঁসে জ্ঞানেশ কুমার, কমিশনের অন্দরে অশান্তি (পঞ্চম কিস্তি) : দিলীপ মজুমদার হাসানের ইতিহাস ও বর্তমান ছুঁয়ে : নন্দিনী অধিকারী গান্ধীজী : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কবরের ইতিহাস : সসীমকুমার বাড়ৈ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ SIR-এর ফাঁসে জ্ঞানেশ কুমার, কমিশনের অন্দরে অশান্তি (চতুর্থ কিস্তি) : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই পিতৃ পক্ষের শেষ, মাতৃপক্ষের সূচনা শুভ মহালয়ার আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com, আমাদের পোর্টালের কিছু ছবি বাদে প্রায় সব ছবিই অন্তর্জাল থেকে সংগ্রহ করা হয়। কারুর যদি কপিরাইট থাকে জানাবেন। আমরা সেই ছবি পোর্টাল থেকে ডিলিট করে দেব।

সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন কানাডার কবি অ্যান কারসন : অসিত দাস

Reporter
অসিত দাস / ৭০ Views জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬

Etymology বা ব্যুৎপত্তি যে সাহিত্যের অঙ্গ হতে পারে, তা দেখিয়েছেন এই বর্ষীয়ান লেখিকা। বহুদিন ধরে শব্দের ব্যুৎপত্তি ও স্থাননাম নিয়ে কাজ করে পেয়েছি নবীন ও প্রবীণ সাহিত্যিকদের তাচ্ছিল্য ও উপহাস। এবারে অন্তত এই বিশ্বাস মনের মধ্যে জাগল যে, বছরের পর বছর বৃথা সময় কাটাইনি।

২০২৬-এ সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার জয়  করেছেন কানাডার প্রখ্যাত কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক এবং ধ্রুপদী সাহিত্যের অধ্যাপক অ্যান কারসন।  স্টকহোমের সুইডিশ অ্যাকাডেমি তাঁর এই অনন্য প্রাপ্তির পেছনে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে — ”তাঁর সাহসী ও উদ্ভাবনী সাহিত্যকর্মের জন্য, যা ধ্রুপদী ঐতিহ্যের সাথে এক কৌতুকপূর্ণ সংলাপের মাধ্যমে সমকালীন সাহিত্যে নতুন আঙ্গিক তৈরি করেছে”। অ্যান কারসন এমন এক বিরল ধারার লেখক, যিনি কবিতা, গদ্য, সমালোচনা, অনুবাদ ও নাটকের চেনা সীমারেখাকে ভেঙে চুরমার করে এক সম্পূর্ণ নতুন নান্দনিক ভাষা তৈরি করেছেন।

বিশ্বসাহিত্যে যখন কোনো লেখক চেনা ঘরানার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব এবং অভূতপূর্ব এক শৈলী নির্মাণ করেন, তখন সাহিত্যের গতিপথ বদলে যায়। অ্যান কারসন ঠিক এই কাজটুকুই করেছেন বিগত চার দশক ধরে তিনি কেবল একজন কবি নন; তিনি একাধারে একজন ধ্রুপদী ভাষাবিদ (Classicist), প্রাবন্ধিক, এবং উত্তর-আধুনিক সাহিত্যের এক পরম জাদুকর। ৭৬ বছর বয়সী এই কানাডীয় লেখক ২০২৬ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়ে বিশ্বমঞ্চে নিজের অনন্যতার সর্বোচ্চ স্বীকৃতি পেলেন। তাঁর সাহিত্যকর্মের মূল শক্তি হলো প্রাচীন গ্রিক ও ল্যাটিন সাহিত্যের অন্তহীন জ্ঞানকে আজকের আধুনিক ও অতি-আধুনিক মানুষের মনস্তত্ত্বের সাথে জুড়ে দেওয়া।

অ্যান কারসন ১৯৫০ সালের ২১ জুন কানাডার টরন্টোতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন একজন ব্যাংকার, যার চাকরির সুবাদে কারসনকে শৈশবে কানাডার বিভিন্ন ছোট ছোট শহরে ঘুরে বেড়াতে হয়েছিল। এই যাযাবর জীবন সম্ভবত তাঁর ভেতরে এক গভীর একাকীত্ব ও অনুসন্ধিৎসু মনের জন্ম দেয়। হাইস্কুলে পড়ার সময় একজন ল্যাটিন শিক্ষকের মাধ্যমে তিনি প্রথম প্রাচীন গ্রিক ও হেলেনীয় সংস্কৃতির প্রেমে পড়েন। সেই শিক্ষক কারসনকে দুপুরের খাবারের বিরতিতে গ্রিক ভাষা শেখাতেন, যা পরবর্তীতে তাঁর জীবনের মূল চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়ায়। এরপর তিনি টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ধ্রুপদী সাহিত্যে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর পিএইচডি থিসিসের শিরোনাম ছিল ‘Odi et Amo Ergo Sum’ (আমি ঘৃণা করি এবং ভালোবাসি, অতএব আমি আছি)।

কারসনের সাহিত্যকে কোনো নির্দিষ্ট ছকে বাঁধা অসম্ভব। তিনি গ্রিক শব্দ ‘পোয়েসিস’ (যার অর্থ কোনো কিছু তৈরি করা) শব্দটিকে নিজের লেখার মূল মন্ত্র মেনে চলেন। তিনি নিজেকে কবির চেয়ে একজন ‘মেকার’ বা নির্মাতা ভাবতেই বেশি পছন্দ করেন।

তাঁর লেখার বড় বৈশিষ্ট্য হলো গদ্য ও পদ্যের মেলবন্ধন। যেখানে সাধারণ কবিতা শেষ হয়, সেখান থেকে কারসনের প্রবন্ধ বা সংলাপ শুরু হয়। তিনি প্রাচীন গ্রিক মিথলজি বা পৌরাণিক চরিত্রগুলোকে তুলে এনে বসিয়ে দেন আধুনিক কোনো প্রেক্ষাপটে। যেমন — প্রাচীন গ্রিক দানব বা দেবতারা তাঁর লেখনীতে হয়ে ওঠে আমেরিকার কোনো নিঃসঙ্গ কিশোর কিংবা কোনো আধুনিক সম্পর্কের টানাপড়েনের শিকার।

অ্যান কারসনের সাহিত্যভাণ্ডার বিপুল এবং বহুমুখী। তাঁর প্রধান কয়েকটি সৃষ্টিকর্ম নিচে আলোচনা করা যাক,  —

১. ইরোস দ্য বিটারসুইট (Eros the Bittersweet – 1986):

এটি মূলত তাঁর একটি গবেষণাধর্মী গদ্যগ্রন্থ। এই বইয়ে তিনি প্রাচীন গ্রিক কবি স্যাফোর (Sappho) কবিতার সূত্র ধরে মানুষের আকাঙ্ক্ষা, প্রেম ও কামনার মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করেছেন। কারসন দেখিয়েছেন যে, প্রেম বা আকাঙ্ক্ষা একই সাথে মিষ্টি এবং তেতো (Bittersweet); কারণ মানুষ যা চায়, তা পুরোপুরি না পাওয়ার যে শূন্যতা, সেটাই প্রেমের আসল সৌন্দর্য।

২. অটোবায়োগ্রাফি অব রেড (Autobiography of Red – 1998):

কারসনের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং যুগান্তকারী সৃষ্টির একটি হলো এই পদ্য-উপন্যাস (Verse Novel)। এখানে তিনি প্রাচীন গ্রিক কবি স্টেসিকরাসের একটি খণ্ডিত মিথকে পুনর্নির্মাণ করেছেন। গ্রিক পুরাণের ডানাওয়ালা লাল দানব ‘গেরিয়ন’ (Geryon)-কে তিনি আধুনিক যুগের এক সংবেদনশীল কিশোর সমকামী শিল্পী হিসেবে চিত্রায়িত করেছেন, যে হেরাক্লিসের প্রেমে পড়ে এবং হৃদয়ভাঙার যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে নিজের আত্মপরিচয় খুঁজে পায়। পুরাণ ও আধুনিকতার এই মেলবন্ধন সাহিত্যজগতে এক বিপ্লব ঘটিয়েছিল

৩. দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড (The Beauty of the Husband – 2001):

২৯টি ট্যাঙ্গো নাচের ছন্দে লেখা এই চমৎকার কাব্য-উপন্যাসটির জন্য তিনি প্রথম নারী হিসেবে ব্রিটেনের মর্যাদাপূর্ণ ‘টি এস এলিয়ট প্রাইজ’ লাভ করেন। এটি একটি ব্যর্থ দাম্পত্যের গল্প, যেখানে জন কিটসের সৌন্দর্যতত্ত্বকে এক তীব্র রোমান্টিক ও বেদনাদায়ক বৈবাহিক বিশ্বাসঘাতকতার আলোয় দেখা হয়েছে।

৪. নক্স (Nox – 2010):

কারসনের ভাই মাইকেলের মৃত্যুর পর তাঁর স্মরণে তৈরি এই বইটি কোনো সাধারণ বই নয়, এটি একটি শিল্পবস্তু (Art Object)। এটি একটি বক্সের ভেতর ‘অ্যাকর্ডিয়ন’ বা ভাঁজ করা কাগজের আকারে প্রকাশিত। এতে রয়েছে আলোকচিত্র, পুরোনো চিঠি, হাতের লেখা নোট এবং রোমান কবি ক্যাটুল্লাসের শোকগাথার অনুবাদ। এই বইটির মাধ্যমে কারসন দেখিয়েছেন কীভাবে মানুষের ভাষা এবং স্মৃতি কোনো প্রিয়জনকে হারানোর শোককে ধরে রাখতে গিয়ে ব্যর্থ ও খণ্ডিত হয়ে পড়ে।

৫. রং নরমা (Wrong Norma – 2024):

তাঁর সাম্প্রতিকতম এই বইটিতে ২৫টি গদ্য-পদ্যের মিশ্রণ রয়েছে। এই গ্রন্থের জন্য তিনি ২০২৫ সালে ‘ন্যাশনাল বুক ক্রিটিকস সার্কেল অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন। এখানে তাঁর পারফর্মেটিভ এবং নিরীক্ষাধর্মী লেখার শৈলী এক চূড়ান্ত রূপ ধারণ করেছে।

অ্যান কারসন একজন অসাধারণ অনুবাদক। তবে তাঁর অনুবাদ চেনা ব্যাকরণের ধার ধারে না। তিনি স্যাফোর খণ্ডিত কবিতা অনুবাদ করেছেন ‘ইফ নট, উইন্টার’ (If Not, Winter) গ্রন্থে, যেখানে মূল পাণ্ডুলিপির হারিয়ে যাওয়া অংশগুলোকে তিনি কাগজের সাদা শূন্যস্থান দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন। এছাড়া ইউরিপিডিস এবং এস্কাইলাসের গ্রিক ট্র্যাজেডির অনুবাদেও তিনি সমকালীন আধুনিক ভাষার স্পর্শ দিয়েছেন।

অ্যান কারসন সবসময় প্রচারবিমুখ ও নিভৃতচারী। তিনি ইমেলের মাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিতে পছন্দ করেন এবং নিজের ব্যক্তিগত জীবনকে আড়ালে রাখতেই ভালোবাসেন। ২০২৬ সালের ৮ অক্টোবর যখন সুইডিশ অ্যাকাডেমি সাহিত্যে তাঁর নোবেল জয়ের ঘোষণা করে, তখন অ্যাকাডেমির স্থায়ী সচিব ইনগ্রিড কার্লবার্গ তাঁর সাথে ফোনে যোগাযোগ করেন। সেই সময় কারসন আইসল্যান্ডে ছিলেন। পুরস্কার পাওয়ার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি স্বভাবসুলভ কৌতুক ও সরলতায় বলেছিলেন, “আমার মনে হয় আপনারা সবাই পাগল হয়ে গেছেন”। অ্যাকাডেমি জানায়, নোবেল পাওয়ার খবরটি শোনার মুহূর্তে তিনি আইসল্যান্ডের তীব্র বাতাসের শব্দ শুনছিলেন।

তাঁর এই নির্লিপ্ততাই প্রমাণ করে যে, তিনি পুরস্কার বা যশের জন্য লেখেন না। শব্দের উৎস, শব্দের ইতিহাস (Etymology) এবং ভাষা কীভাবে মানুষের নীরবতাকে প্রকাশ করতে পারে — এটাই তাঁর সাহিত্যের মূল অন্বেষণ।

অ্যান কারসনের সাহিত্যে নোবেল প্রাপ্তি আসলে প্রচলিত সাহিত্যিক সীমানাগুলো ভেঙে ফেলার এক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন যে, আড়াই হাজার বছর আগের হোমার, স্যাফো বা ইউরিপিডিস আজকের আধুনিক মানুষের থেকে আলাদা কিছু ছিলেন না। মানুষের প্রেম, বিরহ, শোক, হিংসা আর একাকীত্বের গল্পগুলো চিরন্তন। কারসন সেই প্রাচীন সুরকে উত্তর-আধুনিক কোলাহলের ভেতর এক ধীর, ধ্যানমগ্ন ও সূক্ষ্ম সুরে আমাদের সামনে পরিবেশন করেছেন। ২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অ্যান কারসনের সাহসী, আপসহীন এবং সৃষ্টিশীল সাহিত্যযাত্রাকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিল।

অ্যান কারসন কবিতা লিখছেন, অনুবাদ করছেন, প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করছেন, আবার কখনো প্রবন্ধ লিখছেন, কখনো মঞ্চে পারফর্ম করছেন, কখনো ভিজ্যুয়াল আর্ট নিয়ে কাজ করছেন। অ্যান কারসনকে ঠিক কোন পরিচয়ে চেনা যায়, সেটাই যেন একটা ধাঁধা!

চার দশকের বেশি সময় ধরে সাহিত্যের চেনা ছক ভেঙে নিজের মতো করে লিখে চলেছেন এই কানাডীয় লেখক। ২০২৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারও উঠেছে তাঁর হাতে।

তিনি বলেছেন, তাঁর প্রিয় বইগুলি সব খ্রিস্টপূর্ব পাঁচশ অব্দেই লেখা হয়ে গেছে। আধুনিক সাহিত্য ও সাহিত্যিক নিয়ে তিনি বিশেষ কিছু জানেন না। এক্ষেত্রে নীরদচন্দ্র চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর বেশ মিল আছে।

কারসনের বিশেষত্ব কেবল তাঁর লেখার ধরনে নয়। তাঁর লেখা পড়লে মনে হয়, চিন্তা করাটাও একটা সাহিত্যিক কাজ হতে পারে। গবেষণা আর সৃজনশীল লেখা যে আলাদা দুটো জগৎ নয়, বরং পাশাপাশি হাঁটতে পারে, সেটাই তিনি বারবার দেখিয়েছেন।

তাঁর লেখায় তথ্য আছে, আবার কল্পনাও আছে। আছে ইতিহাস, আছে কবিতা, আছে ব্যক্তিগত অনুভূতি। সব মিলিয়ে তাঁর বই যেন একই সঙ্গে সাহিত্য ও শিল্পের সমাবেশ। তিনি শুধু দীর্ঘ কবিতাই লেখেননি, অনেক নাতিদীর্ঘ কবিতাও লিখে গেছেন।

প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য কারসনের লেখার বড় একটি অংশ জুড়ে আছে। তবে পুরোনো লেখকদের তিনি কেবল গবেষণার বিষয় হিসেবে দেখেন না। বরং তাঁদের জীবনকে জানার চেষ্টা করেন।

স্যাফো, সিমোনিদিস, সফোক্লিস কিংবা ইউরিপিদিস, হাজার হাজার বছর আগের এসব লেখকের কথা তিনি আজকের মানুষের জীবন ও অনুভূতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছেন।

প্রেম, আকাঙ্ক্ষা, শোক, একাকিত্ব, বিচ্ছেদ কিংবা মৃত্যু, মানুষের এসব অনুভূতি তো আর পুরোনো হয় না। তাই প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যের শব্দও কারসনের লেখায় নতুন করে কথা বলেছে।

তাঁর কাছে প্রাচীন সাহিত্য কোনো জাদুঘরে তুলে রাখা পুরোনো জিনিস নয়। বরং এমন এক জগৎ, যেখান থেকে আজও নতুন নতুন অর্থ বের করা যায়।

কারসনের লেখায় একটি বিষয় বারবার ফিরে আসে, দূরত্ব। দুজন মানুষের মধ্যে দূরত্ব, এক ভাষা থেকে আরেক ভাষার দূরত্ব, জীবিত ও মৃতের দূরত্ব, কিংবা যা জানা যায়, আর যা কখনোই পুরোপুরি জানা সম্ভব নয়, এসব নিয়েই তিনি ভাবেন।

তাঁর কাছে ভালোবাসা মানেই কাউকে পাওয়া নয়। বরং কখনো কখনো না-পাওয়াটাও ভালোবাসার বড় অংশ। মানুষের জীবনের যে শূন্যতাগুলো থাকে, আমরা সাধারণত সেগুলোকে এড়িয়ে যাই, কারসন সেখানেই কলম ধরেছেন। এই কারণেই তাঁর লেখায় না পাওয়া, নীরবতা ও শূন্যতার এত গুরুত্ব।

কার্সনের লেখার ধরনও বেশ মজার। কোথাও কবিতা, কোথাও প্রবন্ধ, কোথাও অনুবাদ, কোথাও উদ্ধৃতি; আবার হঠাৎ এমন কিছু, যা প্রচলিত বইয়ের ছকের সঙ্গে একেবারেই মেলে না।

খণ্ডিত লেখা, কোলাজ, হঠাৎ থেমে যাওয়া; এসব তাঁর কাছে নিছক স্টাইল নয়। এগুলোর মাধ্যমে তিনি স্মৃতি, ভালোবাসা, হারিয়ে ফেলা কিংবা আকাঙ্ক্ষার মতো জটিল বিষয়কে তুলে ধরতে চান।

ইরোস দ্য বিটারসুইট (১৯৮৬), অটোবায়োগ্রাফি অব রেড (১৯৯৮), দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড (২০০১), নক্স (২০১০) ও ফ্লোট (২০১৬); এসব বইয়ে তিনি বারবার দেখিয়েছেন, কবিতা বা বই দেখতে ঠিক কেমন হতে হবে, তার কোনো বাঁধাধরা নিয়ম নেই।

তাঁর কাছে লেখার ধরন কেবল সাজসজ্জা নয়। কী বলা হচ্ছে, আর কীভাবে বলা হচ্ছে, দুটোই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

কারসনের লেখায় একদিকে আছে বুদ্ধিবৃত্তিক দোলাচল, অন্যদিকে আছে আবেগের গভীরতা। তিনি কঠিন বিষয় নিয়ে লেখেন, কিন্তু কেবল জ্ঞান বিতরণের জন্য নয়। বরং পাঠককে ভাবানোর জন্য, ভাবনার জগতে নেওয়ার জন্য। তাঁর লেখা কখনো মজার, কখনো বিষণ্ণ, কখনো বা আবেগে ভাসানো।

তরুণ লেখক ও গবেষকদের ওপরও তাঁর প্রভাব পড়েছে। অনেকেই এখন সাহিত্য সমালোচনা, অনুবাদ, কবিতা ও সৃজনশীল লেখার সীমানা আলাদা করে দেখছেন না।

কারসনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটিই, সাহিত্যে সব প্রশ্নের উত্তর থাকতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই। বরং কখনো কখনো ভালো সাহিত্য এমন প্রশ্নই তৈরি করে, যার উত্তর খুঁজতে পাঠককে বই বন্ধ করার পরও ভাবতে হয়।

সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার এমন লেখকদেরই স্বীকৃতি দেয়, যাঁরা সাহিত্যের সম্ভাবনাকে একটু হলেও বড় করে দেন। অ্যান কারসন সেই কাজটি করেছেন নিজের মতো করে।

কবিতা ও গবেষণা, প্রাচীন ও আধুনিক সময়, চিন্তা ও অনুভূতি, সবকিছুর মাঝখানে তিনি তৈরি করেছেন নিজের এক অদ্ভুত সাহিত্য ভুবন। সেখানে ভাষা কেবল লেখার মাধ্যম নয়; ভাষা নিজেই হয়ে ওঠে ভাবনার খোরাক। গতবারের সাহিত্যে নোবেল-প্রাপক লাসলো ক্রাসনাহোরকাই আর অ্যান কারসন দুজনেই লেখায় দীর্ঘ বাক্য ব্যবহার করতে পছন্দ করেন। এদিক দিয়ে আমাদের কমলকুমার মজুমদারও কম যাননি। ‘সুহাসিনীর পমেটম’-এ এক একটি বাক্য এত দীর্ঘ, পড়তে পড়তে মনে হয়, লেখাটি আদি অন্তহীন বাক্যের সমাহার। বাস্তবিকই সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তিনি সুহাসিনীর পমেটম আটপাতার পরে আর পড়তে পারেননি!

অ্যান কারসন সম্বন্ধে অবশ্য এমন কথা কেউ বলেননি।

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

পেজফোরনিউজ-এর নববর্ষ বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Currently Maintained by the2.dev