
[সংক্ষিপ্তসার — এই কিস্তিতে আমরা গ্রান্ট জমা-তুমারি-তশখিস (সংশোধিত রাজস্ব-তালিকা) অনুযায়ী বাংলার প্রধান জমিদারিগুলোর যে বিবরণ দিয়েছেন তার কয়েকটা অনুবাদ করব। ২। রাজশাহী: বাংলা তথা সমগ্র ভারতের সম্ভবত সবচেয়ে বিশাল ও পরিচালনা করা কঠিন এমন এক জমিদারি। গঙ্গা এবং তার শাখা-প্রশাখা, বহু নৌ-চলাচলযোগ্য নদী এর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। হিন্দুস্তানের রেশমের অন্তত চার-পঞ্চমাংশ এখানে উৎপাদিত হতো। মুর্শিদাবাদের রাজধানী, কাশিমবাজার, বাউলিয়া ও কুমারখালির কারখানা-কেন্দ্র এর সীমানায় পড়ত। ১৭২৫ সালে রামজীবন নামে এক ব্রাহ্মণকে এই বিশাল এলাকার রাজস্ব সংগ্রহের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। তিনি তাঁর কথিত পৌত্র রামকান্তকে উত্তরাধিকারী গ্রহণ করেন; রামকান্ত ছিলেন রাণী ভবানীর স্বামী। রামকান্তের মৃত্যুর পর পুরোহিত-শ্রেণির কারসাজিতে সেই অধিকার শেষ পর্যন্ত রাণী ভবানীর হাতে ন্যস্ত হয়। গ্রান্ট এখানে জাফর খানের প্রশাসনকে “সেকালের সবচেয়ে সক্ষম, সৎ ও কঠোর ন্যায়পরায়ণ শাসন” বলে অভিহিত করেছেন। তিরস্ত্রি (ত্রিবেণী) পরগনাটি মুর্শিদাবাদ, ঘোড়াঘাট ও মাহমুদাবাদের চাকলার বিশাল অংশ জুড়ে বিস্তৃত ছিল — রাজশাহী, ভাতুরিয়া ও নলদি বা ভুষণা অঞ্চল নিয়ে ১৩৯টি পরগনা, রাজস্ব ১৬,৯৬,০৮৭ টাকা। ৩। দিনাজপুর (পাঞ্জেরা [বা পিঞ্জিরা] সরকারের হাভেলি) : জাফর খান তাঁর শাসনকালের শেষভাগে রামনাথ নামক এক কায়স্থ ভূস্বামীর ওপর এই জমিদারি ন্যস্ত করেন। রামনাথ গুপ্তধন আবিষ্কার করে সম্পদের মালিক হয়েছিলেন বলে জনগণের বিশ্বাস ছিল; তবে গ্রান্টের বক্তব্য মূল কারণ ছিল পতিত জমি উদ্ধার, সে সবের উন্নয়ন এবং গোপনে সীমানা সম্প্রসারণ। তিনি নিয়মিত রাজস্বের বাইরে মোটা অঙ্কের উপঢৌকন দিয়ে অভ্যন্তরীণ শাসনের বিশেষ সুবিধা ভোগ করতেন। ১৭৫৭ পর্যন্ত এই সুবিধা বন্ধ হয়নি। জায়গির বাদে ৮৯টি পরগনা অন্তর্ভুক্ত ছিল। ৪। নদীয়া (উখড়া/কৃষ্ণনগর): ভবানন্দ মজমুয়াদারের বংশধর ব্রাহ্মণ রঘুরামকে জমিদারি অধিকার দেওয়া হয় । জেলার আয়তন বিশাল ও ভূমি উর্বর; হুগলি নদী দিয়ে বিদেশে পণ্য পরিবহন সহজ ছিল। রাজস্ব আত্মসাতের ফলে এই জেলার মূল্য অত্যন্ত কম দেখানো হয়েছে — ৭৩টি পরগনা, ৫,৯৪,৮৪৬ টাকা। ৫। বীরভূম: জাফর খাঁ, জমিদারি অধিকার তুলে দেন, আফগান শের শাহের বিতাড়নের পর এখানে বসতি স্থাপন করা আসাদুল্লাহর পরিবারকে। পশ্চিম সীমান্ত রক্ষার জন্য যুদ্ধবাজ মুসলমান কৃষকদের মিলিশিয়া নিযুক্ত করা হয়। কিছু জমি ছিল লাখেরাজ (কর-মুক্ত) — অনেকটা ইউরোপের সামরিক ফিফ-এরমত। কাসিম আলীর আমলে এই সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়; ২২ পরগনা, ৩,৬৬,৫০৯ টাকা। ৬। কলকাতা: আগে মোহাম্মদ শরিফের এখতিয়ারভুক্ত ক্ষুদ্র তালুকদারদের দখলে ছিল; পরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জমিদারি হয়ে লর্ড ক্লাইভকে জায়গির হিসেবে প্রদান করা হয় — ২৭টি পরগনা, ২,২২,৯৫৮ টাকা। ৭। বিষ্ণুপুর: বর্ধমান চাকলার জমিদারি; রাজপুত পরিবারের উত্তরাধিকার — ১,০২১ বছর ধরে ৫৫ জন রাজার নিয়মিত উত্তরাধিকার; ১৭১৫ পর্যন্ত কেবল সামান্য পেশকাশ দিত; গোপাল সিং-এর ওপর পুনরায় দায়িত্ব দেওয়া হয় — ২টি পরগনা, ১,২৯,৮০৩ টাকা। ৮। ইউসুফপুর: রেনেলের বর্ণনায় আধুনিক যশোরের গোটা অংশ; কায়স্থ কিষেন-রামকে দেওয়া হয়; সৈদপুর পরগনা পরে আলাদা হয়; ২৩টি পরগনা, ১,৮৭,৭৫৪ টাকা। ৯। লস্করপুর: ছোট অথচ উর্বর জমিদারি — কাঁচা রেশম উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত; গঙ্গার পূর্ব তীরে কাসিমবাজার দ্বীপের উল্টোদিকে; রাজশাহী জমিদারির এখতিয়ারে; ব্রাহ্মণ অনুপনারায়ণকে দেওয়া হয়; পরে ১০ আনা ও ৫.৫ আনা — দুই অসম ভাগে বিভক্ত করা হয়; তাহেরপুর পরগনা আলাদা হয়; ১৫টি পরগনা, ১,২৫,৫১৬ টাকা।]
২। রাজশাহী (Rajeshahy): বাংলা তথা সম্ভবত সমগ্র ভারতের সবচেয়ে বিশাল জমিদারি। বিশালতার জন্য পরিচালনা-কঠিন জমিদারী হিশেবে পরিচিত। এর সমগ্র দৈর্ঘ্য জুড়ে প্রবাহিত হয়েছে মহান গঙ্গা ও তার ছোট ছোট শাখা-প্রশাখা; এছাড়াও রয়েছে বহু নৌ-চলাচলযোগ্য নদী ও উর্বরতা-বর্ধক জলধারা। এর সীমানার মধ্যেই উৎপাদিত হতো হিন্দুস্তানের বিলাস-ব্যসনে মগ্ন সাম্রাজ্যে ব্যবহৃত বা সেখান থেকে রপ্তানিকরা রেশমের (কাঁচা বা প্রক্রিয়াজাত) অন্তত চার-পঞ্চমাংশ। পাশাপাশি, এশিয়ায় উষ্ণ জলবায়ু অঞ্চলে পাওয়া বাণিজ্যোপযোগী প্রকৃতি ও শিল্পের বহু মূল্যবান ও সমৃদ্ধ পণ্যও এখানে প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত হতো। মুর্শিদাবাদের বিশাল ও জনবহুল রাজধানীর শিল্প ও জনসংখ্যার সুফলভোগী এবং কাশিমবাজার, বাউলিয়া ও কুমারখালির মতো প্রধান কারখানাগুলো নিজের সীমানায় মধ্যে পড়ে — সেই সাথে সুবার অন্যান্য বড় প্রাদেশিক শহর, শিল্প-নগরী ও বাজারের কাছে এর অবস্থান — এই বিশাল এলাকার রাজস্ব সংগ্রহের দায়িত্ব ১৭২৫-এ (অর্থাৎ ব্রিটিশ বিজয়ের মাত্র ৮০ বছরের কিছু বেশি সময় আগে — এই সময়ক্রমের যৌক্তিকতা বুঝতে আলাদা করে টিকা করা হয়েছে) রামজীবন নামক এক ব্রাহ্মণকে অর্পণ করা হয়। তিনি ছিলেন এই জেলায় রাজস্ব সংগ্রহের দায়িত্বে নিয়োজিত বর্তমান পরিবারের প্রথম ব্যক্তি। তিনি তাঁর তথাকথিত পৌত্র (supposed grandson), তৎকালীন রাণী ভবানীর (যিনি সম্ভবত তখনও জীবিত ছিলেন) স্বামী রামকান্তকে — উত্তরাধিকারী হিসেবে গ্রহণ করে জমিদারি উত্তরাধিকারের জন্য তাঁর নাম প্রস্তাব করেন। রামকান্তের মৃত্যুর পর — বা আরও ঠিকভাবে বলতে গেলে, পুরোহিত-শ্রেণির কারসাজিতে ও নামমাত্র আইনি প্রক্রিয়ার আড়ালে — সেই অধিকার শেষ পর্যন্ত রাণী ভবানীর হাতে ন্যস্ত করা হয়। তবে বাস্তবে এটা ছিল নিম্নস্তরের ধর্মযাজকদের দুর্নীতিপরায়ণ, অদক্ষ এবং সাধারণত নিপীড়নমূলক ও অর্থলিপ্সু প্রশাসনের এক মর্মান্তিক ও বিস্ময়কর উদাহরণ; অথচ এই ধর্মযাজকরা তৎকালীন শাসনক্ষমতার কাছে ছিলেন সম্পূর্ণ অপরিচিত ও জবাবদিহি-বহির্ভূত। এই বিশাল অঞ্চলের শাসনভার পরিবারের হস্তান্তরের ঘটনাটি ঠিক সেই সময়েই ঘটেছিল। তখন সমগ্র ভূখণ্ডের বৃহত্তর অংশের প্রাচীনতম মালিক উদয়নারায়ণের বংশধারা আত্মহত্যা করে বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং ভূষণার সীতারামের বংশধারাকে সরকারি কর্তৃত্ব অমান্য করার কারণে চিরতরে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। জাফর খান — যিনি বৈকুণ্ঠ বা স্বর্গ নামের এক কুখ্যাত ও জঘন্য শাস্তিকক্ষ তৈরি করেছিলেন (নামটি ছিল ব্যঙ্গাত্মক, কারণ জায়গাটি ছিল নানাবিধ নোংরা আবর্জনায় পূর্ণ) — তিনিই এই দায়িত্ব অর্পণ করেন। জমিদারি সংক্রান্ত অপরাধের সাধারণ ঘটনাগুলোর শাস্তির চেয়ে বরং অপরাধ সংঘটন রোধ করাই ছিল এই কক্ষের উদ্দেশ্য; যা তাঁর দীর্ঘ ও দক্ষ প্রশাসনের সময় — যাকে সেকালের সবচেয়ে সক্ষম, সৎ ও কঠোর ন্যায়পরায়ণ শাসন হিসেবে গণ্য করা হতো — বাস্তবে কার্যকর হতে দেখা গিয়েছিল। সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকার ক্ষুণ্ণ না করে এবং নিজের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে থাকাকালীন সময়েই এমন একজন ব্যক্তি কীভাবে একজন ব্রাহ্মণকে এত বিশাল ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব — যা মূলত পুরোহিত-শ্রেণির কাজের পরিধির সম্পূর্ণ বাইরে — অর্পণ করতে পারলেন, তা কোনোভাবেই বিস্ময়কর নয়। হিন্দুদের এই উচ্চতর বর্ণের চাতুর্য ও আধিপত্য বিস্তারের মানসিকতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা সুপ্রতিষ্ঠিত নীতিমালার পরিপন্থী হয়েও — এবং রাজ্যের দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থের কথা বিন্দুমাত্র বিবেচনা না করেই — তিনি তাঁর এখতিয়ারভুক্ত সর্বোচ্চ ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদটি যেভাবে হস্তান্তর করলেন (যে পদটি প্রকৃতিগতভাবে স্থায়ী অথবা প্রথাগত উত্তরাধিকারের ধারায় উত্তরাধিকারীদের কাছে শর্তসাপেক্ষে হস্তান্তরের যোগ্য ছিল), তার একমাত্র ব্যাখ্যা পাওয়া যায় সেই ক্ষণস্থায়ী ও স্বার্থপর নীতির মধ্যে, যা স্বৈরতন্ত্রের অবমাননাকর প্রভাবাধীন সকল মানুষের মনকেই অনিবার্যভাবে প্রভাবিত করে। তিরস্ত্রি (Tirstrie) পরগনাটি [যতদূর সম্ভব ত্রিবেণী] — কিছু জায়গির বাদ দিয়ে এর আদি আয়তন অনুযায়ী — মুর্শিদাবাদ, ঘোড়াঘাট ও মাহমুদাবাদের চাকলাসমূহের এক বিশাল অংশ জুড়ে ছড়িয়ে ছিল; এর ভিতরে ছিল আজকের রাজশাহী, ভাতুরিয়া এবং নলদি বা ভূষণা অঞ্চল, মোট ১৩৯টি পরগনা নিয়ে গঠিত এবং নির্ধারিত রাজস্বের পরিমাণ ছিল ১৬,৯৬,০৮৭।
৩। দিনাজপুর — পাঞ্জেরা সরকারের হাভেলি (মূল এলাকা) বলা হতো এবং কখনও কখনও আওরঙ্গাবাদের অধীনে ইদরাকপুর-এর সাথেও গণ্য করা হতো — তা জাফর খান তাঁর শাসনকালের শেষভাগে অন্যান্য বড় জমিদারির মতোই প্রথমে রামনাথ নামক কায়স্থ বা লেখক বর্ণের এক অত্যন্ত বুদ্ধিমান ভূ-স্বামীর ওপর ন্যস্ত করেছিলেন। রামনাথ মূলত উত্তর হিন্দুস্তানের বাসিন্দা ছিলেন। বলা হয়, কৃষির উন্নতির জন্য জলাশয় বা পুকুর খননকালে গুপ্তধন আবিষ্কার করে তিনি প্রচুর সম্পদের মালিক হয়েছিলেন; আর তাই রাজ্যের প্রকৃত বা কৃত্রিম সংকটের অজুহাতে নাজিম (শাসক) তাঁর কাছে প্রায়শই আর্থিক সহায়তার দাবি জানাতেন। তবে প্রকৃত সত্য হয়তো, নিজের এখতিয়ারভুক্ত বিশাল পতিত জমি বিকাশ আর সুব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ফলপ্রসূ করে তোলা কিংবা সব দিকে — বিশেষ করে কোচবিহারের দিকে — গোপনে সীমানা সম্প্রসারণের ফলে তিনি সেই নীতিবাক্যটিই বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন: বুদ্ধি, পরিশ্রম বা সৌভাগ্যের সমন্বয়ে পরিচালিত কৃষি ও ভূমি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই বিপুল সম্পদ অর্জন করেছিলেন। যা-ই হোক, নিজের ব্যক্তিগত দক্ষতা ও বিচক্ষণতার গুণে এবং শাসকের প্রতিনিধি বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার প্রয়োজন ও আকাঙ্ক্ষা আগেভাগেই বুঝে নিয়ে নিয়মিত রাজস্বের বাইরেও মোটা অঙ্কের উপঢৌকন দিয়ে তিনি নিজ জেলায় অভ্যন্তরীণ শাসন পরিচালনার বিশেষ বার্ষিক সুবিধা ভোগ করতেন। ফলে অন্যান্য জমিদারের মতো তাঁকে হস্তবুদ (রাজস্বের প্রকৃত উৎস ও পরিমাণ যাচাই)-এর তদন্ত বা কোনো মুসলমান আমিলদারের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণের অধীন হতে হতো না। ১৭৫৭ সাল পর্যন্ত এই বিশেষ সুবিধাগুলো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি; ওই বছর নতুন রাজনৈতিক পরিবর্তনে সরকারের কার্যকর ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং নিয়মিত স্থায়ী সামরিক বাহিনী রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনে রাষ্ট্রীয় ব্যয় বেড়ে যায়। তখন রাজকীয় ন্যায্য ও অপরিহার্য অধিকার পুনরুদ্ধারের বিষয়টি জরুরি হয়ে পড়ে — যার আওতায় ফার্মিং কালেক্টর বা ইজারাদারদের দিয়ে প্রজাদের থেকে আদায়করা অথচ এতদিন প্রতারণামূলকভাবে নিজের কাজে ব্যবহৃত উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। মূলত জাগির বা নিষ্কর ভূমি বাদে এই জমিদারিতে ৮৯টি পরগনা অন্তর্ভুক্ত ছিল।
৪। নদীয়া (প্রকৃত নাম উখড়া, এবং অতিসম্প্রতি কৃষ্ণনগর নামে পরিচিত) — ভারতীয় ভূস্বামীদের মধ্যে প্রাচীন ও প্রতিষ্ঠিত শাসনব্যবস্থাকে ওলটপালট করে নিজেদের অবস্থানকে উচ্চতর ও রাজকীয় মর্যাদায় উন্নীত করার যে প্রবণতা দেখা যায়, তার অংশ হিসেবেই এই নতুন নামকরণ করা হয়েছিল। এই জমিদারির অধিকার বর্তমান শতাব্দীর শুরুতে ব্রাহ্মণ রঘুরামকে দেওয়া হয়। তিনি ছিলেন পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা প্রখ্যাত ভবানন্দের উত্তরাধিকারী; ভবানন্দর উপাধি ছিল মজমুয়াদার এবং সাতগাঁও সরকারের রাজস্ব বা জমার হিসাবরক্ষক ও সাময়িক প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। এই জেলাটি আয়তনে বিশাল এবং ভারতের উর্বর ভূমিতে উৎপাদিত মূল্যবান ফসলের জন্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ; হুগলি নদীর মাধ্যমে বাংলার প্রধান বিদেশি বসতিগুলোতে এখান থেকে সহজে ও দ্রুত পণ্য পরিবহন করা সম্ভব। তা সত্ত্বেও, জমিদারি থেকে রাজস্ব আত্মসাতের যে দুর্নীতিমূলক প্রথা এখানে প্রচলিত ছিল — এবং যা এক্ষেত্রে প্রতারণামূলকভাবে জমি হস্তান্তর বা একই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত স্বজনদের সরকারি পাওনা পরিশোধ থেকে অব্যাহতি প্রদানের মাধ্যমে আরও বৃদ্ধি পেয়েছিল — তার ফলে সমগ্র প্রদেশের সাধারণ রাজস্ব নির্ধারণে এবং আসল তুমারির (মূল রাজস্ব তালিকা) আনুপাতিক হিসেবে এই জেলার মূল্য ও আয় অত্যন্ত কম দেখানো হয়েছে; সেখানে মাত্র ৭৩টি পরগনার উল্লেখ পাওয়া যায়, যার মোট মূল্য ধরা হয়েছিল ৫,৯৪,৮৪৬ টাকা।
৫। বীরভূম, যা বাংলার বৃহত্তম মুসলিম জমিদারি ছিল, তা মূলত জাফর খাঁ কর্তৃক আফগান বা পাঠান বংশোদ্ভূত আসাদুল্লাহকে প্রদান করা হয়েছিল। শের শাহ ও তাঁর বংশধরদের বিতাড়নের পর আসাদুল্লাহকে এখানে বসতি স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়। এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল পশ্চিম সীমান্ত রক্ষা করা — বিশেষ করে ঝাড়খণ্ডের বর্বর হিন্দুদের আক্রমণ প্রতিহত করা। এই কাজের জন্য একদল যুদ্ধবাজ মুসলমান কৃষককে স্থায়ী মিলিশিয়া বা রক্ষীবাহিনী হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছিল এবং তাদের জন্য উপযুক্ত ভূখণ্ড বরাদ্দ করা হয়েছিল। এই বাহিনীর প্রধান ভূস্বামী ছিলেন রাষ্ট্রের স্বার্থের প্রতি গভীরভাবে অনুগত (ধর্মীয় কারণে), আবার একই সাথে তিনি ছিলেন সেই একই কুসংস্কারাচ্ছন্ন বিশ্বাসের অনুসারী নয় এমন সকল অবিশ্বাসীর ঘোর বিরোধী। সুতরাং, যদিও সাধারণভাবে একই ধরনের লিখিত দলিলের মাধ্যমে এই অঞ্চলটি প্রদত্ত হয়েছিল, তবুও এর মালিকানা বা ভোগ-দখলের শর্তাবলি ছিল দেশের প্রচলিত অন্য যেকোনো প্রথা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এর সাথে ইওরোপের প্রাচীন সামরিক জায়গির বা ফিফ (fief)-এর সাদৃশ্য ছিল; কারণ এর অন্তর্ভুক্ত নির্দিষ্ট কিছু জমি ছিল লাখেরাজ — অর্থাৎ কর-মুক্ত — এবং সেগুলোর আয় কেবল সৈন্যবাহিনীর ভরণপোষণের কাজেই ব্যয় করা হতো।
প্রকৃতিগতভাবে সাময়িক এই বিশেষ সুবিধাটি পরবর্তীতে কাসিম আলীর আমলে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়; কারণ পূর্ববর্তী মুসলিম শাসনব্যবস্থায় এটা সার্বভৌম ক্ষমতার পরিপন্থী এবং বর্তমান সময়ের প্রয়োজন কিংবা আরও বলিষ্ঠ ও বিচক্ষণ শাসনব্যবস্থার (যেখানে শাসনক্ষমতা ও সামরিক শক্তি অবিভাজ্যভাবে শাসকের হাতে থাকা আবশ্যক) সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হয়েছিল। এই প্রত্যাহারের ফলে সুবাদারির রাজকোষে কেফিয়ত (Keffyet) বা অতিরিক্ত আয় হিসেবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভূ-রাজস্ব যুক্ত হয়; যা ভুলবশত সমগ্র দেশে ইতিমধ্যে পর্যাপ্তভাবে কর-নির্ধারিত জমির হস্তবুদ (hustabood) বা প্রকৃত আয়-ক্ষমতার ওপর বর্ধিত ভাড়ার ফল বলে মনে করা হতো। সেই অনুযায়ী, করযোগ্য জমির আয়তন বিবেচনায় জমিদারির মূল সীমানা এর বর্তমান আনুমানিক এলাকার এক-তৃতীয়াংশের বেশি ছিল না; যদিও এর অন্তর্ভুক্ত পরগনাগুলোর সংখ্যা নামমাত্র অপরিবর্তিত — অর্থাৎ ২২টিই — রয়ে গেছে এবং তা থেকে আয় হয় ৩,৬৬,৫০৯।
৬। কলকাতা: পূর্বে মোহাম্মদ শরিফের এখতিয়ারভুক্ত অনেক ক্ষুদ্র তালুকদারের দখলে থাকা জমি — যা পরবর্তীতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জমিদারিতে পরিণত হয় এবং লর্ড ক্লাইভকে জায়গির হিসেবে প্রদান করা হয় — ২৭টি পরগনা নিয়ে গঠিত ছিল, যার মূল মূল্যায়ন ছিল ২,২২,৯৫৮।
৭। বিষ্ণুপুর (Bishenpoor): বর্ধমান চাকলার অন্তর্ভুক্ত; এই নামের বিশাল জমিদারি, ওড়িশার মেদিনীপুর এবং পচেত জেলার সীমানা দ্বারা পরিবেষ্টিত। এটা দাবি করা হয় যে, এটি ছিল একটি রাজপুত পরিবারের উত্তরাধিকার — ১,০২১ বছর ধরে ৫৫ জন রাজার নিয়মিত উত্তরাধিকারসূত্রে, এবং বাংলার সার্বভৌম শাসকের প্রতি কেবল একটি সামান্য পেশকাশ বা করের অধীন ছিল; ১৭১৫ সাল পর্যন্ত — অর্থাৎ জাফর খানের প্রশাসন শুরু হওয়ার পরপরই — যখন দেশটি আরও সম্পূর্ণভাবে বশীভূত হয়, যদিও তখনও অসম্পূর্ণভাবে অন্বেষিত ছিল এবং গোপাল সিং-এর ওপর পুনরায় জমিদারি দখল conferred করা হয় — যিনি ছিলেন বংশের উত্তরাধিকারী; ২টি পরগনা-র অধীনে মূল্যায়িত … ১,২৯,৮০৩ টাকা।
৮. ইউসুফপুর (Yusefpoor): রেনেল-এর বর্ণনা অনুযায়ী আধুনিক যশোর প্রদেশের প্রায় সমগ্র অংশই এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই শতাব্দীর শুরুতে কায়স্থ বংশোদ্ভূত কিষেন-রামকে এটা প্রদান করা হয়েছিল। তখন এর এখতিয়ারের মধ্যে ছিল সাঈদপুরের (Saidpoor) জমিদারি পরগনা — যা পরবর্তীতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং যার পৃথক মূল্যায়ন ছিল ৪৫,৮০৫ টাকা — তবে সব মিলিয়ে এটা ২৩টি পরগনা নিয়ে গঠিত ছিল।।। মূল্যায়ন ১,৮৭,৭৫৪-
৯. লস্করপুর (Lushkerpoor): এটা একটা ছোট অথচ উর্বর জমিদারি, যা কাঁচা রেশম ইত্যাদি উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। গঙ্গার পূর্ব তীরে কাসিমবাজার দ্বীপের বিপরীতে অবস্থিত এই জমিদারিটি সম্পূর্ণভাবে রাজশাহী জমিদারির এখতিয়ারভুক্ত ছিল। শুরুতে এটা অনুপনারায়ণ নামক এক ব্রাহ্মণকে প্রদান করা হয়েছিল। পরবর্তীতে এটা ১০ আনা ও ৫½ আনা (ষোল ভাগের অংশ হিসেবে) — এই দুই অসম ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। এর মধ্যে শুরুতে অন্তর্ভুক্ত থাকা তাহেরপুর (Tahrpoor) পরগনাটি অনেক আগেই এই জেলা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল; সব মিলিয়ে এটা ১৫টি পরগনা নিয়ে গঠিত ছিল এবং এর মূল্যায়ন ছিল ১,২৫,৫১৬ টাকা। [২৬৮]
টিকা ১
“৮০ বছর” প্রসঙ্গ
গ্রান্ট লিখেছেন — “১৭২৫ সালে (অর্থাৎ ব্রিটিশ বিজয়ের মাত্র ৮০ বছরের কিছু বেশি সময় আগে) রামজীবন নামক এক ব্রাহ্মণকে এই বিশাল এলাকার রাজস্ব সংগ্রহের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়।” এখানে দুটো কালিক সমস্যা স্পষ্ট — প্রথমত, ১৭২৫ থেকে ৮০ বছর যোগ করলে দাঁড়ায় ১৮০৫। কিন্তু বাংলায় ব্রিটিশ বিজয়ের কোনো তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ১৮০৫ সালে ঘটেনি। পলাশী (১৭৫৭) থেকে ১৭২৫ = ৩২ বছর; বক্সার (১৭৬৪) থেকে = ৩৯ বছর; দেওয়ানি (১৭৬৫) থেকে = ৪০ বছর। কোনোভাবেই ৮০ বছর হয় না। দ্বিতীয়ত, গ্রান্ট সম্ভবত “British conquest” বলতে বক্সারের যুদ্ধ (১৭৬৪) বা দেওয়ানি লাভ (১৭৬৫) — কোনোটিকেই স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করছেন না। তিনি যদি ১৮০৫-কে ব্রিটিশ বিজয় ধরেন, তাহলে সেটি ঐতিহাসিকভাবে ভুল — কারণ ১৮০৩ সালে দিল্লি ব্রিটিশদের অধীনে আসে, ১৮১৮ সালে মারাঠা সাম্রাজ্যের অবসান হয়; কিন্তু বাংলার প্রেক্ষাপটে ১৮০৫ কোনো মাইলফলক নয়। তাছাড়া তিনি রাজস্ব সমীক্ষা জমা দেন ১৭৮৬তে — ফলে ১৮০৩এর দিল্লি বিজয়ের ঘটনাকেও আমরা হিসেবের বাইরে রাখতে পারি।
তৃতীয়ত, ফার্মিঙ্গার ফিফথ রিপোর্টের দ্বিতীয় খণ্ডের ভূমিকায় গ্রান্টের লেখাকে “obscure, perplexed, and often unintelligible” বলে স্বীকার করেছেন। কিন্তু তার মত পোড় খাওয়া সম্পাদকের এই ত্রুটি চোখ এড়াল কেন সেটা বোঝা দুর্বোধ্য — ফার্মিঙ্গার সাধারণত গ্রান্ট বা শোরের যেসব অংশ বুঝতে পারতেন না বা যেগুলোকে সন্দেহজনক মনে করতেন, সেখানে “[sic]” লিখে ইঙ্গিত দিতেন যে পাঠ্যটি মূলের মতোই রাখা হয়েছে। কিন্তু এই “৮০ বছর antecedent” অংশে তিনি “[sic]” লেখেননি। এই অসঙ্গতিটি সম্ভবত তাঁর সতর্ক সম্পাদকীয় দৃষ্টিও এড়িয়ে গেছে।
চতুর্থত এর পেছনে আরেকটি মজার এবং সবচেয়ে জোরালো প্রমাণ রয়েছে, যা এই ভুলটিকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করে: মূল সংখ্যার ভুল (৩০ বনাম ৮০): জেমস গ্রান্টের সমসাময়িক অন্যান্য অনুলিপি এবং তৎকালীন কিছু প্রকাশনায় (যেমন পুরোনো সময়ের ক্যালকাটা রিভিউ পত্রিকার কিছু রেফারেন্সে) ঠিক এই অনুচ্ছেদ যখন উদ্ধৃত করা হয়েছে, সেখানে দেখা যায় মূল শব্দবন্ধটি আসলে ছিল “being little more than 30 years antecedent to the British conquest”।
গাণিতিক সত্যতা: আমরা যদি গাণিতিকভাবে মেলাই: ১৭২৫ (নাটোর জমিদারি অর্পণ) থেকে ১৭৫৭ (পলাশীর যুদ্ধ বা ব্রিটিশ বিজয়) এর ব্যবধান হলো ঠিক ৩২ বছর! এই ৩২ বছরকে বোঝাতেই জেমস গ্রান্ট মূল খসড়ায় লিখেছিলেন “little more than 30 years” (৩০ বছরের কিছু বেশি সময় আগে)।
ভুল যেভাবে স্থায়ী হলো: ১৭৮০-র দশকে হাতে লেখা নথির (Manuscript) টানা হাতের লেখায় ইংরেজিতে “30” এবং “80” দেখতে অনেক সময় প্রায় একই রকম লাগত। কোম্পানির ক্লার্কদের দ্বারা ফাইনাল কপি করার সময় কিংবা পরবর্তীতে পার্লামেন্টের জন্য টাইপসেট (Typeset) করার সময় কোনো এক পর্যায়ে অসাবধানতাবশত ‘30’ শব্দটি ‘80’-তে রূপান্তরিত হয়ে যায়। যেহেতু গ্রান্টের পুরো লেখার রচনারীতি অত্যন্ত জটিল, দীর্ঘ এবং গোলমেলে বাক্যে ভরা ছিল, তাই ফার্মিঙ্গারও সম্পাদনা করার সময় এই গাণিতিক অসঙ্গতিটিকে গ্রান্টের নিজস্ব কোনো “জটিল অর্থহীন বাক্য” বা মুদ্রণপ্রমাদ ভেবে হয়তো আলাদা করে ফুটনোট দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি বা তার চোখ এড়িয়ে গেছে।
টিকা ২
বাঙলা উপনিবেশিক সাহিত্যে রাণীভবানী চরিত্র বিচার
ঔপনিবেশিক ইতিহাস ও সাহিত্যে রাণী ভবানী একইসঙ্গে প্রশংসিত ও বিতর্কিত এক চরিত্র। একদিকে তাঁকে তাঁর প্রজারা নাটোরের রানী আর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করা ফকির-সন্ন্যাসীরা “অর্ধবঙ্গেশ্বরী” হিসেবে সম্মানিত করেছেন, অন্যদিকে উপনিবেশিক লেখকেরা তাঁকে কখনো শক্তিশালী প্রতিরোধকারী, আবার কখনো ব্রিটিশ-বিরোধী ষড়যন্ত্রের অংশীদার কিংবা ব্রিটিশ-সহায়ক হিসেবেও উপস্থাপন করেছে। প্রথম যুগের ঔপনিবেশিক প্রশাসকরা রাণী ভবানীর জমিদারি ব্যবস্থায় শ্রদ্ধা ও ভয়ের মিশ্রণ দেখিয়েছেন। ১৭৭০-এর দশকে রাজশাহীর ইংরেজ সুপারভাইজার বাউটন রাউস রাউস (Dissertation Concerning the Landed Property of Bengal-এর লেখক) জমিদারিতে রাজস্ব আদায়ে ইজারা ব্যবস্থা চালু করতে গিয়ে দেখেন — রাণীকে প্রজারা এতটাই শ্রদ্ধা করে যে তার জমিদারিতে বাস করা কেউই তাঁর জমি ইজারায় নিতে রাজি নয়; এমনকি রাণীর কর্মচারীদের চাপে স্থানীয় জমিদাররাও ইজারায় নিতে অস্বীকার করেন। এই ঘটনা রাউসের মনে জমিদারের সম্মান ও মর্যাদা এবং স্থায়ী ও বংশানুক্রমিক মালিকানা প্রতিষ্ঠার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা তৈরি করে। কিন্তু ঔপনিবেশিক প্রশাসনের শীর্ষস্তরের নির্দেশ ছিল যেকোনো মূল্যে রাণীর জমি ফার্মিংয়ে দিতে হবে — এবং রাউস তা করতে ব্যর্থ হওয়ায় তাঁকে সাজা পেতে হয়।
১৮৭৫-এ নবীনচন্দ্র সেন পলাশীর যুদ্ধ কাব্যে রাণী ভবানীকে ভিন্ন আলোকে উপস্থাপন করেন — সেখানে তাঁকে ব্রিটিশদের কোলাবরেটর হিশেবে চিত্রিত করা হয়। রজতকান্ত রায়ে বলছেন কবিএ এই উদ্যম আদতে রাণীর গৌরব-বিরোধিনী চরিত্রায়ন। ইতিহাস বলে, সিরাজ-উদ-দৌলার সেনাবাহিনী যখন তাঁর কন্যা তারাসুন্দরীকে দাবি করতে আসে, তখন রাণী নিজেই সেনাবাহিনী পরিচালনা করে সিরাজের বাহিনীকে পরাজিত করেন। এই প্রতিরোধের ইতিহাস ঔপনিবেশিক বয়ানে প্রায়শই চাপা পড়ে যায়।
ঔপনিবেশিক শাসনামলে রাণী ভবানী একদিকে প্রশংসিত হলেও অন্যদিকে তিনি ব্রিটিশ রাজস্ব নীতির শিকার হন। দেওয়ানি লাভের পর কোম্পানি রাজশাহী জমিদারির রাজস্ব এক লক্ষ থেকে বাড়িয়ে সাড়ে চৌত্রিশ লক্ষ টাকা করে দেয়, যা পরিশোধ করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। কারণ তিনি ইতিমধ্যে প্রায় ৪,২৯,১৪৯ বিঘা জমি লাখেরাজ হিসেবে দান করেছিলেন। ১৭৭২ সালের ফার্মিং সিস্টেম চালু হলে প্রজাদের ওপর অত্যাচার বেড়ে যায়। রাণীর আবেদনে সেই চিত্র স্পষ্ট: “ফার্মিং সিস্টেমের অধীনে প্রজাদের জমি, বলদ, কৃষি সরঞ্জাম সবই লুট করা হয়েছিল, যার ফলে দেশ জনশূন্য হয়ে পড়ছিল।” জীবনের শেষ পর্যায়ে এই বিশাল জমিদারির অধিকারিণীকে সরকারি ভাতার ওপর নির্ভর করতে হয়, যা শেষে মাত্র ১০০০ টাকায় নেমে আসে।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লুঠতরাজের বিরুদ্ধে অর্ধবঙ্গেশ্বরী, অমিয় বাগচী কথিত এম্পায়ার অব প্রফিট, প্রফিট ফর এম্পায়ারের করাল গ্রাসে পড়া বাংলায় ছিয়াত্তরের গণহত্যায় জনগণের ত্রাণে জমিদারির খাজাঞ্চিখানা খুলে দেওয়া রাণী ভবানীর একটি বৈপ্লবিক চিঠি ‘দ্য পিজান্ট্রি অব বেঙ্গল’এ রমেশচন্দ্র দত্ত তুলে ধরে বলেছেন কিভাবে দুলাল দত্ত অত্যাচার চালিয়েছে —
‘ভাদ্র মাসে নদীর বাঁধ ভাঙা প্রজার জমি ভাসিয়া গেল শস্য হইল না। আমি জমিদার সুতরাং প্রজাকে সর্বনাশ হতে রক্ষা করা কর্তব্য মনে করিলাম। খাজনা দাখিল সম্বন্ধে তাহাদিগকে সময় দিয়া যথা সাধ্য দুঃখ লাঘব করিলাম। সাহেবগনকে অনুরোধ করিলাম আমাকেও ঐরূপ সময় দেওয়া হউক। ক্রমে রাজস্ব পরিশোধ করিব। কিন্তু আমার প্রতি অবিশ্বাস করিয়া তাহারা আমার কাছারি আমার গৃহ হইতে মতিঝিলে স্থানান্তরিত করিলেন। এবং আমার ও দেশের নিকট খাজনা আদায় করিবার জন্য দুলাল রায়কে ভৃত্য ও সাজাওল নিযুক্ত করিলেন।
তাহার পর আমার বাড়ি ঘেরাও হইল। আমার টাকাকড়ির অনুসন্ধান হইল। আমি জমিদারস্বরূপ যাহা খাজনা আদায় করিয়াছিলাম, যাহা কর্জ করিয়া আনিয়া ছিলাম, আমার মাসিক নিত্য যাহা ছিল, সব লইয়া গেল। সর্বশুদ্ধ ২২৫৮৬৭৪ টাকা হইয়াছিল।
নতুন বৎসর ১৮৮১(১১৮১৭) সালে (১৭৭৪ খ্রিঃ) আমাকে সমস্ত অধিকারে বঞ্চিত করিয়া ২২,২৭,৮১৪ টাকায় দুলাল রায়কে আমার জমিদারি বিলি করিয়াছিল।….. যাহারা পূর্বে জমি ত্যাগ করিয়া গিয়েছিল তাহাদের নিকট যে খাজনা প্রাপ্য ছিল সেই খাজনা বর্তমান রায়তের নিকট আদায় করিতে লাগিল। এই দুইজন হুকুম জারি করিতে লাগিল, রায়তের যথাসর্বস্ব এমনকি শস্যবীজ ও বলদ পর্যন্ত হরণ করিতে লাগিল। এইরূপ প্রজাহ্রাস ও জমিদারি নষ্ট করিল। আমি পুরাতন জমিদার, আমি কোন দোষ করি নাই।
দেশ লুণ্ঠিত হইয়াছে।’
টীকা ৩
১. জমা-তুমারি-তশখিস — বাংলা সুবার সংশোধিত রাজস্ব-তালিকা। প্রথমে জাফর খানের (মুর্শিদ কুলি খান) আমলে প্রবর্তিত, পরে সুজা খানের আমলে (১৭২৮ খ্রিস্টাব্দ, ১১৩৫ ফসলি বঙ্গাব্দ) চূড়ান্ত রূপ পায়।
২. এহতিমাম — জমিদারি এলাকা — যা সনদ বা Letters patent-এর মাধ্যমে অর্পণ করা হতো।
৩. খালসা — সরাসরি সরকারি ব্যবস্থাপনাধীন ভূমি — যার রাজস্ব রাজকোষে যেত।
৪. জায়গির — সামরিক বা প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বেতনের বিনিময়ে দেওয়া ভূমি।
৫. আসল জমা তুমারি — মূল নির্ধারিত রাজস্ব-তালিকা — যা টোডরমল ১৫৮২ সালে নির্ধারণ করেন।
৬. ওয়াসিল — নতুন অধিকৃত অঞ্চল থেকে আসা রাজস্ব — যা মূল মূল্যায়নের সঙ্গে যোগ করা হয়।
৭. এজাফা — পুরনো খাজনার বৃদ্ধি — ভূমির ক্রমোন্নতি, হস্তাবুদের প্রকৃত উৎপাদন বা পর্যায়ক্রমিক তদন্তের মাধ্যমে।
৮. জেবতী — পুনরুদ্ধারকৃত ভূমি — যা জায়গিরে বরাদ্দ ছিল, পরে রাজকোষে ফিরিয়ে আনা হয়।
৯. জমা কামিল তুমারী — সমগ্র বাংলার ১৩টি চাকলার মোট রাজস্ব — যা খালসা ও জায়গির ভূমি, মহল ও সায়ের সহ গণনা করা হয়।
১০. সিক্কা রুপি — মুঘল আমলে প্রচলিত রুপি — যার মান মুদ্রার ওজন ও খাঁটি ধাতুর ভিত্তিতে নির্ধারিত।
১১. মহল — রাজস্বের একক — গ্রাম বা জমিদারির অংশ।
১২. সায়ের — ভূমি রাজস্ব বাদে রাজস্বের অতিরিক্ত উৎস — যেমন বাজার, শুল্ক, টোল ইত্যাদি।
১৩. রুকুনপুর (Rokinpoor) — আয়তনে বিশাল এবং সমগ্র বাংলার সমআয়তনের জমিদারিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সমৃদ্ধ। মূলত শাহ নারায়ণকে — যিনি সুবার সমস্ত জমির কানুনগো বা নিবন্ধক ছিলেন — এর এখতিয়ার প্রদান করা হয়েছিল। এই নিয়োগ ছিল অত্যন্ত অনুপযুক্ত ও অসাংবিধানিক। পরে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে একই পরিবারের দুই শাখার মধ্যে দাপ্তরিক সুবিধাটি অসমভাবে ভাগ করে দেওয়া হয়। ৬২টি পরগনা নিয়ে গঠিত; রাজস্ব ২,৪২,৯৪৩ টাকা।
১৪. মাহমুদশাহী — ভূষণা চাকলায় অবস্থিত; উৎপাদনশীলতায় তুলনামূলক কম — বিশেষত নলদি অঞ্চলের তুলনায়। ১৭২২ সালের পর রামদেব নামক এক ব্রাহ্মণকে প্রদান; জায়গিরসহ ২৯টি পরগনা; রাজস্ব ১,১০,৬৩৩ টাকা।
১৫. ফতেহসিংহ – অখণ্ড ও সুসংহত প্রশাসনিক এলাকা; ভাগীরথী বা কাশিমবাজার নদীর তীরে, মুর্শিদাবাদের সামান্য দক্ষিণে। হরি প্রসাদ নামক ব্রাহ্মণকে প্রদান। জরিপ-বহির্ভূত ছোট তালুক আলাদা করে নেওয়ায় ও রাজস্ব কমে আসায় কাগজে-কলমে ক্ষয়িষ্ণু মনে হলেও বাস্তবে জমির অবস্থার উন্নতি হয়েছিল। ১১টি পরগনা; রাজস্ব ১,৮৬,৪২১ টাকা।
১৬. ইদ্রাকপুর — রেনেলের মানচিত্রে ঘোড়াঘাট প্রদেশ হিসেবে দেখানো হয়েছে। মাঝে মাঝে দিনাজপুর ও রংপুরের সঙ্গে জোড়া লাগানো হতো; তবে বেশিরভাগ সময় কায়স্থ বিশ্বনাথের পরিবারের অধীনে স্বতন্ত্র জমিদারি হিসেবে টিকে ছিল। ৬০টি পরগনা; রাজস্ব ৮১,৯৭৫ টাকা।
১৭. ত্রিপুরা — বাংলার সর্বপূর্বের ও বিশাল আয়তনের জমিদারি; সিলেটের দক্ষিণে, বন্য হাতির বিচরণক্ষেত্র। শাহজাহানের রাজত্বকালে মানিক বংশের উত্তরাধিকারীদের থেকে জয় করা হয় এবং উদয়পুর সরকার গঠন করা হয়। ১১৩৫ বঙ্গাব্দে ৪টি পরগনা নিয়ে গঠিত হলেও পরে রোশনাবাদ পুনর্দখলের পর ২৪টি পরগনায় বিভক্ত হয়। প্রাথমিক রাজস্ব ৯২,৯৯৩ টাকা; তবে ৪৫,০০০ টাকার জায়গির বাদ দেওয়ার পর খাস অংশের জন্য মাত্র ৪৭,৯৯৩ টাকা অবশিষ্ট থাকে।
১৮. পচেত — বাংলার বিশাল ও সর্বপশ্চিমের জমিদারি; ছোটনাগপুর ও রামগড় দিয়ে ঘেরা। বিষ্ণুপুর সংলগ্ন অঞ্চল গুর-নারায়ণ নামক রাজপুত পরিবারের শাসনাধীন থাকায় বড় অংশ শুরুতে কেবল পেশকশ প্রদানের শর্তে শাসিত হতো। ২টি পরগনা; রাজস্ব ২৮,২০৩ টাকা।
১৯. সামগ্রিক হিসাব — খালসা ভূমির বার্ষিক রাজস্ব নির্ধারণ বা জমা বন্দোবস্ত তুমারির মোট হিসাবে বাংলার ১৫টি বড় জমিদারি অন্তর্ভুক্ত ছিল; মোট ৬১৫টি পরগনা; রাজস্ব ৬৫,২২,১১১ টাকা।
২০. মুর্শিদ কুলি খান — বাংলার দেওয়ান ও সুবাদার — গ্রান্ট বলছেন ১৭২২ সালে ১৩ চাকলার চূড়ান্ত বন্দোবস্ত করেন। মুজফফর আলম, সঞ্জয় সুব্রহ্মণ্যমের মতে, ১৩ চাকলার পুনর্গঠন আসলে তার রাজত্বের প্রাথমিক পর্যায়েই (১৭০৭-১৭১২) সম্পন্ন হয়েছিল — গ্রান্টের দাবির প্রায় এক দশক আগে।
২১. কানুনগো — মুঘল প্রশাসনিক পরিভাষায় নিবন্ধক বা হিসাবরক্ষক — যিনি জমির নথি ও রাজস্বের হিসাব সংরক্ষণ করতেন।
২২. রসুম — রাজস্ব আদায়ের বিনিময়ে প্রদত্ত কমিশন বা প্রচলিত ভাতা। এখানে ২.৫ শতাংশ হারে।
২৩. মিরাসি — উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তি বা ভূমি — যা কর-মুক্ত বা নামমাত্র করের অধীন।
২৪. কুইট-রেন্ট — নামমাত্র ভূমি-কর — যা প্রদান করে সামন্ততান্ত্রিক বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি পাওয়া যেত।
২৫. হস্তবুদ — জমির প্রকৃত আয়-ব্যয় ও উৎপাদন ক্ষমতা সংক্রান্ত জরিপ।
২৬. পেশকশ — করদ রাজা বা জমিদারদের সার্বভৌম শাসককে প্রদত্ত নির্দিষ্ট কর।
২৭. পরগনা — মুঘল প্রশাসনিক উপবিভাগ — মহল বা তালুকের সমতুল্য।
মন্তব্য
গ্রান্টের এই অংশ বাংলার জমিদারি ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক দেখায় — কীভাবে ছোট ছোট আর বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ড জমিদারি থেকে আলাদা করে নিয়ে – জুড়ে জুড়ে বিশাল এস্টেট তৈরি করা হতো। রুকুনপুরের উদাহরণে তিনি দেখান — শাহ নারায়ণ, কানুনগো হিসেবে নথি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থেকেও নিজেরস্বার্থে জমিদারির আয়তন বাড়িয়েছিলেন। উত্তর সরকারের মাসুলিপত্তনম বিভাগের উদাহরণ আরও স্পষ্ট। গ্রান্টের মূল বক্তব্য — এই ধরনের জমিদারি গঠনের প্রক্রিয়াই উপনিবেশিক রাজস্ব ব্যবস্থার বিকৃতির মূল কারণ।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ