| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার পার্থ সারথি পাত্র-র ছোটগল্প ‘টাইম-ব্যাঙ্ক’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সার্ধশতবর্ষে কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও শতবর্ষে সুরসম্রাট ভূপেন হাজারিকার স্মরণে : যশোবন্ত রায় মাটির নিচের ইন্টারনেট — অণুজীব ও উদ্ভিদের এক অদৃশ্য নেটওয়ার্ক : অন্বেষা গাঙ্গুলী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ব্রম্পটনে জ্ঞানেন্দ্রমোহন ঠাকুরের সমাধি : অসিত দাস শৌনক দত্ত-র ছোটগল্প ‘হোয়েন আই ওয়াজ ডেড’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ডোকরা শিল্পীদের কাহিনি : স্বর্ণাভা কাঁড়ার পীযূষ কান্তি দাস-এর ছোটগল্প ‘ছমছম পায়েল বাজে’ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শাশ্বত বোস-এর বড়োগল্প এক বসন্ত স্বাধীনতার জন্যে নন্দিনী অধিকারী-র বড়োগল্প ‘দুর্গাদালান’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নকশালবাড়ি স্থাননামের নকশাল শব্দটির উৎসের সন্ধান : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিনয় মজুমদারের কবিতা — বিজ্ঞান ও দর্শনের রসায়নজাত স্বতন্ত্র নির্মাণ : আনন্দগোপাল হালদার উৎসবে মানুষ নতুন হয়ে ওঠে : হাসান আজিজুল হক ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মৌসুমী মিত্র ভট্টাচার্য্য-র ছোটগল্প ‘চার্বাক দর্শন’ দুর্গা যখন মাঠংমা : শ্যামলী কর ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার গিরমিটিয়া ভারতীয়দের ইতিহাস — কলকাতা বন্দর থেকে বিশ্বজুড়ে এক সংগ্রামের কাহিনী : কমল ব্যানার্জী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com, আমাদের পোর্টালের কিছু ছবি বাদে প্রায় সব ছবিই অন্তর্জাল থেকে সংগ্রহ করা হয়। কারুর যদি কপিরাইট থাকে জানাবেন। আমরা সেই ছবি পোর্টাল থেকে ডিলিট করে দেব।

পার্থ সারথি পাত্র-র ছোটগল্প ‘টাইম-ব্যাঙ্ক’

Reporter
পার্থ সারথি পাত্র / ৬১ Views জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

তুহিন সরকার যাদবপুর থেকে কম্পিউটার ইনজিয়ারিং পাশ করে টি.সি.এসে চাকরি পেল। বর্ধমানের আউশগ্রামের মেধাবী ছাত্র তুহিন। ইউনিভারসিটিতে এসে তার রুমমেট ছিল তার বছরের বোর্ড ফার্স্ট; তার আগের বছরের বোর্ড ফার্স্ট।

আউশগ্রামের গ্রাম্য পরিবেশ থেকে যাদবপুরের পরিবেশে এসে প্রথমে তার মনে হয়েছিল যেন কোন স্বপ্নের ঠিকানায় এসে পড়েছে। তারপর বোর্ড ফার্স্টদের সাথে রুম শেয়ার করতে গিয়ে নিজেকে আরও অনেক সমৃদ্ধ করেছে তুহিন। কিন্তু কোনদিনই তার মন থেকে গ্রামের মেঠো পথের গন্ধখানা হারিয়ে যায়নি। বরং থার্ড ইয়ার বা ফোরথ ইয়ারের সময় পাকা ধানের সুবাস, তাতরশির ঘ্রাণ, কিংবা উঠোনের শিউলি ফোটা সকালটাকে বড় মিস করত।

ক্যাম্পাসিং-এ প্রথম চাকরি টি.সি.এসে। ফার্স্ট পোস্টিং ব্যাঙ্গালোরে। দু’বছরের মধ্যে বিদেশ যাওয়ার অফার এল। এবার সুইজারল্যাণ্ড। খবরটা শুনে আনন্দে ভেসে গেল তুহিন। এই দু’বছর কোথা থেকে কোথায় পৌঁছে গেছে সে ভাবলেই নিজে অবাক হয়ে যায়।

ঘরে বাবা-মায়ের চিন্তার শেষ নেই। আউশগ্রামের প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষকের ছেলে ইউরোপে যাবে এটাই গ্রামের সবচেয়ে বড় খবর। পথে, ঘাটে, মাঠে, চাষের জমিতে সবার মুখে এক কথা প্রদীপের ছেলে তুহিন বিলেত যাবে গো।

পাসপোর্টের কাজের জন্য ছেলে বাড়ি ফিরলে মা প্রশ্ন করেন, কি রে বাবু, তুই ওখানে গিয়ে কোথায় উঠবি কিছু ব্যবস্থা করতে পারলি? আমি কি করে তোর খোঁজ পাবো? কি খাবি? ইত্যাদি ইত্যাদি।

যাদবপুরে থাকাকালীন বাড়ির চিঁড়ে, মুড়ি, খই দিয়েই দু’বেলা কেটে যেত তুহিনের। দুপুরের এবং রাত্রির ভাতটা বড় কষ্ট করেই খেত। কোন কোন দিন রাত্রির খাবার খেতে ডাইনিং হলে যেতও না। ব্যাঙ্গালোরে থাকাকালীনও এই নিয়মের কোন ব্যতিক্রম হয়নি। কিন্তু এবার তো সেটা হয়েই যাবে। সেই চিন্তাটাই মায়ের কাছে বড় বেদনার হয়ে উঠেছে। ব্যাপারটা তুহিনের কাছেও খুব চাপের। সুইজারল্যাণ্ডে গিয়ে থাকা-খাওয়ার ভাবনার মাঝে হঠাৎ প্রদীপবাবু বললেন, তুহিন আমি তো ছোট থেকেই বেলুড় মঠে দীক্ষিত; একবার ওখানে গিয়ে বাবাজীকে বলি তোর ব্যাপারটা; জেনিভাতে আর.কে.মিশনের খুব বড় শাখা আছে। বছর দুই আগেও কল্পতরু উৎসবে ওখানের মঠের প্রধান বেলুড়ে এসেছিলেন। তখন আলাপও হয়েছিল। এখন হয়ত ভুলে গেছেন ৷

আবার মনে থাকতেও পারে। দেখি তো একবার যোগাযোগের চেষ্টা করে।

বাবা ছেলের কথার মাঝে তুহিনের ব্যাঙ্গালোরের এক বন্ধু অর্ঘ্য ফোন করে বলল, কি রে তুহিন, কবে বেরোবি?

— পরের মাসের দু-তারিখে ফ্লাইট রয়েছে।

— তুই ওখানে থাকার কোন ব্যবস্থা করতে পেরেছিস?

তুহিন চিন্তিত হয়ে জবাব দিল, না রে।

— শোন, তোর ব্যবস্থা আমি করে ফেলেছি।

তুহিন প্রথমে ভাবল, অর্ঘ্য তার সাথে বোধ হয় ঠাট্টা করছে। তাই বিষয়টাকে হাল্কাভাবে নিয়ে বলল, তুই ব্যাঙ্গালোরে বসে সুইজারল্যাণ্ডের ঠিকানা কি করে জোটালি রে ভাই?

অর্ঘ্য জানায়, আরে না রে, সেই যে তোর মনে আছে, আমাদের চেয়ে দু’বছরের সিনিয়ার রাহুলদা, ঐ যে রে রাহুল বোস ছিল না, ও তো সুইজারল্যাণ্ডে আজ বছর দুই রয়েছে। এবার ওখান থেকে স্টেটসে চলে যাবে। এই মাসেই সিফ্ট করবে, আমাকে গতকাল হোয়াটস্ অ্যাপ করেছিল; আমার তখন তোর কথা মাথায় এল। আমি বললাম, তুহিন যাবে, তোমার ওখানের রেসিডেন্টটা তোর নামে বুক করে দিতে। রাহুলদা রাজী হয়েছে। ও তো একজনের বাড়িতে পেয়িং গেস্ট থাকত। বাড়ির মালিক খুব ভালো শুনেছি। এতটুকু কষ্ট হয়নি তুহিনদার। হয়ত একটু কস্টলি হবে, বাট গুড; তুই একবার রাহুলদারসাথে কথা বলে নে, আমি ওর নাম্বারটা দিয়ে দিচ্ছি। তাহলে একেবারে বাড়ির মালিকের সাথেও কথা হয়ে যাবে।

হঠাৎ করে এত চিন্তার এত সহজ সমাধান পাওয়া যাবে এটা তুহিন স্বপ্নেও ভাবে নি।

অর্ঘ্য নাম্বার দিলে, তুহিন রাহুলকে লিখল, রাহুলদা, আমি তুহিন অর্ঘ্য-এর কাছে তোমার সব কথা শুনেছি। দাদা আগামী মাসে আমি সুইজারল্যাণ্ডে যাবো, তোমার ঠিকানাতেই যাতে উঠতে পারি তার ব্যবস্থা করে দাও প্লিজ।

ঘণ্টা দুই পর রাহুল রিপ্লাই দেয়, ঠিক আছে আমি তোকে বাড়ির মালিকের সাথে কথা বলিয়ে দেবো।

রাহুলের দু-ঘণ্টা মানে ঠিক দু-ঘণ্টাই। হোয়াটস অ্যাপ কল ঢুকল তুহিনের মোবাইলে। মা ব্যস্ত হয়ে বললেন, দেখ, দেখ বোধহয় তোকে রাহুল ফোন করেছে।

মানুষের কাছে প্রয়োজনের চেয়ে কোন বড় শিক্ষা নেই। প্রয়োজনের জন্যই মানুষ শিখতে শিখতে আজ গুহামানুষ থেকে বেরিয়ে এসে মহাকাশে পৌঁছে গেছে। হয়ত কখনও গ্রহান্তরীও হয়ে যেতে পারে।

আউশগ্রামে তখন সন্ধ্যা নেমেছে। ঘরে ঘরে তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বলছে, এদিক-ওদিক থেকে শঙ্খধ্বনি ভেসে আসছে। তুহিনের সাথে রাহুল কথা বলে বলল, নে তুই ম্যাডামের

সাথে কথা বলে নে।

ম্যাডাম—? একটু ঢোক গিলে তুহিন বলল, দাও ।

বয়স্ক ভদ্রমহিলা, মাই সন সম্বোধন করে কথা বললেন। মূলতঃ এগ্রিমেন্টের কথাই হল। আপাত এডভান্স বাবদ হাজার ইউরো দিতে বললেন। তুহিন কিভাবে দেবে ব্যাপারটা বুঝে উঠতে না পারলে রাহুল ফোনটা নিয়ে বলল, তুই চাপ নিস্ না, আমি তোর এ্যাডভান্স দিয়ে যাবো।

তুহিন প্রশ্ন করে, তোমাকে আমি টাকাটা দেবো কি করে?

— তুই আমার স্টেট ব্যাঙ্কের এ্যাকাউন্টে ইন্ডিয়ান কারেন্সি ট্রান্সফার করে দে।

হঠাৎ করে এতবড় সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। যাবতীয় সমস্যার সমাধান করে তুহিন পা রাখল পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ভূ-খণ্ডে। ধূলো নেই, ধোঁয়া নেই, সুশৃঙ্খল মানুষজন, ঝাঁ চকচকে রাস্তা, নীল আকাশ, সবুজ ঘাসে ঢাকা বিস্তীর্ণ মাঠ; তার শেষ প্রান্তে শ্বেত শুভ্র আল্পস পর্বত।

এয়ারপোর্টে অফিসের একজন স্টাফ এসেছিল তুহিনকে রিসিভ করতে। উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা; আগে থেকেই তুহিনের সাথে যোগাযোগ হয়েছে; অফিসের সবাই মিশ্রাজী বলে; প্রকৃতনাম নিতিশ মিশ্র। বয়সে বছর দশের বড় হবে তুহিনের চেয়ে। ভীষণ পরিশ্রমী। সুইজারল্যাণ্ডে যে কোন পরিবহনে যাতায়াতের জন্য পাস করিয়ে এনেছে। মুগ্ধতা চোখ নিয়েই তুহিন প্রথমে অফিসে পৌঁছালো। কাজকর্ম বুঝে তারপর ওখানের রেসিডেন্সের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হল। জুরিখ থেকে কিছু দূরে ছবির মত শহর লুসার্ন। সেখানেই তার নতুন ঠিকানা। খানিকটা কর্টেজের মত বাড়ি। সামনে বেশ অনেকটা ফাঁকা জায়গা। একেবারে মানালী বা মিরিখের মত। একটা মেঘের কুয়াশা ঘিরে রেখেছে গোটা এলাকাটা।

মিশ্রাজীর গাড়িতে তুহিন তার নতুন ঠিকানায় পৌঁছালো। বাড়ির মালকিন সোফিয়া লরেন্স রিটায়ার্ড টিচার। তিনি জুরিখের একটা গ্র্যাজুয়েট কলেজে অধ্যাপনা করতেন। নিঃসন্তান, স্বামী মারা গেছেন বছর দুই হল। তারপর থেকে একা। তাই দু-কামরার বাড়ির একটা রুম ভাড়া দেন কমবয়সী কোন অফিসের স্টাফকে। সন্তান স্নেহেই তাকে দেখেন। বিগত দু’বছর রাহুল ছিল। আর এখন তুহিন। শিক্ষিত ভদ্রমহিলা। ভারতবর্ষ সম্বন্ধে বরাবরই উচ্চ ধারণা ছিল। স্বামীর সাথে বহুবার জেনিভাতে রামকৃষ্ণ মিশনের আশ্রমে গিয়েছেন। তাই ভারতীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে অনেক কিছু জানেন। ভেবেছিলেন রিটায়ারমেন্টের পর একবার ভারতে আসবেন। কিন্তু হঠাৎ স্বামী মারা যাওয়ায় তাঁর জীবনের ছন্দটাকে একেবারেই আলাদা করে দিয়েছে। তাঁর সেই নিঃসঙ্গতার সময় রাহুল এসেছিল। সন্তান স্নেহে তারজন্য রান্না করা, টিফিন বানিয়ে দেওয়া সবই করতেন ভদ্রমহিলা। চলে যাওয়ার সময় রাহুল কেঁদেই ফেলেছিল। তুহিনকে লিখেছিল, বিদেশে এসে মায়ের অভাব বুঝতেই পারিনি ভাই।

তুহিনকে নিজের ঘর দেখিয়ে সোফিয়া বললেন, তুমি ফ্রেস হয়ে নাও, আমি তোমার টিফিনের ব্যবস্থা করছি।

দুপুরে অফিসে বাটার ব্রেড, ডিম, কলা, খেয়েছিল। বাড়ি থেকে কিছু চিঁড়ে, মুড়ি-মুড়কি নিয়ে এসেছে। যা এনেছে তাতে দিন দশ চলে যাবে।

ফ্রেস হয়ে এসে টিফিন বাটিতে মুড়ি চানাচুর নিয়ে বসেছে। ভদ্রমহিলা বড় একটা ট্রেতে ডিম ভাজা, বাড়িতে বানানো কেক সাথে ড্রাই ফ্রুটস ও এক মগ কফি নিয়ে এসে হাজির ।

ডিম ভাজাটা একেবারে বাঙালীদের মতই করেছেন। তুহিন প্রশ্ন করে আন্টি, এখানে এরকম ডিম ভাজার চল আছে?

— না, এটা রাহুল আমাকে শিখিয়েছে। ওর কাছে আমি তোমাদের মত অনেক কিছুই শিখেছি। আমারও খুব ভালো লাগে ইন্ডিয়ানদের মত খাওয়া-দাওয়া। এমন অনেক দিন গেছে, যখন রাহুল নিজে রান্না করেছে, আমি খেয়েছি বলতে বলতে কেমন অন্যমনস্ক হয়ে পড়লেন সোফিয়া।

প্রায় দুটো দিন বিনিদ্র কাটছে তুহিনের। বিমানের ন’ঘণ্টার জার্নিতে কখনও কখনও হয়ত চোখ লেগেছে। কিন্তু সেই ঘুমে শরীরের ক্লান্তি দূর হয় না। জুরিখে নেমেও অফিসে গিয়েছে। সেখানেও ঘণ্টা পাঁচ ধরে ডিউটি বুঝেছে। ঘরের শান্ত পরিবেশটুকু পেতে, একটু নিশ্চিন্ত হতেই চোখ দুটো জড়িয়ে আসতে চাইছিল তুহিনের। কষ্ট করেই খাওয়া সেরে বলল; আন্টি, আজ আর রাত্রিতে খাবো না। আমি শুয়ে যেতে চাইছি।

সোফিয়া বললেন, ওকে, মাই সন। তুমি দরজাটা বন্ধ করে, আলোটা নিভিয়ে দাও৷ আমি এরপর একটু বেরোবো। ঘণ্টা দুই থাকবো না। তোমার কোন প্রয়োজন থাকলে এখুনি জানিয়ে দাও।

তুহিন বলল, আমাকে দুটো জলের বোতল দিয়ে গেলেই হবে; আর কিছু চাই না। সোফিয়া প্রশ্ন করেন কাল কখন অফিসের জন্য বের হবে?

— আটটা নাগাদ।

— কাল কি অফিস থেকে গাড়ি আসবে নাকি ট্রেন ধরবে?

— না, না, ট্রেনেই চলে যাবো।

— ও, তবে তো সকালেই ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে যাবে, দুপুরের জন্য রাইস বানিয়ে দেবো, অফিসে নিয়ে চলে যাবে। বাড়ির চাবি একটা তোমার কাছে রাখো। যদি কখনও আমি বাড়িতে না থাকি, তুমি এসে যাতে বাড়িতে ঢুকতে পারো ।

এক ঘুমে সকাল। পরদিন ঝকঝকে লুসার্নে নতুন দিন শুরু হল তুহিনের। সকালে স্নান সেরে ব্রেকফাস্ট করে পায়ে হেঁটেই পৌঁছে গেল স্টেশনে। ঝাঁ চকচকে স্টেশন চত্বর। বড় একটা ভিড় নেই। স্টেশন থেকে বের হওয়া থেকে অফিস পৌঁছানো পর্যন্ত মোট পথ এক ঘণ্টার।

ট্রেনে বসেই হোয়াটস্ অ্যাপে ভিডিও কল করে বাবা-মাকে অপরূপ সুইজারল্যাণ্ডের কিছু ছবি দেখানোর চেষ্টা করল তুহিন। বলল, অসুবিধা হবে না মা; খুব ভালো জায়গার খোঁজ দিয়েছে রাহুলদা। তোমাদের চিন্তা করার কোন কারণ নেই। শুধু তোমরা নিজেদের খেয়াল রাখো। আমি ভালই আছি।

দিন কয়েকের মধ্যে বেশ সড়গড় হয়ে গেল তুহিন। অফিস থেকে ফিরতে মোটামুটি বিকেল পাঁচটা সাড়ে পাঁচটা বাজে। যেহেতু দুপুরে ভারী টিফিন করে তাই বিকেলে স্ন্যাকস্, কফি আর ড্রাই ফ্রুটসেই কাজ চলে যায়। তুহিনকে টিফিন দিয়ে সোফিয়া প্রতিদিন সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ বের হয়ে যান। ফেরেন প্রায় রাত্রি নটা সাড়ে নটা নাগাদ ৷

এটা তুহিন প্রথম দিন থেকেই দেখে আসছে। বিষয়টা নিয়ে তার কদিন থেকেই একটা কৌতূহল হচ্ছিল। প্রথম প্রথম ভাবতো, হয়তো প্রয়োজনীয় কিছু সংগ্রহের উদ্দেশ্যে বের হন। কিন্তু সেটা যখন নিত্যদিনের রুটিন হয়ে যায়; তখন তার মনে হয়, না এর মধ্যে নিশ্চয়ই অন্য কোন কারণ রয়েছে। তাই একদিন প্রশ্ন করা উচিত হবে কি হবে না সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে তুহিন প্রশ্ন করেই ফেলল, আন্টি যদি কিছু মনে না করেন, তবে একটা প্রশ্ন করবো? আপনি সন্ধ্যাবেলা প্রতিদিন কি কোন ডিউটিতে যান? নাকি কোন রিলেটিভের বাড়ি?

সোফিয়া উত্তর দেন, ডিউটি বলতে পারো, সমাজসেবা বলতে পারো। বা সময়কে জমা করা বলতে পারো।

অবাক হল তুহিন। প্রশ্ন করল, সময়কে জমা করা মানে?

— আমাদের এখানে টাইম ব্যাঙ্ক মূলতঃ সুইস ফেডারেল মিনিস্ট্রি অফ সোশ্যাল সিকিউরিটি কর্তৃক উদ্ভাবিত একটি অবসরকালীন ভাতা প্রকল্প। এতে কমবয়সীরা কর্মক্ষম অবস্থায় বয়স্ক মানুষদের যতটা সময় ধরে সেবা প্রদান করবেন, সেই সময়টা ব্যাঙ্কে জমা থাকবে। যখন তাঁরা জীবনের যে কোন সময় অসুস্থ বা অক্ষম হয়ে পড়বেন সেই সঞ্চিত সময় ব্যাঙ্ক থেকে তুলতে পারবেন। অর্থাৎ ব্যাঙ্কের নির্ধারিত কেও এসে তাঁকে নিঃশুল্কভাবে সেবা প্রদান করবেন। এই প্রকল্পের দরখাস্তকারীরা হবেন স্বাস্থ্যবান, কথাবার্তায় কুশলী এবং ভালোবাসাপ্রবণ। তাঁদের বয়স্ক মানুষের প্রয়োজনে সেবা প্রদানের জন্যপ্রস্তুত থাকতে হবে।

তাঁদের সেবার সময়, সোশ্যাল সিকিউরিটি সিস্টেম-এর পারসোন্যাল টাইম-এর খাতায় জমা থাকবে।

আমি বিরাশি বছরের একজন বৃদ্ধের জন্য প্রতিদিন সকালে দু-ঘণ্টা, আবার সন্ধ্যাবেলায় দু’ঘণ্টা সময় অতিবাহিত করি। উনি আমার গ্রাজুয়েশন লেভেলে কলেজের স্যার ছিলেন। একটা সময় আমাকে উনি অনেক সাহায্য করেছিলেন। স্যারের স্ত্রী বছর দুই হল মারা গেছেন। আমি জানতাম না। হঠাৎ টাইম ব্যাঙ্ক থেকে আমাকে জানানো হয় একজন বয়স্ক মানুষকে সেবা দেওয়ার জন্য। আমি গিয়ে দেখি উনি আমার স্যার। স্যারের নিউমোনিয়া হয়েছিল। আমি হসপিটাল থেকেই ওঁর সাথে আছি। আজ প্রায় দু-মাস হয়ে গেল। এখন উনি বেশ কিছুটা সুস্থ। তবে নিজের সব কাজ করার ক্ষমতা এখনও ওঁর হয়নি। আমি গিয়ে ওঁর রান্না করি, খেতে দিই, ওঁর জন্য বাজার করি। ঘর বাড়ি পরিষ্কার করে দিই, ওঁকে রোদে নিয়ে যাই, একটু গল্প করি, ওষুধ দিই। তারপর ঘণ্টা খানেকের প্রয়োজনীয় জিনিস হাতের কাছে নামিয়ে দিয়ে ফিরে আসি। আবার রাত্রিবেলা গিয়ে রান্না করি, খেতে দিই। ওষুধ দিই, সামনের লনে আবহাওয়া ভালো থাকলে একটু হাঁটিয়ে নিয়ে আসি। দু-ঘণ্টা করে মোট চারটা ঘণ্টা ওঁর জন্য আমি আমার সময় থেকে ব্যয় করি। অবশ্য এটা ব্যয় নয়। এটা সঞ্চয়।

টাইম ব্যাঙ্কের নিয়ম অনুযায়ী; এইভাবেই একবছর সেবা প্রদানের পর টাইম ব্যাঙ্ক তাঁর প্রদত্ত সেবা হিসাব করে পাশ বই-এর মত একটি টাইম ব্যাঙ্ক কার্ড দেবে।

যখন সেবাপ্রদানকারী তাঁর নিজের সেবার জন্য কাউকে প্রয়োজন হবে তখন তিনি টাইম ব্যাঙ্ক কার্ডটি ব্যবহার করে টাইম এবং টাইম ইনটারেস্ট তোলার অভিপ্রায় জানাবেন । টাইম ব্যাঙ্ক তখন অন্য একজন ভলেনটিয়ারকে প্রার্থীর বাড়িতে বা হাসপাতালে সেবা প্রদানের দায়িত্ব দেবেন।

তুহিন সব মন দিয়ে শুনল। কিছুটা তার বিশ্বাসযোগ্য মনে হলেও বেশীরভাগটা অবিশ্বাস্য লাগল। তবে কনসেপটা যে ভীষণ ভালো এবং নতুন এটা সে মনে মনে স্বীকার করল। সময়কে যে এভাবে হিসেব কষে ধরে রাখা যেতে পারে এটা দেখে সে —  আশ্চর্য্য হয়ে গেল। ভারতবর্ষের বেশীর ভাগ মানুষই সুইজারল্যাণ্ডকে অপরূপ প্রাকৃতিক শোভার জন্যই চেনে। অনেকের কাছে আন্তর্জাতিক কর্মকাণ্ডের এক প্রাণকেন্দ্র বলে পরিচিতি সুইজারল্যাণ্ড। কিন্তু সেখানে যে এমন এক কনসেপ্ট রয়েছে, যা ভারতবর্ষের খুব কম মানুষই জানে।

মাস দুই কেটে গেছে। বিদেশী পরিবেশে বেশ মানিয়ে নিয়েছে তুহিন। উইক এণ্ডে কখনও ফ্রান্স, কখনও ইটালি ঘুরতে যায়। কোন কিছুতেই খুব একটা সমস্যা হয় না। একদিন অফিসে কাজ করছে তুহিন হঠাৎ একটা ফোন এল, হসপিটাল থেকে, ওর জনল, সোফিয়া ম্যাডাম হাইটুল থেকে পড়ে গেছেন। তাঁর পায়ে ফ্রাকচার এসেছে।

তুহিন সেদিনের মত অফিসের কাজকর্ম তাড়াতাড়ি গুটিয়ে রেখে হসপিটাল এল। অন্ততঃপক্ষে এক মাস সম্পূর্ণ বেড রিডিং।

তুহিন প্রশ্ন করল, আন্টি আমি তাহলে কটা দিন অফিস ছুটি নিয়ে আপনার কাছে থাকি? এই অবস্থায় আপনাকে একা রেখে অফিসে আমি যেতে পারবো না।

সোফিয়া মৃদু হেসে জবাব দিলেন, ডোন্ট ওরি মাই সন। আমি টাইম ব্যাঙ্কে খবর পাঠিয়েছি। ওখান থেকে একমাসের জন্য রোজ চারঘণ্টার এটেনডেন্স চেয়ে পাঠিয়েছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই কেউ না কেউ ঠিক এসে যাবে ।

তুহিন অবাক হয়ে গেল। সত্যিই আধাঘণ্টার মধ্যে একজন মধ্যবয়সী ভদ্রমহিলা এসে হাজির।

সোফিয়া তুহিনকে বলল; যে দিনগুলো আমি হসপিটালে থাকবো; সেদিনগুলো তোমার একটু কষ্ট হবে; কিন্তু আমি বাড়ি ফিরে গেলে, যিনি আমার জন্য খাবার তৈরি করবেন, তিনি তোমার জন্যও করে দেবেন। তখন তোমার কোন কষ্ট হবে না। এই কটা দিন একটু কষ্ট করে চালিয়ে নাও।

তুহিন হেসে বলল, আন্টি, আপনি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যান। আমি ছোট থেকে হোস্টেলে থেকেছি, আমার নিজের কাজ নিজে করার অভিজ্ঞতা রয়েছে।

হাসপাতাল চত্বর থেকে বেরিয়ে মূল রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে এটাই ভাবছিল তুহিন, মানুষ তার বুদ্ধি দিয়ে কত কিছুই না করেছে। কোথাও জীবনকে সহজ সুন্দর করার এমন সুন্দর ব্যবস্থা, আবার কোথাও সেই জীবনকেই কঠিন করে তোলার পথ খুঁজে নিয়েছে।

প্রয়োজন মানুষের চিরন্তন। যতদিন জীবন রয়েছে ততদিনই প্রয়োজন রইবে। সমাজ ব্যবস্থার মাধ্যমে পরস্পরকে সাহায্য করার এত সুন্দর পদ্ধতি অবিলম্বে অন্যান্য দেশও গ্রহণ করতে পারে। ভাবতে ভাবতে তুহিন এসে হাজির হল তার ভাড়া ঘরের দোরগোড়ায়।

আপনার মতামত লিখুন :

One response to “পার্থ সারথি পাত্র-র ছোটগল্প ‘টাইম-ব্যাঙ্ক’”

  1. pijushkanti das says:

    অসাধারণ এক গল্প
    আমাদের দেশে ও যদি এএই ব্যবস্থা থাকত তবে কতই না ভালো হতো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Currently Maintained by the2.dev