
৬৭. যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ওরফে নিরালম্ব স্বামী
‘যদি যাও চান্না / ঘরে উঠবে কান্না।’ প্রাচীন প্রবাদ। কিন্তু চান্না গেলে ঘরে কান্না উঠবে কেন? আসলে চান্না গ্রামে যাবার পথে ছিল গভীর শালবন আর সেই বনে ঠ্যাঙাড়রা। এক সময়ে এই গ্রামে ছিল চন্দন গাছের প্রাচুর্য। তাই নাম হয়েছে চন্না গ্রাম। কিন্তু চান্না গ্রামটা কোথায়? পূর্ব বর্ধমান জেলার খড়ি নদীর পারে গলসির চন্নাগ্রাম। এই গ্রামে দুজন মানুষের জন্য বিখ্যাত হবয় আছে।
তাঁদের একজন হলেন সাধক কমলাকান্ত ভট্টাচার্য। কমলাকান্ত অ ম্বিকা-কালনায় জনমগ্রহণ করলেও তাঁর বাবার অকালমৃত্যুর পরে তাঁর মা কমলাকান্ত আর শ্যামাকান্তকে নিয়ে চলে আসেন তাঁর বাপের বাড়ি চন্নাগ্রামে।
আর একজন কে?
তিনি হলেন নিরালম্ব স্বামী। গলসির ২ নম্বর ব্লকে চন্নগ্রামে গেলে দেখা যাবে চান্না আশ্রম। খড়ের চালের সেই ছোট ঘরে একদিন আসতেন ভগত সিং-এর বাবা কিষেণ সিং, বটুকেশ্বর দত্ত, লালা লাজপত রায়, সুভাষচন্দ্র বসু, অরবিন্দ ঘোষ, বারীন্দ্র ঘোষ, চিত্তরঞ্জন দাশ, ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত, বিপিনবিহারী গাঙ্গুলি, জীবনতারা হালদার, যাদুগোপাল মুখোপাধ্যায়, তিব্বতীবাবা, ফকির রায় প্রভৃতিরা। আসতেন নিরালম্ব স্বামীর কাছে। বিপ্লবের কর্মপথের আলোচনা হত এই ছোট ঘরে।
নিরালম্ব স্বামী হলেন কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছেলে যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৭৭-১৯৩০)। তখনকার বিপ্লবীরা যাঁকে বলতেন ‘অগ্নিযুগের ব্রহ্মা’। ছোটবেলায় দুরন্ত ছিলেন তিনি। তাঁকে শান্ত করার জন্য কালীচরণ তাঁকে নিয়ে যান এক সাধুর কাছে। লোকে বলত এই সাধুকে বন্দুক দিয়ে গুলি করলে তাঁর কিছুই হয় না। যতীন্দ্রনাথ সাধুর কাছে গিয়ে বাবাকে বলেছিলেন, ‘একবার দেখব গুলি করলে কিছু হয় কি না?’
গ্রামের বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে তিনি বর্ধমান রাজ কলেজে ভর্তি হন। তখন থেকে তাঁর মনে দেশপ্রেমের উন্মেষ। ইংরেজের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য তিনি সামরিক কলাকৌশল শিখতে চাইলেন। এফ এ পাশ করে চলে গেলেন বরোদায়। সেখানে নিজের নাম গোপন করে ছদ্মনামে যোগ দিলেন অশ্বারোহী বাহিনীতে।
অরবিন্দ ঘোষ তখন বরোদা রাজ কলেজের অধ্যক্ষ। তাঁর সঙ্গে পরিচয় হল যতীন্দ্রনাথের। বিপ্লব মন্ত্রে দীক্ষিত হলেন তিনি। অরবিন্দের নির্দেশে বারীন ঘোষের সঙ্গে যতীন্দ্রনাথ চলে এলেন কলকাতায়। উঠলেন ৪নম্বর শ্যামপুকুর লেনে যোগেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষণের বাড়িতে। এখানেই ছিল অনুশীলন সমিতির আখড়া। তারপর ১০২ নম্বর সার্কুলার রোডে একটি বাড়ি ভাড়া নিলেন। সে বাড়ির পাশেই থাকতেন নিবেদিতা। বরোদায় নিবেদিতার সঙ্গে তাঁর আলাপ হয়েছিল অরবিন্দ ঘোষের মাধ্যমে। নিবেদিতা ও তাঁর চেষ্টায় ১০২ নম্বর সার্কুলার রোডের বাড়িটি বিপ্লবীদের শিক্ষাকেন্দ্র হয়ে ওঠে।
ততদিনে অরবিন্দও চলে এসেছেন কলকাতায়। একদিন অরবিন্দ তাঁকে বললেন যে বিপ্লবের বাণী দেশের দিকে দিকে ছড়িয়ে দিতে হবে। অরবিন্দের নির্দেশে যতীন্দ্রনাথ চলে গেলেন পাঞ্জাব। সে সময়ে পাঞ্জাবে করবৃদ্ধি ও চন্দ্রভাগা জল কর আইনকে কেন্দ্র করে মানুষের মনে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। যতীন্দ্রনাথ পাঞ্জাবে গিয়ে বিখ্যাত বাবা গুরুদিৎ সিংএর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। এই গুরুদিৎ সিংএর সাহায্যে তিনি পাঞ্জাবে গড়ে তুলেন বিপ্লবীদের একটি শাখা। ভগৎ সিংএর বাবা ছিলেন সে শাখার প্রথম দিকের সদস্য। অনেকে বলেন যতীন্দ্রনাথ পাম্জাবে এভাবে গদর পার্টির বীজ পুঁতে এসেছিলেন।
যতীন্দ্রনাথের জীবনে একটা পরিবর্তন এল। আলমোড়াতে তিনি যখন ছিলেন, তখন পরিচয় হয় সাধক শ্রীমৎ সোহহং স্বামীর সঙ্গে। যতীন্দ্রনাথ সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। তাঁর নতুন নাম হয় নিরালম্ব স্বামী।
ফিরে এলেন নিজের গ্রাম চান্নায়। ২৫ বিঘা জমির উপর তিনি তৈরি করেন ছোট একটি কুটির। চান্না আশ্রম। সে আশ্রমে চলতে থাকে সাধন-ভজন, আধ্যাত্মিক আলোচনা। সাধন-ভজনের আড়ালে অব্যাহত ছিল বিপ্লবী কাজকর্ম। বিপ্লবী কাজের জন্য এই জায়গাকে বেছে নেও্য়ার কারণও ছিল। একদিকে নদী, জঙ্গল আবার যোগাযোগের জন্য সমনে খানা জংশন।
কমলকৃষ্ণ দে লিখেছেন, ‘ ব্রিটিশদের হাত থেকে দেশ ও দেশবাসীকে রক্ষা করতে ব্রিটিশ শাসনকে উৎখাত করার প্রতিজ্ঞা নিয়ে চন্দন গাছে ঘেরা খড়িনদীর ধারে গলসীর চন্নাগ্রামে ১৯০৭ সাল নাগাদ বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ওরফে শ্রীমৎ স্বামী নিরালম্ব প্রতিষ্ঠা করেন এক আশ্রম যা পরবর্তীকালে চান্না আশ্রম নামে খ্যাতিলাভ করে। তৎকালীন সময়ে এই আশ্রমই ছিল ভারত তথা বাংলার বহু স্বাধীনতা সংগ্রামীর গোপন ডেরা। এই আশ্রমে বসেই তৎকালীন বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও অন্যান্য বিপ্লবীরা রাতের পর রাত গোপন সভা করতেন। সেখান থেকেই ছকে নেওয়া হত বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের নানান ব্লুপ্রিন্ট।
‘সেই গৌরবময় ইতিহাসের সাক্ষী এই আশ্রম আজ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অবহেলিত অবস্থায় পড়ে আছে। কার্যত গোচারণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামের এক বর্ণময় ইতিহাস।’