
হড়পা বান মানে নদীতে আসা হঠাৎ বন্যা। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষ অভিধানে শব্দটিকে প্রাদেশিক বা দেশি বলা হয়েছে। গোলাম মুর্শিদ সম্পাদিত বাংলা একাডেমি বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান তো শব্দটিকে বিশেষ্য বলেই খালাস। কোনো গোত্রভুক্ত করেনি। তবে প্রয়োগ উদাহরণ আছে এখানে।
‘হু হু করে অশ্রুর হড়পা বান বয়ে গেল।’ নজরুল ইসলাম লিখেছেন ১৯২২ সালে।
জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের বাঙ্গালা ভাষার অভিধানে শব্দটি নেই। নেই সুবলচন্দ্র মিত্রর আদর্শ বাঙ্গালা অভিধানেও। আমরা জানি, বাংলাভাষার বেশির ভাগ দেশি বা অজ্ঞাতমূল শব্দই হয় দ্রাবিড়, না হয় অস্ট্রিক ভাষা থেকে এসেছে।
তাহলে কি দ্রাবিড় বা অস্ট্রিক ভাষা থেকেই এসেছে হড়পা? খুঁজতে গিয়ে দেখলাম, কন্নড় ভাষায় হুরুপু মানে অতিরিক্ত উদ্দীপনা, উৎসাহ। হড়পা বানের হঠাৎ জলোচ্ছ্বাস তো জলীয় উদ্দীপনারই ফসল। হুরুপু থেকে হড়পা আসতেই পারে। নেপথ্যে যাই থাকুক না কেন।
হড়পা বান বা ‘ফ্ল্যাশ ফ্লাড’ (Flash Flood) প্রকৃতির এক আকস্মিক ও ধ্বংসাত্মক রূপ। এটি কোনো সাধারণ প্লাবন নয়, যেখানে জল ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায় এবং মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার পর্যাপ্ত সময় দেয়। হড়পা বান আসে অত্যন্ত দ্রুত, ক্ষিপ্র বেগে এবং কোনো পূর্বসংকেত ছাড়াই। সাধারণত পাহাড়ি বা ঢালু অঞ্চলে হঠাৎ অতিভারী বৃষ্টির ফলে কয়েক মিনিটের মধ্যে প্লাবনের সৃষ্টি হয়। মুহূর্তের মধ্যে শুকিয়ে যাওয়া নদীর খাদ বা শান্ত পার্বত্য নদী উত্তাল রূদ্রমূর্তি ধারণ করে এবং গতিপথে আসা ঘরবাড়ি, সেতু, গাছপালা, গবাদিপশু ও মানুষকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। বিশ্ব উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে হড়পা বানের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে।
সহজ কথায়, নদী বা খালের অববাহিকায় অতিরিক্ত জল জমে যখন অতি অল্প সময়ের মধ্যে — সাধারণত ৩ থেকে ৬ ঘণ্টার মধ্যে — উপকূল প্লাবিত করে প্রলয়ঙ্কারী রূপ নেয়, তাকে হড়পা বান বলে। এটি ঘটে যখন মাটিতে জল শোষণের ক্ষমতা থাকে না এবং বৃষ্টির জল মাটির ওপর দিয়ে তীব্র বেগে গড়িয়ে নিচে নামতে থাকে। পাহাড়ি উপত্যকায় বা সরু নদীর খাদে অতিরিক্ত জলের চাপ তৈরি হলে সেই জল পর্বতগাত্র বেয়ে ভয়াল বেগে নিচে নেমে আসে।
হড়পা বানের প্রধান প্রধান কারণ, —
হড়পা বানের পেছনে প্রাকৃতিক এবং মানবসৃষ্ট, উভয় প্রকার কারণই দায়ী :
মেঘভাঙা বৃষ্টি (Cloudburst) : পার্বত্য অঞ্চলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে (ঘণ্টায় ১০০ মিমি বা তার বেশি) কোনো নির্দিষ্ট এক জায়গায় মেঘ ভেঙে প্রচণ্ড বৃষ্টিপাত হলে হড়পা বানের সৃষ্টি হয়।
হিমবাহ হ্রদের বিস্ফোরণ (GLOF-Glacier Lake Outburst Flood) : বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে হিমালয় বা অন্যান্য পার্বত্য অঞ্চলের হিমবাহগুলো দ্রুত গলছে। ফলে হিমবাহের পেছনে বড় বড় হ্রদ তৈরি হয়। কোনো কারণে এই হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ (পাথর ও বরফের স্তূপ) ভেঙে গেলে এক লহমায় বিপুল পরিমাণ জল নিচে নেমে এসে হড়পা বান ঘটায়।
অপরিণামদর্শী পাহাড় কাটা ও নির্মাণকাজ : পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি, বহুতল ভবন নির্মাণ, অনিয়ন্ত্রিত সুড়ঙ্গ খোঁড়া ইত্যাদি কারণে পাহাড়ি ঢাল দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে ধস নেমে নদীর গতিপথ রুদ্ধ হয়। পরবর্তী সময়ে সেই কৃত্রিম বাঁধ ভেঙে প্রচণ্ড বেগে জল নিচে ধেয়ে আসে।
বনভূমি ধ্বংস : গাছপালার শিকড় মাটিকে ধরে রাখে এবং বৃষ্টির জলের গতি কমিয়ে দেয়। ব্যাপক হারে গাছ কাটার ফলে মাটির জল শোষণের ক্ষমতা কমে যায়, যার ফলে বৃষ্টির সম্পূর্ণ জল একযোগে মাটির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।
পাহাড়ি নদীর গতিপথ পরিবর্তন ও দখল : নদীর স্বাভাবিক গতিপথে বাঁধ দেওয়া বা নদীর পলি জমে গভীরতা কমে যাওয়ার ফলে অতিরিক্ত জল ধারণ ক্ষমতা নদী হারিয়ে ফেলে।
হড়পা বানের ভয়াবহ প্রভাব : —
হড়পা বানের প্রভাবে মানবসমাজ এবং পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, —
জীবন ও সম্পদের ক্ষতি : হড়পা বান যেহেতু কোনো সতর্কবার্তা না দিয়ে আসে, তাই মানুষ নিরাপদ স্থানে যাওয়ার সময় পায় না। মানুষ, গবাদিপশু ও বন্যপ্রাণীর মৃত্যু হয়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বাড়িঘর, যানবাহন, সেতু এবং বিদ্যুতের খুঁটি ভেসে যায়।
অবকাঠামোগত ধ্বংস : পাহাড়ি অঞ্চলের রাস্তাঘাট ও সেতু ভেঙে যাওয়ার কারণে উপদ্রুত এলাকাগুলো উপত্যকা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে উদ্ধারকার্য চালানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
কৃষি ও জীবিকার ক্ষতি : চাষের জমি পলি, পাথর ও বালির নিচে চাপা পড়ে যায়। পাহাড়ি অঞ্চলের কৃষকদের বছরের পর বছরের পরিশ্রম ব্যর্থ হয়ে যায়। পাশাপাশি পর্যটন শিল্পের ওপর নির্ভরশীল মানুষদের জীবিকা স্তব্ধ হয়ে পড়ে।
পরিবেশগত বিপর্যয় : নদী তীরবর্তী ইকোসিস্টেম বা বাস্তুতন্ত্র নষ্ট হয়। মাটির উপরিভাগের উর্বর অংশ ধুয়ে যায় এবং ব্যাপক ধস (Landslide) সৃষ্টি হয়।
উপমহাদেশীয় প্রেক্ষাপট ও উদাহরণ, —
ভারত, নেপাল ও ভুটানের মতো হিমালয় সংলগ্ন দেশগুলোতে হড়পা বান অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু প্রাণঘাতী ঘটনা। ভারতের উত্তরাখণ্ড, হিমাচল প্রদেশ, জম্মু-কাশ্মীর এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোতে প্রতি বছর বর্ষাকালে হড়পা বানের ঘটনা ঘটে।
২০১৩ সালের কেদারনাথ বিপর্যয় : মেঘভাঙা বৃষ্টি ও চোরবারি হ্রদের বাঁধ ভাঙার ফলে মন্দাকিনী নদীতে আসা হড়পা বানে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।
২০২১ সালের চামোলি বিপর্যয় : হিমবাহের অংশ ধসে ঋষিগঙ্গা ও ধৌলীগঙ্গা নদীতে ভয়ংকর হড়পা বান আসে, যা নির্মাণাধীন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোকে ধ্বংস করে দেয়।
সিকিম ও উত্তরবঙ্গের হড়পা বান : সিকিমের লোনাক হ্রদ ফেটে তিস্তা নদীতে আসা হড়পা বান গোটা উত্তরবঙ্গ ও সিকিমের যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়েছিল।
হড়পা বান প্রতিরোধ ও মোকাবিলা, —
হড়পা বান সম্পূর্ণভাবে আটকানো সম্ভব নয়, তবে আগাম সতর্কতা ও সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করলে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেকটাই কমানো সম্ভব।
প্রারম্ভিক সতর্কবার্তা ব্যবস্থা (Early Warning System) : পার্বত্য অঞ্চলে রাডার, স্যাটেলাইট ও নদীর জলস্তর মাপার সেন্সর বসিয়ে আগাম পূর্বাভাস দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
বৃক্ষরোপণ ও মৃত্তিকা সংরক্ষণ : পাহাড়ি ঢালে ব্যাপক পরিমাণে গাছ লাগানো দরকার, যাতে মাটির জল শোষণ ক্ষমতা বাড়ে এবং ক্ষয় রোধ হয়।
নিয়ন্ত্রিত নগর পরিকল্পনা : পাহাড়ি অঞ্চলে যথেচ্ছ বাড়িঘর নির্মাণ ও নদীখাদ দখল বন্ধ করতে হবে। পরিবেশবান্ধব ও ভূ-প্রকৃতির উপযোগী পরিকাঠামো তৈরি করা উচিত।
হিমবাহ হ্রদ মনিটরিং : বিপজ্জনক হিমবাহ হ্রদ চিহ্নিত করে সেগুলোর জল কৃত্রিমভাবে নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে বাঁধ ভাঙার ঝুঁকি কমে।
জনসচেতনতা ও মহড়া : পাহাড়ি এলাকার অধিবাসী ও পর্যটকদের হড়পা বান সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। বান আসলে কীভাবে দ্রুত উঁচুতে আশ্রয় নিতে হয়, সে বিষয়ে মহড়ার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
হড়পা বান প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও এর ভয়াবহতার পেছনে মানুষের প্রকৃতি-বিরোধী কাজকর্ম অনেক অংশে দায়ী। প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রেখে যদি উন্নয়নের কাজ পরিচালনা করা যায়, তবে এই বিপর্যয়ের মাত্রা হ্রাস করা সম্ভব। জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, সঠিক আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং জনসচেতনতার সমন্বয়েই কেবল হড়পা বানের মতো প্রলয়ঙ্করী শক্তির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অমূল্য মানবজীবন ও সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব।
নেপাল-তিব্বতের এবারে হড়পা বান যে কীরকম প্রাণঘাতী হতে পারে তা তো দেখাই গেল। নিখোঁজ হাজার হাজার, মৃত ১৫০০-র কাছাকাছি। দেশিবিদেশি বহু পর্যটক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের শিকার হলেন। কৈলাস মানস সরোবর যাত্রীরা বেঘোরে প্রাণ হারালেন। তবে কাদাটাই প্রাণঘাতী হল বেশি। শুধু জলের তাণ্ডব হলে, মানুষের বাঁচার ক্ষীণ আশা থাকে। কাদাজল নাকে মুখে ঢুকে মানুষের ফুসফুসকে নিমেষে অকেজো করে দেয়। এই প্রলয়ঙ্কর Mud flood হড়পা বানের ভয়ালতম রূপ। আমেরিকাবাসী ছেলে যখন মায়ের নিখোঁজ হওয়ার খবর পেয়ে দেশে ফিরে আসে, আবার নেপাল রওনা হয় মাকে উদ্ধারের শেষ চেষ্টায়, পরিশেষে ব্যর্থমনোরথ হয়ে ডিএনএ টেস্টের জন্যে রক্ত দিয়ে ঘরে ফিরে আসে, তখন আমাদেরও চোখ থেকে দুফোঁটা জল নিজের অজান্তেই ঝরে পড়ে।