| | |
এই মুহূর্তে ::
জলবায়ূ দুর্যোগ কোনো সীমান্ত মানে না : নিকোলাস বিশ্বাস জিয়াউর রহমানের বিএনপি গঠন ও ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ : অধ্যাপক ড. মিল্টন বিশ্বাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার রবীন্দ্রনাথ ও বঙ্গপুঙ্গবের রাখী : অসিত দাস কবরের মানুষ : সোহেল আর রানা (তরু) আজ রাখী বন্ধন…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নিম্নচাপের বৃষ্টিতে নষ্ট সবজি, আকাশ ছোঁয়া দামে নাজেহাল মানুষ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় রামযাত্রার মাঠ ফাঁকা : অয়ন মুখোপাধ্যায় যাদবপুরের যাদবদের গোপালনের ইতিহাস : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাম নামে কাম নাই, আমিই তো রাম : দিলীপ মজুমদার তৃষিত মাঠের খসড়া : বিশ্বজিৎ মণ্ডল ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মাঠের মাছ ও একটি ঢ়োড়া সাপের গল্প : সুব্রত দত্ত রোহিঙ্গা সংকটের নয় বছর — সমস্যা সমাধানে চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ যাদবপুর নামটি এল কোথা থেকে : অসিত দাস ইতিহাস গড়ে নারী, ইতিহাস ধরা থাকে অক্ষরে : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিজেপির দুর্ধর্ষ আই টি সেল থেকে মালব্য বিদায় : দিলীপ মজুমদার বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের শপথ গ্রহণ : নিকোলাস বিশ্বাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বার্ধক্যের নিঃসঙ্গ ছায়া: একাকীত্ব, বিচ্ছিন্নতা ও অবসাদ : যশোবন্ত রায় মনসার ঢেলাফেলা পার্বণ মনসাভক্তদের একচক্ষু দেবীকে নিবেদনের লোকাচার : অসিত দাস সংকট সমাধান ও সহযোগিতা বাড়াতে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্ক উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার এখন বারাণসী যেতে মন চায় না : বিজয় চৌধুরী
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ রাখি পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

জিয়াউর রহমানের বিএনপি গঠন ও ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ : অধ্যাপক ড. মিল্টন বিশ্বাস

Reporter
অধ্যাপক ড. মিল্টন বিশ্বাস / ৪৭ Views জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬

১৯৭৫ সালের রক্তক্ষয়ী পটপরিবর্তন-উত্তর বাংলাদেশে তৈরি হওয়া গভীর প্রশাসনিক শূন্যতা, অর্থনৈতিক পঙ্গুত্ব এবং আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা দূরীকরণে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ভূমিকা বাংলাদেশের আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায় নির্দেশ করে। সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার প্রধান ধারায় আগমন এবং পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর, তিনি দেশের অভ্যন্তরীণ শাসনকাঠামো ও বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে এক আমূল পরিবর্তন আনেন। একদলীয় শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনর্প্রবর্তন, জাতীয়তাবাদের রাষ্ট্রীয় সংজ্ঞায়ন এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তিনি দেশীয় রাজনীতিতে এক নতুন ধারার সূচনা করেন। একই সাথে, তৎকালীন ভারত-সোভিয়েত বলয়কেন্দ্রিক একমুখী কূটনৈতিক অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসে তিনি একটি বহুমাত্রিক, বাস্তববাদী ও জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক রূপান্তরের পর দেশে বিদ্যমান সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভাজন দূর করে একটি সুসংহত জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা জিয়াউর রহমানের অভ্যন্তরীণ নীতির মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠে। এই উদ্দেশ্যে তিনি প্রথমে ‘জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল’ (জাগোদল) এবং পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। বিএনপির মূল রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ে উঠেছিল একটি সমন্বিত ও ভূ-খণ্ডভিত্তিক জাতীয়তাবাদী ভাবধারার ওপর, যা ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ নামে সমাদৃত হয়।

স্বাধীনতার অব্যবহিত পর সংবিধানে প্রবর্তিত ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ মূলত ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু এই কাঠামোর ভেতরে ভৌগোলিক সীমানায় বসবাসকারী অ-বাঙালি নৃগোষ্ঠী, যেমন পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা কিংবা সমতলের সাঁওতাল ও গারো জনগোষ্ঠীর রাষ্ট্রীয় অন্তর্ভুক্তির সুযোগ সীমিত ছিল। জিয়াউর রহমান এই জাতীয় পরিচয়ের সংকীর্ণতা দূরীকরণে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’-এর তত্ত্ব হাজির করেন, যা রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমানার ভেতরে বসবাসকারী সকল নাগরিককে ধর্ম, বর্ণ, ভাষা ও সংস্কৃতি নির্বিশেষে একক রাজনৈতিক পরিচয়ে আবদ্ধ করে। এই অভ্যন্তরীণ সংহতিকে সুদৃঢ় করতে জিয়া সরকার সংবিধানের ৫ম সংশোধনীর মাধ্যমে প্রারম্ভে ‘বিসমিল্লাহির-রহমানির-রহিম’ সংযোজন করেন এবং রাষ্ট্রের অন্যতম মূলনীতি হিসেবে “সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস” অন্তর্ভুক্ত করেন। একই সাথে সংবিধানে পরিবর্তন এনে মুসলিম বিশ্ব ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে আন্তর্জাতিক ভ্রাতৃত্ব ও সংহতি জোরদার করার আইনি বাধ্যবাধকতা যুক্ত করা হয়। এটি কেবল দেশীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর মনস্তাত্ত্বিক আকাঙ্ক্ষাকে রূপ দেয়নি, বরং মধ্যপ্রাচ্য থেকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি, অর্থনৈতিক সাহায্য এবং বিশ্ব রাজনীতিতে স্বাতন্ত্র্য অর্জনের ভূ-রাজনৈতিক পথও উন্মুক্ত করেছিল।

অভ্যন্তরীণ রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে ১৯৭৭ সালের মে মাসে ঘোষিত হয় জিয়াউর রহমানের ১৯-দফা কর্মসূচি। এই কর্মসূচিটি দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি দীর্ঘমেয়াদী ব্লুপ্রিন্ট হিসেবে কাজ করে। ১৯-দফার মূল দর্শন ছিল গ্রামীণ অর্থনীতির অভূতপূর্ব রূপান্তর এবং রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। দেশীয় খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নিয়ে হাজার হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও সংস্কার কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষি বিপ্লবের সূচনা হয়, যা ১৯৮০ সালের মধ্যে দেশকে চালে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে নেপালে চাল রপ্তানির সক্ষমতা প্রদান করে। এর পাশাপাশি, দেশের ৬৫,০০০ গ্রামে ‘গ্রাম সরকার’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সরাসরি তৃণমূলের মানুষকে উন্নয়ন ও শাসনের প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করা হয়, যা গণশিক্ষার প্রসার ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের মতো সামাজিক আন্দোলনে জোয়ার এনেছিল।

স্বাধীনতার পরপরই গ্রহণ করা রাষ্ট্রায়ত্ত অর্থনীতি এবং সাম্যবাদী অর্থনৈতিক কাঠামোর কারণে তৎকালীন শিল্প খাত গভীর স্থবিরতার মুখোমুখি হয়েছিল। দেশের প্রায় ৯২% শিল্প কারখানা ছিল সরকারের নিয়ন্ত্রণে এবং বেসরকারী খাতে বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারিত ছিল মাত্র ২৫ লাখ টাকা। এই অবস্থায় জিয়াউর রহমান অর্থনীতিকে মুক্তবাজার ধারায় রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ব্যক্তিগত বিনিয়োগের সীমা তুলে নেন, বেসরকারী ব্যাংক ও ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠান গঠন সহজতর করেন এবং ১৯৭১ সালের পর বন্ধ হয়ে যাওয়া ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE) পুনরুজ্জীবিত করেন। জাতীয়কৃত প্রতিষ্ঠানে বেসরকারী ও বৈদেশিক মালিকানার পথ সুগম করতে বিরাষ্ট্রীয়করণ (Privatization) নীতি গ্রহণ করা হয়, যার ফলে ২৫৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানসহ মোট ৩৬২টি শিল্প ইউনিট বেসরকারী খাতে হস্তান্তর করা হয়।

এই মুক্তবাজার সংস্কার এবং সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক আন্তর্জাতিকীকরণের ফলে দেশে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নতুন ভিত্তি তৈরি হয়। জিয়া সরকারের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় দক্ষিণ কোরিয়ার ডেইউ (Daewoo) করপোরেশনের সাথে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে দেশ গার্মেন্টসের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশে তৈরি পোশাক (RMG) শিল্পের উত্থান ঘটে। এর পাশাপাশি, ১৯৭৬ সালে ব্যুরো অফ ম্যানপাওয়ার, এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং (BMET) প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিকাশমান দেশগুলোতে বাংলাদেশী শ্রমিক পাঠানোর সরকারি নীতি চালু করা হয়। এই পদক্ষেপের ফলে শুরু হওয়া বৈদেশিক রেমিট্যান্স প্রবাহ গ্রামকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে অভূতপূর্ব গতিশীলতা আনে। বৈদেশিক ও স্থানীয় বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করতে ১৯৮০ সালে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (BEPZA) গঠনের আইন পাস হয় এবং চট্টগ্রামে দেশের প্রথম ইপিজেড প্রতিষ্ঠার কাজ সমাপ্ত করা হয়। জিয়াউর রহমানের বৈদেশিক নীতির মূল দর্শন ছিল রাজনৈতিক বাস্তববাদ এবং “সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়” নীতিকে কেন্দ্র করে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা। তিনি স্পষ্ট অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, একটি সদ্য স্বাধীন উন্নয়নশীল দেশের নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের একমুখী অনুগত অবস্থান থেকে বের হয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বহুমাত্রিক আন্তর্জাতিক নীতি গড়ে তুলতে হবে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ মূলত ভারত ও তৎকালীন সোভিয়েত ভূ-রাজনৈতিক বলয়ের প্রভাবে ছিল। জিয়াউর রহমান বাস্তববাদী কূটনীতির প্রয়োগ ঘটিয়ে চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিম ইউরোপ, জাপান এবং আসিয়ান (ASEAN) ভুক্ত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সাথে কৌশলগত ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুনর্গঠন করেন। ১৯৭৭ সালে তাঁর ঐতিহাসিক বেইজিং সফর চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সূচনা করে, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা চাহিদার প্রধান সোপান হয়ে ওঠে। একইভাবে, পুঁজিবাদী পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও খাদ্য সাহায্য জোরদার করার ফলে ১৯৭৬ থেকে ১৯৭৮ সালের মধ্যেই দেশটি প্রায় ৭৩৫ মিলিয়ন ডলারের মার্কিন সাহায্য লাভ করতে সমর্থ হয়, যা স্বাধীনতা-উত্তর অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছিল।

প্রতিবেশী ভারতের ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান আধিপত্যবাদী আচরণের বিপরীতে সমমর্যাদা, পারস্পরিক সম্মান ও আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক কূটনীতি পরিচালনা করেন। ভারত একতরফাভাবে গঙ্গার পানি প্রত্যাহার করে ফারাক্কা বাঁধ চালু করলে বাংলাদেশের কৃষি ও পরিবেশ চরম ক্ষতির সম্মুখীন হয়। জিয়াউর রহমান দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগের পাশাপাশি বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিয়ে যান; তিনি নির্জোট আন্দোলন (NAM) সম্মেলন এবং জাতিসংঘের ৩১তম সাধারণ পরিষদে ফারাক্কা ইস্যুটি উত্থাপন করে ভারতের ওপর জোরালো বৈশ্বিক কূটনৈতিক চাপ তৈরি করতে সক্ষম হন। এই কূটনৈতিক সাফল্যের পরিণতিতেই ১৯৭৭ সালের ৫ নভেম্বর দুই দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক ৫ বছর মেয়াদী “গঙ্গার পানি বন্টন চুক্তি” স্বাক্ষরিত হয়, যা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পানি কূটনীতির ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন।

বাংলাদেশের সংবিধানে ইসলামী মূল্যবোধ এবং মুসলিম বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের ধারা সংযোজনের মাধ্যমে জিয়া সরকার মধ্যপ্রাচ্যের ধনকুবের রাষ্ট্রগুলোর কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমর্থন আদায়ে সক্ষম হয়। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত যেসব মুসলিম দেশ (বিশেষ করে সৌদি আরব) বাংলাদেশকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়নি, তারা জিয়া সরকারের শাসনকালে ঢাকার অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জোটে পরিণত হয়। ১৯৭১–১৯৭৫ সময়কালে যেখানে সামগ্রিক মুসলিম বিশ্ব থেকে বাংলাদেশের প্রাপ্ত আর্থিক সাহায্যের পরিমাণ ছিল মাত্র ৭৬৪ মিলিয়ন টাকা, সেখানে ১৯৭০-এর দশকের শেষ এবং ১৯৮০-র দশকের শুরুতে এই সাহায্যের পরিমাণ বেড়ে প্রায় ৪,০০০ মিলিয়ন টাকায় পৌঁছায়। শুধুমাত্র সৌদি আরবই ১৯৭৬ থেকে ১৯৮২ মেয়াদের মধ্যে বাংলাদেশকে প্রায় ৫,৫৪১.৮ মিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ আর্থিক সাহায্য ও ঋণ প্রদান করেছিল।

কূটনৈতিক স্বীকৃতি ও বৈশ্বিক সমর্থনের পাশাপাশি, অর্গানাইজেশন অফ ইসলামিক কোঅপারেশন (ওআইসি)-তে বাংলাদেশ এক প্রভাবশালী মধ্যপন্থী মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করে। জিয়াউর রহমান ফিলিস্তিনের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে বিশ্বমঞ্চে সোচ্চার ছিলেন এবং ওআইসির শীর্ষ চার স্থায়ী কমিটির অন্যতম ‘আল-কুদস কমিটি’-র গুরুত্বপূর্ণ সদস্য নির্বাচিত হয়ে সক্রিয় অবদান রাখেন। ফিলিস্তিন মুক্তিসংগঠনের (PLO) চেয়ারম্যান ইয়াসির আরাফাত জিয়াউর রহমানের আহ্বানে ঢাকা সফর করেন, যা বৈশ্বিক মুসলিম সংহতি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে। এছাড়া, ১৯৮০ সালে সূচিত রক্তক্ষয়ী ইরান-ইরাক যুদ্ধ বন্ধের উদ্দেশ্যে ওআইসি কর্তৃক গঠিত ‘ইসলামিক পিস কমিশন’-এর সদস্য হিসেবে জিয়াউর রহমান ব্যক্তিগতভাবে তেহরান ও বাগদাদ সফর করে দুই দেশের উর্ধ্বতন নেতৃত্বের সাথে শান্তি আলোচনায় সরাসরি মধ্যস্থতা করেন। এই উদ্যোগগুলো বিশ্ব রাজনীতিতে বাংলাদেশকে এক দায়িত্বশীল, স্থিতিশীল এবং নিরপেক্ষ কূটনৈতিক অনুঘটক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতি কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থায় বাংলাদেশের স্বাতন্ত্র্য নিশ্চিত করা এবং একটি শক্তিশালী ভূ-আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো প্রতিষ্ঠার দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল। বাংলাদেশের বহুপক্ষীয় কূটনীতির সবচেয়ে ঐতিহাসিক ও গৌরবময় সাফল্য অর্জিত হয় ১৯৭৮ সালের ৩০ নভেম্বর, যখন বাংলাদেশ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে (UNSC) দুই বছরের (১৯৭৯-১৯৮০) জন্য অ-স্থায়ী সদস্য পদে নির্বাচিত হয়। এই নির্বাচনে এশীয় অঞ্চলভিত্তিক আসনের জন্য বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী ছিল অর্থনৈতিকভাবে মহাশক্তিধর রাষ্ট্র জাপান। জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত কূটনৈতিক দূরদর্শিতা এবং তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সমর্থন আদায়ের ফলে সাধারণ পরিষদের তৃতীয় ধাপের ভোটাভুটিতে বাংলাদেশ ১২৫টি ভোট পেয়ে বিশাল ব্যবধানে জাপানকে (যিনি মাত্র ২ ভোট পেয়েছিল) পরাজিত করে আসনটি জয় করে নেয়। নিরাপত্তা পরিষদে থাকাকালীন বাংলাদেশ দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর আগ্রাসনের নিন্দা (রেজোলিউশন ৪৪৪), রোডেশিয়ার বর্ণবাদী জিম্বাবোয়ে সরকারের ওপর অবরোধ (রেজোলিউশন ৪৪৫) এবং এঙ্গোলায় দক্ষিণ আফ্রিকার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে নীতিগত সোচ্চার অবস্থান গ্রহণ করে। পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে সশস্ত্র হস্তক্ষেপ করলে বাংলাদেশ সরাসরি সোভিয়েত আগ্রাসনের তীব্র প্রতিবাদ জানায় এবং তার অংশ হিসেবে মস্কো অলিম্পিক বর্জন করার নীতিনিষ্ঠ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে বৈরী রাজনৈতিক আবহাওয়া প্রশমন এবং পারস্পরিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে জিয়াউর রহমান একটি সুসংহত বহুপক্ষীয় কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করেন। এই চিন্তা থেকেই ১৯৮০ সালের মে মাসে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি দেশের (বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভূটান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ) সরকারপ্রধানদের কাছে একটি নতুন বিস্তৃত আঞ্চলিক ব্লকের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে একটি চিঠি ও ঐতিহাসিক শ্বেতপত্র বা ওয়ার্কিং পেপার পাঠান। এই প্রদেয় প্রস্তাবনায় তিনি প্রথাগত ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে না জড়িয়ে নন-ট্যাডিশনাল সিকিউরিটি ইস্যুসমূহ, যেমন — জলবায়ু পরিবর্তন, মাদক চোরাচালান প্রতিরোধ, পর্যটন উন্নয়ন, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমন এবং সীমান্ত যোগাযোগের মতো বাস্তবমুখী খাতগুলোতে যৌথ উদ্যোগের ওপর জোর দেন। যদিও ১৯৮১ সালে তাঁর মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর ঢাকায় প্রথম শীর্ষ সম্মেলনের মাধ্যমে সংস্থাটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জিয়াউর রহমানকেই ‘সার্কের প্রতিষ্ঠাতা ও মূল রূপকার’ হিসেবে গণ্য করা হয়।

মূলত জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন, বিএনপি প্রতিষ্ঠা এবং তাঁর আন্তর্জাতিকতাবাদী ভূ-কৌশলকে পর্যালোচনা করলে এটি স্পষ্ট হয় যে, তাঁর গৃহীত প্রতিটি নীতি ছিল একটি দূরদর্শী দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় ব্লুপ্রিন্টের (Grand Strategy) অংশ। অভ্যন্তরীণ পরিচয়ের পুনর্গঠনের সাথে বৈদেশিক নীতির সংযোগ স্থাপন ছিল জিয়া সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সাফল্য। ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’-এর পরিবর্তে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’-এর সূচনা কেবল পাহাড় ও সমতলের সকল নৃগোষ্ঠীকে একটি একক রাষ্ট্রীয় পরিচয় দেয়নি, বরং তা দেশের ভাবমূর্তিতে ইসলামী মূল্যবোধ ও বাস্তববাদী রাষ্ট্রনীতির ভারসাম্য তৈরি করেছিল। এটিই পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্য ও উন্নয়নশীল বিশ্ব থেকে ব্যাপক অর্থায়ন, শ্রমবাজার এবং রাজনৈতিক সাহায্য নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়। একইভাবে, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক উদারীকরণের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান সাময়িক সাহায্য-নির্ভরতা কাটিয়ে ওঠার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। পোশাক শিল্পের আন্তর্জাতিকীকরণ, রেমিট্যান্সের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ এবং বহুপক্ষীয় বাণিজ্য অঞ্চল তৈরির পদক্ষেপগুলো পরবর্তী চার দশক ধরে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে আসছে। বিশ্বরাজনীতিতে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর আত্মমর্যাদা ও ভূ-রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন (Small State Autonomy) রক্ষা করে আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর মাঝে কীভাবে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করতে হয়, জিয়াউর রহমানের পরিচালিত পররাষ্ট্রনীতি তার এক সফল এবং বাস্তবমুখী রূপরেখা তৈরি করেছিল।

লেখক : সেক্রেটারি, ইক্যুমেনিক্যাল খ্রিষ্টান ট্রাস্ট-ইসিটি, ঢাকা

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Currently Maintained by the2.dev