
৬০. শোভনাসুন্দরীর লোকসাহিত্যচর্চা
শোভনাসুন্দরী (এবং নলিনীদেবীকে) রবীন্দ্রনাথ পাঠাচ্ছেন এক ছন্দোময় চিঠি (‘শিলংএর চিঠি’) :
ছন্দে লেখা একটি চিঠি চেয়েছিলে মোর কাছে,
ভাবছি ব’সে এই কলমের আর কি তেমন জোর আছে!
তরুণবেলায় ছিল আমার পদ্য লেখার বদ অভ্যাস,
মন ছিলো হই বুঝি বা বাল্মীকি কি বেদব্যাস।
কিছু না হোক ‘লঙফেলো’দের হবো আমি সমান তো,
এখন মাথা ঠাণ্ডা হ’য়ে হ’য়েছে সেই ভ্রমান্ত।
এখন শুধু গদ্য লিখি, তাও আবার কদাচিৎ,
আসল ভালো লাগে খাটে থাকতে প’ড়ে সদা চিৎ।….
কে এই শোভনাসুন্দরী (১৮৭৭-১৯৩৭)? ঠাকুরবাড়ির মেয়ে তিনি। হেমেন্দ্রকুমার ঠাকুরের মেয়ে। পঞ্চম কন্যা। রবীন্দ্রনাথের ভাইঝি। পড়াশুনো করেছেন লরেটোয়। শিবপুরের নগেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিয়ে হয় তাঁর। নগেন্দ্রনাথ ছিলেন জয়পুরের ইংরেজির অধ্যাপক। বিয়ের পরে শোভনা স্বামীর সঙ্গে চলে আসেন জয়পুরে।
ঠাকুরবাড়ির মেয়ে শোভনা। তাই সাহিত্যচর্চা তাঁর রক্তে। স্বর্ণকুমারীদেবীর লেখা খুব ভালো লাগত। ‘কাহাকে’ বলে একটা উপন্যাস লিখেছিলেন স্বর্ণকুমারী। পড়ে শোভনার খুব ভালো লাগল। ইংরেজিতে অনুবাদ করলেন। নাম হল ‘To Whom’? সাহিত্য রচনা করতে গিয়ে পিছিয়ে এলেন। ভাবলেন লেখার হাত নেই তাঁর। তাহলে কি করা যায়? হারিয়ে যাওয়া রূপকথা, উপকথা সংগ্রহ করলে কেমন হয়। মৃণালিনীদেবী শুরু করেছিলেন এই কাজ। কিন্তু বেশি দূর এগোতে পারেন নি। শোভনা যখন রবীন্দ্রনাথকে বললেন তাঁর ইচ্ছের কথা, রবীন্দ্রনাথ উৎসাহ দিলেন খুব।
একেবারে নতুন প্রেক্ষাপটে লিখে ফেললেন ফুলচাঁদ, ডালিমকুমারী, গঙ্গাদেব, লুব্ধ বণিক তেজারাম, দিলীপ ও ভীমরাজ। এগুলো সব উপকথাকেন্দ্রিক গল্প।
২৮টি লোককাহিনি নিয়ে প্রকাশিত হল .দ্য ওরিয়েন্টাল পার্লস : ইণ্ডিয়ান ফোকলোর’। ১৯১৫ সালে। এই বইএর ভূমিকায় তিনি প্রেরণা সম্বন্ধে বলেছেন :
‘আমার কাকা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প পড়ার সময় এই গল্পগুলি লেখার ধারণাটি আমার মাথায় আসে। কিন্তু তাঁর মতো উদ্ভাবনী প্রতিভা আমার নেই, তাই আমি লোককাহিনি সংগ্র্ করে তাদের ইংরেজি পোশাক দিই এবং নিম্নলিখিত পৃষ্ঠাগুলিতে থাকা গল্পগুলি আমাকে গ্রামের বিভিন্ন নিরক্ষর লোক বলেছিল। একজন অন্ধ ব্যক্তি, যে এখনও আমার সেবায় নিয়োজিত, সে অক্ষয় স্মৃতি এবং গল্প বলার দুর্দান্ত ক্ষমতা নিয়ে আমাকে বলেছিল।’
শোভনার এসব লেখা আদৃত হয়েছিল বিদেশেও। ১৯১৫-১৯২০ সালের মধ্যে লণ্ডনের প্রকাশনা সংস্থা শোভনার চারটি বই প্রকাশ করেন। যেমন ‘ইণ্ডিয়ান নেচার মিথ’ (১৯১৯), ইণ্ডিয়ান ফেবলস অ্যাণ্ড ফোকলোর’ (১৯১৯), ‘দ্য টেলস অব দ্য গডস অব ইণ্ডিয়া’ (১৯২০)।
শোভনা রাজস্থানী প্রবাদ-প্রবচনও সংগ্রহ করেছিলেন। রাজস্থানী প্রবাদের সঙ্গে বাংলা প্রবাদের মিল খোঁজার চেষ্টাই তাঁর ছিল। দু-একটি উদাহরণ :
১] নিবীর ভূমি কব ই জন হোয় ( দেশ কখনও একেবারে বীরশূন্য হয় না )
২] সালী নহী তো সাসু সেহী মসখরী ( শালী নেই বলে কি শাশুড়ির সঙ্গে মস্করা চলে? )
ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাতেও শোভনা ভ্রমণকাহিনি ও অন্যান্য নিবন্ত রচনা করেছেন। যেমন : ‘লণ্ডনে’,‘য়োরপে মহাসমরের পরে’, মহাযুদ্ধের পরে প্যারী নগরীতে’।
শোভনার মৃত্যুর পরে তাঁর স্বামী নগেন্দ্রনাথ প্রকাশ করেছিলেন একটি ‘শোকগাথা’। এই বইএর ভূমিকা লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ভূমিকাটি ছিল আসলে একটি কবিতা। ‘শোভনা’ নামে :
অস্তরবির কিরণে তব জীবন শতদল
মুদিল তার আঁখি
মরমে যাহা ব্যাপ্ত ছিল স্নিগ্ধ পরিমল
মরণে দিল ঢাকি।
লয়ে গেল সে বিদায়কালে মোদের আঁখিজল
মাধুরীসুধা সাথে
নূতনলোকে শোভনারূপ জাগিবে উজ্জ্বল
বিমল নবপ্রাতে।