অপারেশন লোটাস। বা, অপারেশন কমল। ইংরেজি নামটা শুনতে যতই গম্ভীর হোক না কেন, গোদা বাংলায় ব্যাপারটা দল ভাঙানোর ছক। দল মানে রাজনৈতিক দল। রাজ্যে বা কেন্দ্রে ক্ষমতা লাভের জন্য অন্য দলের সদস্যদের ভাঙিয়ে আনার রীতি। কি ভাবে দল ভাঙানো হয়? অনুরোধ উপরোধ করে! না, ওতে চিড়ে ভেজে না। হাতে কড়ি মাখো তেল। এক দল থেকে আরেক দলে গেলে পকেট ভরাতে হয়। ভয়ও দেখাতে হয়। এই অপারেশনের পথপ্রদর্শক বিজেপি হলেও কংগ্রেস বা অন্য দল যে লোক ভাঙায় নি, সে কথা হলফ করে বলা যায় না।
আয়া রাম গয়া রাম
১৯৬৭ সাল। ভারতে দলত্যাগের ইতিহাসে স্মরণীয় বছর। স্মরণীয় বছরের স্মরণীয় মানুষ হলেন গয়া লাল। ১৯৬৭ সালে হরিয়ানা বিধানসভার নির্বাচন হয়। ফলাফল : জাতীয় কংগ্রেস-৪৮, জনসংঘ-১২, স্বতন্ত্র পার্টি-৩, রিপাবলিকান পার্টি-২, নির্দল-১৬টি করে আসন পায়; সংহত সোশ্যালিস্ট পার্টি, কমিউনিস্ট পার্টি, প্রজা সোশ্যালিস্ট পার্টি কোন আসন পায় নি। গয়া লাল সে বছর হরিয়ানার হাসানপুর নির্বাচনী কেন্দ্রে জয়লাভ করেন। স্বতন্ত্র দলের প্রার্থী হিসেবে। তারপর যোগ দিলেন জাতীয় কংগ্রেস দলে। তারপর মাত্র ১৫ দিনে গয়া লাল ৩ বার দল বদল করেন। এটা সর্বকালীন রেকর্ড। জাতীয় কংগ্রেস থেকে গেলেন সংযুক্ত ফ্রন্টে। সংযুক্ত ফ্রন্ট থেকে কংগ্রেসে। আবার কংগ্রেস থেকে সংযুক্ত ফ্রন্টে। দ্বিতীয় বার তিনি যখন কংগ্রেসে এলেন, তখন জাতীয় কংগ্রেস নেতা রাও বীরেন্দ্র সিং চণ্ডীগড়ের সাংবাদিক সম্মেলনে গয়া লালকে পাশে বসিয়ে হাসতে হাসতে বলেছিলেন, ‘গয়া রাম এখন আয়া রাম।’ গয়া লাল তারপরেও দল বদল করেছিলেন। ১৯৭২ সালে তিনি আর্য সমাজে যোগ দেন, সেখান থেকে চরণ সিংএর ভারতীয় লোকদলে, আবার সেখান থেকে জনতা দলে। তাঁর ছেলে উদ্য় ভানও এই দল-বদলের খেলা আয়ত্ত করেছিলেন।
ব্যাস। সেই থেকে ‘আয়া রাম গয়া রাম’ প্রবাদের জন্ম। প্রবাদ তো মানুষের অভিজ্ঞতা থেকেই জন্ম নেয়। নিউজিল্যাণ্ডে দলত্যাগীদের বলে waka-jumper, আর নাইজিরায় দলত্যাগকে বলে carpet-crossing. শুরু হয়ে গেল ভারতের রাজনীতিতে আয়া রাম গয়া রামদের খেলা। আমাদের এই বিচিত্র বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশের নির্বাচকমণ্ডলীও বিচিত্র। তাঁরা দলবদলুকে ভোট দিয়ে জিতিয়ে দেন। সত্য, সেলুকাস, কি বিচিত্র এই দেশ।
১৯৬৭ স্মরণীয় বছর হতে পারে, তবে প্রদীপ জ্বালানোর আগে সলতে পাকানোর পালা ছিল। স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই তা শুরু হয়ে যায়। ১৯৪৮ সালে কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে যান কংগ্রেস সোশ্যালিস্ট পার্টি। তার সদস্যরা আইনসভা থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৫০ সালে উত্তরপ্রদেশে ২৩ জন কংগ্রেস বিধায়ক দলত্যাগ করে যোগ দেন জনকংগ্রেসে। অন্ধ্র প্রদেশের সরকার গঠনের জন্য ১৯৫৩ সালে প্রজা সোশ্যালিস্ট পার্টির নেতা প্রকাশম কংগ্রেসে যোগ দেন।
পেনদেকান্তি ভেঙ্কটশুভাইয়ার কমিটি ও দলত্যাগের হিড়িক
কংগ্রেস দল থেকে মাঝে মাঝে সদস্যরা অন্য দলে চলে যাচ্ছিলেন। এই গুরুতর সমস্যা মোকাবিলা করার জন্য কংগ্রেস দলের সাংসদ পেনদেকান্তি ভেঙ্কটশুভাইয়া একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেন। কমিটিতে ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ওয়াই বি চ্যবন, জয়প্রকাশ নারায়ণ, মধু লিমায়ে। কমিটি তার প্রতিবেদনে জানায় ৭টি রাজ্যের ২২০ জনের মধ্যে ১১৬জন দলত্যাগীকে মন্ত্রীত্ব দেওয়া হয়েছে। কমিটি বলে যে দলত্যাগীদের অন্তত ১ বছর বা পুনরায় নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত যেন মন্ত্রীত্ব না দেওয়া হয়। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধি নিজেই দলত্যাগের উৎসাহদাত্রী ছিলেন। এভাবে বহু অ-কংগ্রেসি সরকার ভেঙে দেওয়া হয়েছে। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭১ সালের মধ্যে দলত্যাগ করেছিলেন ১৪২ জন সাংসদ ও ১৯৬৯ জন বিধায়ক। (‘Thirty two governments collapsed and 212 defectors were rewarded with ministerial positions’)
দলত্যাগবিরোধী আইন, ১৯৮৫
১৯৮৫ সালে ৫২তম সাংবিধানিক সংশোধনীর মাধ্যমে ১০ম তফশিলে দলত্যাগবিরোধী আইন প্রবর্তন করা হয়। এর লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন সরকারকে অস্থিতিশীল করে তোলা রাজনৈতিক দলত্যাগের মোকাবিলা করা। ১৯৬৭ সালের নির্বাচনের পরে দলত্যাগের প্রবণতা বিশেষ করে বৃদ্ধি পায়।
এই তফশিল অনুযায়ী রাজ্য বিধানসভা বা সংসদের কোন সদস্য যদি স্বেচ্ছায় তাঁর রাজনৈতিক দল থেকে পদত্যাগ করেন অথবা দলের নির্দেশের বিরুদ্ধে গিয়ে সংসদে ভোটদানে বিরত থাকেন, তবে তাঁকে বিধানসভা বা সংসদ থেকে অপসারণ করা যেতে পারে। এই ভোটদানের নির্দেশিকা জারি করেন দলীয় চিফ হুইপ, যিনি রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে মনোনীত সদস্য।
দলত্যাগ বিরোধী আইনের অধীনে অযোগ্য ঘোষণার প্রক্রিয়া
আবেদন
সদনের যে কোন সদস্য অন্য কোন সদস্যের দলত্যাগের অভিযোগ তুলে স্পিকারের (লোকসভা) বা চেয়ারম্যানের (রাজ্যসভা) কাছে আবেদন/অভিযোগ দাখিল করে প্রক্রিয়া শুরু করতে পারেন।
সভাপতি কর্মকর্তা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে অযোগ্য ঘোষণার কার্যক্রম শুরু করতে পারেন না এবং শুধু মাত্র আনুষ্ঠানিক অভিযোগের ভিত্তিতেই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন।
সিদ্ধান্তগ্রহণকারী কর্তৃপক্ষ
দলত্যাগ বিরোধী আইনের অধীনে অযোগ্যতার আবেদনগুলি লোকসভার স্পিকার, রাজ্যসভার চেয়ারম্যান বা রাজ্য বিধানসভা নিষ্পত্তি করে থাকে।
সময়সীমা
আইনে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য কোন কঠোর সময়সীমা নির্দিষ্ট করা নেই, যার ফলে সম্ভাব্য বিলম্বের কারণে সৃষ্টি হয়েছে সমালোচনা।
বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনা
এই সিদ্ধান্তকে আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যেতে পারে, যা একটি নিয়ন্ত্রণ বা ভারসাম্য নিশ্চিত করে।
ব্যতিক্রম
আইনসভা দলের এক তৃতীয়াংশ সদস্য বিভক্ত হয়ে একটি পৃথক গোষ্ঠী গঠন করলে অযোগ্যতা বলে গণ্য হবে না।
কোন আইনসভার দুই তৃতীয়াংশ সদস্য অন্য একটি দলের সঙ্গে একীভূত হতে সম্মত হলে রাজনৈতিক দলগুলির একত্রীকরণের অনুমতি দেওয়া হয়।
শুরু হল অপারেশন লোটাস : প্রথম পরীক্ষা কর্নাটকে
২০০৮ সালে কর্নাটকে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী ছিলেন বি এস ইয়েদুরাপ্পা। এইচ ডি কুমারস্বামীর সঙ্গে হিসেব চুকিয়ে দেওয়ার জন্য জনগণের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ইয়েদুরাপ্পা। বিজেপি ১১০টি আসনে জয়লাভ করে। কিন্তু সেটা সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে ৩টি আসন কম ছিল। বি এস ইয়েদুরাপ্পা জনার্দন রেড্ডি জেডি (এস)-এর ৪ জন এবং কংগ্রেসের ৩ জন বিধায়ককে পদত্যাগ করাতে রাজি করান। তাঁরা উপনির্বাচনে প্রার্থী হন। ২০০৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর ৭টি উপনির্বাচনের ফল প্রকাশিত হয়। বিজেপি ৫টি আসনে ও জেডি (এস) ২টি আসনে জয়লাভ করে। এর ফলে বিধানসভায় বিজেপির আসন সংখ্যা হয় ১১৫টি। এর সঙ্গে ৫জন স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও যুক্ত হন। বিজেপির বিভিন্ন মন্ত্রী পদত্যাগ করেন এবং নতুনদের মন্ত্রীসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করা হয়েছিল। দলত্যাগীদের পদত্যাগ করিয়ে দলত্যাগবিরোধী আইনকে পাশ কাটিয়েছিল বিজেপি।
কর্নাটকের অপারেশন লোটাসের মামলা কর্নাটক হাইকোর্টে উঠেছিল, ইয়েদুরাপ্পার বিরুদ্ধে তদন্তের কথা বলেছিলেন হাইকোর্ট : ‘So we demand that BJP which always talks about cleanliness in politics, transparency, morality, should solicit the resignation of their Chief Minister, Yediyurappa Ji and the Governor should order, or the new Government should order a fair investigation against him in ‘Operation Lotus’ or ‘Operation Kamalam’, whatever it is called, because it is very serious matter, and a serious and impartial probe is required in this issue.’
এবার ফুটতে লাগল অপারেশন কমলের কমলগুলি
১] অরুণাচল, ২০১৭। অরুণাচলে কংগ্রেস দলের দীর্ঘ দিনের শাসন ছিল। ২০১৫ সালে কংগ্রেসের ২১ জন বিধায়ক তখনকসর মুখ্যমন্ত্রী নবস টুকির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। সরকার ও রাজ্যপালের বিরোধ শুরু হয়। জারি হয় রাষ্ট্রপতির শাসন। ২০১৬ সালে পেমা খাণ্ডু মুখ্যমন্ত্রী হন। তাঁর দল কংগ্রেস ত্যাগ করে পিপিএ-তে যোগ দেন। বিজেপি এবার পেমা খাণ্ডুর দিকে মনোযোগ দেন। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে পেমা খাণ্ডু ও অন্যান্য বিধায়করা পিপিএ ত্যাগ করে বিজেপিতে যোগ দেন। অরুণাচলে প্রতিষ্ঠিত হয় বিজেপি সরকার।
২] বিহার, ২০১৭। বিহারে ছিল লালুপ্রসাদ যাদবের আরজেডি, কংগ্রেস ও নীতীশ কুমারের জোট সরকার। নীতীশ কুমার মুখ্যমন্ত্রী ও তেজস্বী যাদব উপ-মুখ্যমন্ত্রী। তেজস্বীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় নীতীশ তাঁকে পদত্যাগ করতে বলেন। তেজস্বী অস্বীকার করায় নীতীশ ২০১৭ সালের ২৬ জুলাই পদত্যাগ করেন। ঠিক তার পরের দিন অর্থাৎ ২৭ জুলাই তিনি বিজেপির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স বা NDA-এর সমর্থনে পুনরায় মুখ্যমন্ত্রীর পদে বসেন। নীতীশকে ‘পল্টুরাম’ বলার রেওয়াজ আছে।
৩] গোয়া, ২০১৭। ২০১৭ সালে গোয়া বিধানসভা নির্বাচনে মোট ৪০টি আসনের মধ্যে কংগ্রেস ১৭টি, বিজেপি ১৩টি, গোয়া ফরওয়ার্ড পার্টি ৩টি, মহারাষ্ট্রবাদী গোমন্তক পার্টি ৩টি, এনসিপি ১টি ও নির্দল প্রার্থীরা ৩টি আসন লাভ করেন। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য ২১টি আসনের দরকার ছিল। বিজেপি মহারাষ্ট্রবাদী গোমন্তক পার্টি, গোয়া ফরওয়ার্ড পার্টি ও নির্দলদের নিয়ে সরকার গঠন করেন।
৪] মনিপুর, ২০১৭। মনিপুর বিধানসভা নির্বাচনে ৬০ আসনের মধ্যে কংগ্রেস পায় ২৮টি আসন, বিজেপি পায় ২১টি আসন। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য দরকার ছিল ৩১টি আসন। বিজেপি ন্যাশনাল পিপলস পার্টির ৪ জন, জন নাগা পিপলস ফ্রন্টের ৪জন, লোক জনশক্তি পার্টির ১ জন, তৃণমূল কংগ্রেসের ১ জন বিধায়কের সমর্থন আদায় করেন এবং এভাবে সরকার গঠন করেন।
৫] কর্নাটক, ২০১৯। ২০১৯ সালে কর্নাটকের বিধানসভার কংগ্রেস ও জেডিএসের ১৭ জন বিধায়ক পদত্যাগ করেন। তাঁদের মধ্যে বেশির ভাগ বিজেপিতে যোগ দেন। ফলে মুখ্যমন্ত্রী এইচ ডি কুমারস্বামী পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। বিজেপি সরকার গঠন করেন এবং বি এস ইয়েদুরাপ্পা মুখ্যমন্ত্রী হন।
৬] মধ্যপ্রদেশ, ২০২০। ২০১৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস জয়লাভ করে এবং কমলনাথ মুখ্যমন্ত্রী হন। ২০২০ সালের মার্চ মাসে কংগ্রেস নেতা জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া অনুগামী ২২ বিধায়ক নিয়ে পদত্যাগ করেন ও বিজেপিতে যোগ দেন। ফলে কমলনাথের সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়। মুখ্যমন্ত্রী হন বিজেপির শিবরাজ সিং চৌহান।
৭] মহারাষ্ট্র, ২০২২। মধ্যপ্রদেশে ছিল উদ্ভব ঠাকরের নেতৃত্বাধীন মহা বিকাশ অঘাড়ির সরকার। ২০২২ সালের জুন মাসে শিবসেনার তৎকালীন নেতা একনাথ শিণ্ডে ৪০জন বিধায়ক নিয়ে পদত্যাগ করেন এবং বিজেপির সঙ্গে জোট করেন। মুখ্যমন্ত্রী হন একনাথ শিণ্ডে ও উপ মুখ্যমন্ত্রী হন বিজেপির দেবেন্দ্র ফড়নবিশ।
অপারেশন লোটাসের বঙ্গ সংস্করণ
পশ্চিমবঙ্গে ২০২১ সালের নির্বাচনে প্রথম অপারেশন লোটাস প্রয়োগ করা হয়। শুভেন্দু অধিকারী, রাজীব ব্যানার্জি, মুকুল রায়, রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, শীলভদ্র দত্ত, দীপালি বিশ্বাস, বিশ্বজিৎ কুণ্ডুকে দলত্যাগ করানো হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী ঘন ঘন আসতে থাকেন পশ্চিমবঙ্গে। তাঁরা ঘোষণা করেন ‘ইসকে বার দোশ পার’। সে ঘোষণা সফল হয় নি। বিজেপি নয়, ক্ষমতাসীন তৃণমূলই ২০০ পার করেন, বিজেপি আটকে থাকেন দুই অংকে। ২০২৪ এর লোকসভা নির্বাচনেও আশাভঙ্গ হয় বিজেপির। তাঁদের আসন সংখ্যা কমে যায়।
তখন থেকেই নতুন পরিকল্পনা শুরু করেন বিজেপি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্ল্যান এ, বি, সি, ডি-র কথা বলেছিলেন। রোহিঙ্গা বাংলাদেশি বলে চিৎকার, সংখ্যালঘুদের প্রতি প্রকাশ্যে বিদ্বেষ, হিন্দুভোটের মেরুকরণের নানাবিধ প্রয়াস, SIR, নির্বাচন কেন্দ্র ধরে ধরে নাম কাটার আয়োজন, ফল গণনার দিনের কৌশল। এসব কাজ দিল। ২০০ পার করলেন বিজেপি। এখানে দল ভাঙানোর দরকার নেই। অপারেশন লোটাসের দরকার নেই। কে বলল দরকার নেই? তৃণমূলের ভোট শতাংশ ৪০। ঘাড়ের উপর নিশ্বাস ফেলছে। দলটাকেই ভেঙেচুরে ফেলতে হবে। কাজে লাগল এজেন্সি। জয়ী বিধায়করা দল ভেঙে বেরিয়ে আসতে লাগলেন দুর্নীতির দোহাই দিয়ে। প্রায় ৬০ জন। বলতে লাগলেন এঁরাই আসল তৃণমূল। এঁরা প্রতীক চান, তহবিল চান, অফিস ঘর চান। মহারাষ্ট্রের একনাথ শিণ্ডের খেলা। বিজেপি এঁদের ‘ ভালো তৃণমূল’ বললেন। এঁরা বললেন অকারণ সরকার বিরোধিতা নয়, গঠনমূলক সমালোচনা করবেন।
তৃণমূলের সাংসদদের উপর অপারেশন লোটাসের প্রয়োগ হল। ২৮ এর মধ্যে ২০ জন বিদ্রোহী হলেন। এন সি পি আই নামে এক অজ্ঞাতপরিচয় দলের সদস্য হলেন। তারপর এন ডিএর সঙ্গে জোট করবেন।
রাইট টু রিকল
আমাদের দেশের গণতন্ত্রে একজন বিধায়ক বা সাংসদ ৫ বছর নির্বিবাদে রাজত্ব করেন। এর মধ্যে তাঁদের কার্যকলাপে মানুষ অসন্তুষ্ট হলে তাঁদের করার কিছু নেই। তাঁদের প্রত্যাহার করাবার উপায় নেই। কানাডা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিনিধিদের প্রত্যাহার করার বিধি আছে। কোন নির্দিষ্ট কেন্দ্রের ভোটারদের এক চতুর্থাংশের স্বাক্ষরিত আবেদনের মাধ্যমে বিধায়ক বা সাংসদকে প্রত্যাহারের উপায় থাকলে রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিশুদ্ধ হতে পারে। বিধায়ক বা সাংসদ তখন ক্ষমতার অপব্যবহার বা দুর্নীতি থেকে বাধ্য হয়ে বিরত থাকবেন।
বৈদিক যুগে ‘রাজধর্ম’ ধারণাটি ‘প্রত্যাহারের অধিকার’ ধারণার অনুরূপ; কার্যকর শাসনের অভাবে রাজাকে অপসারণ করা হত।
১৯৪৪ সালে এম এন রায় শাসনের বিকেন্দ্রীকরণ ও ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তাব করেন যার মাধ্যমে প্রতিনিধিদের নির্বাচন ও প্রত্যাহার করা সম্ভব হবে।
সোমনাথ চ্যাটার্জি জবাবদিহিতার উদ্দেশ্যে ‘প্রত্যাহারের অধিকার’-এর কথা উল্লেখ করেছিলেন।
জনপ্রতিনিধি আইন (RPA) ১৯৫১-এ প্রত্যাহারের অধিকার সম্পর্কে বলা আছে।
২০১৬ সালে বরুণ গান্ধি লোকসভায় অসদাচরণের জন্য সাংসদ ও বিধায়কদের প্রত্যাহার করার উদ্দেশ্যে ‘জনপ্রতিনিধিত্ব (সংশোধনী) বিল পেশ করেন।