‘আবার আসিব ফিরে ধানসিড়িটির তীরে এই বাংলায়।’ লিখেছিলেন জীবনানন্দ দাশ। অসীম মমতা ছিল বাংলার প্রতি। ভালোবাসা ছিল গভীর। এ কালের কবি তসলিমা নাসরিনও লিখেছেন : —
আমার জন্য অপেক্ষা করো মধুপুর নেত্রকোণা
অপেক্ষা করো জয়দেবপুরের চৌরাস্তা
আমি ফিরব। …
শোন শালবন বিহার, মহাস্থানগড়, সীতাকু পাহাড়, আমি ফিরব,
যদি মানুষ না হবে পারি, পাখি হয়েও ফিরব একদিন।
দেশে ফেরার এই আকুল আকুতি দুজনের। কিন্তু দুজনের অবস্থানগত পার্থক্য আছে। জীবনানন্দকে দেশ থেকে বিতাড়িত হতে হয় নি। দেশে দেশে আশ্রয়ের জন্য যাযাবরের মতো ঘুরতে হয় নি। কিন্তু পেশায় চিকিৎসক নেশায় লেখক, মুক্তচিন্তক, লিঙ্গসমতাকামী, মৌলবাদবিরোধী, নারীবাদী তসলিমা নাসরিন দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন মৌলবাদবিরোধিতার জন্য। প্রতিবেশী ভারতে এসেছিলেন তিনি। এসেছিলেন পশ্চিমবাংলায়। এখানেও আছে বাংলার গন্ধ, বাংলার রূপ। তখন বাংলায় বাম সরকার। বাংলাদেশে যেমন ‘লজ্জা’র জন্য মৌলবাদীরা ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন, এখানেও তেমনি ‘দ্বিখণ্ডিত’-এর জন্য প্রতিবাদের ঢেউ উঠল। ভোটব্যাঙ্কের কারণে বাম সরকার বাধ্য হলেন তাঁকে আশ্রয়চ্যুত করতে। পাঠিয়ে দেওয়া হল দিল্লিতে। সেখান থেকে বিদেশে। সুইডেন থেকে জার্মানি, জার্মানি থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সেখান থেকে ফ্রান্স। ইতিমধ্যে পটপরিবর্তন হয়েছে পশ্চিম বাংলার। ক্ষমতায় এসেছেন তৃণমূল সরকার। তাঁদেরও ভোটব্যাঙ্কের দায়। তসলিমার ফেরার ব্যাপারে উচ্চবাচ্য করলেন না তাঁরা।
অনেক দিন বাদে, এই গত বছর তসলিমার ফেরার ব্যাপারে রাজ্যসভায় প্রশ্ন তুললেন বিজেপি সাংসদ শমীক ভট্টাচার্য। ধন্যবাদ তাঁকে। হয়তো তাঁরই উদ্যোগে এ বছর কলকাতায় ফিরছেন তসলিমা। পাকাপাকি থাকার ব্যবস্থা। ১লা আগস্ট তসলিমাকে প্রথম দেখা যাবে কলকাতার এক মৌলবাদবিরোধী সভায়। আচ্ছা, এই সভায় তসলিমা কি শুধুই ইসলামি মৌলবাদের বিরুদ্ধে বলবেন? সব ধর্মেই তো আছে মৌলবাদ। আছে হিন্দু মৌলবাদ, খ্রিস্টান মৌলবাদ, বৌদ্ধ মৌলবাদ…. তসলিমা কি সাধারণভাবে মৌলবাদের বিরুদ্ধেই বলবেন? আর বিজেপি কি সেটা মেনে নেবেন? না, তা হয় না।
এখানকার সাধারণ মুসলমান সমাজ কি মেনে নেবেন তসলিমাকে? এই প্রশ্নটা কেন জানি না আমার মনে দেখা দিচ্ছে। আমরা জানি পৃথিবীর কোন লেখক তসলিমার মতো এতো আত্মজীবনী লেখেন নি। তসলিমার আত্মজীবনীর সংখ্যা ৭টি — আমার মেয়েবেলা, উতল হাওয়া, দ্বিখণ্ডিত, সেই সব অন্ধকার, আমি ভালো নেই — তুমি ভালো থেকো প্রিয় দেশ, নেই কিছু নেই, নির্বাসন। এইসব আত্মজীবনীতে তিনি নিজের নির্যাতন, অপমান ইত্যাদির পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিয়েছেন। সব চেয়ে বেশি এসেছে যৌন নির্যাতনের বিবরণ। তাঁর উপন্যাসেও (উপন্যাসেও পড়েছে আত্মজীবনের ছায়া) আছে সে বর্ণনা। নির্যাতনকারীরা মুসলমান। তাহলে কি সাধারণ মুসলমানও ভাববেন না যে তসলিমা মুসলমানদের নেতিবাচক দিকটাই শুধু তুলে ধরেছেন? তার মানে আমি বলতে চাইছি : তসলিমা এদেশে থাকলেও সাধারণ মুসলমানের চোখের মণি হয়ে থাকতে পারবেন না। তাই তাঁকে ঘেরাটোপে থাকতে হবে। ঘেরাটোপ মানে নিরাপত্তার বলয়। স্বাধীনভাবে তিনি চলাফেরা করতে পারবেন না। সুচিত্র সেন স্বেচ্ছায় নির্বাসন বরণ করে নিয়েছিলেন, তসলিমাকে বাধ্যতামূলক নির্বাসন নিতে হবে। তার মানে স্বদেশে প্রবাসীর মতো থাকা।
আর স্বাধীন মতপ্রকাশ? সম্ভব হবে কি সেটাও? বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর নির্ষাতনের কথা বলে তিনি অপ্রিয় হয়েছিলেন। এদেশে সংখ্যালঘু মুসলমানের উপর নির্যাতনের কথা তিনি কি বলতে পারবেন? বলতে কি পারবেন প্রশাসন স্বয়ং বিভাজনের কথা বলে? মদত দেয় বিভাজনকে?
রাজনীতির (ভোটব্যাঙ্ক) কারণে একদা তাঁকে পশ্চিমবাংলায় থাকতে দেওয়া হয় নি। আবার রাজনীতির (ভোটব্যাঙ্ক) কারণেই তাঁকে আশ্রয় দেওয়া হচ্ছে কি? এ প্রশ্ন উঠতেই থাকবে।
তাই আমার মনে হয়, এদেশে এসে মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে পারবেন না তসলিমা। ঢেউ-এর দোলায় তাঁকে দুলতেই হবে। রাজনীতির ঢেউ-এর দোলা। দোলে দে দুল দোলে …