রথের দিন রথ দেখা, কলা বেচার মতো, জগন্নাথের রথের রশিতে টান শেষ হওয়ার পরেই ক্লাবে ক্লাবে খুঁটিপূজা করিয়ে নেওয়া হল। দুর্গাপূজার দেড়-দু মাস আগে থেকেই শুরু হয়ে যায় শহর কলকাতা ও অন্যত্র ‘খুঁটিপুজো’৷ এখন নায়ক-নায়িকাদের দিয়েও খুঁটিপুজোর সূচনা করা হচ্ছে৷ যে সেলিব্রিটির টিআরপি যত বেশি তিনি তত আগে ডাক পান। সিঙ্গুরের কয়েকটি ক্লাবেরও দুর্গাপূজার খুঁটিপুজো হল এবার।
পঞ্চদশ শতকের উড়িষ্যাবাসী কবি সরলা দাস ওড়িয়া মহাভারত রচনার জন্যে খ্যাত। তাঁর জীবনী যদিও সম্পূর্ণরূপে জানা যায় না, তবু তিনি তাঁর লেখায় ‘কোটিপূজা’-র উল্লেখ করেছেন। মহাভারতের সূচনায় জগন্নাথের বন্দনা করতে গিয়ে ‘কোটিপূজা’-র কথা বলেছেন। এই কোটিপূজাই পরে অপভ্রংশে খুঁটিপূজা হয়ে যেতে পারে। তাহলে জগন্নাথের রথযাত্রার দিনের সঙ্গে খুঁটিপূজার একটি যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া গেল।
এই খুঁটিপুজোর বিবরণ শ্রদ্ধেয় চিন্তাহরণ চক্রবর্তীর ‘হিন্দুর আচার-অনুষ্ঠান’ বইয়ে নেই৷ নেই পল্লব সেনগুপ্তর বই ‘পূজাপার্বণের উৎসকথা’-তেও।
কালীপ্রসন্ন সিংহ-র ‘হুতোম পেঁচার নক্সা’য় ‘দুর্গোৎসব’ পর্বের যে বিবরণ পাচ্ছি তাতেও কোথাও খুঁটিপুজোর বিবরণ নেই৷ দেখেশুনে মনে হচ্ছে, এই বিশেষ অনুষ্ঠানটির শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা আজ পর্যন্ত কেউ দেননি।
কিন্তু আইডিয়াটি এল কোথা থেকে? হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষে এই ‘খুঁটিপুজো’ শব্দবন্ধের উল্লেখ নেই৷ জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের বাংলা অভিধানেও নেই এর উল্লেখ৷ তবে বঙ্গীয় শব্দকোষে ‘খুঁটিগাড়ী’ বলে একটা কথা আছে৷ নদীর তীরে নৌকা বাঁধতে হলে জমির মালিককে দেয় কর বা শুল্ককে ‘খুঁটিগাড়ি’ বলা হত৷ তাহলে কি প্রাচীন কুমারটুলি থেকে গঙ্গাবক্ষে নৌকাযোগে প্রতিমা নিয়ে যাওয়ার জন্য কুমারটুলির গঙ্গাতীরে খুটিবাঁধার চল ছিল একসময়? এজন্য ভূস্বামীকে কিছু টাকাকড়ি বা কর দিতে হত? এই খুঁটিকে পুজো করার রেওয়াজও ছিল? যাতে একজনের নৌকা বাঁধার খুঁটিকে আর-একজন অস্বীকার করতে না পারে? কে জানে!
বঙ্গীয় শব্দকোষে ‘খুন্তি’ শব্দের একটি অর্থ দেওয়া হয়েছে ‘খুন্তির মতো বস্তুবিশেষ’৷ ‘প্রসিদ্ধি যে, ইহা নবাব-পাঞ্জার নিদর্শন৷ ইহা নগরকীর্ত্তন দলের আগে থাকে৷ ইহা দেখিলে, কোন মুসলমান কীর্ত্তনে বাধা দেয় না৷ বৃন্দাবনে এখনও ইহার ব্যবহার আছে৷’ মোগলশাসিত বঙ্গে একদা নিজেদের পুজোমণ্ডপ চিহ্ণিত করার জন্য ও পূজা নির্বিঘ্ন করার জন্যে নগর সংকীর্তনের অনুকরণে শুরু হয়েছিল কি এই ‘খুন্তি-পুজো’? এইভাবেই কি দুর্গাপুজোর ‘খুন্তি পুজো’ অপভ্রংশের ফলে হয়ে যায় ‘খুঁটিপুজো’? জিজ্ঞাসা থেকেই যায়!
এবার একটি শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যার চেষ্টা করা যাক।
বাংলা ভাষায় ‘কোটি’র অর্থ শীর্ষ বা অগ্র। কোটি মানে উৎকর্ষও হয়।
‘কোটিপূজা’ থেকেও অপভ্রংশে খুঁটিপুজো আসতে পারে৷ বৈদিক দেবতাদের উচ্চকোটির স্থান বা আসনটিকেই যেন পূজা করা হয় খুঁটিপুজোয়। যে লম্বা খুঁটিতে কাপড় জড়িয়ে সেলিব্রিটি নায়কনায়িকারা ধরে সেটিকে খাড়া করেন সবাই মিলে, তার উচ্চতম বিন্দুটিই কোটি। কোটিকেই পূজা করা হয় প্রতি বছর। বামন শিবরাম আপ্তের সংস্কৃত অভিধানে কোটি-র অর্থ শীর্ষবিন্দু। সেখানেই যে দেবতা আসনগ্রহণ করবেন। দণ্ডটি তো উপলক্ষমাত্র।

পঞ্চদশ শতকের উড়িষ্যাবাসী কবি সরলা দাস ওড়িয়া মহাভারত রচনার জন্যে খ্যাত।
তেত্রিশ ‘কোটিদেবতা’
দ্বাদশ আদিত্য :
(১) ধাতা (২) অর্য্যমা (৩) মিত্র (৪) বরুণ (৫) অংশ (৬) ভগ(৭) বিবস্বান (৮) ইন্দ্র(৯) পূষা (১০) পর্জ্জন্য (১১) ত্বষ্টা (১২) বিষ্ণু
একাদশ রুদ্র :
(১) অজ (২) একপাৎ(৩) অহিব্রধ্ন (৪) বিরূপাক্ষ (৫)রৈবত (৬) হর(৭) বহুরূপ (৮) ত্র্যম্বক(৯) সাবিত্র (১০) জয়ন্ত (১১) পিনাকী
অষ্টবসু :
(১) ধর (২) ধ্রুব(৩) সোম (৪) অহ(৫) অনিল (৬) অনল (৭) প্রত্যূষ (৮) প্রভাস
ইন্দ্র ও প্রজাপতি বা, অশ্বিনীকুমারদ্বয়=২
মোট= ১২+ ১১ + ৮+ ২ = ৩৩
এই তেত্রিশ বৈদিক দেবতা শাস্ত্রস্বীকৃত। তাঁদের স্মরণ করেই দেবী দুর্গার পূজা শুরু করার বিধি আছ শাস্ত্রে।
শাস্ত্রে আছে — ‘কোটিপূজা ফলম লভেৎ তৎভালোৎপন্ন কৈবল্যম্’৷
শিবপুরাণেও কোটিপূজার উল্লেখ পাওয়া যায়, —
“সামন্তানাং জয়ে চৈব কোটিপূজা প্রশস্যতে
রাজামযুতসংখ্যং চ বশীকরণকর্মণি।”
উড়িষ্যাবাসী কবি সরলা দাস লিখেছেন, —
‘কলিকাল ধ্বংসন ভোগেণ কোটিপূজা’।
প্রণমিতে খটই দেবাদিদেব কপিলেশ্বর মহারাজা।’
পঞ্চদশ শতকের ওড়িয়া কবি সরলা দাস তাঁর কাব্যকর্মের মাধ্যমে পুরীর জগন্নাথ ও দ্বারকার শ্রীকৃষ্ণের মধ্যেকার এক অনাবিষ্কৃত যোগসূত্র উন্মোচন করেছেন।
কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণকারী কবি সরলা দাস মহাভারতের ওড়িয়া সংস্করণটি রচনা করেন, যা কোনো আঞ্চলিক ভাষায় মহাভারতের প্রথম পুনর্কথনগুলোর মধ্যে অন্যতম। চারণকবিতার দণ্ডী ছন্দে রচিত এই ওড়িয়া মহাভারতের চরিত্ররা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষায় কথা বলে। যদিও সরলা দাস মূল মহাকাব্যের বিষয়বস্তু ও কাহিনি অনুসরণ করেছিলেন, তবুও তিনি তাঁর মহাভারত বর্ণনায় লোককাহিনী, কথ্য ভাষা এবং স্থানীয় ওড়িয়া জীবনের চিত্রও যুক্ত করেছিলেন।
জগন্নাথের কাহিনীটি সরলা দাসের মহাভারতের মৌশালা পর্বে (মুষল পর্ব) পাওয়া যায় এমনই একটি গল্প। আখ্যানটি সেই মুহূর্ত থেকে শুরু হয় যখন সমগ্র যাদব বংশ যুদ্ধে ধ্বংস হয়ে গেছে এবং শিকারী জরার ছোড়া বিষাক্ত বাণে শ্রীকৃষ্ণও প্রাণ হারান। জরা শায়িত (ঘুমন্ত) কৃষ্ণের চরণযুগলকে চরে বেড়ানো হরিণের কান বলে ভুল করেছিল। সরলা দাস এই পর্যায়ে মূল কাহিনী থেকে সরে এসে পরে অন্য একটি উপকাহিনীর সন্নিবেশ করেন, যা শবর উপজাতির সঙ্গে কৃষ্ণের সংযোগের ইঙ্গিত দেয় এবং এই ধারণা দেয় যে জগন্নাথ রূপে কৃষ্ণ সম্ভবত একজন উপজাতীয় দেবতা ছিলেন।
উপজাতীয় দেবতা থেকে আর্যত্বে উত্তরণের জন্যে কোটিপূজার প্রচলন হয়ে থাকতে পারে।
স্কন্দপুরাণেও আছে কোটিপূজার উল্লেখ।
কোটিপূজা তাই পৌরাণিক দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমনের আগে তাঁর ও তাঁর পুত্রকন্যাদের স্থাপনের নিমিত্ত বৈদিক দেবতাদের উচ্চকোটির আসনগুলিকে প্রতি বছর পূজা করে নেওয়ার অনুষ্ঠান।
অর্থাৎ পৌরাণিক দেবী দুর্গা, সরস্বতী, লক্ষ্মী ও পৌরাণিক দেবতা কার্তিক ও গণেশের আগমনকে নির্বিঘ্ন করতে কোটিপূজার মাধ্যমে বৈদিক দেবতাদের স্মরণ করা হয় এই অনুষ্ঠানটিতে।
কোটিপূজাই অপভ্রংশে খুঁটিপুজো হয়ে গেছে।
কোটিপূজা > কুটিপূজা > খুটিপূজা > খুঁটিপুজো।
এবং আমরাও খুঁটির পেছনে দৌড়চ্ছি। বিভিন্ন নামকরা পুজোমণ্ডপে সেলিব্রিটিদের দৌড়ঝাঁপ ও তাঁদের আদর-আপ্যায়ন দেখে মনে পড়ে যায় সেই প্রবাদটি, — ‘মেড়া লড়ে খুঁটির জোরে’! এবারে যেন ক্লাবে ক্লাবে খুঁটিপুজোর ধুম পড়ে গেছে।