৫১. কথা রাখলেন রানি শঙ্করী
কলকাতার কালীঘাটের কাছে একটি পরিচিত রাস্তার নাম রানি শঙ্করী লেন। কে এই রানি শঙ্করী? ইনি হুগলির বাঁশবেড়িয়ার রাজপরিবারের মানুষ। রাজা নৃসিংহ দেব রায়ের দ্বিতীয়া স্ত্রী। মহামায়া হলেন তাঁর প্রথমা স্ত্রী। তাঁর কোন সন্তান ছিল না। মহামায়ার ইচ্ছেতেই রাজার দ্বিতীয় বিয়ে হয়। কিন্তু শঙ্করী স্ত্রীর যথাযথ মর্যাদা পেলেন না।
কেন?
রাজা জানতে পারলেন শঙ্করী আশ্রিতা ও ব্রাহ্মণ কন্যা। ছি, ছি, এ কি হল! রাজা নৃসিংহ দেব পরিত্রাণের চিন্তা করতে লাগলেন। সংসার ত্যাগ করে তিনি চলে এলেন কাশীধামে। সেখানে নিবিষ্ট হলেন তন্ত্রসাধনায়। সেই সঙ্গে সংস্কৃত ও পারসি ভাষায় সুপণ্ডিত রাজা ‘কাশীখণ্ডে’-র বঙ্গানুবাদ শুরু করলেন, অনুবাদ করলেন ‘উড্ডীশতন্ত্র’।
একদিন রাতের বেলায় তিনি স্বপ্ন দেখলেন : এক উচ্চ বেদীর উপর ত্রিকোণযন্ত্রে দেবাদিদেব মহাদেব যোগনিদ্রায়। তাঁর নাভিকুণ্ড হতে উথ্থিত হয়েছে পদ্ম। সেই পদ্মের উপর দেবী হংসেশ্বরী দক্ষিণাস্য হয়ে কল্পতরুমূলে উপবিষ্টা। এই স্বপ্ন থেকে হ্ংসেশ্বরী মন্দির গড়ার ভাবনা। পঞ্চতোলা, ত্রয়োদশ মিনারবিশিষ্ট সুউচ্চ কুণ্ডলিনী শক্তিরূপে পরাশক্তির বিকাশস্বরূপা দেবী হংসেশ্বরীর (‘হং’ শব্দটি শিবকে এবং ‘সা’ শব্দটি ‘মা শক্তি’কে প্রকাশ করে) ছয়টি মন্দির তিনি প্রতিষ্ঠা করবেন।
কথা ছিল বিলেত যাবার। সম্পত্তি উদ্ধারের জন্য। কিন্তু তা আর হল না। তাঁর স্বপ্ন তাঁকে আবিষ্ট করে দিল। তিনি ফিরে এলেন বাঁশবেড়িয়ায়। বাড়ির ভেতর ঢুকলেন না। ধনুকভাঙা পণ তাঁর। যতদিন না মন্দির হবে, তিনি বাড়ির ভেতরে যাবেন না। যেখানে মন্দির তৈরি করবেন ভেবেছিলেন, তার কাছাকাছি একটা জায়গায় তালপাতার ছাউনি বানিয়ে বাস করতে লাগলেন।
আবার একটা স্বপ্ন তাঁকে আলোড়িত করল। দেবী হংসেশ্বরী স্বপ্নে দেখা দিয়ে রাজাকে বললেন, ‘গঙ্গার জলে ভেসে আসবে একটা নিমকাঠ। সেই কাঠ দিয়ে গড়বি আমার মূর্তি।’
কি আশ্চর্য! একদিন গঙ্গায় স্নান করতে গিয়ে রাজা দেখলেন এক ভাসমান কাষ্টখণ্ড। তুলে নিলেন সেই কাঠ। বাড়িতে ফিরে দেখলেন, হ্যাঁ, নিমকাঠ তো! মহা আনন্দে রাজা ভাবলেন এবার তিনি সেই নিমকাঠ দিয়ে দেবীর মূর্তি গড়বেন, মন্দির তৈরি করে দেবীকে রাখবেন তার ভেতরে। শুরুও করলেন মন্দির। চুনার থেকে আনিয়েছিলেন মার্বেল পাথর। আনিয়েছিলেন কারিগরদের। কিন্তু মাঝপথে মৃত্যু হল রাজা নৃসিংহ দেবের। তখন সতীদাহ পথা চালু ছিল। মহামায়া গেলেন সহমরণে। এই বাঁশবেড়িয়ায় শত শত সতীদাহ হয়েছে। ‘সমাচার দর্পণ’ পত্রিকায় তার উল্লেখ আছে। কিন্তু রানি শঙ্করী সতীদাহের বিরোধী। তিনি জানতেন রামমোহন রায়ের আন্দোলনের কথা। তিনি জানতেন এটা একটা কুসংস্কার।
মানুষ ভাবে এক, হয় আর এক।
যে নারীকে তিনি স্বীকৃতি দেন নি, স্বপ্ন পুরণের জন্য সেই নারীর সাহায্য প্রয়োজন হল। অসুস্থ হয়ে পড়লেন রাজা। বুঝলেন তাঁর আয়ু শেষ হয়ে আসছে। ডাকলেন রানি শঙ্করীকে। বললেন, ‘আমার স্বপ্ন পুরণের ভার নিতে হবে তোমাকে।’ কেন বললেন একথা? কারণ তিনি ততদিনে ‘আশ্রিতা’ শঙ্করীর ব্যক্তিত্বের স্বরূপ বুঝতে পেরেছিলেন। বুঝেছিলেন, শঙ্করী মহামায়া নয়। নিজের হাতে বিশ্বজয় করার জেদ তাঁর আছে।
আরও একটা কাজ করলেন রাজা।
তাঁর কোন সন্তান ছিল না। তাই কাশীতে এক দত্তকপুত্র নিয়েছিলেন। নাম তাঁর কৈলাস। সেই কৈলাসকেও তিনি রানি শঙ্করীর হাতে তুলে দেন।
১৮১৪ সাল। বাঁশবেড়িয়ায় হংসেশ্বরী মন্দির নির্মাণ সম্পূর্ণ হল। মোট ১৩টি পদ্মকলি আকৃতির মিনার নিয়ে গঠিত মন্দির। তাদের উচ্চতা ২৭.৫ মিটার। মিনারগুলির ভেতরের অংশ মানবদেহের গঠনশৈলী অনুসরণ করে নির্মিত। কেন্দ্রীয় মিনারের শীর্ষে উদীয়মান সূর্যদেবতার সহস্র উজ্জ্বল রশ্মিসহ একটি ধাতব মূর্তি খোদিত আছে। ছয়টি ত্রিকোণাকার মার্বেলের উপর শ্বেতশুভ্র শিবের মূর্তি শায়িত অবস্থায়। শিবের নাভি থেকে একটি পদ্মদণ্ড বেরিয়ে এসেছে, যাতে বারো দল রক্তিম পদ্ম আছে। এর উপরে চতুর্ভুজা মা-শক্তি ডান পায়ের উপরে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, আর বাঁ পা ডান উরুর উপরে রেখেছেন। তাঁর উপরের বাম হাতে একটি তরবারি আর তলার বাম হাতে এক অসুরের ছিন্ন মস্তক। উপরের ডান হাতের তালু অভয়মুদ্রায় ধারণ করা আর নিচের ডান হাতে আশীর্বাদের ভঙ্গি।
এবার দত্তকপুত্রকে নিয়ে রানির বিড়ম্বনার কাহিনি বলতে হয়।
কথায় বলে খেতে পেলে শুতে চায়। দত্তকপুত্র কৈলাসের তর সইছিল না। রাজা মারা যেতে তিনি ঠিক করেছিলেন রাজার দুই রানি সহমৃতা হবেন। তখন সব সম্পত্তির অধিকারী হবেন তিনি। কিন্তু শঙ্করী বেঁকে বসতে তিনি ক্রুদ্ধ হলেন। লেঠেলদের দিয়ে জব্দ করতে চাইলেন রানিকে। রানিরও ছিল লেঠেলরা। কৈলাসের লেঠেলরা শেষ পর্যন্ত বর্শাবিদ্ধ হল। হার মানলেন কৈলাস। ক্ষমা চাইলেন রানি শঙ্করীর কাছে। মিটমাট হল।