Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘রাত পাহারা’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বই পড়া : প্রসেনজিৎ দাস অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘নীলমণির প্রত্যাবর্তন’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্যাটা গরম করে দেওয়া, স্যাটা ভেঙে দেওয়ার গোড়ার কথা : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘ভাসামানিক ভাসামানিক’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ হুগলি-চুঁচুড়ার স্মৃতি ও বঙ্কিম প্রতিভার উন্মেষ : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আর্ট কলেজ থেকে পাশ করে মুখ্যমন্ত্রী — বলে কি রে : বিজয় চৌধুরী বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কামারপুকুর পুরসভায় এলেন ঠাকুর রামকৃষ্ণ, কাজের জন্য মানুষ দরকার — লোকোত্তরানন্দ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে বিদ্যাসাগর — একটি কল্পিত সাক্ষাৎকার : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ খোলা খামের পরে খোলা চিঠি : দিলীপ মজুমদার সুরাবর্দী অ্যাভিনিউ ও তিনি — ওবায়দুল্লাহ আল ওবায়দী সোহরাওয়ার্দী (১৮৩২-৮৬) : প্রলয় চক্রবর্তী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘মেরিলিন মনরোর চশমা’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কবি ধনঞ্জয় সাহার মুক্তছন্দে লেখা কাব্যগ্রন্থ বহুমাত্রিক স্বর : সসীমকুমার বাড়ৈ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তারাশঙ্করের উপন্যাসে সমাজগতির ধারা : ড. অলোক রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

বই পড়া : প্রসেনজিৎ দাস

প্রসেনজিৎ দাস / ১০১ জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬

আমাজনের বৃষ্টি অরণ্য ‘সেলভা’, সেখানকার আজব প্রাণী কিম্বা তাহিতি দ্বীপের মানুষের কথা, আবার ইনকাদের কিচুয়া ভাষা, মরিশাস দ্বীপের গল্প বা দক্ষিণ মেরু প্রদেশ আন্টার্কটিকাকে জানতে হলে যদি সেখানে অভিযান করতে হয়, তবে সেই জানা অজ্ঞাতই থেকে যাবে চিরকাল। কারণ সবার পক্ষে ওখানে পৌঁছানো সম্ভবপর হবে না। তাহলে উপায়? হ্যাঁ, উপায় একটা আছে-বই। বই পড়েই অনেক অদেখাকে আমরা ঘরে বসেই দেখে নিতে পারি, অনেক অচেনা জিনিসকে আমরা চিনে নিতে পারি। মহাভারতের সঞ্জয় যেমন ঘরে বসেই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের কাহিনী অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রকে বলতেন তেমনি বই আমাদের কাছে সেই অন্ধের যষ্ঠী, ভালোবাসার এক অভিজ্ঞান। ভাগ্যিস আমরা বই পড়তে জানি,নইলে শিম্পাঞ্জি আর মানুষের মধ্যে কোনো তফাত থাকত না। বই পড়েই আমরা অর্ধেক পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় নিয়ে নিতে পারি। কথায় বলে — ‘Good books are the store house of knowledge and wisdom’ অর্থাৎ ভালো বই হচ্ছে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ভান্ডার। তেমন বই যদি হয় ঘরে বসে পড়েই আমাদের মন প্রশান্তিতে পূর্ণ হয়ে ওঠে। বর্তমানে তেমন বই এর আর অভাব নেই। ম্যানুয়াল না থাকলেও হাতে রাখা মুঠোফোনের গুগলে টাইপ করো, তারপর সার্চ। দেখো চোখের সামনে খুলে যাবে আজব এক পৃথিবী। তার মধ্যে থেকে বেছে নাও যেটা পছন্দ, তারপর পড়ে ফেলো,ব্যাস। এক সময় একথা ছিল কল্পনারও অতীত। তার অনেক গল্প মনে পড়ে।

একসময় বই-ই ছিল পড়ার অন্যতম মাধ্যম। আমরা যখন ক্লাস নাইন বা টেনে পড়ি তখন বাজারে রেফারেন্স বই-এর খুব বেশি আনাগোনা দেখা যায়নি। বাংলার অমল পালের সহজ-সরল লেখা, অপরদিকে চক্রবর্তী চক্রবর্তী রচিত দাঁতভাঙা ভাষার বাংলা রেফারেন্স ছাড়া কিছু ছিল বলে আমার মনে পড়ে না। আর ইতিহাসের জীবন মুখোপাধ্যায়, ভূগোলের বসু মল্লিক, মাইতির জীবনবিজ্ঞান আর ভূঁইয়া ধরের ভৌতবিজ্ঞানের টেক্সট্ ছাড়া আমরা আর কিছুই পড়িনি। ওগুলোই আমাদের টেক্সট আর ওগুলোই রেফারেন্স। টেক্সট আর রেফারেন্সের তফারেন্স আমরা বুঝতাম না। কোনো কোনো বই অবশ্য লাইব্রেরীতে গেলে পাওয়া যেত। কিন্তু তখনও লাইব্রেরীর সদস্য হতে পারিনি, তাই বই নিয়ে যেতে পারতাম না। শুধু পড়ার সৌভাগ্যটা হত মাঝে মাঝে। আমাদের বেতাইতে ‘সুকান্ত স্মৃতি গণ পাঠাগার’ টিমটিম করে চলত। তবুও আমরা যেতাম বই পড়ার লোভে। ফাইনাল পরীক্ষা যেদিনই শেষ হত সেদিনই বাবার বকাবকিতে পড়ায় বের হতে হত নতুন ক্লাসের পুরোনো বই কার কাছে আছে তা খুঁজতে। এক-দুদিন যে রেস্ট নেব, তার উপায় ছিল না। সুতরাং বই খুঁজে নিয়ে এসে সেদিন থেকেই আবারও সেই একঘেঁয়ে পড়তে বসা! তারপর নতুন ক্লাসে উঠে বুকলিস্ট পেলে মিলিয়ে যেটা যেটা মিলত সেটা নিয়ে এক তৃতীয়াংশ দাম চুকিয়ে পুরোনো না মেলা বইগুলো ফেরত দিয়ে আসতাম। কোনো নতুন বই কিনতে হলে শুরু হত বাবার কাছে ঘ্যানঘ্যানানি। বাবা নতুন বইগুলো কবে কিনে দেবেন — তা আমার জানার অগোচর ছিল। খুব শখ ছিল নবম-দশমে উঠে K.C.Nag (keshob chandra Nag) এর একটা ‘কোর গণিত’ কিনব। কিন্তু কিনতে পারিনি। তাই ধার করে,চেয়ে চিন্তে বইটা মাঝে মাঝে নিয়ে আসতাম এক বন্ধুর কাছ থেকে। বইটা হাতে পেলেই অদ্ভূত এক অনুভূতি হত। যেটুকু পারতাম একদিনের মধ্যেই প্র্যাকটিস করে খাতায় টুকে নিতাম। কারণ পরের দিন তাকে বইটা ফেরত দিতে হত। যেটুকু পড়েছি সেই বই থেকে, না সে আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। আজ আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে ‘কোর গণিত’ বইটি আছে। যখনই বইটা চোখে পড়ে নস্টালজিক হয়ে পড়ি পুরোনো দিনের কথা ভেবে। তাই বই পড়ার কোনো বিকল্প নেই। মনে রাখুন একটি ভালো বই একশত বন্ধুর সমান। বই পড়লে জ্ঞানের পরিধি বাড়ে, মন উদার হয়, সকল সংকীর্ণতার অবসান ঘটে। কিন্তু আজকের যন্ত্র যুগে মানুষের বই পড়ার অভ্যাস কমছে। নতুন বই এর সুগন্ধে মাতোয়ারা হয়ে যেতাম আমরা। মনে পড়ে প্রথম শ্রেণীর ‘কিশলয়’ বই-এর একটি ছড়া —

“বছর বছর কি মজা ভাই

নতুন নতুন বই খাতা পাই। ”

বলাবাহুল্য এখনও নতুন কোনো বই কিনলে প্রথমেই তার সুঘ্রাণ নিই। কালি আর কাগজের সুগন্ধে মনটা এখনও ভরে ওঠে। বই যে কতবড়ো বন্ধু তা আমরা জানতাম ভালোভাবেই। বই এর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ছিল ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর এখন বই এর বদলে নবীন পাঠক হাতে তুলে নিচ্ছে বই এর পিডিএফ। বই এর সঙ্গে তৈরি হচ্ছে দূরত্ব। তবে হ্যাঁ এমন কিছু দুষ্প্রাপ্য বই আছে যেগুলি হয়তো হাতে পাওয়া দুরূহ, সেগুলির ডিজিটাল কপি পড়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। বর্তমানে নোটস্ কেন্দ্রিক শিক্ষা ছাত্রছাত্রীদের পুঁথিগত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলেছে। তাই বলি বই পড়ুন এবং অন্যকে বই পড়ার সুযোগ করে দিন। আমার বই কেনার শখ ষোলো আনা। ধরুন কারো বাড়িতে গেলাম, আলমারিতে বই সাজানো থাকলেই আমার ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করে এর মধ্যে আমার সংগ্রহে কোন কোনটি নেই। চেষ্টা করি সেটা সংগ্রহ করার। কিন্তু একসময় পয়সার অভাবে সব বই সংগ্রহ করতে পারতাম না। সেটা আগেই বলেছি। তাই গ্রন্থাগারই ছিল আমাদের একমাত্র ভরসা। সে কলেজ লাইব্রেরীই হোক আর ভিলেজ লাইব্রেরীই হোক। তবুও লাইব্রেরীতে সেরকম সংগ্রহ ছিল না। যেটা চাইছি সেটা পাওয়া যেত না।

একবার আমাদের গ্রন্থাগারের গ্রন্থাগারিক দেবব্রত চক্রবর্তী (আমার শিক্ষকও বটে) বললেন এবারের অর্থবর্ষে বই কেনার জন্য আমাদের লাইব্রেরী বেশ কিছু টাকা পেয়েছে। তোদের পছন্দমতো কিছু বই এর তালিকা তোরা তৈরি কর, যেগুলো সকলের উপকারে লাগবে। ২০০৬-০৭-র ঘটনা। যাইহোক ব্যক্তিগত পছন্দমতো খান ২০ বই এর তালিকা আমি তৈরি করেছিলাম। সে সব বই কেনাও হয়েছিল। তখন মানুষ গ্রন্থাগারমুখী ছিল। কারণ বই পড়ার একটা তাগিদ ছিল মানুষের মধ্যে। কিন্তু মানুষ ধীরে ধীরে বই পড়ার অভ্যাস হারাচ্ছে। তাই এখনকার শতকরা ৯০-৯৫ ভাগ মানুষ গ্রন্থাগারমুখী নয়। তবুও এমন কিছু মানুষ আছেন, যারা ধুলো ঝেড়ে পুরোনো বই পড়ার অভ্যাস ত্যাগ করতে পারেননি। উপরিউক্ত প্রথম শ্রেণির মানুষদের জন্যই আজকালকার গ্রামীণ গ্রন্থাগারগুলির বেহাল দশা চোখে পড়ছে। তবে সবচেয়ে বড়ো কথা গ্রন্থাগারিকের অভাবে গ্রন্থাগারগুলো রীতিমত ধুঁকছে। আজকের মানুষ হাতের মুঠোয় পৃথিবীটাকে পুরে নিয়েছে। নিয়েছে স্মার্টফোন আর কম্পিউটারে পৃথিবীকে পুরে। কী বই চায়? শুধু গুগুলে টাইপ করো আর পেয়ে যাও পিডিএফ। শুয়ে শুয়েই পড়া হয়ে যায় আস্ত একটা বই। তবে আর লাইব্রেরী কেন? তাই বাঙালির বই কেনার পরিমাণ কমছে। এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত রম্য রচনাকার সৈয়দ মুজতবা আলি একটি গল্প বলেছেন তাঁর ‘বইকেনা’ প্রবন্ধে। গল্পটি আরব্য উপন্যাসের গল্প।

“এক রাজা তাঁর হেকিমের একখানা বই কিছুতেই বাগাতে না পেরে তাঁকে খুন করেন। বই হস্তগত হল। রাজা বাহ্যজ্ঞান হারিয়ে বইখানা পড়ছেন। কিন্তু পাতায় পাতায় এমনি জুড়ে গিয়েছে যে, রাজা বার বার আঙুল দিয়ে মুখ থেকে থুথু নিয়ে জোড়া ছাড়িয়ে পাতা উল্টোচ্ছেন। এদিকে হেকিম আপন মৃত্যুর জন্য তৈরি ছিলেন বলে প্রতিশোধের ব্যবস্থাও করে গিয়েছিলেন। তিনি পাতায় পাতায় কোণের দিকে মাখিয়ে রেখেছিলেন মারাত্মক বিষ। রাজার আঙুল সেই বিষ মেখে নিয়ে যাচ্ছে মুখে। রাজাকে এই প্ৰতিহিংসার খবরটিও হেকিম রেখে গিয়েছিলেন কেতাবের শেষ পাতায়। সেইটে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজা বিষবাণের ঘায়ে ঢলে পড়লেন।

বাঙালির বই কেনার প্রতি বৈরাগ্য দেখে মনে হয়, সে যেন গল্পটা জানে, আর মরার ভয়ে বই কেনা, বই পড়া ছেড়ে দিয়েছে। “জীবনের প্রথম কবিতার বই ‘Twilight’ ছাপাতে গিয়ে পাবলো নেরুদাকে নিজের যাবতীয় জিনিস বিক্রি করে দিতে হয়েছিল। বই এমনই একটি জিনিস যার মোহ মানুষকে গ্রাস করে,অবশ্য তেমন মানুষ যদি হন। অনেকে মনে করেন এই মোহ যদি তাকেও পেয়ে বসে তবে তাকেও দেউলিয়া হতে হবে। কিন্তু সৈয়দ মুজতবা আলি বলছেন, “বই কিনে কেউ তো কখনো দেউলে হয়নি। ’’

বই পড়ার কায়দা-কানুন

বই পড়ার কায়দা কানুন নিয়ে বলতে এসে কী সব বাজে বকছি। আসলে বইপড়া বা কেনার কথা উঠলেই আমি নিজেকে সামলাতে পারি না। তবে চলুন এবার আসি কাজের কথায়। বই পড়ার আবার কী কায়দা কানুন? আজ্ঞে তাও আছে। বই পড়ার আগে বইকে ভালো করে চিনতে শেখো। এ পৃথিবীতে কত রকমের যে বই আছে তার ইয়ত্তা নেই।

তারা অনেকটা মানুষের মতোই, কত আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য তাদের। কেউ সরু (কেউ কেউ একে চটি বইও বলে থাকেন), কেউ মোটা। বই আবার নানা আকারেরও হয়। কোনোটা চৌকো, কোনোটা আয়তাকার, কেউ বা লম্বাটে। তাদের আকার যেমন ভিন্ন, ভাষাও হতে পারে ভিন্ন। বিষয় কিংবা রচনারূপও হতে পারে ভিন্ন। সে-সব তো পরের কথা। প্রথম হলো বইটার নাম। নাম জানা যাবে বই খুললেই। যে পাতায় বইয়ের নাম ছাপা থাকে সেটাকে বলে নামপত্র বা আখ্যাপত্র। ইংরাজিতে বলে Title Page। অদি-মধ্য যুগে এই অংশটিকে পুষ্পিকা বলা হত। বইয়ের নামের নীচেই থাকে লেখকের নাম। তবে বই এর প্রচ্ছদের উপরেও বই এর নাম ও লেখকের নাম লেখা থাকে। একটি বইকে আকর্ষণীয় এবং বিপণনযোগ্য করে তুলতে প্রচ্ছদের কিন্তু একটা বিরাট ভূমিকা রয়েছে। অনেক প্রচ্ছদ থাকে সাদামাঠা, আবার অনেক প্রচ্ছদের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে বিমূর্ত একটা ভাবনা। শিল্পীর মননের গভীরতাও প্রকাশ পায় সেই প্রচ্ছদের মধ্যে দিয়ে এবং সেই বইয়ের মূল কথাও অনেক সময় বলে দেয় এই প্রচ্ছদ। আবার একটু লক্ষ করলেই দেখবে বইয়ের হরফ আলাদা-আলাদা হতে পারে। তার বিন্যাস, তার আকার, তার চেহারা বিভিন্ন। কাগজও নানারকম। কোনোটা চকচকে, কোনোটা মোটা, কোনোটা মসৃণ, কোনোটা একটু হলদেটে। তাই তার দামেও দেখা যায় পার্থক্য। আরও একটু বিশদে বই এর বিভিন্ন অংশের নাম আমরা জেনে নিই। কোনো বই না খুলেই তার উপরিভাগের যে অংশটা আমরা দেখতে পাই, সেটাই হচ্ছে কভার পেজ বা প্রচ্ছদ। এর দুটি ভাগ-Front Cover Page এবং Back Cover Page অর্থাৎ প্রচ্ছদের সম্মুখ ভাগ ও পশ্চাদ্ ভাগ। প্রচ্ছদের সম্মুখ ভাগে মুদ্রিত হয় বই এর নাম,লেখকের নাম ও প্রকাশনা সংস্থার নাম ও লোগো। প্রচ্ছদের পশ্চাদ্ ভাগে অনেক সময় বই এর মূল বিষয় সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা বা সংক্ষিপ্ত প্রচারমূলক লেখা বা বিবরণ থাকে যাকে Blurb বলে, যা পাঠককে কাজটি পড়তে বা দেখতে আগ্রহী করে তোলে; একে “প্রচারণা” বা “সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ” ও বলা যেতে পারে। আর বইকে ধুলো বালির হাত থেকে বাঁচাতে সাহায্য করে যে মলাটের মত অংশটা তাকে বলে Dust Jacket। বই এর মেরুদণ্ডের মত যে অংশটা তাকে বলে Spine। স্পাইনে লেখা থাকে বই এর নাম, লেখকের নাম ও প্রকাশনা সংস্থার নাম ও লোগো। স্পাইনের উপরের অংশ ও নীচের অংশ একটা ছোট্ট কাপড় দিয়ে জোড়া থাকে। উপরের অংশটাকে বলে Garter আর নীচের অংশটাকে বলে Footband। বই-এর সামনে ও পেছনে কভারের পরে যে সাদা পৃষ্ঠা থাকে, যে পৃষ্ঠা দুটি কভারের সঙ্গে যুক্ত থাকে তাকে বলা হয় পুস্তানি। এর পরের পাতাকে বলে শিরোনামপত্র বা Title Page। এখানে মুদ্রিত হয় বই এর নাম,লেখকের নাম ও প্রকাশনা সংস্থার নাম ও লোগো। Title Page এর পরের পাতাকে বলে Copyright Page। এখানে বইটির ISBN নম্বর, গ্রন্থসত্ত্ব, প্রথম প্রকাশকাল, শেষ সংস্করণ কবে হয়েছে, বইটির দাম, প্রচ্ছদ শিল্পীর নাম, প্রকাশকের নাম ইত্যাদি বিষয় ছাপা হয়। তারপর থাকে উৎসর্গপত্র অর্থাৎ কবি বা লেখক কাকে বইটি উৎসর্গ করছেন তার নাম লেখা থাকে। তারপর লেখক বা প্রকাশকের মুখবন্ধ, বই সূচিপত্র ও মূল লেখা। বই এর শেষে থাকে পরিশিষ্ট অংশ, যাতে ছাপা হয় ঘটনাপঞ্জী, নির্ঘন্ট, গ্রন্থপঞ্জী, লেখক পরিচিতি, ফ্র্যাকসিমিলি ইত্যাদি। তাই বই পড়ার আগে বইকে ভালো করে চিনতে শেখো।

বই আমাদের পরম বন্ধু। তাই তার প্রতি যত্ন নেওয়াটাও জরুরি। শুধু বই পড়লেই হবে না, তাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা জানতে হবে। বই কিনে আমি প্রথমেই পারতপক্ষে একটা স্বচ্ছ প্লাস্টিক মলাট লাগিয়ে নিই। যাতে উপর দিয়ে বইয়ের নামটা দেখা যায়। এতে বইয়ের উপরটা নতুন থেকে যায় বহুদিন। ময়লা হাতে বই ধরা খুবই বাজে অভ্যাস, এতে বইয়ে নোংরা দাগ লেগে তার বাহ্যিক সৌন্দর্যকে নষ্ট করে দেয়। অনেকে খেতে খেতে বই ধরে — এটা কখনোই নয়। বইকে কখনো কড়া রোদে শুকোতে দেওয়া উচিত নয়। এতে বই এর পাতা গুড়ো হয়ে যায়। বই-এর কোণ বা পাতা দোমড়ানো বা ভাঁজ করা উচিত নয়, এতে বই-এর পাতা কেটে যায়। অনেকে বই এর মধ্যে অযথা দাগ কাটে, হিজিবিজি লিখে বা ছবি এঁকে ভর্তি করে। আমার অনেক ছাত্রছাত্রীকে দেখেছি বইতে ব্যবহৃত ছবিগুলিকে কলমের আঁচড়ে ক্ষতবিক্ষত করতে। এগুলো একরকম বদ অভ্যাস। যদি একান্তই কিছু লেখার দরকার হয়, পেনসিল ব্যবহার করা যেতে পারে। বইকে শুকনো স্থানে রাখা উচিত, যাতে কোনো তরল পদার্থ তাকে স্পর্শ না করে। অন্ধকারে বা খুব কম আলোয় কষ্ট করে বই পড়া উচিত নয়। এতে চোখের ক্ষতি হয়। আবার বিছানায় শুয়ে শুয়ে বই পড়া খুবই খারাপ অভ্যাস। এই বদ অভ্যাস ত্যাগ করা উচিত। যা পড়ছো বুঝে পড়ো। তবেই তোমার বোধগম্যতা বাড়বে। এই পদ্ধতিগুলি মেনে চলতে হয় বই পড়ার ক্ষেত্রে।

বই পড়া ও তার কায়দা-কানুন নিয়ে এতক্ষণ যে কথা হল তা সকলে মনে রাখার চেষ্টা করো। সারাদিনের কর্মব্যস্ততার মাঝে বই মানুষের মনকে নির্মল প্রশান্তি দান করে, কর্মক্লান্তি মুছে দিয়ে মনকে নতুন দিনের জন্য প্রস্তুত করে। বই আমাদের মানসিক সক্ষমতা তথা বুদ্ধিবৃত্তি বাড়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বইয়ের খুঁটিনাটি বিভিন্ন বিষয় সম্বন্ধিত বিচারবিশ্লেষণ পাঠককে তথ্য ও তত্ত্বগত দিক থেকেও সমৃদ্ধ করে তোলে। বই মানুষকে জীবনযুদ্ধ তথা প্রাত্যহিক জীবনের লড়াইয়ে বেঁচে থাকার রসদ জোগায়। মানুষ তার জ্ঞান ও বোধকে ছাপার অক্ষরে সঞ্চিত করে সমগ্র বিশ্বের কাছে তথা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারে বইয়ের মাধ্যমে। বই মানুষকে তার কৌতূহল নিবারণেও সাহায্য করে। বৈচিত্র্যময় এই ধরণির পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা বিস্ময়-অজানা, অচেনা রূপ কখনোই অবারিতভাবে আমাদের কাছে ধরা দেয় না। ভ্রমণের মাধ্যমে তাকে আবিষ্কার করাও সব সময় সম্ভব হয় না, জ্ঞানের ক্ষুধা রয়েই যায়। এই ক্ষুধানিবৃত্তিই সম্ভবপর করে তোলে বই। অজানাকে জানার কৌতূহলী মন বইয়ের গহন জগতে প্রবেশ করে তৃপ্ত হয়। অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের মাঝে সেতুবন্ধন রচনা করে মানুষকে সময়ের সারণিতে এগিয়ে দেয় বই। তাই বই পড়ার কোনো বিকল্প নেই। আনন্দে-রাগে-শোকে-দু:খে বইই হোক আমাদের একমাত্র আশ্রয়,আমাদের যখের ধন-যাকে আমরা সযত্নে আগলে রাখতে পারি আজীবন। বই পড়া নিয়ে প্রমথ চৌধুরীর সুন্দর একটা কথা দিয়েই ইতি টানব এই রচনার —

“…যে জাতির জ্ঞানের ভান্ডার শূন্য, সে জাতির ধনের ভাঁড়েও ভবানী।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন