দু-চারটে মদের বোতল ইতস্তত পড়ে আছে, ছড়ানো চায়ের ভাঁড়-ও। তার একটা পায়ের চাপে গুঁড়ো গুঁড়ো। ঘরটা ভ্যাপসা, গাঢ় সবুজ রঙ ছিল দেওয়ালে, চুন বালি খসে জায়গায় জায়গায় এখন মানচিত্র। খাটে ধামসানো বালিশে হেলান দিয়ে ওরা তিনজন তিন তাসের জুয়া খেলছে। ওরা মানে অবিনাশ, প্রলয় এবং সুধন্য। অবিনাশ মেডিক্যাল রিপ্রেজেনন্টেটিভ, প্রলয় গান করে এবং সুধন্য কাঠ বেকার। কলকাতায় এলেই প্রলয় মধ্য কলকাতার এই হোটেলে ওঠে। একচল্লিশে পৌঁছেও প্রলয় অবিবাহিত। তার পেশা গান করা। প্রলয়ের কণ্ঠে অনেকটাই কিংবদন্তী গায়ক হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ছাপ, যেজন্য সে ছুটছাট ফাংশনে ডাক পায়। আজ রাত দশটায় সে গাইবে কলকাতার এক পাড়ার জলসায়। তা মফস্বলে যা দেয় কলকাতায় তার থেকে কিছু বেশিই দক্ষিণা দেবে।
জুয়া এখন জমাটি, তারা তিনজন উপুড় করে তিনটে তাস ফেলল। প্রলয় ওগুলোর মধ্যে একটা তাসকে নিতান্ত আন্দাজে সাহেব ঘোষণা করে সেটার উপর একশো টাকার নোট রাখে। তাস উলটে দেখা গেল প্রলয়ের আন্দাজ ঠিক, ওই তাসটাই সাহেব। সে দুই বন্ধুর কাছে একশো-একশো দুশো টাকা পেল। নেশায় লালচে ছলছলে চোখে সুধন্য তাকে বলে, ‘আরে গুরু, আজ তোমার দিন। একটা গান হয়ে যাক।’
প্রলয় চিবোনো লবঙ্গটা ‘থু’ করে ফেলে ঘরের কোণে, গলা একটু ঝেড়ে গায়—
আমার জীবনের এত খুশি এত হাসি
কোথায় গেল
ফুলের বুকে সেই অলির বাঁশি
আজ কোথায় গেল?
হায় স্বপ্নভরা সেই গান
আজ কেন হল অবসান!
গানের মাঝে তাকে থামিয়ে স্খলিত গলায় সুধন্য বলে, ‘পলুদা, এটা ঠিক হল না। এ দুঃখের গান আজকের দিনে কেন? আজ তুমি যেখানে গাইবে, ওখানে প্রসূন দত্ত-র মতো নামকরা লোক অ্যাঙ্কারিং করবে, তারপর গাইবে…’
হাত তুলে তাকে নিরস্ত করে প্রলয়। খানিকক্ষণ অন্যদিকে চেয়ে থেকে বলে, ‘আচ্ছা, বিদেশেও কি কণ্ঠী শিল্পী আছে?’
— ‘কে জানে! বিদেশ নিয়ে কোন শালা ভাবে। তুমিই আমাদের গুরু।’
— ‘না রে, মনটা মাঝে মাঝে খুব খারাপ হয়। মনে হয়, আমি তাহলে কী? আমি কি একটা ছায়া মাত্র? হেমন্তর মতো গলা বলে অল্পবয়সে খুব গর্ব ছিল আমার, এখনও আছে, তবু মাঝে মাঝে মনে হয়। কেন কে জানে! আচ্ছা, সুধন্য, অবিনাশ — তোরা দুজনই তো এখানে আছিস, বল তো, আমার কি নিজের গলায় গান করা উচিত? আমি তো না হলে একটা নকল হয়েই থাকব। একি গলার ক্লোনিং নাকি?’
— ‘ওসব বুঝি না, তবে তোমার গলার গান কে শুনবে?’
— ‘না, তা কেউ শুনবে না।’
এবার অবিনাশ বলে, ‘পলু, তুই যদি নিজের গলায় গান করিস, ব্যাপারটা মন্দ হয় না। আসলে, কণ্ঠী শিল্পীদের বাজার এখন মন্দা। মানুষ কতদিন আর দুধের বদলে ঘোল খেতে চাইবে? কিছুদিন আগে নিজেরাই লিখে, গেয়ে, সুর দিয়ে সুমন, নচিকেতা, কাজী কামালরা বাজার কাঁপাচ্ছিল। এখন আবার ওদের বাজারে ভাঁটার টান। এখন রিমেকের যুগ। শ্রীকান্ত আচার্যরা রিমেক করছেন। এমনকি কুমার শানুও সুধীরলালের গান গাইছেন। তুই যদি নিজে কিছু দিতে পারিস, মানে আমি বলতে চাইছি, ইউনিক, ওরিজিন্যাল কিছু, তাহলে তুইও স্পটলাইটে আসতেও পারিস। এই ওরিজিন্যালিটির এখন ভীষণ অভাব। চারিদিকে স্রোতে গা ভাসানোর একটা চেষ্টা।’
প্রলয় বিধ্বস্ত গলায় বলল, ‘জানিস, সেদিন আরামবাগে শ্যামলকণ্ঠী পিকলুর সঙ্গে দেখা হল। পিকলু এখন মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ, গান প্রায় ছাড়ার মুখে। উফ, ওর মুখে ‘হংস পাখা দিয়ে’ গানটা শোনা রীতিমতো একটা অভিজ্ঞতা। সেই পিকলু ওষুধের ভারি ব্যাগ হাতে বলল, ‘দ্যাখ, আশির দশকটা কণ্ঠীশিল্পীদের ছিল, নব্বই দশকটা রিমেক গানের। দেখছিস তো, বড় বড় শিল্পীরা রিমেক করছে।’
অবিনাশ বলে, ‘তবে তুমি আমাদের বন্ধু। তুমি আমাদের গর্ব। হারমোনিয়ামটাও ঠিকমতো বাজাতে জানো না, অথচ স্রেফ গলার জোরে করে খাচ্ছ। যখন ফাংশন শেষে মেয়েরা তোমাকে ছেঁকে ধরে, আমার তো হিংসে হয়। সীতাপুর গাঁয়ে তোমাদের একান্নবর্তী পরিবারের তিরিশ বিঘে মোটে জমি। তোমার বাবা চোখ বুজলে কী-ই বা ভাগে পাবে! তোমার গুরু হেমন্ত হওয়াই ঠিক।’
— ‘তুই বোধহয় ঠিকই বলেছিস।’
জলসার জায়গায় প্রলয় পৌঁছল সন্ধ্যা ছ’টা নাগাদ। দেখল, একটি বছর চোদ্দর কিশোরী উদ্বোধনী সঙ্গীত গাইছে। নিশ্চয়ই পাড়ার। সাজঘরে ঢুকে সে দেখল, আশাকণ্ঠী মিস ডোনার চারপাশে ভিড়। মিস ডোনা একগ্লাস জল চাইতেই কৃতার্থ ভঙ্গিতে একটি ছেলে ছুটে গেল। প্রলয় একটি চেয়ারে বসে। ডোনার মুখ গোলাকার, মুখে খানিক চটক আছে। ওর বয়স তেইশ থেকে তেত্রিশের মধ্যে যে কোনো একটা হতে পারে। মেকআপের ঠেলায় আজকাল মেয়েদের বয়স বোঝা যায় না। উদ্যোক্তারা তাকে জানায়, আর একটু পরেই প্রলয়কে তারা স্টেজ দেবে, তারপর আছে মিস ডোনা। একটা প্লেন চারমিনার ধরিয়ে প্রলয় চুপচাপ বসে থাকে।
মঞ্চে ওঠার পাঁচ মিনিট আগে সে মেপে আধকাপ হুইস্কি খেল। মেজাজ আনার জন্য প্রত্যেক ফাংশানের আগেই সে এটা করে থাকে। নিজের পাঞ্জাবি হাত দিয়ে টানটান করে সে মঞ্চে ওঠা মাত্রই ভেসে এল তীক্ষ্ণ শিস। প্রলয় নমস্কার জানিয়ে গান শুরু করে-‘দাদার কীর্তি’ ছবির ‘চরণ ধরিতে দিও গো আমারে…’ ত্রিপল ঘেরা জায়গার মানুষগুলি চুপচাপ গান শুনছিল, আচমকা বছর বাইশের এক ছোকরা চেঁচাতে থাকে-‘হিন্দি, হিন্দি।’ প্রলয় বলে, ‘সব রকমের গানই করব ভাই, চুপ করে বসুন একটু।’ সে আবার বাংলা গানই গায় ‘ইন্দ্রাণী’ ছবির সূর্য ডোবার পালা আসে যদি আসুক, বেশ তো…’
গানের মাঝেই দর্শকাসন থেকে হল্লা ওঠে — ‘ হিন্দি, হিন্দি। আমরা মিস ডোনাকে চাই। এটাকে নামা, ওরে নামরে।’ দু’চারটে শ-কার ব-কারও ছুটে আসে মঞ্চের দিকে। সে বাধ্য হয়ে নাগিনের গান ধরে, সেই নাগিন — যে সিনেমার গান একসময় মানুষকে জাদু করেছিল। এ গানও এগোয় না। কালো, সিড়িঙ্গে মতো একটা লোক উঠে দাঁড়িয়ে তাকে চূড়ান্ত অশ্লীল খিস্তির বান ডাকায়। প্রলয় ভেবে পায় না তার কী ভুল হচ্ছে! সে মঞ্চ থেকে নেমে আসে।
বিধ্বস্ত, অপমানিত প্রলয় সাজঘরে বসে দেখে — হাই হিল জুতো পরা মিস ডোনা উদ্ধত বুক নিয়ে মঞ্চ দাপিয়ে গাইছে — ‘ও মেরি সোনা রে সোনা রে’ গান। আশা ভোঁসলের গাওয়া এই গানটা এখন এম টিভির কল্যাণে পাবলিক খুব খাচ্ছে। প্রলয় বোঝে, মানুষ চায় যৌনতার মিশেল দেওয়া হিন্দি গান, হেমন্তকে কেউ চায় না। সে দেখল, মিস ডোনার গানে ছোকরার দল কোমর দুলিয়ে নাচছে, মেয়েদের মুখে ওর রূপ আর সাজের গুনগুন আলোচনা।
উদ্যোক্তারা ভদ্র। তাকে পুরো টাকাটাই দিয়ে একটা ট্যাক্সি ডেকে তুলে দিল। একজন শুধু বলল, ‘দাদা, আজকাল হিন্দিটাই চাইছে মানুষ। আর একটু দেখনদারি শুদ্ধু। মানে ওই মাইক হাতে স্টেজে খানিক লাফঝাঁপ…’। ট্যাক্সি চলতে শুরু করে।
প্রলয় বিড়ি ধরায়। সে একা। অথচ কথা বলতে সে ভালোবাসে। আজকের ঘটনাটাগুলো বন্ধুদের না বলা পর্যন্ত তার শান্তি নেই। টাটানগর, ফরাক্কা, বহরমপুর, দিঘা — কত কত জায়গায় সে ফাংশন করেছে। আজকের অভিজ্ঞতা তার কোনোদিন হয়নি। কলকাতার মানুষ কী বাংলা ভুলে গেল, ভুলতে চায়! তবে যে সে শুনতে পায় বাঙালির সংস্কৃতির রাজধানী কলকাতা!
যথেষ্ট নিস্তেজ লাগছে তার শরীর। সে বুঝতে পারে, তার পাঞ্জাবি ঘামে ভেজা। পা বেয়ে পর্যন্ত ঘাম গড়াচ্ছে। অনেক আশা নিয়ে সে কলকাতায় গাইতে এসেছিল। সুধন্যর মামাতো দাদার বাড়ি কলকাতায়, ওকে বলে-কয়ে সুধন্য তাকে এই সুযোগটা করে দিয়েছিল। যাক গে, কী আর করা! একবার মনে হল, সে-ও কি তাহলে হিন্দির লাইনটাই ধরে নেবে? মানুষ তো দেখা যাচ্ছে তাই চাইছে। পরক্ষণেই মনে হল, নাঃ, সে নিজস্বতা বিসর্জন দেবে কেন? সে বাঙালি, বাংলা গানই তার প্রাণ। একদিন নিশ্চয়ই মানুষ আবার নিজস্ব সংস্কৃতির কদর করবে। ট্যাক্সি পৌঁছল হোটেলের দরজায়। রিসেপশন থেকে চাবি নিয়ে নিজের বরাদ্দ ঘর খুলে সে শুয়ে পড়ে। মনটা ভার, জীবনে কিছুই হলো না। প্রতিষ্ঠিত শিল্পী হবার আশা ছিল জীবনে। তা বোধহয় আর কোনোদিনই পূরণ হবে না। কলকাতা যাকে নেয় না, তার এ জীবনে কিছু হবার নয়। বালিশে মাথা রেখে সে চুপ করে ভাবে, প্রতিমা বলেছিল, ‘তোমাকে বড় শিল্পী হতে হবে পলুদা।’ মাধ্যমিক পাশ করার পর গোলগাল ফরসা প্রতিমার বিয়ে হলো ঘাটালের দিকে এক লোমশ কালো পূজারী বামুনের সঙ্গে। প্রতিমা এখন পুরোহিত গিন্নি। লোকটার কানে পর্যন্ত বড় বড় লোম। বিয়ের পর প্রতিমা, প্রলয়কে বলেছিল, ‘জানো পলুদা, আমার বর পুজোর বলির মাথাটা পায়। আমাকেই রান্না করতে হয়, কেমন যেন লাগে। পাঁঠার খোলা চোখদুটো দেখলে মনে হয় আমার দিকেই বুঝি তাকিয়ে আছে।’ বলতে বলতে প্রতিমার চোখ জলে ভরে আসছিল। প্রলয় বুঝেছিল প্রতিমা সুখী নয়, সুখী হয়নি। কিন্তু তার কী-ই বা করার আছে! সে তখন গায়ক হবার স্বপ্নে বিভোর, চাকরি নেবে না ঠিক করেছে। কিন্তু আজকের পর মনে হচ্ছে আম আর ছালা দুই-ই গেল।
প্রতিমাকে সে জীবনে প্রথম চুমু খেয়েছিল তাদের বাড়ির গোয়ালঘরে। সরস্বতী পুজোর সময় আমোদর নদের বাঁধের পাশে সেই সন্ধের কথাটা এখনও মনে আছে। এই মুহূর্তে প্রলয়ের দেহ এক নারীশরীর চাইছে যাকে সে দলে পিষে ভেঙে তার আজকের অপমানের গ্লানি ভুলতে পারে। অথবা এক নারীর পাশে শুয়ে এই অপমানের টেনশন থেকে সে রিল্যাক্সেসন চাইছে। আসলে পৌরুষ হার মেনে নিতে পারে না। তাই নারীর উপর চড়াও হয়ে অপমান ভুলতে চায় বা দুদন্ডের সুখ খোঁজে। কিন্তু একা এই হোটেলে তা সম্ভব নয়। খানকিবাড়ি যাওয়া বা কোনো কলগার্ল ডাকা কোনোটাই তার পক্ষে অসম্ভব। সে যে হেমন্তর গান গায়। ছোটবেলায় সে গান জানত না। প্রতিমা গান শিখত আর তার নাক নেড়ে দিয়ে ছড়া কাটত — ‘সিমফুলটি টুসটুসেটি মধু নাইকো ভুবনে/যে পুরুষ গান জানেনা ধিক ধিক তার জীবনে।’
প্রতিমার গোপন উৎসাহে সে গান শেখা শুরু করে। গান আর ফুটবল খেলায় তার ঝোঁক ছিল খুব। কাছাকাছি গ্রামগুলোতে সে ম্যাচ খেলতে গিয়ে অনেকবারই দেরি করে বাড়ি ফেরায় বাবার ঠ্যাঙানি খেয়েছে। গান করলে বাবা খুব রেগে যেত। বলত, ‘চাষ করবি, চাষার ব্যাটা তুই। গান গেয়ে কী সোনাটা লেদে দিবি আমার সংসারে?’ প্রলয় সেবার মাধ্যমিকের ছাত্র। সদ্য তখন ‘মাদার’ সিনেমাটা রিলিজ করেছে। সে প্রায়ই বাড়িতে নিজের মনে ‘হতাম যদি তোতাপাখি’ গানটা গাইত। বাবা একদিন খুব ধমকাল — ‘শালো, মেয়েছেলের গান গাইচু? ফের যদি দেখেচি ত জেংলিই ঠ্যাং ভেঙে দুব তর।’ সেই যে সে অভিমানে ওই গানটা ছাড়ল আজও সে আর কখনো ওই গানটা গায় না। ইচ্ছেটাই চলে গেছে। হায়ার সেকেন্ডারি দিয়ে সে খেলা, তার প্রাণের ফুটবলও ছেড়েছিল শুধু ভালো করে গান গাইবে বলে। কেননা সে শুনেছিল খেলার ধকলে গানের গলা নষ্ট হয়। সত্যি কিনা কেই বা জানে! আজ সে ভাবছে তাহলে চাষই বোধহয় করতে হবে। গানে তো তার আশা নেই। কলকাতায় সাফল্য না পেলে গান গাওয়ার কোনও অর্থ হয় না। মুখ নয়, মুখোশ হয়েই তার দিনও কেটেছে এতকাল। এক নিদারুণ হৈমন্তিক কুয়াশাজালে সে আবদ্ধ।
প্রলয় চিন্তা করে কেন মানুষ তার গান গ্রহণ করল না? নিজেকে জানতে হবে, নিজের মানে খুঁজে নিজস্বতা উপলব্ধি করতে হবে। যুগ পালটেছে। মানুষ নকলি চায় না। সে ঝুটো হিরে। আসল ফেলে কে আর নকল চায়? পয়সা ফেললেই যেখানে হেমন্তের ক্যাসেট পাওয়া যাবে। নিজের গলায় সে গাইবে কিনা তাও ভাবতে হবে। লোক শুনবে তো? একে তো হিন্দি গানের দাপটে বাংলা গান মুমূর্ষু। বহু কষ্ট করে সে নিজের কন্ঠস্বর হেমন্তের ছাঁচে ঢেলেছে। আচ্ছা, যদি তার আসল গলার অস্তিত্ব আর না থেকে থাকে! সে আতঙ্কিত হয়। সে কি তাহলে আজীবন একটা ছায়া বয়ে বেড়াবে তার চারপাশে?
সকালবেলা উঠে প্রলয় টের পায় গা ম্যাজ ম্যাজ করছে, গলা ধরেছে। টেনশনে অতিরিক্ত সিগারেট খাওয়ার ফল। আজই একবার মানিকদার কাছে যেতে হবে।
হোটেল থেকে বেরিয়ে সে বাড়ি ফেরে। বিকেলে প্রলয় গেল আরামবাগ, মানিক ডাক্তারের কাছে। গলা তখন বসে গিয়ে তিন-চার রকম আওয়াজ বেরোচ্ছে। সে কাতর গলায় অনুনয় করে — ‘ মানিকদা, আগামীকাল রাতে আমাকে গাইতে হবে বিষ্ণুপুরে। সারিয়ে দাও।’ মানিক ডাক্তার মর্মভেদী দৃষ্টিতে বলে — ‘তোর কিছু একটা হয়েছে প্রলয়, তুই মানসিক অশান্তির মধ্যে আছিস।’
প্রলয় ভেঙে পড়ে — ‘হ্যাঁ মানিকদা, কলকাতায় গাইতে চান্স পেয়েছিলুম, নিল না পাবলিক। একরকম প্রায় পালিয়ে এসেছি। কেন এরকম হলো বলো তো? আমি কি খারাপ গান করি?’
— ‘না, তা নয়। শোন, তুই যতই হেমন্তের গলায় গাস, তুই হেমন্ত হতে পারবি না। হ্যাঁ, অনেকেই হয়ত করে খাচ্ছে কণ্ঠীগিরি করে, কিন্তু আমি জানি তুই জাত শিল্পী বলে এ ব্যাপারে তোর মনে একটা অতৃপ্তি রয়ে গেছে। ‘শেষের কবিতা’ মনে আছে? রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন যে ফজলি আমের পর ফজলিতর আম নয়, বেশ পাকা নোনা আতা নিয়ে এস তো হে। তুই হেমন্তর গানই গা না হয় — কিন্তু নিজের গলায়।’
— ‘এ তো নতুন বোতলে পুরনো মদ। যেভাবেই বলো এতো আসলে রিমেক! আপাতত আমাকে কালকের জলসাটা তো উতরে দাও। গলা ধরে আছে।’
— ‘ঠিক আছে, জেলসিমিয়াম থারটি দু’ডোজ দিচ্ছি। এখন একটা দাগ খা। আগামীকাল সকালে একটা দাগ খাবি। কাল দুপুরে ঘুমোস নি। রাতে যদিও জাগতে হবে, তবু দুপুরে ঘুমোলে আবার গলা বসে যাবে।’
ওষুধ খেয়ে তার গলা অনেকটা সারল। বিষ্ণুপুর রসিকগঞ্জে রয়্যাল সূর্যালোক অপেরার ‘বেতন করা বাবা’ যাত্রাপালার শেষে সে গাইল। মোটামুটি গাইল। কিন্তু খুব একটা বাহবা পেল না। গলা এখনো পুরো সারেনি।
রাতে বাড়ি ফেরে প্রলয়। প্রচন্ড গুমোট। আষাঢ়ের ভ্যাপসা রাত। পরপর দুটো ব্যর্থতায় প্রলয় ঝড়ে ভাঙা গাছের মতো। প্রলয় ভাবে নিজেকে চিনতে হবে, জানতে হবে। এখন সে বুঝছে সে কতটা ঠুনকো ভিতের উপর দাঁড়িয়েছিল। গাঁয়ের ছেলে সে। চাষ করেই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবে। দামোদর নদের ওপারে তাদের জমি। তার বাবার সাড়ে সাত বিঘে মাঠের ধান ভাগে পড়ে। জমিটা চেনা দরকার।
রাতে প্রলয়ের ঘুম আসে না। ঝড় উঠেছে। ভূতগ্রস্তের মতো সে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে, তার গলায় সুর ঝলসে ওঠে — ‘ঝড় উঠেছে, বাউল বাতাস আজকে হলো সাথী…’ সবাই সুপ্তিতে মগ্ন। দিগ্বিদিক নিস্তব্ধ। নদের তিরতিরে জল পেরিয়ে সে তাদের জমিতে পৌঁছয়। একটা কালকেউটে সরসর করে তার পায়ের পাশ দিয়ে চলে যায়। প্রলয় ভয় পায় না। সে চিনে নিতে পেরেছে নিজের জায়গা। এই জমি, এই খেত, এই শস্যফসল — তার একান্ত নিজের। জমি তার মা। গর্ভবতী আউস ধানগুলি যেন মানুষকে স্তন দেবার জন্য অপেক্ষারত। ফসলভারে তারা ন্যুব্জ। সে ধানের ছোঁয়া নিতে নিতে মাঠের মাঝখানে নেমে আসে। আকাশের দুপ্রান্ত চিরে ছুটে গেল বিদ্যুৎরেখা — কিছুক্ষণ পর পর কয়েকটা। গুমগুম শব্দে মাটি কেঁপে ওঠে। অবিরল জলধারা তাকে ভেজায়। সে দু’হাত উপরে তুলে গান ধরে — ধানকাটার গান, নিজের গলায়। সে চমৎকৃত হয় আপন গলায়, নিজের কণ্ঠস্বরের সন্ধান সে পেল এই অখন্ড নিস্তব্ধতা ও নিঃসঙ্গতাকে সঙ্গী করে। সে গায় — ‘এই মাটিতে কলিজার আশা, স্বপ্নেরও বীজ বুনি/ চোখেরই জল সেচ দিয়ে, ফসলের কাল গুনি/ খেতের আলে আলে, আজ সোনালি ঢেউ খেলে/ আহা মাটিমাতা, দুইহাতে অন্ন ঢালে…’
তার চোখের জল মিশে যায় বৃষ্টির জলে। তার পোশাক সিক্ত। সে পরম মমতায় পাকা ধানের গায়ে হাত বোলায়। মনে হয় তার গানে সাড়া দিচ্ছে সোনার ফসল। প্রলয় জীবনের মানে, জীবনের খুশি খুঁজে পায়। তার গান ছড়িয়ে যায় দিগন্ত থেকে দিগন্তে। বৃষ্টি এবং মেঘের ডাক তার গানে সঙ্গত করে।