| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্বাধীনতা — অর্জন নয়, দায়িত্বও : যশোবন্ত রায় চোখের বালি যখন চোখের বালিশ : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বাগ্মী কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী হুমায়ুন কবিরকে কি বাঙালি ভুলে গেল : অসিত দাস পূর্বিতা পুরকায়স্থ-র ছোটগল্প ‘প্রান্তিক’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ উই দ্য পিপল অব ইণ্ডিয়া : দিলীপ মজুমদার সিনে সেন্ট্রালের লুসোফন চলচ্চিত্র উৎসবে পর্তুগিজ ছবি — ফ্লাইট অফ ক্রোকোডাইল : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মুখার্জিবাড়ি — জিরাট ও রসা রোড : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার বাংলাদেশেকে লুক ইস্ট পলিসি বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হবে : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

বাংলা নববর্ষের রূপান্তর লিখেছেন পবিত্র সরকার

Reporter
পবিত্র সরকার / ৭৯০ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২১

ইউরোপে শুনেছি জুলিয়াস সিজার (৪৫ খ্রি.পূ.) প্রবল শীতের মধ্যে ১ জানুয়ারিকে নববর্ষের প্রথম দিন হিসেবে চিহ্নিত করেন। প্রশ্ন উঠবে, এ দুর্বুদ্ধি তার কেন হল? কারণ আর কিছুই নয়, রোমান দেবতা জানুস বা ইয়ানুস, যিনি ছিলেন একই সঙ্গে নতুন আর পুরনোর দেবতা, তার নামেই বছরের প্রথম মাস জানুয়ারির নাম হয়। আর প্রথম মাস যখন হয়েই গেল, তার প্রথম তারিখটাই তো নববর্ষের দিন হওয়ার কথা। তাই ১ জানুয়ারি হয় ইউরোপের নতুন বছর। পরে খ্রিস্টানরা তাদের গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারেও এ তারিখটা মেনে নেয়। আবার ভারতের প্রায় সব জায়গায় নববর্ষ হেমন্ত ঋতুর মধ্যে পড়ে। আগে তো সেটা হওয়াই স্বাভাবিক ছিল, কারণ চাষীর ঘরে নতুন শস্য উঠলে সমাজ নতুন জীবন পায়, তাই উৎসব-আনন্দ দিয়ে নতুন বছর শুরু করে। সেই কারণেই উত্তর ভারতের অনেকে নববর্ষ পালন করে দেওয়ালির দিন। অন্যদিকে বাংলা, আসাম, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব ইত্যাদি নানা রাজ্য ১ বৈশাখ নববর্ষের দিন হিসেবে গ্রহণ করেছে। এ ব্যাপারে বাংলা পঞ্জিকাগুলো একটি ইতিহাসের গল্প তৈরি করেছে, জানি না সে আখ্যান কতটা সত্য।

এই গল্পের দুটো দিক আছে। প্রথমত, বাংলা বছর বা সালের উদ্ভব কী করে হল? এ সম্বন্ধে আবার মত আছে দুটি। বেশিরভাগ পণ্ডিতই একমত যে, ইসলামের হিজরি সন থেকেই বাংলা সালকে গ্রহণ করা হয়েছে। হিজরি সালের উৎপত্তি ৬৬২ খ্রিস্টাব্দে। কিন্তু হিজরিতে চান্দ্রবছর প্রচলিত ছিল। ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট আকবর যখন সিংহাসনে বসেন, তিনি নাকি লক্ষ্য করেন চান্দ্র (চাঁদের কলার হ্রাস-বৃদ্ধি, কৃষ্ণ-শুক্ল দুই পক্ষে এক মাস) অনুযায়ী বছর ধরলে প্রশাসনের অসুবিধা হয়। তাই সৌর হিসাব গ্রহণ করে ৩৬৫ দিনের বছরে হিজরিকে রূপান্তরিত করেন এবং তখন থেকে অর্থাৎ ৯৬৩ সৌর হিজরি সালকে বাংলা ৯৬৩ সাল ধরে বাংলা সালের গণনা শুরু হয়।

আরেকটি মত হল, বাংলা সালের উৎপত্তি হয়েছে বাংলার প্রাচীন হিন্দু রাজা শশাঙ্কের আমল থেকে, আনুমানিক ৫৬৮ খ্রিস্টাব্দে। এটি কোনো ঐতিহাসিক তথ্যের দ্বারা সমর্থিত নয়, নিছকই অনুমান। শশাঙ্কের জীবনের কোনো ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে এ বছর যুক্ত নয়। বাংলা সালকে একটা হিন্দু চেহারা দেয়ার জন্য পেছন থেকে হিসাব করে ওই ৫৬৮ সালে পৌঁছানো গেছে, কিন্তু শশাঙ্কের জীবৎকালে হলেও ওই বছরেই কেন বাংলা সালের শুরু হল তা কেউ বলতে পারেননি। কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা শশাঙ্কের রাজত্বকালে ওই বছরে ঘটেনি, তাহলে হঠাৎ নতুন সাল শুরু হতে যাবে কেন?

গল্পের দুনম্বর দিক হল, বৈশাখের পহেলা কবে থেকে নববর্ষ হিসেবে মেনে নেয়া হল? তার তারিখ ঠিক জানা যায় না। তবে আগে অগ্রহায়ণ বা মার্গশীর্ষ মাসটি থেকে নববর্ষ শুরু হতো, তা ফসলের মাস হওয়ায় এমনই প্রত্যাশিত। পরে মেষ সংক্রান্তির সময় অর্থাৎ বৈশাখ থেকে বাংলার বছর শুরু হয়। বৈশাখ মাসে সূর্য সাধারণভাবে মেষ রাশিতে থাকে। আমি এসব ব্যাপার কিছুই বুঝি না, কাজেই আমি বোকার মতো প্রশ্ন করতেই পারি, মেষ রাশি এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ল কেন? বাঙালিদের সঙ্গে মেষের কী সম্বন্ধ, খাদ্য-খাদক ছাড়া? আশা করি পণ্ডিতরা এর জবাব দেবেন।

২.

যাই হোক, বাঙালি এবার ১৪২১ সালের মুখোমুখি, তার পহেলা বৈশাখও এসে গেল। হিন্দু ও মুসলমান বাঙালি এর মধ্যে নানা রকম পঞ্জিকা কিনে নিয়েছেন, এবং আশা করি সারা বছরের মধ্যে নানা শুভদিনের হিসাব বুঝে নিয়েছেন। এই পঞ্জিকার মধ্যে বাঙালির অস্তিত্বের একটা দুভাগ হওয়ার সংকট দেখতে পাই আমরা। সে বাইরে এক রকম মানছে, ভেতরে আরেক রকম মানতে বাধ্য হচ্ছে। তার বাঁচা দুটুকরো হয়ে গেছে। পাশ্চাত্য সভ্যতার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মানতে বাধ্য হওয়া সব সংস্কৃতির মধ্যেই এই একটা ফাটল তৈরি হয়েছে। এমনকি চীন-জাপানও সংস্কৃতির এই দ্বিধা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। তার অর্থনীতি, শিক্ষাব্যবস্থা, বিচার, প্রশাসন সব নিয়ন্ত্রণ করে বিলেতি বছর, তার জাতীয় সংস্কৃতি চালায় তার নিজের ক্যালেন্ডার।

এরই মধ্যে একই কারণে আবার বাঙালির শহর আর গ্রাম ভাগ হয়ে গেছে, ভাগ হয়ে গেছে লেখাপড়া জানা চাকরিজীবী মানুষ আর নিরক্ষর খেটে খাওয়া মানুষ। কারণ উপরতলার বাঙালি স্কুল-কলেজে, অফিসে-আদালতে যায়, ইংরেজি বছর অনুযায়ী মাসমাইনে দেয় বা পায়। তার ঘরের বাইরের জীবন ইংরেজি বছর নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু গ্রামের বাঙালি, নিরক্ষর বাঙালি, চাষের ক্ষেতের বাঙালি, নৌকার হাল-ধরা বাঙালি, গঞ্জের দোকানদার বাঙালি মেনে চলে বাংলা সাল। এখনও গ্রামে মাইক্রোফোনে ঘোষণা চলে, “আগামী ১৮ই পৌষ চাকদহ স্কুলের মাঠে কলিকাতার প্রসিদ্ধ নট্ট অপেরার রায়সুন্দরী যাত্রাভিনয় হইবে।” বাঙালি বাবু-বিবি যদি বিলেতি ক্যালেন্ডার মেনে চলেন, তবে তাদের বাড়িতে গ্রাম থেকে আসা কাজের মানুষরা বাংলা তারিখের খোঁজ রাখে, তা-ই ব্যবহার করে। বাঙালি বাবু-বিবির একটা অস্পষ্ট হিসাব আছে যে ইংরেজি মাসের মাঝামাঝি বাংলা মাসের শুরু বা শেষ হয়, কিন্তু বাড়ির কাজের লোক ঠিক বলতে পারে মঙ্গলবারে সংক্রান্তি পড়বে আর বুধবারে হবে নতুন বাংলা মাসের পহেলা। বাঙালি বাবু-বিবি পূর্ণিমা-অমাবস্যার আসা-যাওয়ার খবর রাখেন না, কোটাল কখন আসে আর যায় তাও জানেন না। তার ছোট বৃত্তের বাইরে যে বাঙালিরা থাকেন, তারা এসবের দিব্যি হিসাব রাখেন।

তবে এও ঠিক যে, বাবু-বিবিও সব সময় ইংরেজি তারিখ ব্যবহার করেন না। আগেই বলেছি, বাঙালি হিন্দু বছরে একটি করে নতুন বাংলা বছরের পঞ্জিকা কেনেন। বাড়িতে সন্তানের জন্ম হলে তার নানা অনুষ্ঠান- যেমন অন্নপ্রাশন, বামুনের ছেলে হলে উপনয়ন, বিয়ে ইত্যাদি সবই বাংলা পঞ্জিকাতে লিখে দেয়া শুভদিন মেনে হয়। আবার কোন দিন অশুভ, কোন দিন নানা কুগ্রহের যোগাযোগ যাত্রা নাস্তি, তাও বাংলা পঞ্জিকা দেখে বাঙালি হিন্দু বুঝে নেন, সেখানে ইংরেজি ক্যালেন্ডার তার কোনো কাজে লাগে না। আমি বাঙালি মুসলমানদের কাছে শুনেছি, তারাও অনেক সময় এ হিন্দু পঞ্জিকা ব্যবহার করেন, তবে নিছক ধর্মীয় অনুষ্ঠান, মহরম, রোজা, ঈদ, শবেবরাত ইত্যাদি জানার জন্য ইসলামী পঞ্জিকা দেখে নেন। নিশ্চয় তাদের আরও অনেক ক্ষেত্রে ইসলামী পঞ্জিকা ব্যবহৃত হয়। হিন্দু পঞ্জিকাতেও অবশ্য এখন ইসলামী পরবের দিন লেখা থাকে।

তাই আমি বলি, ইংরেজি বছর হল আমাদের বুকপকেটের বছর, আর বাংলা বছর হল বুকের বছর।

পহেলা বৈশাখ বাঙালি হিন্দু দোকানদার আর ব্যবসায়ীদের কাছেও এক পবিত্র দিন। ওইদিন ব্যবসার পুরনো হিসাব চুকিয়ে নতুন হিসাব শুরু করার দিন, ক্রেতা ও গ্রাহকদের দেনা-পাওনার নতুন খাতা শুরু করার দিন। ভোরবেলায় উঠে তারা গঙ্গা বা কাছাকাছি নদীতে স্নান করে আসেন, কলসিতে তার জল নিয়ে তা দোকানে বা গদিতে ছিটিয়ে দেন, ধুপধুনো জ্বালিয়ে, গণেশ বা লক্ষ্মীর পূজা করে নতুন খাতার শুভ মহরত করেন। বিকেলে খদ্দেরদের সপরিবারে নিমন্ত্রণ করেন, সবার জন্য মিষ্টির প্যাকেট ও ঠাণ্ডা পানীয়ের ব্যবস্থা থাকে। খদ্দেররা বাকি টাকা শোধ করেন এবং লেনদেনের নতুন খাতায় নাম ওঠান।

আর নতুন বছর হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বাঙালির পরিবারের কাছেও একটা উৎসবের দিন। এদিন সবার নতুন জামা-কাপড় হয়, স্নানের পর ছোটরা বড়দের প্রণাম করে সেই জামা-কাপড় পরে। এদিন ধুতি-পাঞ্জাবির বাঙালির পোশাক পরাটাই অনেক হিন্দু বাঙালি উচিত মনে করেন। আর সেদিন একটু বিশেষ খাওয়াদাওয়ারও আয়োজন হয়। হিন্দুর পঞ্জিকায় অবশ্য বলা আছে, প্রতি রোববার মৎস্য, মাংস, মাষকলাইয়ের ডাল, মসুর ডাল, নিম (পাতা?), আদা আর পোড়া জিনিস খাওয়া চলবে না- সেসব আজকাল শহরে কেউ মানে বলে জানি না। পঞ্জিকায় আরও বলা আছে, বৈশাখ মাসে রোজ ভোরবেলায় স্নান করতে হবে, তার পরে চাষীরা যেন কলা, পান আর পিপুল ইত্যাদির চারা রোপণ করে ইত্যাদি ইত্যাদি। এতে বোঝা যায়, পঞ্জিকাগুলো মূলত কৃষিজীবী সংস্কৃতির কথা মাথায় রেখে নিজেদের তৈরি করে এসেছে। অবশ্যই পঞ্জিকা এসেছে ছাপাখানা আসার পর, কিন্তু তার অন্তরে আছে কৃষি সভ্যতার স্মৃতি। তখন ব্রাহ্মণ গণকঠাকুররা হিন্দু বাড়িতে বাড়িতে বিধান দিতেন, নববর্ষে কী করতে হবে, ব্রাহ্মণদের কী কী দিতে হবে।

তবে ভালো বাঙালি খাওয়াদাওয়ার বাণিজ্যিক বিপণন শুরু হয়েছে কয়েক বছর হল। এখন কলকাতার বিখ্যাত হোটেলগুলো তালপাতার হাতপাখার ছবিশুদ্ধ বিশুদ্ধ বাঙালি খানার বিজ্ঞাপন দেয়। মস্তবড় কাঁসা বা পিতলের থালা, তাতে ভাত, মাছ ও আরও অনেক কিছু ভাজা, শাক, চারদিকে ঘের দিয়ে সাজানো পাঁচ-দশখানা বাটি, যাতে সুক্তো থেকে মাংস পর্যন্ত সব সাজানো, তার পরে দই আর মিষ্টি শেষে পরিবেশন করা হবে। মুখশুদ্ধির জন্য মিষ্টি পানও যথানিয়মে আসবে। তালপাতার হাতপাখা আর কিছু নয়, বাঙালি গিন্নিরা স্বামীকে এ রকম ষোড়শ ব্যঞ্জন দিয়ে খেতে বসিয়ে তালপাতার হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতেন, তারই স্মৃতিমেদুর একটি ছবি। এখন পুরুষের সেই সুখের দিন আর নেই। নেই যে, সে ভালোই হয়েছে। এ ছবি সচ্ছল ঘরের, গরিবরা কীভাবে নববর্ষ পালন করে কলকাতার বাণিজ্যিক হোটেল-রেস্টুরেন্ট তার খবর রাখবে কেন? বিজ্ঞাপনকামী খবরের কাগজেরও তা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই।

৩.

ইদানীংকালে এই ধর্মীয় আর সামাজিক ভিত্তির বাইরে একটা ধর্মমুক্ত নববর্ষের ধারণা বাঙালি ধীরে ধীরে গ্রহণ করছে। সেটি সম্পূর্ণভাবে সাংস্কৃতিক নববর্ষ। সময়টা তীব্র গ্রীষ্মের অধীন, উৎসব-অনুষ্ঠানের খুব অনুকূল নয়। তবে আমরা আগে দেখতাম পাড়ার ক্লাবগুলো ভোরবেলায় ছেলেমেয়েদের নিয়ে শোভাযাত্রা বের করত, মেয়েরা লালপাড় শাড়ি পরে আসত, শাঁখ বাজিয়ে নতুন বছরকে অভিনন্দন জানাত। সমবেত কণ্ঠে গান হতো, রবীন্দ্রনাথের গান, নজরুল, অতুলপ্রসাদের বর্ষবন্দনার গান। এখনও তা চলছে। কোনো কোনো শিশু-সংগঠন মাঠে সমাবেশ করে নানা খেলাধুলার কৌশল দেখাত।

কিন্তু বাংলাদেশে ঢাকায় যেটা হয় সেটার তুলনা অন্যত্র পাওয়া কঠিন। ঢাকার রমনার বটগাছতলায় ছায়ানট নামে সঙ্গীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রায় তিনশ শিল্পী (মেয়েরা সবাই লালপাড়ের শাড়ি আর লাল ব্লাউজ পরা, মাথায় লাল টিপ; ছেলেরা সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি) বসে নতুন বছরকে আহ্বান করেন বাংলা কবিতা বলে, বাংলা গান গেয়ে। রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলগীতি, অতুলপ্রসাদ-রজনীকান্ত সেনের গান, লালন ফকির থেকে আরম্ভ করে বাংলার অসামান্য লোকগীতিকারদের গান, প্রখ্যাত কবিদের কবিতা। সেদিন সারা ঢাকা শহর শুধু এ অনুষ্ঠান দেখতে আসে তাই নয়, তাদের সবার বিশেষত মেয়েদের পোশাকে একটা লাল রঙের আভা থাকে। মা-বাবারা ছোট ছেলেমেয়েদের সঙ্গে নিয়ে আসেন, তাদের গালে কখনও নদী আর নৌকার ছবি, কখনও বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার ছবি আঁকা হয়। পরপর তিন বছর এ অনুষ্ঠানের দিনে ঢাকায় উপস্থিত থেকে আমি দেখেছি, শুধু রমনায় নয়, সারা দিন ধরে ঢাকা শহরের অলিতে-গলিতে এ উৎসব চলে, বাংলাদেশের শহরে শহরে এ উৎসব ছড়িয়ে গেছে। বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেরা নানা রকম প্রতিকৃতি নিয়ে বিশাল মিছিল বের করে, গান-বাজনায়, নাচে-হৈ হল্লায় তারা যেন নতুন বছরকে এ উৎসবের মধ্যে ঢুকে পড়তে বলে। এ উৎসবের সঙ্গে ধর্মাচারের কোনো সম্পর্ক নেই। উৎসবের চারপাশে মেলা বসে যায়, সেখানে মেলার সবকিছুই থাকে, অস্থায়ী হোটেলে পান্তা ভাত আর ইলিশ মাছ ভাজা পর্যন্ত পাওয়া যায়। কিন্তু ঢাকার পাঠকের কাছে ব্যাখ্যান করে এ বৃত্তান্ত বলা নিউ ক্যাসেলে কয়লা নিয়ে যাওয়ার মতো।

পশ্চিমবাংলায় এ উৎসব ঢাকার মতো উন্মাদনা সৃষ্টি করতে পারেনি এখনও। তবু চেষ্টা চলছে। চৈত্র সংক্রান্তির দিন কলকাতার একাডেমি অব ফাইন আর্টসের সামনে সারা রাত উৎসব আর শুঁটকি মাছ-পান্তা ভাতের আয়োজন শুরু হয়েছে কয়েক বছর, তা এখনও ঢাকার মতো মেলা আর সর্বজনীন স্ফূর্তির চেহারা নেয়নি।

তবে কলকাতায় আরেকটি ধর্মমুক্ত উৎসব বিশাল আকার নিয়েছে। বৈশাখের শেষদিকে একটি দিনে তা সারা দিন ধরে চলবে। পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সব বাঙালি সেই উৎসবে একদিনের জন্য আত্মবিস্মৃত হবে। সেটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন। পঁচিশে বৈশাখ।

প্রথম প্রকাশ : এপ্রিল ১৪, ২০১৪, সোমবার : বৈশাখ ১, ১৪২১

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev