
৬৮. সুতাহাটার গান্ধী আশ্রমের কুমারচন্দ্র জানা ও চারুশীলাদেবী
১৯৪৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর। সুতাহাটা গান্ধী আশ্রমে সাজো সাজো রব। গান্ধীজি আসছেন । বিকেল ৪টা ৫ মিনিট। গান্ধীজির গাড়ি থামল। গাড়ি থেকে নেমে গান্ধীজি একটু হেসে বললেন, ‘কুমারবাবু, আমার কিন্তু পাঁচ মিনিট দেরি হয়ে গেল।’
কুমারচন্দ্র জানা বললেন, ‘শেষ পর্ষন্ত আপনি আসতে পেরেছেন, সেটাই আমাদের সৌভাগ্য।’
কুমারকে অনেক দিন ধরেই চেনেন গান্ধী। দেশপ্রাণ বীরেন্দ্রনাথ শাসমলের একনিষ্ঠ শিষ্য তিনি। দেশপ্রেমে, আদর্শনিষ্ঠায় তুলনা নেই মেদিনীপুর জেলা কংগ্রেসের এই সভাপতির। পায়ে হেঁটে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ান তিনি। মানুষের কথা শোনেন। সাধ্যমতো মানুষের কষ্ট দূর করার চেষ্টা করেন। তাঁর আন্তরিকতায় উদ্বুদ্ধ হয় মানুষ। অজ পাড়াগাঁয়ের চাষার ছেলে না হয়ে কুমার যদি শহরের ‘ভদ্রলোকের’ ঘরের হতেন, তাহলে তিনি জননায়ক হতেন। সে রকম জননায়ক হবার কোন বাসনা চাষার ছেপের নেই। শুধু দেশকে ভালোবাসা আর দেশের মানুষের উন্নতি করাই তাঁর একমাত্র বাসনা।
গান্ধী আশ্রমের ভেতরে ঢুকে গান্ধীজি মুগ্ধ। চারদিক পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। এর পেছনে নিশ্চয়ই কোন স্নেহময়ী নারীর হাতের স্পর্শ আছে। কুমারের কাছে তার উত্তর পেলেন তিনি।
কুমার বলেন, ‘যদি আমার স্ত্রী আমার কাজকর্ম ও চলার পথে বাধা হতেন, তাহলে আমার পক্ষে স্বদেশি আন্দোলনে এতখানি সময় ও শক্তি ব্যয় করা সম্ভব হত না। তিনি আমার কাজে বিরোধিতা তো করেনইনি, বরং আমার পথ অনুসরণ করে দুঃখ-কষ্ট বরণ করেছেন এবং জেল খেটেছেন। সেজন্য স্ত্রীর কাছে আমার ঋণের শেষ নেই।’
কুমারচন্দ্রের স্ত্রী চারুশীলা। সুতাহাটা থানার ভূঞ্যারচক গ্রামে চারুশীলার জন্ম। ১৯০২ সালে। তাঁর মা-বাবার নাম রমণী সামন্ত ও রমানাথ সামন্ত। গরিব পরিবার। কিন্তু সে পরিবারেও দেশপ্রেমের স্রোত বইত। পারিবারিক সূত্রে চারুশীলার মানেও এসেছিল দেশপ্রেমের আবেগ। এগারো বছর বয়েসে বাসুদেবপুরের কুমারচন্দ্র জানার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়।
কুমারচন্দ্র বাসুদেবপুরে গড়ে তোলেন গান্ধী আশ্রম। গান্ধীজির ১৮ দফা কর্মসূচি পালন করতেন আশ্রমের সদস্যরা। তার মধ্যে ছিল খাদি ও চরকা প্রচলন, মাতৃভাষা চর্চা, গণশিক্ষা প্রসার, কুটিরশিল্প স্থাপন, শ্রমিক উন্নয়ন, সাফাই ও সালিশি সভার আয়োজন, নারী কল্যাণ ইত্যাদি।
মেদিনীপুরে যে অসহযোগ আন্দোলন ও ইউনিয়ন বোর্ড বিরোধী আন্দোলন হব, তার পুরোভাগে ছিলেন কুমারচন্দ্র ও চারুশীলা। তমলুকের নেতারা বুঝেছিলেন যে দেশকে স্বাধীন করতে হলে মেয়েদের বাদ দিলে হবে না, তাদের সাহায্য প্রয়োজন। সেই জন্য তাঁরা ১৯৪১ সালে বাসুদেবপুরের গান্ধী আশ্রমে ১৫ দিনের এক প্রশিক্ষণ শিবির। ক্ষুদিরাম ডাকুয়া আর সুশীলকুমার ধাড়া ছিলেন প্রশিক্ষণ শিবিরের আয়োজক। এই প্রশিক্ষণ শিবিরে উপস্থিত ছিলেন ড. প্রফুল্ল ঘোষ, অজয়কুমার মুখার্জি, সতীশচন্দ্র সামন্ত, ডা. জনার্দন হাজরা, চুনীলাল কুইতি প্রভৃতিরা। প্রশিক্ষণ শিবিরে চারুশীলার সঙ্গে অংশ নিয়েছিলেন বাসন্তী কর,সুবোধবালা কুইতি, সুশীলা জানা, প্রভাবতী সিংহ, কুমুদিনী ডাকুয়া, গিরিবালা দে প্রমুখেরা। প্রশিক্ষণ নিতে নিতে চারুশীলার দৃষ্টি ছিল সকলের সুখ-সুবিধার দিকে। সকলের কাছে প্রিয় ছিলেন তিনি, ছিলেন ভরসার পাত্র, ছায়াদানকারী বৃক্ষ।
চারুশীলা গ্রেপ্তার হয়েছেন অনেকবার। ১৯৩৪ সালে সুশীলা বেরা আর গিরিবালা দে-র সঙ্গে গ্রেপ্তার হন। ৬ মাসের হাজতবাস। মরদিনীপুর সেন্ট্রাল জেলে। সঙ্গে তাঁর ৫ বছরের শিশুকন্যা। কোথায় ফেলে রেখে যাবেন এই শিশুকে? তাই মায়ের সঙ্গে ৫ বছরের শিশুও হাজতবাস করল। লবণ সত্যাগ্রহেও নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।
তারপর সুতাহাটা থানা দখলের রোমাঞ্চকর কাহিনি।
১৯৪২ সাল। ভারতছাড়ো আন্দোলন শুরু হয়েছে। আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করল তমলুকে। সতীশচন্দ্র সামন্তের পরিচালনায়। রাস্তা কেটে ফেলা হল। টেলিগ্রাফ ও টেলিফোনের পোস্ট উপড়ে ফেলা হল। যাতে ইংরেজ পুলিশ ও সেনারা না ঢুকতে পারে, না কোন যোগাযোগ করতে পারে। তমলুক থানা, মহিষাদল থানা, সুতাহাটা থানা, নন্দীগ্রাম থানা দখল করে নিতে হবে। প্রতিষ্ঠা করতে হবে জাতীয় সরকার। তমলুক অভিযানে প্রাণ দিলেন মাতঙ্গিনী হাজরা। এর মধ্যে একমাত্র সুতাহাটা দখল হয় বিনা রক্তপাতে। চারুশীলারা যার নেতৃত্বে ছিলেন। সুতাহাটা থানার স্টেশন অফিসার আর পুলিশকর্মীরা না কি নিজেরাই অস্ত্র-শস্ত্র জমা দিয়ে জাতীয় পতাকাকে স্যালুট করেছিলেন।