| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সাহিত্যে নোবেলজয়ী অ্যান কারসন-এর শব্দের ব্যুৎপত্তির ধারণা : অসিত দাস মিয়ানমার সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন কানাডার কবি অ্যান কারসন : অসিত দাস পেজফোরনিউজ-এর শারদোৎসব বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ প্রকাশিত হল ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ একটি অব্যক্তিগত বয়ান : তপোধীর ভট্টাচার্য মহালয়ার প্রার্থনা : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘এক টুকরো ভোর’ আশ্বিনের শারদপ্রাতে : যশোবন্ত রায় আমার ছেলেবেলার মহালয়ার সকাল : পীযূষ কান্তি দাস পর্দার দাপুটে নায়ক, বাস্তব জীবনে মানবতাবাদী — নানা পাটেকরের জীবন ও অবিনশ্বর কীর্তি : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সসীমকুমার বাড়ৈ-এর ছোটগল্প ‘প্রকৃতি বিভাজন খেলা’ মিরকাশিমের বীরকুল, হেস্টিংসের ব্রাইটন, জন ফ্র্যাঙ্ক স্নেইথ-এর দীঘা : সুব্রত গুহ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ SIR-এর ফাঁসে জ্ঞানেশ কুমার, কমিশনের অন্দরে অশান্তি (শেষ কিস্তি) : দিলীপ মজুমদার রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে পাঁচ দফা কৌশল বাস্তবায়নের রোডম্যাপ : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন কলকাতার নব্য কাজিয়ার দুর্গা : অসিত দাস SIR-এর ফাঁসে জ্ঞানেশ কুমার, কমিশনের অন্দরে অশান্তি (সপ্তম কিস্তি) : দিলীপ মজুমদার আমাদের নিখোঁজ শিশুরা: সংখ্যার বাইরে যে প্রশ্নগুলো জরুরি : নিকোলাস বিশ্বাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মানুষকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে নয়া পুঁজিবাদ : সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় SIR-এর ফাঁসে জ্ঞানেশ কুমার, কমিশনের অন্দরে অশান্তি (ষষ্ঠ কিস্তি) : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ SIR-এর ফাঁসে জ্ঞানেশ কুমার, কমিশনের অন্দরে অশান্তি (পঞ্চম কিস্তি) : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই পিতৃ পক্ষের শেষ, মাতৃপক্ষের সূচনা শুভ মহালয়ার আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com, আমাদের পোর্টালের কিছু ছবি বাদে প্রায় সব ছবিই অন্তর্জাল থেকে সংগ্রহ করা হয়। কারুর যদি কপিরাইট থাকে জানাবেন। আমরা সেই ছবি পোর্টাল থেকে ডিলিট করে দেব।

নন্দিনী অধিকারী-র বড়োগল্প ‘দুর্গাদালান’

Reporter
নন্দিনী অধিকারী / ৪৩৫ Views জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

পঞ্চমীর বিকেল। উৎসবের রঙ আকাশে ছড়িয়ে সূর্য পাটে বসতে চলেছে।

সরল আর বিমল দুই ভাই মস্ত বড় বোঁচকায় মায়ের সাজ নিয়ে সেনবাড়ির পুজোদালানে ঢুকল। তারা মালাকার পরিবারের। বংশপরম্পরায় দেবদেবীদের সাজিয়ে তোলাই তাদের কাজ।

ওদিকে সেনপরিবারের ছোটতরফের বাড়ির মেয়ে আনন্দীর বড্ড তাড়া। ন’বছরের মেয়েটি খেলতে যাবে বলে তড়িঘড়ি দুধের কাপে শেষ চুমুক দিচ্ছিল। মাদুগ্গার সাজ পরানোর খবর তার কানে পৌঁছতেই সে মত বদলে ফেলল। হাতের তালু দিয়ে ঠোঁটের ওপরের দুধের রেখাটুকু মুছে খেলা ভুলে দৌড়তে দৌড়তে এসে বসে পড়ল দুগ্গাদালানে।

সাদাধুতির বোঁচকার গিঁট খুলতেই চমক! যেন প্যান্ডোরা বক্স! কি নেই তাতে? দুগ্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতীর শোলার পোশাক। জরি, চুমকি, রাংতা, পুঁতি দিয়ে সাজানো। ঝলমল করে উঠল দুগ্গা আর তার দুই মেয়ের চিক, সীতাহার, কানবালা কোমরের চন্দ্রহার, হাতের কেয়ূর, বালা, চূড়, পায়ের পাঁয়জোর, মুকুট। ঝনঝন করে উঠল দশভূজা আর কার্তিকের অস্ত্র। বেজে উঠল যেন সরস্বতীর বীণা।

এত ঝলমল করা গয়নাগাঁটি, অস্ত্র শস্ত্র দেখে অবাক আনন্দী। প্রশ্নে প্রশ্নে অস্থির করে তোলে দুই মালাকার ভাইকে, “এত সব গয়না তোমরা তৈরি করেছ? কতদিন ধরে বানিয়েছ এগুলো কাকু? এটা কিসের আঠা?”

সরল মালাকারের নাম সার্থক। সে সরল মনে উত্তর দেয়, “খুকু, আমাদের বাড়ির মেয়ে বৌ ছেলে সব্বাই মিলে আমরা মায়ের গয়না বানাই। যেমন বায়না পাই, তেমনভাবে কাজ শুরু করি। যে আঠা দিয়ে গয়না বানাই, সেটাকে বলি বিরোজা আঠা। সেগুনগাছের ছাল আর মোম গলিয়ে তৈরি হয়। আমরা বাড়িতেই তৈরি করি এ আঠা।”

“আর ঐ যে ঠাকুরের ধবধবে সাদা কাগজের মত পোশাক, সেগুলো কি দিয়ে তৈরি? কোথায় পাও ওগুলো?” প্রশ্নের শেষ নেই বালিকার।

“ওগুলো শোলার। তুমি জানো শোলা কাকে বলে? শোলা জলে হয়।”

সরল আবার কৌতুহল মেটায় বালিকার। বিমলের অত ধৈর্য্য নেই উত্তর দেবার, সে বিরক্ত হয়ে ভুরু কোঁচকায়।

আনন্দী মনে করতে চেষ্টা করে, শোলা সে দেখেছে। লম্বা লম্বা কাঠের লাঠির মত দেখতে হলেও তা নরম। ভেতরটা সাদা। তার সেজদাদুর ঘড়ির দোকানের সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতি ঐ শোলার পাতের ওপরেই রাখা হয় যে! সেগুলো দিয়ে এত সুন্দর ড্রেস বানানো যায়!

দেখতে দেখতে মা দুগ্গার একঢাল কালো কোঁকড়ানো চুল লাগানো শেষ। সরলকাকু বলল এই চুল নাকি তৈরি হয় সোনালী পাটকে কালো রঙ করে।

চুল লাগাতেই ঘামতেল মাখানো দুগ্গার মুখ যেন আরো সুন্দর হয়ে উঠল। আনন্দীর একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস পড়ল।

ঐ একঢাল চুলের ওপর বড় লোভ তার। তার ঘাড় অবধি ঝুমুরঝামুর চুল। একটু বড় হলেই মা কাটিয়ে দেয়! সে একটুকরো চুল চেয়ে নিল সরলকাকুর কাছে। তার পুতুল মেয়ের জন্যে।

রাত গড়িয়ে চললো।

পড়া, খাওয়া, ঘুম ভুলে তন্ময় হয়ে আনন্দী দুগ্গার সাজ পরানো দেখছে। বাড়ি থেকে তলব এলো। বাসন্তীপিসি ডাকছে, “চলো মামণি, মা ডাকছে তোমায়। কত রাত হল খেয়াল আছে?”

“উঁ উঁ একটু পরে যাব।”

“না, না পরে নয়। মা বকবে।” অনিচ্ছুক, ক্লান্ত শরীরটাকে বাড়ির দিকে টেনে নিয়ে যেতে যেতে আনন্দীর আবার মনটা খারাপ হয়ে গেল।

ঠাকুরের এত সুন্দর ঝলমলে পোশাক অথচ তার পুজোর তিনটে জামার একটাও পছন্দ হয় নি।

রেডিমেড জামার জন্যে তাদের শহরে কৃষ্ণা বস্ত্রালয়ই ভরসা। হঠাৎ করে লম্বা হয়ে গেছে আনন্দী। দোকানে আর বিশেষ ভ্যারাইটি দেখাতে পারেনি। আনন্দী এখন সেজপিসির দেওয়া জামার জন্যেই হা-পিত্যেশ করে বসে আছে। তিনি বালিগঞ্জে থাকেন। গড়িয়াহাট থেকে কি সুন্দর সুন্দর ডিজাইনের ফ্রক তার জন্যে প্রতিবছর পুজোয় এনে দেন।

আনন্দী ঠিক করেছে, আরেকটু বড় হলেই সে পুজোয় শাড়ি পরবে। পুজোদালানে এক গা গয়না, নথ পরে সবাই যেমন নিজেরাই দুগ্গাঠাকুর হয়ে ওঠে! আচ্ছা, তার মা এমনটি কেন সাজে না? এসব ভাবতে ভাবতেই ক্লান্ত আনন্দীর চোখে ঘুম জড়িয়ে এল…

দুই

গন্ধবেনেদের দোকান হইতে মাথাঘষা এসে পৌঁছিয়াছে। সঙ্গে চুলবাঁধিবার লাল কার। গহনা পরিষ্কার করিবার রীঠা। আনন্দীর দিদিশাশুড়ির আমলের তোলা গহনা সিন্দুক থেকে বাহির হইয়াছে। সেসব রীঠার জলে পরিষ্কার করিতে হইবে। জড়োয়া, গুলমদ, মীনাকারির গহনা দেখিয়া আনন্দী পুলকিত হইয়া পড়িল। যদিও সে বড়ঘরের মেয়ে। তার পিতৃগৃহেও ষোড়শোপচারে দুর্গাপূজা হইয়া থাকে। তাই নববিবাহিতা আনন্দীর নিজের গহনাও বড় কম কিছু নয়।

আনন্দী সব গুছাইয়া হাতবাক্সে রাখিবার পর চুলে যেইমাত্র কাঁকই ঠেকাইয়াছে, নীচতলা থেকে ঠিকে ঝি হাঁক পাড়িল, “ও নতুনবৌ, নাপতিনী এয়েচে যে”।

আনন্দীর কোমল পদযুগলে নাপতিনী আলতা পরাইয়া চিবুক ছুঁইয়া রসিকতা করিল। আনন্দী সাজা হইতে স্নান সারিয়া রূপার সিঁদূর পাতা দিয়া সীমন্তে হরতনী চিহ্নে সযত্নে সিঁদূর আঁকিল। কপালে দিল সিঁদূর বিন্দু। পরনে জড়াইল ফরাসডাঙার নীলাম্বরী। পায়ে পড়িল রূপার বাঁক মল। হাতে এয়োতীর চিহ্নস্বরূপ প্রথমে কড়ের রুলি, তাহার পর চুড়ি-বালা-কঙ্কণ। ওপর হাতে বাজুবন্ধ। গলায় চওড়া পাটি হার আর গিনি গাঁথা মালা। কানে কানবালা, খোঁপায় বাগান, নাকে ফাঁদি নথ, হাতে জড়োয়ার আংটি। বিলেতি এসেন্সে নিজেকে সুরভিত করিয়া নিজেকে আরশিতে যখন দেখিল, তখন নিজের রূপে নিজেই সে মুগ্ধ।

মাথায় ঘোমটা টানিয়া পদ্ম, শিউলি, দোপাটি, জবা ফুলে ভরা রূপার সাজি লইয়া ঠাকুরবাড়ি যাইবার সময় সে আপনার শ্বশ্রূমাতার নকল করিয়া ওড়িয়া সেবাইতকে হাঁক পাড়িল, “বাওয়াজীইইইই”।

তিন

ষষ্ঠীর ভোরে ঢাকের শব্দে বালিকা আনন্দীর যখন ঘুম ভাঙল, শুনল বালিগঞ্জ থেকে সেজপিসি ভোরভোরই পুজোবাড়িতে পৌঁছে গেছেন। আনন্দী দৌড়ে গিয়ে আদরের সেজপিসির গলা জড়িয়ে ধরল

সেজপিসি এলেই বাড়ির সবাই দল বেঁধে ছেঁকে ধরে। সেজপিসি অণিমার পানপাতার মত মুখে দুগ্গাঠাকুরের মত কোঁচকানো চুল। সঙ্গে কোলকাতার আজব সব গল্প, “জানিস তো, সেদিন রুমা গুহ ঠাকুরতাকে দেখলাম। বাতাসা কিনছিলেন। একটু খেয়াল করলেই এমন অনেককেই দেখা যায় গড়িয়াহাটে। জানতো বৌদি, সেদিন সৌমিত্র চ্যাটার্জির নতুন নাটক দেখলাম। কি যে সুন্দ-অ-র হয়েছে!”

এই সুন্দর শব্দটা সেজপিসির সুন্দর মুখে এক অন্য মাত্রা পায়। আনন্দী মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে।

সেজপিসি বলে “এবার কোলকাতায় এলে নাটক দেখাতে নিয়ে যাব তোদের।” এসব গল্প শুনতে শুনতে আনন্দীর কাছে কোলকাতা আর সেজপিসি কখন যে এক হয়ে যায়!

সেজপিসি চামড়ার স্যুটকেস থেকে বার ক’রে বুকের কাছ কুঁচি আর হানিকোম্ব স্টীচ করা, গোলাপি রঙের বেবিফ্রক। জামা পেয়েই ছুট, ছুট। এবাড়ি, ওবাড়ি সবাইকে না দেখিয়ে শান্তি নেই যে তার! এরপরে চুলের ক্লিপ, হাতের চুড়ি, গলার মালা ম্যাচ করার পালা। এ’সব কিছু কাকিমণির সঙ্গে রকমারি স্টোর্সে গিয়ে আগেই কেনা হয়েছে। ন্যাচারাল কালারের নেলপালিশও। টকটকে লাল, গোলাপি, কমলা রঙে নখ রাঙাতে আনন্দীর খুব ইচ্ছে করে। কিন্তু বাবা পছন্দ করে না যে!

“ওমা! চিনিপিসিটা এখনো সেজপিসির স্যুটকেস হাটকাচ্ছে! তোর অত সুন্দর মুগাকোটা শাড়ি তো পেয়েই গেছিস বাবা!”

আনন্দী জানে চিনিপিসি এবার ঐ শাড়িটা বুকে জড়াবে। একবার পা থেকে মাপবে। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিজেকে দেখবে আয়নায়। সারাদিন ঐ নিয়েই আছে। কখনো মাথায় কেশুতে পাতা ঘষছে।কখনো মুখে হলুদ। ক্ষিদে তেষ্টাও নেই না কি রে বাবা!

ক্ষিদের কথা ভাবতেই তার নাকে ভিয়েনের গন্ধ এলো। ইঁটপাতা মস্ত উনুনে বিশাল কড়ায় টগবগ করে রসে ফুটছে রসগোল্লা। কাঠের বারকোষে সন্দেশের ছানা ঠাসা হচ্ছে। গজা, লবঙ্গলতিকা, পেড়াকির ময়দা মাখা হচ্ছে পরাতে। মাধবঠাকুর সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে ঠাকুরের মিষ্টি তৈরির কাজে খুব ব্যস্ত। আনন্দী চুপটি করে সেখানে গিয়ে দাঁড়াতেই, মাধব ঠাকুর, “চাম্বেলী নিও” বলে তার হাতে একটা দরবেশ তুলে দিয়েই ইশারায় চলে যেতে বলল। ঠাকুরের ভোগে লাগার আগে আনন্দীর ভোগে লাগছে, একথা জানাজানি হলেই খুব মুশকিল!

হাতে সময় থাকলে মাধব ঠাকুর ঠিক বলত, “চাম্বেলী তুমি আমার মিনি। আমি তোমার কাবুলিওয়ালা।” প্রতি বারের মত এই কল্পিত মিনি-কাবুলিওলার গল্প আবার জমে উঠত।

আপাততঃ সে মিষ্টি পেয়েই খুশি। পাঁচদিন ধরে আনন্দী দেদার মিষ্টি খাবে। পুজোর সময় তিনদিন মাছ না খাওয়ার দুঃখ সে অনেকটা ভুলে যাবে মালপো, নারকেল নাড়ু, জোড়া মন্ডা, খাজাগজার মোহে।

***

আনন্দীর ইদানিং রাতে নুচি আহার করিলেই অম্লশূলের বেদনা উপস্থিত হয়।তাই সে ময়দা খাওয়া একপ্রকার ত্যাগ করিয়াছে। শৈশব হইতেই তার মিষ্টান্ন অতীব প্রিয় ছিল। ফলপাকুড়ও। তাই পূজার দিনগুলিতে আপনার আহার লইয়া সে বিশেষ চিন্তিত হয় না। পূজাগৃহে পাঁচদিন ফলমিষ্টি প্রসাদের আয়োজন অঢেল।

বস্তুতঃ আনন্দীর ধনী শ্বশুরগৃহটিতে প্রয়োজনের তুলনায় আয়োজন অধিক। কখনো কখনো সেখানে তাহার প্রাণ পিঞ্জরাবদ্ধ তোতাপাখির ন্যায় বোধ হয়। অলিন্দে দাঁড়াইয়া সে এই কথাই ভাবিতেছিল। “আশ্বিনের আকাশে ভারহীন সাদা মেঘেরা কেমন মুক্তির আনন্দে ভাসিতেছে। আমাদের পরিবার- সমাজ কবে এমন শরতের মেঘের মত মুক্ত -স্বাধীন হইবে?”

নাছদুয়ারে মন্দিরা বাজাইয়া বৈষ্ণবী আগমনী গাহিতে শুরু করিল, “দ্যাখো গো মেনকারাণী, নন্দিনী তোমার এসেছে ঘরে”। আনন্দীর সম্বিত ফিরিল। বৎসরকারদিনে উহাকে খালি হাতে ফিরাইতে নাই। সিধা দিতে হইবে।

ওদিকে পূজার ঘরে তাহার ডাক পড়িয়াছে। সেখানে সীমন্তিনীরা অর্ঘ্য তৈরিতে ব্যস্ত। সেই অর্ঘ্য স্থাপিত হইবে মা দুর্গার শিরে। মুকুটের অন্তরালে। মেয়েমহলে ইহাকে বলা হইয়া থাকে ‘অরুগ্গি পাকানো।’ বড়ই ধৈর্য্যের পরীক্ষা। আঠাশটি দূর্বা ঘাস বাছিয়া রাখিতে হইবে। ততগুলি চাল ধান খুঁটিয়া বাহির করিয়া, তুলায় মুড়াইয়া সিন্দূর লেপিতে হইবে। এমনি করে বহুসংখ্যক অর্ঘ্য তৈয়ের করিয়া কলাপাতায় লপেটিয়া তাহাতে লিখিতে হইবে গৃহের জ্যেষ্ঠতম পুরুষের নাম। পুরুষ কেন? আনন্দীর নবতিপর দিদি শাশুড়ি এ গৃহের জ্যেষ্ঠতমা। তিনি কি দোষ করিলেন?

অর্ঘ্য বানানোর শুভ কাজেও কেবল নাকি সধবা-রমণীদেরই অধিকার। তাই বিধবা মেজখুড়িমা, ন’পিসিমা, ফুলদিদি শতহস্ত দূরে থাকিবেন। যে কাজে সবার অধিকার নেই,সে কাজ শুভ হইবে কেমন করিয়া? আনন্দীর মন বিদ্রোহ করিয়া ওঠে। মায়ের সন্তান সবাই সমান।তাহা হইলে এত ভেদাভেদ কেন?

প্রয়োজন নেই তাহার এমন মঙ্গল কাজে। মোক্ষদা পিটুলি তৈয়ার করিয়া রাখিয়াছে। পূজা অঙ্গনে, ঠাকুরের আসনে আলিপনা দিতে হইবে। আনন্দী শাশুড়ি মাতার আদেশ লইল, “যাই মা, আলপনা দিতে?” ভালোমানুষ শ্বশ্রুমাতা তাহার মনটি বুঝিতে পারেন। তিনি ঘাড় হেলাইয়া বলিলেন, “যাও বাছা”।

আনন্দী ফুলদিদিকে সঙ্গে লইয়া মহা উৎসাহে আলপনায় মগ্ন হইল। পিটুলি গোলায় সে খানিক সিন্দূর মিলাইল। ভান্ডারগৃহ হইতে হরিদ্রা লইয়া হলুদ বর্ণ তৈয়ার করিল। অতিনীল রঞ্জকচূর্ণ সহযোগে তার প্রিয় নীলরঙ প্রস্তুত হইল।

পিটুলি গোলায় সলিতা ডুবাইয়া আপন মনের মাধুরী মিশাইয়া সে কমললতা আঁকিল। ধীরে ধীরে পত্রেপুষ্পেবৃক্ষলতায় ভরিয়া উঠিল পূজাঙ্গন।আনন্দীর হৃদয়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তি বিরাজিত হইল।

সন্ধ্যা নামিল। বোধনের ঢাক বাজিল। পুরোহিত মন্দ্রকন্ঠে জগজ্জননী কে আহ্বান করিলেন,

“রাবণস্য বধার্থায় রামস্যানু গ্রহায় চ

অকালে ব্রহ্মনা বোধো দেব্যাস্ত্বয়ি কৃতঃ পুরা

অহমপ্যাশ্বিনে ষষঠ্যাং সায়াহ্নে বোধয়ামি বৈ”।

***

সপ্তমীর সকালে কলাবৌ চানের ডাক পড়েছে। আনন্দী তড়াক করে বিছানায় উঠে বসে কান খাড়া করে শুনল, “কই, ঢাকের সঙ্গে কাঁসির আওয়াজ তো নেই? ব্যাপারটা কি হল?”

এক দৌড়ে ঠাকুর বাড়ি যাবে কি, মা পেছন থেকে বলল, “এই, কাচাকাপড়ে ঠাকুর বাড়ি যাবি কিন্তু”।

ঠাম্মির গলাও শুনতে পেল আনন্দী। প্রতিদিনের স্বভাব মত চেঁচাচ্ছে, “এই যে সব নবাবপুত্তুরেরা! গা তোলো। বিছনা ছাড়ো। বচ্ছরকারদিনে বাসী কাজ মিটিয়ে তবে তো পুজোর কাজ শুরু হবে”।

আলনা থেকে একটানে লালরঙা ফ্রকটা নিয়ে পরল আনন্দী। দৌড়ে ঠাকুরবাড়ি গিয়ে দেখে, ঢাকিদাদার ছেলে পিন্টু গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে। গায়ে তার বাবার একটা পুরনো লুঙ্গি চাপা দেওয়া।

“কি হয়েছে পিন্টুর, ঢাকিদাদা?”

“দ্যাখোনা দিদিমণি, কাল রাত থেকে জ্বর এসেছে। উঠতে পারছেনি। দাঁতেও কিছু কাটেনি কো”।

আনন্দীর মনটা খারাপ হয়ে গেল। পিন্টু তাদের খেলার সাথী। এই একবছরে কতটা লম্বা হয়ে গেছে! পুজো দালানে মালা, চন্দন, বাপী, ঝিমলি, পিন্টু সবাই মিলে কুমীরডাঙা, চোরপুলিশ, ঝাপসা, কিতকিত খেলে। ক্যাপ ফাটায়। আনন্দী লুকিয়ে লুকিয়ে তাকে তার ভাগের ক্যাডবেরী, প্রসাদের মিষ্টি খাওয়ায়।

মায়ের কাছে আনন্দী শুনেছে, ঢাকিদাদারা বড্ড গরীব। পুজোর নৈবিদ্যির ভেজা চাল ঢাকিদাদা আর পিন্টু রোদ্দুরে শুকোয়। বাড়ি ফেরার সময় নিয়ে যাবে। ঠাকুর মশাই মাদুগ্গার প্রসাদী নতুনশাড়ি দেয় পিন্টুর মায়ের জন্যে। আনন্দীর মাও পিন্টুর বোন মিনুকে দেবে বলে আনন্দীর ছোট হয়ে যাওয়া পুরনো জামা বেছে রেখেছে।

পিন্টুদের বাড়ি সুন্দর বনের কাছে বিবিপুরে। আনন্দী চোখ বড়বড় করে জিজ্ঞেস করে, “তুই বাঘ দেখেছিস পিন্টু? কুমীর, হরিণ?”

দূর থেকে দু-একবার বাঘ দেখেছে পিন্টু। নদী পার হতে। তার জ্যাঠাকে বাঘে খেয়েছিল। মা তাই আর মউলির কাজে বাবাকে জঙ্গলে যেতে দেয় না। মা মীন ধরে। বাবা মুনিষ খাটতে যায় শহরে। পিন্টুও পারে খপাত করে নদীর পার থেকে কাঁকড়া ধরতে। বালি থেকে কাছিমের ডিম খুঁজে বের করতে। কুমীর তো রোজই দেখে পিন্টু। নদীরচরে রোদ পোয়ায়। হরিণরাও নদীতে জল খেতে আসে, তবে “তারা তোর মতই ছটফটে। খালি এদিক ওদিক দৌড়ে পালায়।”

পিন্টু আনন্দীকে লেত্তি দিয়ে লাট্টু ঘোরাতে শিখিয়েছে। গুলতির টিপ করে হনুমানকে ভয় দেখাতে পারে পিন্টু। গতবছর সবার চোখের আড়ালে গুলিও খেলত ওরা।

ঠোঁট কামড়ে আনন্দী একবার ভাবল, কাল রাত্তিরে রণোদাদা এসেছে না? সে তো ডাক্তারী পড়ে। কলাবৌ চানের পরে তাকেই ধরে আনতে হবে পিন্টুকে দেখাতে।

ঢাকিদাদাকে বলল, “আমি পিন্টুর কাঁসিটা তোমার সঙ্গে বাজাব?”

“হ্যাঁ দিদিমণি, এ এমনকি কাজ! নিশ্চয়ই বাজাবে”, একগাল হাসল ঢাকি নিতাই।

শৈশবের সুখদুঃখ নদীর ঢেউয়ের মতই ক্ষণস্থায়ী। আনন্দী মহানন্দে টাঁইলালা, টাঁইলালা করে কাঁসর বাজাতে বাজাতে দলবলের সঙ্গে চলল কলাবৌ চানে।

গঙ্গার ঘাটে আজ তিলধারণের জায়গা নেই। একটু আগে নাকি কেউ কুমীরকে সাঁতরাতে দেখেছে মাঝগঙ্গায়!

বেচারী ঘোমটাটানা কলাবৌ! গণেশের পাশে এমনিতেই তার জড়োসড়ো অবস্থা। মা আর তার চার দুঁদে সন্তানের উজ্জ্বল উপস্থিতির পাশে নেহাতই সে ম্রিয়মাণ। হোমের আগুনের তাপ সইতে সইতে দশমী অবধি তার লাবণ্য চলে যায়। আজ কুমীরের হুজুগে তার স্নানের গৌরবটুকুও রইল না। বৃদ্ধ নারায়ণপুরোহিত কুমীরের ভয়ে মন্ত্রের খেই হারিয়ে ফেললেন।

***

নবপত্রিকা ঢাক-ঢোল-কাঁসর বাদ্য সহযোগে স্নানযাত্রায় চলিলেন। আনন্দী বাতায়ন হইতে তাহা দেখিয়া জোড়হস্তে প্রণাম করিল।

সদ্য সদ্য সে নবপত্রিকার মহিমা জানিয়া বিস্মিত হইয়াছে। তাহার নিকটে একটি পঞ্জিকা রহিয়াছে। অবসর সময়ে সে সেটি পাঠ করে। পুস্তকটি বড়ই চিত্তাকর্ষক। সেখানে বলা হইয়াছে, শাকম্ভরী মাতা দুর্গা স্বয়ং পরমাপ্রকৃতি। তাই নয়টি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বৃক্ষের কিশলয় যেমন কদলী বা রম্ভা (কলা), কচু, হরিদ্রা, জয়ন্তী, বিল্ব , দাড়িম্ব (দাড়িম), অশোক, মান ও ধান

মৃন্ময়ী প্রতিমার সহিত চারদিন সমমর্যাদায় পূজিত হ’ন। নয়টি উদ্ভিদ দেবী অন্নপূর্ণার নয়টি রূপের প্রতীক। তিনিই নবপত্রিকা বা কলাবৌ।

আজ কলাবৌ স্নানের পর সপ্তমীপূজা বিলম্বে শুরু হইবে। আনন্দী নীচের স্নানঘরে যাইবার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নাই। অলিন্দে হইতে সে দেখিল তাহার পিতাশ্বশুর এবং তাঁহার বড়ভ্রাতাকে অঙ্গনে বেহারী ভৃত্য তৈল মর্দন করিতেছে। এদৃশ্য তাহার বড় অশ্লীল লাগে। তবু যদি তাঁহারা সুন্দর দেহসৌষ্ঠবের অধিকারী হইতেন! একজনের তনু অত্যন্ত কৃশ। কাঁকলাস সদৃশ। আনন্দীর পিতাশ্বশুরটির বিশাল বপু।

আনন্দীর তরুণ স্বামী নৃপেন্দ্রচন্দ্র অবশ্য বড়ই সুপুরুষ, সুদেহ। যাগযজ্ঞে সেলাই করা বস্ত্র পরিধানের বিধি নেই। দিনমানে প্রথামত সে কোরাধুতির সহিত ঊর্ধাঙ্গে উত্তরীয় জড়াইয়া লয়। শরীর কদাপি অনাবৃত রাখেনা। গলায় মফ চেন, হাতে হীরে-জহরতের অঙ্গুঠি পরিতে ভালোবাসে। কস্তূরীর সুগন্ধি তাঁহার বড় প্রিয়।

রাতে সে পরিবে ফরাসডাঙার ধাক্কাপাড় ধুতি আর গিলেকরা মহার্ঘ রেশমের পাঞ্জাবি। বামী রজকিনী ধুতি চুনট করিয়া, পাঞ্জাবী গিলে করিয়া আনিয়াছে। আনন্দী তাহাকে পার্বণী দিয়া বিদায় জানাইল। পাঞ্জাবীতে হীরাজড়ানো বোতাম লাগাইল। দেরাজ হইতে পকেট ঘড়ির সহিত ঘড়ির চেন বাহির করিয়া রাখিল।

সূক্ষ্ম ধুতি, উত্তরীয়ের অন্তরাল হইতে নৃপেন্দ্রচন্দ্রের নবনীতসদৃশ গাত্রবর্ণ, সুগঠিত দেহসৌষ্ঠব দেখে আনন্দী মুগ্ধ হইয়া যায়। যেন, “প্রতি অঙ্গে নিরুপম লাবণ্যের সীমা”।এই পরমসুন্দর পুরুষটি কি একমাত্র তাহার? কতদিন সে কেবলমাত্র তাহারই হইয়া থাকিবে? এবাড়ির অন্যপুরুষরা বা’রমুখো। নৃপেন্দ্র অবশ্য তাহাদিগের মত নহে। সে এখনো নবোঢ়া পত্নীর রূপলাবণ্যে, প্রেমে মুগ্ধ হইয়া আছে। শুধু সামান্য পানদোষ আছে তাহার।

নৃপেন্দ্র স্নান সারিয়া গৃহে প্রবেশ করিল। কুলদেবতাদের উদ্দেশ্যে জোড় হস্তে প্রণাম করিল। তাহার বস্ত্রাদি যথাপূর্বক সুশৃঙ্খলিত রহিয়াছে দেখিয়া যারপরনাই প্রীত হইল। আনন্দীর উদ্দেশ্যে বলিল, “নতুন বৌ, বড় ভুল হয়ে গেচে। পুজোয় এখনো পর্যন্ত তোমাকে কোনো উপহার দেওয়া হয় নি। তোমার গয়নাকাপড় কি চাই বল?”

আনন্দী নির্ঝরিণীর ন্যায় কলকল শব্দে হাসিল। তাহার মৃণাল বাহুদ্বারা স্বামীর কণ্ঠ বেষ্টন করিয়া বলিল, “গয়নাকাপড়ের কি আমার অভাব আচে? যদি পারো তো বঙ্কিমবাবুর একটি নূতন নভেল আমার জন্যে এনে দিও”।

***

রণোদাদার ডাক্তারিতে পিন্টু একদিনেই উঠে বসেছে। তবে আজ সকালে আনন্দীর সময় নেই। পিন্টুর সঙ্গে সে পরে দেখা করবে। স্নান সেরে সে মালা গাঁথতে বসেছে। সঙ্গে চিনিপিসি, মালা, ঝিমলি, নতুন বৌদি, কাকিমণি, ফুলদিদি।আজ মায়ের মালা দু-দফা।অষ্টমী আর সন্ধিপুজোর।

মস্ত বড় ঝুড়িতে সাধনদাদা, রতনদাদা বাগান থেকে ফুলবেলপাতাদুর্বা তুলে দিয়ে গেল। কোলকাতার রাঙাদিদি তার ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া নাতি চন্দনকে ফুল চেনাচ্ছে, “এই দ্যাখ, এটা টগর। নীলফুলটা অপরাজিতা। হলুদবোঁটাটা শিউলি। প্রজাপতির মত ফুলগুলোকে বলে দোপাটি। গোলাপি ফুলটার নাম নয়নতারা। লাল রঙের ছোটছোট ফুলগুলো হল করবী। চিনি, হোমের আঠাশটা করবী ফুল গুণে রেখেছিস তো আর অখন্ড বেলপাতা?”

“অখন্ড বেলপাতা কাকে বলে দিদুন?” চন্দন জিজ্ঞেস করে।

আনন্দী মিটিমিটি হাসছে। চন্দন কে এখনো অনেক কিছু শিখতে হবে। আনন্দী মনে মনে শিবপুজোর মন্ত্র আওড়াল, “অখন্ড বিল্বপত্র তোলা গঙ্গার জল/সেই পেয়ে তুষ্ট হন ভোলা মহেশ্বর”। অখন্ড বেলপাতা মানে, ছেঁড়া ফাটা নয়।তাতে শঙ্খচিহ্ন বা সাদা দাগ নেই। মায়ের ত্রিনয়নের মতই সুন্দর। চন্দন জানেনা, শিউলি ফুটলেই পুজো এসে যায়। এই সময় জ্বরের মুখে শিউলিপাতার বড়া খেতে কি ভালো লাগে!চন্দন ছাই জানে, মধুফুল থেকে চুষে চুষে কি করে মধু খেতে হয়।কলকে ফুলে কেমন ঝালনুনের গন্ধ। কাঞ্চনফুলের পাতায় কি সুন্দর বাঁশি বাজে!

চিনিপিসি আর কাকিমণি দুজনে মিলে দু’দিক থেকে মাদুগ্গার বিশাল মালা অনেকটা করে ফেলেছে। বেলপাতাকে পানের খিলির মত মুড়ে, তার সঙ্গে গেঁথেছে টকটকে রক্তজবা। লাল আর সবুজ রঙ মিলিয়ে কি সুন্দর যে দেখাচ্ছে!

“ওরে হাত চালা আনন্দী! কখন থেকে সরস্বতীর মালা নিয়ে তুই বসেই আছিস। একবার সুতোয় জট পাকালি। একবার ছু্ঁচ হারালি। পদ্মগুলোও তো ফোটাতে সময় লাগবে।”

বড়রা কি কিছুই বোঝেনা, আনন্দী সরস্বতীর মালা এত মনোযোগ দিয়ে কেন গাঁথে? শিউলি ফুলের গোড়ের মালা গাঁথা শেষ করে তাতে লাল গোলাপফুলের লকেট ঝোলাল। তারপর ঝিমলির সঙ্গে পদ্ম কুঁড়ি ফোটাতে লাগল। পদ্মফুলের এক একটা করে পাপড়ি খুলতে তার খুব ভালো লাগে। ঠিক যেন আস্তে আস্তে বাঁশের কাঠামো থেকে একমেটে, দুমেটে প্রতিমা তৈরি হয়। তারপর তাতে রঙ চড়ে, সাজ পরানো হয়। ঠাকুর মশাই প্রাণপ্রতিষ্ঠা করেন। পুরো দালান জুড়ে মা দুর্গা ঝলমল করে ওঠে।

পুজোর দিনগুলো এত তাড়াতাড়ি যে কেন শেষ হয়? কতকিছু শেখা, দেখা, শোনা বাকি রয়ে যায়! পুজোসংখ্যার প্রফেসর শঙ্কু, কিকিরা, কাকাবাবু, সন্তু, পঞ্চপান্ডব, নন্টেফন্টে তার জন্যে অপেক্ষা করে বসে আছে। পুজোর পর পরীক্ষা আসবে আর মা সব পত্রিকা লুকিয়ে রেখে দেবে। আনন্দী এই পাঁচদিনে পত্রিকা পড়বে না, বছরে একবার দেখা হওয়া খেলুড়েদের সঙ্গে খেলবে? বড়পিসির কাছে বাবাদের ছোটবেলার গল্প শুনতে শুনতে নীলু ঠাকুরের মুখে রামায়ণের গল্প আর শোনা হয় না। গতবারে সেই যে অযোধ্যার সবাইকে কাঁদিয়ে রামচন্দ্র বনবাসের পথে গেল,তারপরে আর গল্প এগোল না।

একবছরে কতকিছু যে বদলে যায়!

রাণুদিদিটা বড় হয়ে গেছে বলে আর তাদের সঙ্গে খেলতে চায় না। গতবছর শীতকালে ন-দাদু হঠাৎ সবাইকে ছেড়ে আকাশের তারা হয়ে গেল। ন-ঠাকুমা আর আগের মত হাসেও না। পুজোয় সাজলও না।

একটা কালো মেঘ কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে আকাশের ঐ কোণে। আনন্দীর কান্না পেয়ে গেল।

***

“ভুবনমোহিনী বন্দি তোমারে,

দুর্গে দুর্গতি নাশিনী

তুমি মহাবিদ্যা, আদ্যাশক্তি,

এই বিশ্ব তোমারি বিভূতি

তুমি মুক্তি, জ্ঞানদাত্রী,

প্রেমানন্দদায়িনী”

হরুঠাকুরের ভাবগম্ভীর কণ্ঠে দ্রুপদের সুর যেন প্রতিধ্বনিত হইতেছে নাটমন্দিরের প্রাচীরগাত্রে। বাজিতেছে মৃদঙ্গ-মন্দিরা। কাঁদিতেছে ভক্তগণ।

তিনি ব্যাখ্যা করিতেছেন, “ব্রহ্মার শক্তিরূপে তিনিই ব্রহ্মাণী, বিষ্ণুর শক্তিরূপে বৈষ্ণবী, শিবের শক্তি তিনিই শিবানী। সৃষ্টি স্থিতি প্রলয়ের অধিকর্ত্রী জগদীশ্বরী। অন্যদিকে তিনি সাধারণ মানবী। গিরিরাজনন্দিনী। মেনকার দুলালী।

হরুঠাকুর ভৈরবী-একতালায় পুরাতনী ধরিলেন, —

“এসেছিস মা, থাক না উমা দিনকতক,

হয়েছিস ডাগরডোগর

এখন কিসের ভয় এত।”

তিনি যে গুণময়ী মা, লীলাময়ী মা। তাঁর লীলার কি অন্ত আছে? দনুজদলনী হয়ে মহিষাসুর বধ করেন। উমা রূপে গৃহীকে নিয়ে নানা খেলা করেন।”

এবার কাঁদিবার পালা স্বয়ং হরু ঠাকুরের। তাঁহার চোখের কাজল, অলকাতিলকা সব বুঝি ধুইয়া যায়। মলিন ধুতির খুঁট দিয়া তিনি অশ্রু মোছেন। আনন্দী ভাববিভোর হইয়া পড়ে। গলবস্ত্রে হরুঠাকুরকে প্রণাম করিলে তিনি আনন্দীর মস্তক আঘ্রাণ করিয়া আশীর্বাদ করিলেন, —

“কল্য্যাণ হোক কল্যাণী”।

কথকতার ঘোর কাটিল। হরির লুট হইল। আনন্দী সন্ধিপূজার আয়োজনে ব্যস্ত হইল। বেতের ডালিতে একশত আটটি প্রস্ফূটিত পদ্ম সাজাইয়া খুড়শাশুড়িকে জিজ্ঞাসা করিল, “খুড়িমা কি কি ফল কাটব?”

খুড়িমা জিহ্বা কাটিয়া বলিলেন, “আমাদের গোস্বামীমতে পুজো নতুনবৌমা। ফল কাটাকাটি নয়, বলো ফল বুনিয়ে রাখা।”

আতপ চালের নৈবেদ্য সাজাইতে একদিনেই পারদর্শী হইয়া উঠিয়াছে আনন্দী। বাবাজীর নির্দেশমত কাঠের বারকোশে চুড়া করিয়া ভিজা চাল রাখিল। পানের খিলি বানাইল। চুড়ার গায়ে আখের কঞ্চি, পার্শ্বে কলা সাজাইল। চুড়ার উপরে বিল্বপত্র, তাহাতে একটি মিষ্টান্ন স্থাপন করিল। আনন্দী জানিয়া প্রীত হইয়াছে, এই মণ, মণ চাল দীনদরিদ্রকে বিতরণ করা হইবে।

অষ্টমী-নবমী তিথির সন্ধিস্থলে সন্ধিপূজা। সময়ের নিক্তি মাপিয়া যত দ্রুত তাহা শুরু হয়, তত দ্রুত তাহার সমাপ্তি। একশত আটটি মৃৎপ্রদীপ ঘৃতের সলিতায় জ্বালাইতে জ্বালাইতে সন্ধিপূজার আরতি প্রারম্ভ হইল। সন্ধি পূজার দ্রুততার মতই আনন্দীর চেতনায় অনেক প্রশ্নের ঝড় উঠিতে লাগিল।

রামচন্দ্র প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলেন, তিনি দ্বিতীয়বার দার পরিগ্রহ করিবেন না। পত্নীপ্রেম তাহাকে লঙ্কাজয় করিতে বাধিত করিল। এত দেবদেবীর অস্তিত্ব সত্ত্বেও তিনি অনুগ্রহ ভিক্ষা করিলেন এক দেবীশক্তির কাছে? এক স্ত্রীশক্তির সাহায্য লইয়া শ্রীরাম বারবার নিজ স্ত্রীকে অপমান করিলেন? গর্ভবতী সীতাকে বনবাসে নির্বাসন দিলেন

তাঁহার অজান্তে?

আর সীতার অগ্নিপরীক্ষা? সেকি নারীত্বের এক চরম অবমাননা নয়? মর্যাদাপুরুষোত্তম রাম নিজের স্ত্রীর মর্যাদা দিতে এতই কুন্ঠিত হইলেন?

এই সব প্রশ্নের উত্তর সন্ধান করিতে হইবে পূজনীয় হরুঠাকুরের কাছে। তিনিই একমাত্র উত্তর দিতে সমর্থ হইবেন।

***

“তোমায় সাজাব যতনে কুসুমে রতনে

কেয়ূরে কঙ্কণে কুঙ্কুমে চন্দনে…..”

কাকিমণির গলা ভারি মিষ্টি। “থামলে কেন কাকিমণি, পুরোটা গাও না”

“চল, আজ তোকে সাজাতে সাজাতে গাই। তোর শাড়ি, গয়না পরে সাজতে খুব শখ না?”

চিনিপিসির হাতে প্যাকেট, ফুলের সাজি। আরো কত কি?

“কেন গো? মা কিন্তু খুব বকবে। বাবাও এরকম বড়দের মত সাজ মোটেই পছন্দ করেনা।”

“আজ কেউ বকবে না। আজ যে তোকে পুজো করা হবে”।

“কুমারী পুজো? আমি হব কুমারী? এতো সারপ্রাইজ? আমাকে আগেতো কেউ বলেনি”! আনন্দী খুশিতে গলে যায়। গতবারে যখন ঝিমলি কুমারী পুজোয় বসেছিল, তখন আনন্দীরও ঐরকম সাজতে খুব ইচ্ছে করছিল।

আনন্দীর মা’বাবা কিন্তু তাদের একমাত্র মেয়েকে এই পুজো-টুজো করার ব্যাপারে একদম রাজি হন নি। আনন্দীর বাবা স্পষ্ট বলেছিলেন, এসব করলে মেয়ের নরম মনে প্রভাব পড়তে পারে। আনন্দীর মা অজুহাত দিয়েছিলেন, “ছটফটে মেয়ে। ওকি অতক্ষণ বসে থাকতে পারবে?”

এঁদের মাথার ওপরেও বড়রা আছেন। তাই কোনো ওজর আপত্তি ধোপে টিকলো না।

আনন্দী এখন সাজছে জরির ফুল সাজানো লাল বেনারসীতে। কপালে কনেচন্দন। কুঙ্কুমের টিপ। পায়ে আলতা নূপুর। গলায় ফুলের মালা। মাথায় টিকলি, ফুলের মুকুট। হাতে ফুলের গয়না। চিনিপিসি আর কাকিমণি নিখু্ঁতভাবে সাজাচ্ছে আর পাশে দাঁড়িয়ে ঝিমলিটা সমানে বকবক করে যাচ্ছে,

“দ্যাখনা, ওরা তোর পা ধুইয়ে দেবে। তোকে আরতি করবে। দেখিস, অতক্ষণ বসে থাকতে তোর মোটেই ভালো লাগবে না।”

“একটু চুপ করবি ঝিমলি? কানের মাথা আর খাস না।” চিনি পিসি বকুনি দিল ভাইঝিকে।

“ঝিমলিটার কি হিংসে হচ্ছে? তা হোক গে। প্রতিবছর ওই কুমারী হবে নাকি?” আনন্দী আঙুল মটকালো।

আনন্দীকে ধ’রে ধ’রে পুজো দালানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বড় শাড়ি সামলাতে পারছে না। মাথায় ভারি ফুলের মুকুট ছোট চুল থেকে বারবার নীচে নেমে আসছে।

মা চোখে আঁচল চাপা দিয়ে কান্না লুকোলেন। বাবার বুকের ভেতরটা ডুকরে কেঁদে উঠল। যেন মেয়ে শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছে। আনন্দী আড়চোখে দেখল, তার খেলার সাথী মালা, বাপী, চন্দন, পিন্টু, ঝিমলি সবাই যেন তারদিকে কেমন অন্যরকমভাবে তাকিয়ে আছে।

“ওরা কি আর খেলবে না আমার সঙ্গে? ঠিক আছে, যে ক্যাডবেরীগুলো পেয়েছি, সব নাহয় ওদের দিয়ে দেব”।

পুজো দালানে একচালা প্রতিমার পাশটিতে আনন্দীকে একটা জলচৌকির ওপর আসন পেতে বসানো হল। আজ আনন্দী স্বয়ং আনন্দস্বরূপা। হ্লাদিনী শক্তি।

কুমারী কন্যা সরলতার, ভালোবাসার, নিরহঙ্কার ও মানবতার প্রতীক।

শাস্ত্রমতে ন-বছরের বালিকা কালসন্দর্ভা রূপে পূজিত হন।

পুরোহিত মশাই আচমন করে কুমারী পুজো শুরু করলেন। আনন্দীর পা ধুইয়ে নতুন গামছায় পা মুছিয়ে দিলেন। তার ছোট দুটি পা ডোবানো হল দুধেআলতা গোলা কাঁসার পরাতে।

একটু আগে নবমীপুজোর হোমযজ্ঞ হয়ে গেছে। সারা ঘর ধোঁওয়ায় আচ্ছন্ন। প্রদীপ জ্বলছে। পুড়ছে ধূপ। ধুনোগুগ্গলের গন্ধে ভারি হয়ে আছে পুজো দালানের বাতাস। ঠাকুর মশায়ের হাতের ঘন্টা বাজলেই তার সঙ্গত করছে নিতাইঢাকী। পুরোহিত উচ্চারণ করছেন, কুমারীপুজোর ধ্যানমন্ত্র, —

“চারূহাস্যাং মহানন্দহৃদয়াং

শুভদাং শুভাম্।

ধ্যায়েৎ কুমারীং জননীং পরমানন্দরূপিনীম্”।

আনন্দীর কেমন ঘোর লাগতে শুরু করল। বিধিমত মন্ত্রোচ্চারণ, পুজো আরতি শেষ হল। সবাই আনন্দীর পা ছুঁয়ে প্রণাম করল। আনন্দী তখন সম্পূর্ণ আচ্ছন্ন। যেন নিজের মধ্যে নিজে নেই।

পুরোহিত বললেন, “ওঠ মা, তোমার কাজ এবার শেষ।”

আনন্দীর উঠে দাঁড়াবার শক্তিটুকুও নেই। পুরুতমশাই ইশারা করলেন। মা, কাকিমণি কোনোরকমে তাকে ধ’রে ধ’রে পুজোদালান থেকে ঘরে এনে তুলল।

আজ তাদের বাড়ি লোকে লোকারণ্য। নবমীপুজোয় আমিষভোজন। তাই আত্মীয়কুটুমদের নেমন্তন্ন। অন্যান্যবার আনন্দী সবার পায়ে পায়ে ঘোরে। কারোর গলা জড়িয়ে ধরে। কারোর কাছে গল্প শোনে। নয়তো দলবল জুটিয়ে ছোটাছুটি করে। আজ সে গভীর ঘুমের অন্তরালে চেতন অবচেতনের কোন স্তরে রয়েছে কে জানে?

তার রণোদাদা বলল, “আনন্দীকে কেউ আজ বিরক্ত করবে না। খাওয়ার জন্যে জোর করবে না। যতক্ষণ পারে ও ঘুমোক। ঘুম থেকে উঠলেও কেউ ওকে কোনো প্রশ্ন করবে না।”

আনন্দীর মা মেয়ের মাথার কাছটিতে সর্বক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। ঝিমলি একবার ঘরে উঁকি মেরে গেল।

সেই কোন যুগে ভক্ত কবি রাধিকাপ্রসন্ন মা মেনকার মমতার ছবি আঁকলেন তাঁর গানে,

“আর জাগাস নে মা জয়া,

অবোধ অভয়া,

কত করে’ উমা এই ঘুমাল।

মা জাগিলে একবার,ঘুম পাড়ানো ভার —

মায়ের চঞ্চল স্বভাব আছে চিরকাল…”

***

আনন্দীর শ্বশুরগৃহটিতে কুমারী পুজোর বিধি শাস্ত্রমতে অনুষ্ঠিত হইবার কোনো অবকাশ নেই। তা নেহাতই মেয়েমহলের রীতি।

অন্দরমহলে আসিয়াও আদুলগায়ের কিশোরী বামুনমেয়েটি ভয়ে, লজ্জায় জড়োসড়ো। তাহাকে নূতন বস্ত্র দেওয়া হইল। সে ডুরে শাড়িটি কোনোরকমে পরিল। পোঁটলার মত পেটের কাছে উঁচু রহিয়াছে দেখিয়া হাসির ফোয়ারা উঠিল। আনন্দী অসন্তুষ্ট হইল। বাড়িতে নিমন্ত্রণ করিয়া দরিদ্রকন্যাটির সহিত এ কি মশকরা!

আনন্দী তাহাকে সহজ করিবার চেষ্টা করিল। নাম জানিল, গায়ত্রী। ব্রাহ্মণ পরিবারে গীতা এবং গায়ত্রী নামের বড় আধিক্য। যদিও এই নামই সার। দরিদ্র পুরোহিত পরিবারের মেয়েকে লেখাপড়া শেখানোর তাগিদ বড়ই কম।

ষোড়শোপচার আর ষোল শৃ্ঙ্গার না হউক কুমারী গায়ত্রীকে আলতা পরাইবার, প্রণাম করিবার ধূম পড়িল। কেহ কেহ সিকিটা, আনাটা দক্ষিণা দিল। গায়ত্রী তাহা আঁচলে বাঁধিল। মিষ্টিলুচি ইত্যাদি ভালোমন্দ খাইয়া গায়ত্রীর উঁচু পেট আরো ফুলিয়া গেল। সে সব খাইতে পারিল না। পোঁটলা বাঁধিয়া লইল। গৃহে পৌঁছাইলে কনিষ্ঠ ভ্রাতাভগ্নীদের পোঁটলা খুলিবার ধূম পড়িয়া যাইবে।

গায়ত্রীকে বিদায় দেবার কালে আনন্দী তাহাকে একান্তে ডাকিয়া বলিল,

“তুমি তো লেখাপড়া শেখ নি মেয়ে। আমার কাচে পড়তে আসবে দুপুরবেলা? তোমার তো এখেনে, এই কাচেই বাড়ি।”

এই প্রস্তাবে গায়ত্রী প্রথমে কেমন হকচকাইয়া গেল। তাহার পর ভাবিল, সংসারে তাহার কাজের অন্ত নাই। ভ্রাতা-ভগ্নীদিগকে প্রতিপালন করিতে হয়। পড়িবার সময় কোথায়? না, তবু সে আসিবে।

একগাল হাসিয়া, ঘাড় হেলাইয়া সে বলিল, “আসব নতুন বৌদিদি। আমার কোলের ভাইটাকেও সঙ্গে করে আনব”।

আনন্দী বড় প্রসন্ন হইল। দীর্ঘ দ্বিপ্রহর তার কাটিতে চায় না।

আজ নবমীপুজোয় বড় বিলম্ব হইল। পুষ্পাঞ্জলি, হোম, শান্তিজলের পর ধুনিপ্রজ্জ্বলন। আনন্দীর শ্বশ্রুগৃহের এই প্রথাটি ছবির মতই সুন্দর। বাহির অঙ্গনে রমণীরা সারিবদ্ধভাবে বসেন। তাঁহাদের প্রসারিত দুই হস্তে, মস্তকে ধৃত মৃত্তিকা পাত্রে বিচালি এবং ধূনার সহিত অগ্নি প্রজ্জ্বলন করা হয়। তাঁহারা জগজ্জননীর সম্মুখে বসিয়া মনোস্কামনা করেন। অগ্নি নির্বাপিত হইলে সন্তানাদিরা তাঁহার ক্রোড়ে বসিয়া দুই জননীর আশির্বাদ গ্রহণ করেন।

নবমীপূজা সাঙ্গ হইলে পাকশালে পাচক ঠাকুর আমিষপদ রন্ধন আরম্ভ করিলেন। এতদিন এ গৃহে নিরামিষ ভোজন ছিল। মহালয়ায় কলস স্থাপন হইতে অষ্টমী তিথি অবধি। আজ ব্যঞ্জনের তালিকা দীর্ঘ। সাদা অন্ন, ঘৃতসিক্ত শালান্ন, শাক, ছাঁচিকুমড়ার শুক্তুনি, মুগডাল, পাঁচ প্রকারের ভাজা, রোহিত মৎস্যের রসা, দধি ইলিশ, চালিতার অম্বল, পরমান্ন, দধি, মিষ্টান্ন। ভোজন সমাপ্তিতে ছাঁচিপান।

আত্মীয় কুটুম্বতে আজ গৃহ পরিপূর্ণ। কর্তাদের বন্ধু বান্ধবও নিমন্ত্রিত। আজ ভোজনপর্ব চুকিতে বেলা পার হইবে। শেষমেষ গৃহিণী আর ভৃত্যদের পাতে কতটুকু জুটিবে কে জানে? সমস্ত গৃহ আমিষগন্ধে ভরিয়া গিয়াছে। হঠাৎ আনন্দীর বমন উদ্রেক হইল।

***

আজ আকাশের মনখারাপ। মেঘছেঁড়া সকালবেলার আলোয় বিদায়ব্যথার ভৈরবীর সুর। দুয়ারেতে কি ঐ ডম্বরু বাজল? হর বুঝি নিতে এলো!

নিতাইঢাকি সকাল থেকেই “ঠাকুর আসতে যতক্ষণ, ঠাকুর যেতে কতক্ষণ” বাজিয়েই যাচ্ছে। তার ছেলেটার আজ আবার জ্বর এসেছে। মনটা ভালো নেই বাপবেটা কারোর ই।

আনন্দীর বড়ঠাকুমার আকাশের অবস্থা দেখে মনে পড়ল এবারে মায়ের নৌকায় কৈলাসগমন।

ছোটকাকু ডেকরেটারের লোকজনকে দেখে খিঁচিয়ে উঠল, “আরে, বিসর্জন তো হতে দাও! সকাল বেলাতেই লাইট খুলতে চলে এসেছে, এত তাড়া। যাও এখন।

পাড়ার নেতাজী সংঘের ঢাকি বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঢাক বাজিয়ে বখশিস চাইতে শুরু করেছে।

নবমীর রাত না কাটতে কাটতেই যেন বিসর্জনের বাজনা বেজে উঠল! দশমীপুজো শুরু করে দিলেন বৃদ্ধ পুরুত নারায়ণ চাটুজ্জেমশায়।

শরীরটা তার ভাঙছে। কে জানে সামনে বছর কি হবে? থাকবেন কি থাকবেন না? থাকলেও মায়ের পুজোর পাঁচদিনের ধকল কি আর নিতে পারবেন। সেই কোন ছোটবেলা থেকে বাবার হাত ধরে সেনবাড়ির পুজো করতে আসছেন। নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ এই পাঁচদিন বড় শুদ্ধাচারে থাকেন। হব্যিষ্যি করেন।

সেনবাড়িতে আষাঢ়মাসে রথের দিনে কাঠামোপুজো দিয়ে দুর্গোৎসবের শুরু হয়। ধীরে ধীরে অবয়ব পান মা ভগবতী। আজ তাঁকে বিদায় জানাতে গিয়ে গলা ধরে আসছে। চোখে জল।

“ওঁ গচ্ছ গচ্ছ পরমস্থানং স্বস্থানং দেবী চণ্ডিকে।

ব্রজস্রোতা জলে বৃদ্ধৈ তিষ্ঠ গেহে চ ভূতলে।।

ওঁ দুর্গে দেবী জগন্মাতঃ স্বস্থানং গচ্ছ পূজিতে।

সম্বৎসরে ব্যতীত তু পুনরাগমনায় চ।।”

এই ব’লে মায়ার গ্রন্থি কেটে দিলেন তিনি। ঘট নড়িয়ে, দর্পণে মায়ের প্রতীকী নিরঞ্জন হল।

আনন্দী ডুকরে কেঁদে উঠল মায়ের কোলে মুখ গুঁজে। কান্না বড় সংক্রামক। পুজো দালানে কারোর চোখের জলের বাঁধ আর মানল না। অঝোর বৃষ্টিধারা কখন যে মিলে গেল অশ্রুধারায়! সেই নরম, ভেজা পথ ধরে মা চলে গেলেন মায়ার বন্ধন ছিন্ন করে…

***

বিজয়ার দিনে অশান্তি চরমে উঠিল ভিতরে ও বাহিরে। বহুদিন হইতে চলিতে থাকা শরিকে শরিকে অসন্তোষ, ঠান্ডাযুদ্ধ ঘনায়মান হইতেছিল বর্ষাপূর্ব জলভরা মেঘের ন্যায়। আজ তাহা শালীনতার সমস্ত সীমা লঙ্ঘন করিয়া সশব্দে গর্জিত এবং বর্ষিত হইল।

ক্ষমতা, অধিকার, দম্ভ, দাপট, অহংকার, শত্রুতা বনেদীবাড়ির ক্ষয়িষ্ণু ইঁটগুলিকে ক্রমশঃ দুর্বলতর করিয়া তোলে। আনন্দীর শ্বশ্রুগৃহও তাহার ব্যতিক্রম নহে।

কুলদেবীর সম্মুখে তাঁহার সেবাইতরা গালিগালাজ, কোন্দল করিতে লাগিল। গুরুজনদের মর্যাদা রহিল না। ছোটদের প্রতি স্নেহ রহিল না। তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারণ, পুরাতন কাসুন্দি কলহের বিষয় হইয়া উঠিল। আকাশ তখন অবিরাম বর্ষণ করিয়া চলিতেছে। কোনক্রমে দশমী পূজা, দর্পণ বিসর্জন, অপরাজিতা পূজার পর দেবীবরণের সময় আসিল।

সালংকারা এয়োতীরা সিন্দূর আলতা পরিয়া, পানমুখে দিয়া মা’কে বরণ করিতে আসিল দুর্গাদালানে। কর্তাদের কলহের জের আসিল মেয়েমহলেও।

বড় শরিকের বড়গিন্নী বরণডালা ধরিবার অধিকার পাইবে না, ছোট শরিকের? সে এক বিষম গোল বাঁধিল। শেষপর্যন্ত রুখে দাঁড়াইল আনন্দীর মেজখুড়শ্বাশুড়ী প্রীতিলতা। তিনি বলিলেন, “আমাদের বড়দিদি বয়সে-সম্মানে সবচাইতে বড়। তিনিই বরণডালা ধরিবেন।”

বড় শরিকের দলের সদস্যারা সংখ্যায় অনেক কম।তাঁহারা তাই স্বীকার করিয়া রণে ভঙ্গ দিল। আনন্দী খুড়িমাকে মনে মনে তারিফ না করিয়া পারিল না। ভাবিল, “খুড়িমা সংসারের সমস্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে এমন করিয়া কেন গর্জে ওঠেন না!”

দুর্যোগ আরো বাড়িতে লাগিল। মা’কে কাঁধে করিয়া ঘাটে লইবার বেহারারা কেউই উপস্থিত হইল না।

এখন উপায়? অনেক জল্পনা কল্পনা হইল। প্রথাভঙ্গ করিয়া দশমী তিথির পর প্রতিমাকে গৃহে রাখিলে অকল্যাণ হইতে পারে। তাই স্থির হইল, এ যাত্রায় বাড়ির উপযুক্ত-সমর্থ পুত্রেরা ঘাটে মা’কে বিসর্জন দিতে যাইবে।

বাঁশের সহিত প্রতিমাকে বাঁধাছাঁধা করিবার সময় সব কলহ ভুলিয়া দুই তরফের সেবাইতরা একত্রিত হইল। মা তাঁর গৃহের সন্তানদের কাঁধে চড়িয়া কৈলাস গমন করিলেন।

বিসর্জন শেষে পুরোহিত গৃহের সব সদস্যদের পুজা অঙ্গনে শান্তিবারি নিক্ষেপ করিলেন। মিষ্টান্ন আর সিদ্ধির সরবত পরিবেশিত হইল। বৃহৎ পরিবারে বিজয়ার আলিঙ্গন ও প্রণামের পর্বটিও বড় দীর্ঘক্ষণ চলিতে থাকিল।

আনন্দী ভাবিতে লাগিল এই প্রাকৃতিক সংকট কি মেল মিলাইবার ইঙ্গিত? এই দুর্যোগে বিশ্বজননী কি এই পরিবারের কলহের সম্পূর্ণ অবসান করিলেন, না ইহা সাময়িক বিরতি ছিল? সময় তাহার উত্তর জানে।

গভীররাতের নিভৃত শয়ন কক্ষে আনন্দী স্বামীর বক্ষলগ্না হইয়া নিজের শরীরের অন্দরে একটি নূতন প্রাণের সংকেতের সংবাদ দিল।

স্বামীর কাছে অবশ্য সে একটি কথা গোপন রাখিল। দশভূজার কাছে সে তাঁহারই মত দশদিক আলো করা একটি কন্যাসন্তানের প্রার্থনা করিয়াছে।

পেজফোরনিউজ ২০২৫ পুজা সংখ্যায় প্রকাশিত

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

পেজফোরনিউজ-এর নববর্ষ বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Currently Maintained by the2.dev