
৬৫. লোকসংস্কৃতির দিকপাল হরিশচন্দ্র পাল
প্রকাশিত হয়েছে ‘উত্তরবাংলার পল্লীগীতি’। বইটির দুটি খণ্ড। একটায় আছে ‘ভাওয়াইয়া’ আর অন্যটায় আছে ‘চটকা’। চটকা খণ্ডটি প্রকাশের সময় ‘দ্য গ্রামাফোন কোং অব ইণ্ডিয়া লিমিটেডের প্রচার সম্পাদক সন্তোষকুমার দে বইটির প্রচ্ছদ-পরিচিতিতে লিখলেন,
‘বনস্পতির শাখায় শাখায় পত্র-পুষ্পের এত যে বৈচিত্র্য, তার মূল আছে মাটির গভীরে, সেখান থেকে সে তার প্রাণরস আহরণ করে বলেই বাইরে তার সৌন্দর্যের বিকাশ উচ্ছ্বসিত হতে পারে — নিউইয়র্ক সেন্ট্রাল পার্কে অনুষ্ঠিত আমেরিকার কান্ট্রি মিউজিকের অধিবেশনে বসে এই কথাটাই মনে হয়েছিল, আর সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়েছিল বন্ধুবর শ্রীযুক্ত হরিশচন্দ্র পালের কথা, যিনি তাঁর অতুলনীয় নিষ্ঠার সঙ্গে উত্তরবঙ্গের পল্লীগীতির অক্ষয় ভাণ্ডার গড়ে তুলেছেন, বহুধাবিস্তৃত গ্রাম্য পরিবেশে অবহেলার অন্ধকার হতে তিনি সেই রত্নগুলিকে আহরণ করে চলেছেন সমগ্র জীবন ধরে।’
এই হরিশচন্দ্র পালের (১৯১৫-১৯৮২) জন্ম রাজন্যশাসিত কুচবিহারের দিনহাটা শহরের এক সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ী পরিবারে। তাঁর বাবা শশিভূষণ পাল পাবনা জেলার শালগেড়িয়া থেকে দিনহাটায় এসে বসতি স্থাপন করেন। প্রথম জীবনটা কেটেছে কষ্টে। সততা ও পরিশ্রমের ফলে শশিভূষণ ব্যবসায় উন্নতিলাভ করেন। শশিভূষণ ও জ্ঞনদাসুন্দরীর চার সন্তান। হরিশচন্দ্র হলেন চতুর্থ পুত্র।
প্রথাগত শিক্ষা ছিল না শশিভূষণ ও জ্ঞনদাসুন্দরীর। তাই সন্তানদের শিক্ষার ব্যাপারে তাঁরা সজাগ ছিলেন। হরিশচন্দ্র দিনহাটা হাই স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। পড়াশুনোর পরে তিনি বাবার ব্যবসায়ের সঙ্গে যুক্ত হন। ছোটবেলা থেকে সংগীতের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল। রাগসংগীত শিক্ষা করেছিলেন তিনি। নানারকম বাদ্যযন্ত্র — ঢোল, তবলা, পাখোয়াজ, দোতরা, বেহালা, এসরাজ বাজাতে পারতেন।
সংগীতের পাশাপাশি আকর্ষণ ছিল নাটকের প্রতি। দিনহাটার পাইওনিয়র ক্লাবে নাটকের মহড়া হত। আর্য চৌধুরী লিখেছেন, ‘দিনহাটার প্রখভাত প্রবীণ ভাওয়াইয়া শিল্পী সুনীল দাসের কাছে জানতে পেরেছিলাম হরিশদার নাট্যপ্রতিভা সম্পর্কে — কি নির্দেশনায়, কি অভিনয়ে, কি সাজ-সজ্জা ও মেক আপে ভূমিকা ছিল অসামান্য। অন্তর্মুখী এই মানুষটি কোন দিনও মুখ ফুটে কিছু বলেন নি।’
গান রেকডিং করার মাধ্যমেই তিনি লোকসংস্কৃতির জগতের সংস্রবে আসেন। ১৯৪৭ সালে তাঁর প্রথম লোকগীতি রেকর্ডবন্দি হয়। পরবর্তি ৩৫ বছর ধরে এ কাজ করে গিয়েছেন তিনি। ৩৫ বছরের মধ্যে তিনি মোট ৯৪টি 75 R.P.M ( Revolution Per Minute) এবং ১৭টি R.P.M-এর রেকর্ড Columbia, HMV & Hindusthan Records থেকে প্রকাশ করে যান। ওই রেকর্ডগুলির মধ্যে ভাওয়াইয়া ও চটকা ছাড়াও কয়েকটি ভাটিয়ালি ও মালসি ও সারি গান আছে।
উত্তরবঙ্গের পল্লিগীতিগুলি পল্লিশিল্পীদের মুখে মুখে প্রচলিত ছিল। যেহেতু সাধারণ সমাজে সেগুলি গাওয়া একার্থে নিষিদ্ধ ছিল, তাই সেইসব গীতির লিপিকরণ করা হয় নি। হরিশচন্দ্র লিপিকরণের কাজ করে উত্তরবঙ্গের লোকগীতিগুলিকে রক্ষা করেছেন।
হরিশচন্দ্রের আর একটি কীর্তি উত্তরবাংলার পালানাটক বা পালাটিয়া গানগুলির সংরক্ষণ। এই পালানাটকগুলিতে ধর্মীয় কোন ঘটনা বা গ্রামীণ সামাজিক চিত্র প্রকাশিত হত। দিনহাটার পাইওনিয়ার ক্লাবের সাহায্যে তিনি মোট ৯টি পালানাটক রেকর্ডবন্দি করেন HMV ও Columbia থেকে। সেগুলি হল :
১] বিষহরি ২] পাঁচকন্যা ভাগ্যধর ৩] লক্ষণের শক্তিশেল ৪] মধুমালা ৫] সন্ধ্যাবতীর বনবাস (পীড়ান গান) ৬] দুবলা বালী বা কাঁচা পাকা পীড়িত ৭] কদমতলা (কৃষ্ণলীলা) ৮] দানরাজা (হরিশচন্দ্র) ৯ ] কানাই ধামালী (জাগ গান)।
বহু পরিশ্রমে হরিশচন্দ্র উত্তর বাংলা ও নিম্ন আসামের বিভিন্ন স্থান থেকে অসংখ্য ব্রতকথা, উপকথা, প্রবাদ-প্রবচন (ছিল্কা), চুটকি, রঙ্গরসকথা,. মন্ত্র-তন্ত্র, আঞ্চলিক শব্দ সংগ্রহ করেছিলেন। অন্তেশ্বরী দেবীর সহায়তায় তিনি ব্রতকথাগুলি গ্রন্থিত করেছিলেন ‘উত্তর বাংলার লৌকিক ব্রতকথা’ গ্রন্থে। লোকসংস্কৃতিবিদ আশুতোষ ভট্টাচার্য হরিশচন্দ্রের ব্রতকথা সংগ্রহ প্রসঙ্গে বলেছেন :
‘সমস্ত পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে উত্তরবঙ্গ অঞ্চলের ব্রতকথাই সর্বাপেক্ষা রক্ষণশীল এবং সেজন্য তার মধ্যে জাতীয় সংস্কৃতির বহু প্রাচীন উপকরণ বিধৃত আছে। ব্রতকথা গ্রাম্য নিরক্ষর মেয়েলী সমাজের মধ্যে তাদের নিজস্ব একান্ত আঞ্চলিক ভাষায় প্রচলিত। শ্রীযুক্ত পাল যথাসম্ভব মেয়েলী ভাষায় সেই আঞ্চলিক উচ্চারণ বৈশিষ্ট্য রক্ষা করে তাদের নিজস্ব ভঙ্গিতে ব্রতকথাগুলি প্রকাশ করেছেন। তাতে বাংলার সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক ইতিহাস রচনায় যাঁরা প্রয়াস পেয়ে থাকেন, তাঁরা তাঁর সঙ্কলনটিকে একটি নির্ভরযোগ্য আকরগ্রন্থরূপে ব্যবহার করতে পারেন।’