
জেতবন বিহারে অবস্থানকালে বুদ্ধ এক ভিক্ষুকে লক্ষ্য করেন, ভিক্ষুক সংসার ত্যাগ করে এসেও পুনরায় নিজের স্ত্রীর প্রতি আসক্ত হয়ে সংঘ ত্যাগ করার কথা ভাবছিলেন। বুদ্ধ তাকে একদিন জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে ভিক্ষু তোমার উৎকণ্ঠার কারণ কি?’
ভিক্ষু উত্তর দিলেন, ‘আমার গৃহস্থাশ্রমের পত্নী আমার উৎকণ্ঠার কারণ।’ এই কথা শুনে তথাগত তাকে সতর্ক করে বলেন যে, এই নারী কেবল এই জন্মেই নয়, অতীত জন্মেও তার মৃত্যুর কারণ হয়েছিল। এরপর তিনি তাঁকে অতীতের একটি কাহিনী বর্ণনা করেন।
বারাণসী রাজ ব্রহ্ম দত্তের আমলে তক্ষশীলায় এক তরুণ ব্রাহ্মণ সর্বশাস্ত্রে অভিজ্ঞ হলেন শুধু তাই নয়, ধনুর্বিদ্যায় অসাধারণ পারদর্শিতা লাভ করেন। এইজন্য তিনি ‘খুল্লধনুগ্রহ পন্ডিত’ উপাধারী হলেন। ‘খুল্লধনুগ্রহ’ অর্থ ছোট ধনুর্বিদ। তখন তার আচার্য তুষ্ট হয়ে নিজ কন্যার সঙ্গে এই পণ্ডিতের বিবাহ দিলেন।
বিবাহের পর খুল্লধনুগ্রহ তার স্ত্রীকে নিয়ে বারাণসীর উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। পথে একটি বনের সম্মুখে এসে উপস্থিত হলে সেই জনপদবাসীরা বললেন বনের মধ্যে এক দুর্ধর্ষ বিশাল হাতি আছে। সেই হাতি মাঝেমধ্যে লোকালয়ে এসে লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে যায়। সুতরাং ওই বনপথ এড়িয়ে যাওয়াই ভালো। কিন্তু খুল্লধনুগ্রহ পণ্ডিত তাদের কথা শুনলেন না। তিনি বাণচালনায় নিপুন ছিলেন তাই তাকে ভীত হওয়া শোভা দেয় না। তখন তিনি তার সালাংকারা স্ত্রীকে নিয়ে বনমধ্যে প্রবেশ করলেন।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই হস্তির দেখা মিলল। হাতিটি তাকে আক্রমণ করার জন্য ছুটে আসতেই ধনুর্বিদ তাকে তৃণীর থেকে বাণ নিক্ষেপণ করলেন এবং তৎক্ষণাৎ হাতিটি প্রাণ হারালো। খুল্লধনুগ্রহ পন্ডিত সেই অঞ্চলকে নিরুপদ্রব করে বনের আরও গভীরে প্রবেশ করলেন।
সেখানে পঞ্চাশজন দস্যুর বাস ছিল। তারা পথিকদের উপর নানা নিগ্রহ করতেন। লোকে এবারও পণ্ডিতকে বারণ করলেন কিন্তু তাদের কথায় কর্ণপাত না করে স্ত্রীকে নিয়ে পণ্ডিত গভীর জঙ্গলে প্রবেশ করলেন। গভীর জঙ্গলে দস্যুরা দেখতে পেল এক পুরুষ নানা আভরণে শোভিতা একনারীকে নিয়ে গভীর জঙ্গলে প্রবেশ করেছে। তারা দুজনকে ধরবার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠলো। কিন্তু দস্যুদলের যে নেতা সে পুরুষলক্ষণজ্ঞ ছিল। ধনুগ্রহকে দেখেই সে বুঝল এ সামান্য লোক নয়, কাজেই তাকে একাকী দেখেও আক্রমণ না করার আদেশ দিল।
সেই সময়ে ৫০ জন দস্যু একটা মৃগবধ করে পথ পার্শ্বে বসে পাক করছিল। তখন ধনুগ্রহ পন্ডিত নিজের ভার্যাকে বললেন, ‘ওই দস্যুদের কাছে গিয়ে বল তোমরা যে মাংস পাক করছো তার থেকে একটু শুলবিদ্ধ মাংস দাও।’ রমণীর কথায় দস্যুদলপতি তাকে একখণ্ড মাংস দান করল। কিন্তু সেই মাংস অখাদ্য ও অপক্ক ছিল। ধনুর্বিদ সেই অপক্ক মাংস দেখে ক্রোধে উঠে দাঁড়ালেন ও সঙ্গে সঙ্গে পঞ্চাশজন দস্যুকে বধ করার জন্য উঠে দাঁড়ালো। তখনই পঞ্চাশজন দস্যুও হুংকার দিয়ে বলল, ‘তুমি একাই পুরুষ আর আমরা কি নারী?’
ধনুগ্রহ তাদের কথার উত্তর দিলনা বরং তার তৃণীরে তখন ৪৯টি বান ছিল। তিনি একসঙ্গে সেই ৪৯টি বান নিক্ষেপ করলে ৪৯টি দস্যুই ভূতলশায়িত হল। জীবিত রইল কেবল দস্যুদের নেতা।ধনুগ্রহ তখন তাকে মুষ্টিযুদ্ধে ধরাশায়ি করে স্ত্রীর কাছ থেকে খড়গ চাইল। এদিকে সেই নারী ইতিমধ্যে দস্যুদলপতির রূপ দেখে মুগ্ধ হয়ে তার প্রেমে মগ্ন। স্বামী তার কাছে খরগ চাইলে সে বুদ্ধি করে খরগটির ফলকের দিকটি স্বামীর হাতে দিল আর মুষ্টি থাকলো নিচের দিকে। তৎক্ষণাৎ দস্যুদলপতি মুষ্টি ধরে ফলকটিতে টান দিয়ে খুল্লধনুগ্রহের শিরশ্ছেদ করে।
ধনুগ্রহকে বধ করে দস্যু সেই রমণীকে গ্রহণ করলো এবং জিজ্ঞাসা করল, ‘তোমার পরিচয় কি?’ নারী তাকে সমস্ত কথা বলল। রমনীর কথা শুনে দস্যু ভাবলো, যে নারী বিনা কারণে স্বামীকে হত্যা করতে পারে,সে অন্যকেও হত্যা করতে পারে। একে বিশ্বাস করা চলবে না। অতএব বনমধ্যেই একে কৌশলে পরিত্যাগ করতে হবে। এই চিন্তা করে দস্যুর এক অগভীর নদীর কাছে এসে বলল, ‘দেখো এই নদীতে একটা ভয়ংকর কুমীর আছে। তুমি একাকি এটা অতিক্রম করতে পারবে না’। নারী উত্তর দিল, বেশ আমার যত অলংকার সব খুলে একটা পুঁটলি করি। আপনি আগে সেই গহনার পুঁটলি পরপারে রেখে আসুন। তারপর পুনরায় এসে আমাকে স্কন্ধে বহন করে নিয়ে যাবেন।’ দস্যু এটাই চাইছিল সে সমস্ত অলংকার নিয়ে নদী পার হয়ে দ্রুত অদৃশ্য হল।
রমণী যতই চিৎকার করল কিন্তু দস্যু তাতে কর্ণপাত করলো না। তখন সে একাকী বৃক্ষতলে বসে কাঁদতে লাগলো। দেবরাজ সাক্কা (ইন্দ্র) তখন আকাশপথে ভ্রমণ করছিলেন। তার সঙ্গে দুই অনুচার পঞ্চশিখ ও মাতলী ছিল। তিনি তাদের উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘দেখো এই নারীর কি অবস্থা। অতি লোভে স্বামীকেও হারালো আবার প্রেমিকও তাকে ত্যাগ করে চলে গেল। চলো একে শিক্ষা দিয়ে আসি।’
এই বলে দেবরাজ একটি শৃগালের বেশ ধরে মুখে মাংসখণ্ড নিয়ে সে নারীর সম্মুখ দিয়ে চললেন। এমন সময় মৎসরূপী মাতলি জলে লাফ দিয়ে উঠলো। শৃগাল মাছের লোভে মাংস রেখে মাছ ধরতে গেল। এমন সময় ঈগলরুপী পঞ্চশিখ মাংস নিয়ে উড়ে গেল। এত দুঃখের মধ্যেও এই কান্ড দেখে রমনী হেসে উঠলো আর শৃগালকে বলল, ‘মাছের লোভে মাংসও গেল। কোনটাই পাওয়া হলো না’। শৃগাল রূপে দেবরাজ বললেন, ‘তুমি নিজের স্বামীকে হারিয়েছ, ডাকাতকেও হারিয়েছ, আর এখন মাঝখান থেকে সব অলঙ্কার হারিয়ে এখানে একা বসে কাঁদছ। তোমার অবস্থা আর আমার অবস্থা একই।’একথা বলে অদৃশ্য হলেন দেবরাজ, রমণী তার ভুল বুঝতে পারল।
এই গল্পটি থেকে শিক্ষা পাওয়া যায় যে, অসংযমী ইচ্ছা, চঞ্চল চিত্ত এবং বিশ্বাসঘাতকতার ফল কখনোই ভালো হয় না। লোভের বশে যারা বর্তমানের নিশ্চিত সুখ ও আশ্রয় ত্যাগ করে অনিশ্চিত মোহের পেছনে ছোটে, তারা শেষ পর্যন্ত সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়। কাহিনীটি বৌদ্ধধর্মের ত্রিপিটকের খুদ্দকনিকায়ভুক্ত জাতক কাহিনীর ৩৭৪ নম্বর গল্প।