| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মৌসুমী মিত্র ভট্টাচার্য্য-র ছোটগল্প ‘চার্বাক দর্শন’ দুর্গা যখন মাঠংমা : শ্যামলী কর ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার গিরমিটিয়া ভারতীয়দের ইতিহাস — কলকাতা বন্দর থেকে বিশ্বজুড়ে এক সংগ্রামের কাহিনী : কমল ব্যানার্জী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সৃজন-মানসের অন্তর্বয়ন ও লেখাজীবনের প্রেক্ষিত : আনন্দগোপাল হালদার কেতকী কুশারী ডাইসন, রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা ও আমাদের রক্ষণশীল সমাজ : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাষ্ট্রের বিধি বনাম মায়ের শেষ ইচ্ছে — চিন্ময়কৃষ্ণের ঘটনা যে প্রশ্ন রেখে গেল : যশোবন্ত রায় বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার নেপালের পর কি কলকাতা জলের তলায় চলে যাবে — চিন্তায় বিশেষজ্ঞরা : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় বিশ্বাসঘাতকতার পরিণতি : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বৈশ্বিক অস্থিরতায় জাতিসংঘের ছয় অগ্রাধিকার : নিকোলাস বিশ্বাস বাম-ব্যানারে শারদোৎসব না দুর্গোৎসব : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ গুরুবাবাদের প্রবঞ্চনা-শোষণ-যৌনতা ও রাজনীতির জম-জমাট রঙ্গ : দিলীপ মজুমদার সিরাত : জীবন খুঁজে দেয় : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘টেবিলের নিচে একটি দেশ’ বানভাসি এলাকায় মানুষ ও সাপের সহাবস্থান, দংশনে বাড়ছে মৃত্যু : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘সংকোচ’ পাখণ্ডী শব্দটির অর্থ যুগে যুগে পরিবর্তিত হয়েছে : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ লাইন অব প্যাসেজ — সংগ্রামী জীবনের দর্পণ : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয়
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com, আমাদের পোর্টালের কিছু ছবি বাদে প্রায় সব ছবিই অন্তর্জাল থেকে সংগ্রহ করা হয়। কারুর যদি কপিরাইট থাকে জানাবেন। আমরা সেই ছবি পোর্টাল থেকে ডিলিট করে দেব।

দুর্গা যখন মাঠংমা : শ্যামলী কর

Reporter
শ্যামলী কর / ৩৩ Views জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

জীবনের কালসমুদ্রে সকলেই তো মাতৃসন্ধান করে যাচ্ছি। কমলাকান্তর চোখ দিয়ে আমরাও দেখি ‘…সুবর্ণমন্ডিতা, এই সপ্তমীর শারদীয়া প্রতিমা!… এই কি মা? হাঁ, এই মা ‘(কমলাকান্তের দপ্তর /একাদশ সংখ্যা /আমার দুর্গোৎসব)।

সত্যিই তো, এ-ই তো মা, চরাচর জগতের অধিশ্বরী — ত্বমিশ্বরী দেবি চরাচরস্য। জানি, ভারতবর্ষের উত্তর -পূর্বাঞ্চলের বরাক উপত্যকা নামক এই ভূখণ্ডেও এই একই ভক্তি, প্রীতি আর মিনতি নিয়ে যুগ যুগ ধরে মানুষ মায়ের কাছে চেয়ে এসেছেন ‘আয়ুর্দেহি, যশো দেহি /ভাগ্যং ভগবতি দেহি মে’। যুগ যুগ ধরে? হ্যাঁ, যুগ যুগ ধরেই। তবে ঠিক কতো যুগ ধরে, এই প্রশ্নের উত্তর এক কথায় দেওয়া যাবে না। কারণ, বরাক উপত্যকায় দুর্গা পূজো প্রচলনের সঠিক কালনির্ণয় করাতে কিছুটা অসুবিধা আছে, যেহেতু এই অঞ্চলের আদি ও মধ্যযুগের ইতিহাসের প্রকৃত স্বরূপ এখনও অনাবিষ্কৃত। তবে যা কিছু তথ্য প্রমাণ রয়েছে, তা থেকে বলা যেতেই পারে কোচ রাজত্বের সময়কালে বরাক উপত্যকায় রাজকীয় আনুকূল্যে দুর্গাপূজো অনুষ্ঠিত হতো। দশভূজার মূর্তি যে কোচরাজবংশের পারিবারিক বিগ্রহ ছিলেন,সে বিষয়েও তথ্য প্রমাণ রয়েছে। তথ্য প্রমাণে এ-ও রয়েছে যে ডিমাসা রাজত্বকালেও এই অঞ্চলে দুর্গা পূজোর প্রচলন ছিলো। কথিত আছে যুগ যুগ ধরে শরতের নীল আকাশে টুকরো সাদা মেঘ যখন তুলোর মতো ভাসতে শুরু করে, তখন দুঃখী সুখী নির্বিশেষে ডিমাসা জনজাতির মানুষেরা ডাউমাঠংমা-র জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন এবং এখনও করেন। কেনো করেন, এবং কী -বা এর সংকেত সেই আলোচনায় অবশ্যই আসবো, তবে সর্বাগ্রে বরাক উপত্যকায় ডিমাসাদের দুর্গাপূজার ঐতিহাসিক এবং বর্তমান প্রেক্ষাপট জেনে নেওয়া আবশ্যক। সুপ্রাচীন কাল থেকেই এই অঞ্চলে ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির গভীর প্রভাব ছিলো, এবং সেই সূত্র অনুসারে নিশ্চিত করে বলা যায় যে দুর্গোৎসবের সূচনালগ্ন থেকেই এই অঞ্চলে দুর্গা পূজোর প্রচলন ছিলো।

ডিমাসা জনগোষ্ঠীর মধ্যেও দুর্গাপূজোর রীতি বহমান ছিলো বহুকাল আগে থেকেই। শিলং থেকে প্রকাশিত North Eastern Affairs পত্রিকার জানুয়ারি-মার্চ, ১৯৯৭ ইং সংখ্যায় Ariyanisation in North East India প্রবন্ধে অধ্যাপক সুধাংশু শেখর তুঙ্গ লিখেছেন — “… King Vikramadityapha who was a late contemporary of the Ahom king Sukapha made a golden image of the goddess Thakurani (Durga) and worshipped her with full royal devotion as early as 1250 AD. This is perhaps the first instance of Durgapuja celebrated by any Hinduized people east of Bengal.” তবে এই সূত্র ধরে আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আগে ডিমাসা জনজাতির সম্পর্কে কিছু কথা বিশদে বলা প্রয়োজন বলে মনে করি। ডিমাসারা ভারতবর্ষের উত্তরপূর্বাঞ্চলের প্রাচীনতম অধিবাসীদের মধ্যে অন্যতম বিশিষ্ট একটি জনজাতি। ইতিহাসে কাছাড়ি, হেড়ম্ব বা হৈড়িম্ব নামে আখ্যায়িত এই জনজাতির সমৃদ্ধ সংস্কৃতি রামায়ণ ও মহাভারতের সময়কালেও স্বমহিমায় উজ্জ্বল ছিলো। শোনা যায়, প্রাচীন যুগে ডিলাউব্রা সাঙ্গিব্রা অর্থাৎ গঙ্গা ব্রহ্মপুত্রের মোহনাস্থলে অবস্থিত ছিলো প্রথম ডিমাসা রাজ্য। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে — ডিমাসা শব্দের অর্থই হলো ‘বড় নদীর পুত্র’। পরবর্তীকালে নদীর মোহনাস্থল থেকে কামরূপের প্রাগজ্যোতিষপুরে তাদের রাজ্য স্থানান্তরিত হয়েছিলো। তারও পরে বিভিন্ন কারণে তাঁদের রাজধানী তেজপুর, কৌন্ডিল্যনগর, ডিমাপুর, মাইবাং হয়ে ১৭৪০ খ্রিষ্টাব্দে সমতল কাছাড়ের খাসপুরে স্থানান্তরিত হয়। যদিও ডিমাসাদের মুখ্য আরাধ্য দেবতা শিব্রায় (শিব), তবুও শিলচরের অনতিদূরে অবস্থিত এই খাসপুরে রাজার পৃষ্ঠপোষকতায় মহা সমারোহে দুর্গাপূজাও হতো। রাজা তাম্রধ্বজনারায়ণের পুত্র সুরদর্পের শাসনকালে আয়োজিত দুর্গাপূজার কথা বর্ণিত হয়েছে ডিমাসা কবি চন্দ্রমোহন বর্মণের লেখা একটি বাংলা কবিতায় —

“এথায় হেড়ম্ব দেশে সুরদর্প রাজা।

আশ্বিনে প্রতিমা গড়ি করে দুর্গাপূজা”।।

১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দে মণিচরণ বর্ম্মণের পূণঃ প্রকাশিত গ্রন্থ ‘হৈড়িম্ব ভাষা প্রবেশ’ থেকে জানা যায়, শুধু কবিই নন, বেশ কয়েকজন ডিমাসা রাজাও বাংলা ভাষায় মাতৃবন্দনা রচনা করেছিলেন। এই প্রসঙ্গে রাজা রামচন্দ্রধ্বজনারায়ণ (১৭৩৮-১৭৫৭) রচিত মাতৃসঙ্গীতের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে —

‘ত্রাণ কর গো জননী! বিপদে পড়িয়াছি।।

ভক্তি নাহি জানি মাগো! শক্তি নাহি স্থির।

কেবল হইয়াছি আমি জগতে বাহির।।

সম্মুখে শমনের ভয় জ্বর জ্বর শরীর হয়।

হৃদয়ে ধরিয়াছি রাঙ্গাপদ শঙ্করীর।।

প্রণতি করিয়া বলে রামচন্দ্র নৃপ।

আনন্দে কৈলাশে যাব বলে দুর্গা শিব।।’

দেবী দুর্গার অবস্থান ডিমাসা সংস্কৃতিতে এতোটাই গভীরে প্রোথিত ছিলো যে ডিমাসা রাজাদের শাসনকালে দুর্গাপূজোই ছিলো সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ একটি উৎসব, যা আর সকল উৎসবকে ব্যায়বাহুল্যও ছাপিয়ে যেতো। উপেন্দ্রচন্দ্র গুহের ‘কাছাড়ের ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থে রাজা গোবিন্দচন্দ্রের সময়ে ধর্মীয় অনুষ্ঠান বাবদ অর্থব্যায়ের একটি অনুপুঙ্খ বিবরণ পাওয়া যায়। বারো মাসে মহাবিষ্ণু, রথযাত্রা, শ্রী শ্রী কাচাকান্তি ঠাং , দুর্গাপূজা, দীপান্বিতা, শিবরাত্রি, বাসন্তী পূজা ইত্যাদি মিলিয়ে মোট ৩২টি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সর্বমোট ১০১১১। /৬।। টাকা ব্যয় হয়েছিলো, তারমধ্যে শুধু দুর্গাপূজার জন্য ব্যায় হয়েছিলো ৪২৫০ টাকা। এই ব্যায়ই সর্বাধিক। ইতিহাসবিদদের মতে খাসপুর রাজবাড়িতে অনুষ্ঠিত এই দুর্গাপূজাটিই সম্ভবত সমতল কাছাড়ের সবচেয়ে প্রাচীন পূজো ছিলো।

কাছাড় জেলায় ডিমাসা রাজা কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত দশভূজা দুর্গার অন্তত দুটি বিগ্রহ এবং একটি মন্দিরও রয়েছে। বিহাড়া অঞ্চলের ব্রাহ্মণগ্রামে একপ্রান্তে রয়েছে ‘রাজার দীঘি’ আর অপর প্রান্তে রয়েছে ‘দশভূজা’ মন্দির, দেবী এখানে নিত্যপূজিতা। অন্যদিকে বরখলায় রয়েছে অষ্টধাতু নির্মিত দুর্গা মূর্তি, যা রাজা কৃষ্ণচন্দ্রনারায়ণ (১৭৭৪-১৮১৪) তীর্থভ্রমণে গিয়ে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন। দশভূজা -ব্রাহ্মণ পরিবারের মতে এই মূর্তি নবদ্বীপ থেকে আনীত, অন্যদিকে ইতিহাসবিদ শ্রী উত্তমচাঁদ বর্মণ মনে করেন ১৭৯০ খৃষ্টাব্দে বেণারস থেকে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র নারায়ণ এই মূর্তি নিয়ে এসেছিলেন। এই দশভূজা মূর্তির একটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই একচালা মহিষমর্দিনীর প্রতিমায় লক্ষী সরস্বতী কার্তিক গনেশ এর সঙ্গে দক্ষিণে ও বামে অবস্থান করছেন কৃষ্ণ এবং বলরাম, যাকে শাক্ত ও বৈষ্ণব দর্শনের এক বিরল সংমিশ্রণ হিসেবে দেখা হয়। রাজপুরোহিতের বংশধরেরা আজও ভক্তি নিষ্ঠা সহকারে এই দেবী দশভূজাকে সেবাপূজো দিয়ে থাকেন।

এ-কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে ডিমাসাদের সামগ্রিক জীবনেই দুর্গা উপাসনার এক গভীর ব্যঞ্জনা ছিলো। ‘প্রাচীন বাংলা পত্র সঙ্কলন’ গ্রন্থে দেখা যায় মহারাজ কৃষ্ণ চন্দ্র নারায়ণ এবং মহারাজ গোবিন্দ চন্দ্র নারায়ণের একাধিক চিঠির উপরে ‘শ্রীদুর্গা’ কে স্মরণ করে চিঠির মূল বয়ান শুরু হয়েছে। এই প্রসঙ্গে ১২০৬ বঙ্গাব্দের ১৫ই চৈত্র তারিখে লেখা মহারাজা কৃষ্ণ চন্দ্র নারায়ণের একটি চিঠির উল্লেখ করা যেতে পারে, যেখানে চিঠিটি শুরু হয়েছে ‘৭ সস্তি শ্রীদুর্গাচরণারবিন্দ মকরন্দ সানন্দীত….’ দিয়ে।

দেবী দুর্গার প্রতি এই গভীর ভক্তি আর আনুগত্য ডিমাসা সমাজে আজও প্রবলভাবে বহমান। দুর্গাকে তারা ‘মাঠুংমা’, ‘মাঠংমা ‘বা ‘মাঠিংমা’ বলেন। এই শব্দের উৎস নিয়ে বহুধা মত এবং যুক্তি রয়েছে। বিশিষ্ট ডিমাসা ইতিহাসবিদ শ্রী উত্তমচাঁদ বর্মণের মতে ‘মাঠুংমা ‘অর্থ হলো মাতুন-মা অর্থাৎ মাতুনমাতা। আবার প্রয়াত রামকৃষ্ণ বর্মণের মতে মাতঙ্গমা (অর্থাৎ গণেশের মা) থেকেও ‘মাঠংমা’ শব্দের উৎপত্তি হতে পারে। অপরদিকে ডিমাসা সাহিত্যিক এবং আসামের প্রাক্তন মন্ত্রী সোনারাম থাওসেন বলেন বাংলা শব্দ ‘মাটির মা’ থেকেই হয়তো ‘মাঠিংমা’ কথাটি এসেছে। তবে বিশিষ্ট গবেষক অধ্যাপক অমলেন্দু ভট্টাচার্য এ বিষয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন মত পোষণ করেন। তিনি বলেন, দুর্গা জগতের রক্ষাকর্ত্রী। দুর্গার এই প্রকৃতির সঙ্গে মিল আছে, এমন একটি শব্দ ডিমাসা ভাষাতেও আছে। শব্দটি হলো ‘মাঠাং’ মানে ‘রক্ষা কর’। কার্যত সেই সূত্র ধরেই দুর্গাকে রক্ষকারী মা অর্থাৎ ‘মাঠংমা’ বলা হয়।

কৈলাস থেকে মর্ত্যে এসে মাঠ‌ংমা মাত্র দিন পাঁচেক অবস্থান করেন। এই ক’দিন মা-কে আদরে যত্নে ভরিয়ে রাখেন ভক্তরা, অপরূপা করে সাজিয়ে তোলেন ঐতিহ্যবাহী ডিমাসা গহনা ফোয়াল, জংসামা, লিকজাও, খামাওথাই ইত্যাদি দিয়ে। সনাতনী রীতি মেনে রিগু-রিখাউসা-রিজাম্ফাইন-রিসা-র্মাই ইত্যাদি পরিধেয় বস্ত্র দিয়ে মা-কে সাজানো হয় যত্ন করে। পূজোয় আধুনিকতা থেকেও অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় পরম্পরাগত প্রথা এবং সংস্কৃতিকে। মন্ডপসজ্জা, আলো বা প্রতিমা — সবকিছুই এক বিশেষ গুণমানের, যেখানে আড়ম্বর নেই, আছে আন্তরিকতা। নীল আকাশ, আর কাশফুল, শিউলির ঘ্রাণ — প্রকৃতির এই সরল সুন্দরকে ডিমাসারা আজও হারিয়ে যেতে দেন নি, আর দেন নি বলেই তাঁদের দুর্গোৎসবের প্রস্তুতিও শুরু হয় ডাউমাঠংমার ডাকে, যার কথা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। ডাউ মানে পাখি। শরৎকালে মাঠংমা (দুর্গা) পূজোর আগে এই পাখি ডাকে বলে তার নাম ডাউমাঠংমা। এই ছোট্ট বাদামী রঙের পাখিটিকে ডিমাসারা দেবীর আগমনের প্রতীক হিসেবে মানেন। এ নিয়ে একটি প্রচলিত কথাও আছে —

‘ডির্গুং ডির্গুং কাশীবার

জাফায়খাগো ফুলিলী,

ডাউমাঠংমা গো মসাখা

মাঠং বঠর সফায়ব্লি।’

অর্থাৎ

নদী তীর ধবল কাশফুলে ভরে উঠেছে,

ডাউমাঠংমা ঐ ডেকে ডেকে জাগাচ্ছে

দুর্গাপূজার বঠর (ঋতু) এসে গেছে।

হয়তো ডাউমাঠংমা বার্তা দিতে আসে — ঘরের কোণে বসে যে কাঁদছিলো, সে আর কাঁদবে না। যে মানুষটির ভেতরে নীলকষ্টের তোলপাড় ছিলো, সে-ও আর বিষণ্ণ থাকবে না পূজোর এই পাঁচটি দিন। এ যেনো কবি জয় গোস্বামীর সেই উচ্চারণের মতো প্রাণবন্ত ‘…ব্যাধি, সরে দাঁড়াও /সমতলে নেমে গিয়ে অপেক্ষা করো /যন্ত্রণা, বিরতি নাও এখন…।’

আসলে জীবনের ‘অবর্ণনীয় দুঃখ আর অনীর্বচনীয় আনন্দের’ ঠিক মাঝখানে রয়েছে এই পাঁচটি দিনের প্রসন্নতা। যাপনের গ্লানি পেরিয়ে উদযাপনের এই উচ্ছ্বাস সর্বদুঃখহরা।তারপরেই তো দশমীর চাঁদ আর একটা শূন্য মন্ডপ। আবার তখন ডাউমাঠংমার ফিরে আসার অপেক্ষায় কাটবে আরো একটা বছর। সময় পাল্টেছে, পাল্টেছে মানুষের যাপনকথাও। তবুও মানুষের এই একটি অনুভূতি অবিকৃত রয়ে গেছে যুগ যুগ ধরে।

তথ্যঋণ:

১। উপেন্দ্রচন্দ্র গুহ : ‘কাছাড়ের ইতিবৃত্ত’/১৯৭১/অসম প্রকাশন

২। অমলেন্দু ভট্টাচার্য : নিবন্ধ ‘হেড়ম্ব রাজপরিবারের দুর্গোৎসব’

৩। অমলেন্দু ভট্টাচার্য : নিবন্ধ ‘বরাকের দুর্গোৎসব’

৪। বিশ্বজ্যোতি বর্মণ : নিবন্ধ ‘ডিমাসাদের শক্তিপুজা : ঐতিহাসিক ও বর্তমান প্রেক্ষাপট’

পেজফোরনিউজ ২০২৫ পুজা সংখ্যায় প্রকাশিত

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Currently Maintained by the2.dev