
৬৬ . বিপ্লবী ক্ষুদিরামের পাতানো দিদি চারুশীলা গোস্বামী
মায়া হয় ছেলেটাকে দেখে। রোগা পটকা ছেলে। দুবেলা ঠিকমতো খাবার জোটে না। একেবারে অভাগা। এই বয়েসে মা-বাবাকে হারিয়েছে। এসে উঠেছে দিদির বাড়ি। মেদিনীপুরের হবিবপুরে। চারুশীলার বাপের বাড়ির কাছেই তার দিদির বাড়ি। দূর থেকে দেখেন ছেলেটাকে। তাঁরই মতো দুর্ভাগা। বাবা রাখালচন্দ্র অধিকারী বারো বছর বয়েসে বিয়ে দিয়েছিলেন মেয়ের। বিবাহিত জীবন ছিল মাত্র পাঁচ বছর। মারা গেলেন স্বামী। চারুশীলা চলে এলেন বাপের বাড়ি। দুর্ভাগা তিনি। কিন্তু ক্ষুদিরামের মতো দুর্ভাগা নন। তাঁর তো তবু মা-বাবা আছেন, আগলে রাখেন তাঁরা। ক্ষুদিরামকে আগলে রাখার নেই কেউ।
ছেলেটার সঙ্গে ভাব জমালেন চারুশীলা। ও বাবা, এইটুকু ছেলে আবার ইংরেজ মারার স্বপ্ন দেখে। এর মধ্যে ভিড়ে পড়েছে বিপ্লবী দলে। একদিন শুনলেন ক্ষুদিরামকে পুলিশ ধরেছে। তার অপরাধ সে কেল্লার কাছে বিলি করছিল ব্রিটিশ বিরোধী প্রচারপত্র। যাহোক ছিলেন নাড়াজোলের রাজা নরেন্দ্রলাল খান। তিনি জেল থেকে ছাড়িয়ে আনলেন ক্ষুদিরামকে। চারুশীলার মনে জাগল প্রশ্ন। আমার দেশের ছেলের উপর কেন অত্যাচার করবে ইংরেজের পুলিশ? এ তো ভারী অন্যায় ব্যাপার !
একদিন বিকেলবেলা ক্ষুদিরামকে খেতে দিয়ে তিনি লাজুক ভাবে বললেন, ‘এই খুদি, আমাকে নিবি তোদের দলে?’ চমকে উঠলেন ক্ষুদিরাম। তারপর হাসিতে ভরে উঠল তাঁর মুখ। ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালেন।
সেই ক্ষুদিরাম ইংরেজসাহেবকে মারার জন্য যে মজফফরপুর যাচ্ছেন, সে কথা কিন্তু দিদিকে জানান নি। সেখানে যাওয়ার আগের দিনও তিনি চারুশীলার বাড়িতে ছিলেন। খুদি যে ধরা পড়েছেন, তাঁর যে ফাঁসি হবে, সে কথা চারুশীলা জেনেছেন পরে। তারপর একদিন ফাঁসির দড়ি পরলেন ক্ষুদিরাম। ব্যথায় বুক ভেঙে গেল চারুশীলার। সেই সঙ্গে রাগও হল শাসক ইংরেজদের উপর।
১৯২১-এর অসহযোগ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন তিনি। গঠন করলেন মহিলা সমিতি। গ্রামে গ্রামে ঘুরতে লাগলেন। ইংরেজবিরোধী আন্দোলনে মানুষ যাতে যোগ দেন, নারীরা যাতে একাজে এগিয়ে আসেন, তার আবেদন করতে লাগলেন তিনি। একটি সভায় বক্তৃতা করার সময়ে ইংরেজের পুলিশ লাঠিচার্জ করে। রক্তাক্ত হয় বারো বছরের এক কিশোর। সে দৃর্স দেখে সহ্য হল না চারুশীলার। তিনি পুলিশের হাত থেকে লাঠি কেড়ে নিয়ে পুলিশকেই দু’চার ঘা লাঠির বাড়ি দেন।
সে সময়ে জেলাশাসক ছিলেন পেডিসাহেব। তাঁর নজর ছিল চারুশীলার উপর। মহিলাটি খুব বাড়াবাড়ি করছে। শায়েস্তা করতে হবে। চারুশীলার নামে জারি হল গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। না, ধরা দেওয়া চলবে না। চারুশীলা খড়গপুরে এসে আত্মগোপন করলেন। সেখানে চুপচাপ বসে রইলেন না। সত্যাগ্রহীদের জন্য অর্থসংগ্রহ শুরু করলেন শ্রমিক ইউনিয়নের সভা থেকে।
তারপর সংগৃহীত অর্থ নিয়ে যাত্রা করলেন কাঁথি। কিন্তু বাসে তো পুলিশ আছে। চারুশীলা তাঁর অভিনয় ক্ষমতা দিয়ে ধোঁকা দিলেন পুলিশকে। বাসে ড্রাইভারের পাশে বসে ড্রাইভারের সঙ্গে খোশ গল্প করে গেলেন। সন্দেহ হল না পুলিশের। কাঁথিতে নেমে অন্নদা চৌধুরীর হাতে তুলে দিলেন ৫০০ টাকা আর কিছু সোনার গয়না।
মেদিনীপুরে একটি শোভাযাত্রা পরিচালনা করার অপরাধে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। ছয় মাসের কারাদণ্ড। জেলে এসে চারুশীলা দেখলেন সেখানে বন্দিদের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার কোন ব্যবস্থা নেই। জেল কর্তৃপক্ষের কাছে তিনি অভিযোগ করলেন। কোন সাড়া দিলেন না তাঁরা। এবার তিনি বিধবাদের রান্নার অধিকারের জন্য শুরু করে দিলেন অনশন। এবার কর্তৃপক্ষ তাঁর দাবি মানতে বাধ্য হলেন ।
এর পরে আরও দুবার কারাবরণ করতে হয়েছে তাঁকে — ১৯৩১, ১৯৩২ এবং ১৯৩৩-এ।
শুধু চারুশীলা নন, পুলিশের নজর ছিল তাঁর ছেলের উপরেও। ছেলের নাম ভবানীপ্রসাদ। বিপ্লবী দলে তিনিও নাম লিখিয়েছিলেন। তাই ১৯৩০ সালে চারুশীলাদেবীর বাড়ি ৩ মাসের জন্য বাজেয়াপ্ত করা হয়। এই সময় তাঁর বাড়ির নানা জিনিস, গয়না, কাপড়চোপড় চুরি হয়ে যায়।
১৯৩৩ সাল। এই বছরের ২ সেপ্টেম্বর ম্যাজিস্ট্রেট বার্জকে হত্যা করেন বিপ্লবীরা। প্রথমে তাঁরা ঠিক করেছিলেন হত্যা করা হবে এপ্রিল মাসে। এপ্রিল মাসটাকে তাঁরা ম্যাজিস্ট্রেট হত্যার ‘অ্যানিভারসারি ডে’ করে তুলতে চেয়েছিলেন। ১৯৩১ সালের এপ্রিলে মেদিনীপুরের জেলাশাসক পেডিকে হত্যা করা হয়, ১৯৩২ সালের এপ্রিলে জেলাশাসক ডগলাসকে হত্যা করা হয়। এসব কারণে বাংলার গবর্নর জন অ্যাণ্ডারসন বলে দিয়েছিলেন, ‘মেদিনীপুরের নৈরাজ্যবাদী শক্তিধরেরা আমাদের সামনে একটা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে—তারা একজন ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেটকেই জীবিত রাখবে না। সরকার সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে। শহরে সৈন্য মোতায়েন করা হয়েছে। পরে মেদিনীপুরে কোন নৈরাজ্যসৃষ্টিকারী আন্দোলনকে মিলিটারি নামিয়ে কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হবে।’
এপ্রিল মাসের পরিকল্পনা ব্যর্থ হতে বিপ্লবীরা দ্বিতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
১৯৩৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর। মেদিনীপুর কলেজ মাঠে ফুটবল খেলার আয়োজন। ক্রীড়াপ্রেমী ম্যাজিস্ট্রেট বার্জ থাকবেন সেখানে। সেখানেই বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের দুই সদস্য – অনাথবন্ধু পাঁজা আর মৃগেন্দ্রনাথ দত্ত হত্যা করেন বার্জকে। আরও অনেকের মতো চারুশীলদেবীর প্রতি সন্দেহ হয় পুলিশের। ৮ বছরের জন্য তাঁকে মেদিনীপুর জেলা থেকে বহিষ্কারের আদেশ দেওয়া হয়। তাঁর বাড়ি ও জমি নিলাম হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে চারুশীলা চলে যান পুরী। ৮ বছর বাদে ফিরে আসেন কলকাতায়।