আজ থেকে একশো বছর আগে ফেনী এসেছিলেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। অবস্থান করেছিলেন খান সাহেব বজলুল হকের বৈঠকখানায়। সমাবেশ করেছিলেন ইসলামিয়া হাই স্কুল মাঠে। কবিকে সংবর্ধনা দিয়েছিলেন ফেনীর আম জনতা। স্মৃতিবিজড়িত সেই বজলুল হকের বৈঠকখানা এখন গ্র্যান্ড হক টাওয়ার, যেখানে বিপ্লব ও মহাজাগরণের কবি নজরুলের প্রতিকৃতি রয়েছে। শত বছর পর কবির ফেনী আগমনকে স্মরণ করে দিনভর নানা আনুষ্ঠানিকতায় ফেনীবাসী। নজরুল প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা হয়।
চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ফেনী দীর্ঘ সময় ফেনীর সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
জাতীয় কবির ফেনী আগমনের শতবর্ষ পূর্তি (১ আগস্ট ১৯২৬ – ১ আগস্ট ২০২৬) এবং সরকার ঘোষিত ‘নজরুল বর্ষ’ উপলক্ষে গত ২৫ জুলাই ‘চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ফেনী’ জেলা আয়োজন করে ‘শতবর্ষের আলোয় ফেনীতে নজরুল’ শীর্ষক আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার। ফেনী শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক ছিলেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ এর উপদেষ্টা কমরেড খালেকুজ্জামান।

Screenshot
এই সমৃদ্ধ আয়োজনের অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নজরুল গবেষক, বিশিষ্ট কবি ও সমালোচক সৈকত হাবীব, ফেনী ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি ও লেখক ড. এ.কে.এম.সহিদ রেজা, লেখক, গবেষক ও গণমাধ্যমব্যক্তিত্ব ড. অখিল পোদ্দার, বাসদ ফেনী জেলার আহ্বায়ক মালেক মনসুর, গল্পকার শিহাব শহীদুল, সমাজসেবক ও সংগঠক ইমন-উল-হক, ফেনী জেলা কালচারাল অফিসার সুদীপ্তা চক্রবর্তী ও ফেনী সাহিত্য সভার আহবায়ক কবি ও গবেষক শাবিহ মাহমুদ। চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, ফেনী জেলার সদস্য সচিব কবি শামীম পাটোয়ারীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনাসভা শেষে নজরুল সঙ্গীত, কবিতা আবৃত্তি, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ফেনী জেলার আহ্বায়ক অর্জুন দাস।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি কমরেড খালেকুজ্জামান তাঁর বক্তব্যে জানান ‘বহুবিচিত্র ধারায় বিকশিত ও প্রসারিত নজরুলকে এখনো আমরা সামগ্রিক পূর্ণতায় ধারণ করতে পারি নাই। যতবার অন্ধকার এসেছে ততবারই নজরুলের দ্রোহের আগুন আমাদের আলোকিত করেছে। যে অগ্নিশিখা আমাদের বরাবরই পথ দেখিয়েছে। নজরুলের ফেনী সফরের ইতিহাস সংরক্ষণ ও নতুন প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দিতে এ ধরনের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে তিনি আরো বলেন, একটি বিশেষ শ্রেণী এখনো কুসংস্কার আঁকড়ে আছে। সেটিকে পুঁজি করে তারা মানুষকে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে ঠকাচ্ছে। কবি নজরুল ছিলেন এ সকল দোমুখো গুঁইসাপদের বিরুদ্ধে বিপ্লব ও বিদ্রোহের প্রতীক। সময়ের প্রয়োজনে তাই নজরুল চর্চার ক্ষেত্র বাড়াতে হবে। ফেনী থেকে চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র যে দ্রোহের শিখা প্রজ্জ্বলন করলো তা বিশ্ববাঙালির মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে।
ফেনী জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এ আনুষ্ঠানিকতায় আলোচক ছিলেন কবি সৈকত হাবীব। তিনি বলেন, নজরুল ফেনীতে কয়েক ঘণ্টার জন্য এসেছিলেন। কিন্তু তার প্রভাবটা ছিল অনেক বড়। গেল একশ বছরেও কবির সে অনুপ্রেরণা ফুরিয়ে যায়নি, যে কারণে ফেনীবাসী নতুন করে জেগে উঠেছে। এটি দেখে অন্যরাও জাগবে।

সময়ের প্রয়োজনে শিশুকিশোরদের মধ্যে নজরুলের চেতনা ছড়িয়ে দেয়ার আহ্বান জানিয়ে বিশিষ্ট সাংবাদিক ও গবেষক ড. অখিল পোদ্দার বলেন, অন্যায়- অত্যাচার-অসামাজিকতার দাবানলে ঝলসে গেছে মানবিকতা। এমন দুর্বিষহ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে স্কুল কলেজের সিলেবাসে নজরুল পাঠ অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে। এমন ক্রান্তিলগ্নে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে নজরুলকে গুরুত্ব না দিয়ে হাইস্কুল থেকেই কবির নির্দিষ্ট গান, কবিতা ও প্রবন্ধ সিলেবাসভুক্ত করার দাবি জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে গল্পকার শিহাব শহীদুল বলেন, নজরুল আদিগন্ত এক চেতনার নাম। তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ করতে ফেনী হতে পারে আমাদের অন্যতম মডেল।
অনুষ্ঠানের সঞ্চালক শামীম পাটোয়ারী বলেন, ১৯২৬ সালের ১ আগস্ট হাবীবুল্লাহ বাহার এবং কয়েকজন রাজনৈতিক কর্মী ও শিক্ষককে সঙ্গে নিয়ে নজরুল রাজনৈতিক কাজে কয়েক ঘণ্টার জন্য চট্টগ্রাম থেকে ফেনীতে আসেন। ফেনীর ইসলামিয়া হাইস্কুল মাঠে তাঁর আগমন উপলক্ষে একটি সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সমাবেশে নজরুল দেশি-বিদেশি শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বক্তৃতা করেন। অনুষ্ঠানে এক পর্যায়ে তিনি ‘কারার ঐ লৌহ কবাট’, ‘ওঠ রে চাষী’, ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’ ইত্যাদি গান পরিবেশন করেন। এ ছাড়া তিনি বিদ্রোহী কবিতার কিছু অংশ আবৃত্তি করে শোনান। এত বিপুল উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়, তবে বৃষ্টির জন্য সভা তড়িঘড়ি করে শেষ করতে হয়।

Screenshot
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, শিল্পী, সাহিত্যিক, শিক্ষার্থী এবং সংস্কৃতিপ্রেমীরা উপস্থিত ছিলেন। জেলা শিল্পকলার অডিটোরিয়াম ছিল পরিপূর্ণ। অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে নজরুলের গান, কবিতা আবৃত্তি ও নৃত্য পরিবেশনায় এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশগ্রহণ করেন চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছাগলনাইয়া ও দাগনভূঞা শাখার শিশু শিল্পীবৃন্দ।
অনুষ্ঠানে কবি নজরুলের ফেনী আগমনের শতবর্ষ উপলক্ষে প্রকাশিত সাহিত্য সাময়িকী ‘আনন্দ ভৈরবী’-এর বিশেষ সংখ্যার মোড়ক উন্মোচন করা হয়। মোড়ক উন্মোচনকালে আরও উপস্থিত ছিলেন কবি মনজুর তাজিম, ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন মানিক, নাট্যজন নাসির উদ্দিন সাইমুম, ছাগলনাইয়া গণপাঠাগার সেক্রেটারি মাস্টার আবুল কালাম আজাদ, নিজাম উদ্দিন মজুমদার, কুমিল্লার চারণ সংগঠক সর্দার হুমায়ুন কবির, জাসাস সাধারণ সম্পাদক সাব্বির হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক দিলদার হোসেন, চট্টগ্রামের বাসদ নেতা আল কাদেরী জয়, ডা: সুশান্ত বড়ুয়া, জে বি বিজয়, কবি নূর নবী, মাস্টার আব্দুল মান্নান, চিত্রকর গিয়াস উদ্দিন ও বাসদ নেতা ডা. হারাধন চক্রবর্তী। অনুষ্ঠানের সবশেষে চিত্রাংকন প্রতিযোগীর ৩৬ জন বিজয়ীর হাতে পুরস্কার ও সার্টিফিকেট তুলে দেয়া হয়।
চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, ফেনী জেলার সদস্য সচিব কবি শামীম পাটোয়ারী এই আয়োজনের সার্বিক তথ্য দিয়ে আমার এই প্রতিবেদনে সমৃদ্ধ করেছেন তাঁর প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।