
সম্প্রতি বিশ্ব ক্ষুধা সূচকের (গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স — জিএইচআই) প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। দেখা যাচ্ছে চলতি বছরের (২০২৬) বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে ফের তলানিতে ভারত। ১২২টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১০০তম। গতবছর (২০২৫) ১০২তম স্থানে ছিল। এবছর সামান্যই এগিয়েছে।
সমীক্ষায় জানা গিয়েছে, দেশে ৫ বছরের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে প্রায় প্রতি ৫ জনের মধ্যে একজন উচ্চতার তুলনায় কম ওজন বা ওয়েস্টিং-এর সমস্যায় ভুগছে। অপুষ্টির দিক থেকে ইথিওপিয়ার মতোই ভারতও রয়েছে একই অবস্থানে। দু’টি দেশের স্কোরই ২৪.১। যা তাদের ‘গুরুতর’ ক্ষুধার শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করে। ভারতের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে — বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা।
এই সূচকটি মিলিতভাবে জার্মান সংস্থা ‘ওয়েলথুঙ্গারহিলফে’ (Welthungerhilfe, আইরিশ সংস্থা ‘কনসার্ন ওয়ার্ল্ডওয়াইড’ (Concern Worldwide) এবং ‘ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ল অফ পিস অ্যান্ড আর্মড কনফ্লিক্ট’ প্রকাশ করে। এছাড়া এই উদ্যোগে ‘হেলভেতাস’ (Helvetas)-ও যুক্ত রয়েছে।
বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে মূলত চারটি বিষয়ের ভিত্তিতে ক্ষুধার পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হয়—জনসংখ্যার অপুষ্টি, শিশুদের বয়সের তুলনায় কম উচ্চতা, উচ্চতার তুলনায় কম ওজন এবং ৫ বছরের কম বয়সি শিশুদের মৃত্যুহার। এই সূচকগুলির মাধ্যমে একটি দেশের খাদ্য ও পুষ্টি পরিস্থিতির সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়। এর আরেকটি লক্ষ্য হল — বৈশ্বিক, আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ে ক্ষুধার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা এবং খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ও অপুষ্টির কারণ ও পরিণতির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা।
ভারতের মোট ক্ষুধা সূচক স্কোর ২৪.১। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক গড় (২৩.৫)-এর চেয়েও বেশি। স্কোর যত বেশি হয়, ক্ষুধার পরিস্থিতি তত ভয়াবহ বলে গণ্য করা হয়। এই স্কোর ২০ থেকে ৩৪.৯-এর মধ্যে থাকলে সংশ্লিষ্ট দেশের ক্ষুধা পরিস্থিতিকে ‘গুরুতর’ বা Serious শ্রেণিতে রাখা হয়। অন্যদিকে, বাংলাদেশের স্কোর ১৯.২, নেপালের ১৪.৫ এবং শ্রীলঙ্কার ১০.২, যা ‘মাঝারি’ বা Moderate শ্রেণির মধ্যে পড়ে। পাকিস্তানের স্কোর ২৫.৫, ফলে সেই দেশও গুরুতর ক্ষুধা পরিস্থিতির শ্রেণিতে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে ৮৪তম স্থানে, নেপাল ৭২তম এবং শ্রীলঙ্কা ৫৩তম স্থানে রয়েছে।
ভারতে শিশু অপুষ্টির পরিসংখ্যান আরও উদ্বেগজনক। সূচকের তথ্য অনুযায়ী, ৫ বছরের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে ১৯ শতাংশের ওজন তাদের উচ্চতার তুলনায় কম। এই অবস্থাকে ‘চাইল্ড ওয়েস্টিং’ (Child Wasting) বলা হয়। সাধারণত তীব্র অপুষ্টি বা অসুস্থতার সঙ্গে এই সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় এই হার ভারতের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ। একই সঙ্গে ৫ বছরের কম বয়সি শিশুদের ২৯.৩ শতাংশের উচ্চতা তাদের বয়সের তুলনায় কম, যা দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টির ইঙ্গিত দেয়। এই সমস্যাকে বলা হয় ‘চাইল্ড স্টান্টিং’ (Child Stunting)। ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর হার ২.৭ শতাংশ। ভারতের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯.৮ শতাংশ অপুষ্টির শিকার। ২০০০ সালে শিশুদের খর্বাকৃতির হার ৫০ শতাংশ ছিল। তা ছাড়া ৩ জনে ১ জন শিশু অপুষ্ট ছিল, এ ছবিও স্বস্তিকর নয়।

পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্ব ক্ষুধা সূচক তৈরির ক্ষেত্রে চারটি বিষয়ে প্রাধান্য দেওয়া হয়। জনসংখ্যার কত অংশ পর্যাপ্ত ক্যালোরি পাচ্ছে না, ৫ বছরের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে উচ্চতার তুলনায় কম ওজনের হার, বয়সের তুলনায় কম উচ্চতার হার এবং ৫ বছরের আগে শিশুমৃত্যুর হার। ফলে এই সূচক শুধুমাত্র খাদ্য উৎপাদন বা খাদ্যের প্রাপ্যতা মাপে না; মানুষের পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতিরও ইঙ্গিত দেয়।
শিশু অপুষ্টির পিছনে শুধু খাবারের অভাবই দায়ী নয়। পরিবারের আর্থিক অবস্থা, মায়েদের পুষ্টি, নিরাপদ পানীয় জল, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং শিশুদের খাদ্যতালিকায় পুষ্টিকর খাবারের বৈচিত্র — সবকিছুরই প্রভাব রয়েছে। পর্যাপ্ত খাবার পাওয়া গেলেও সেই খাবারে প্রয়োজনীয় পুষ্টি না থাকলে শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টি শারীরিক বিকাশের পাশাপাশি শিশুর শেখার ক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যের উপরও প্রভাব ফেলতে পারে। ভারতে পরিবারগুলির কর্মহীনতা, কাজের অনিশ্চয়তা, সামান্য মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব বিশেষত দরিদ্র মাকে সামান্য আয়ের জন্য প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়, যা শিশুর জীবনে নানাভাবে ছাপ ফেলে যায়। শিশুরা মিড-ডে মিলে পর্যাপ্ত পরিমাণে পুষ্টিকর খাবার পেল কি না, তা প্রধানত নজরদারি করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। শিশুরা প্রোটিন ফল, সুষম আহার, নিরাপদ পানীয় জল ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে কিনা সরকারি প্রকল্পে নিবিড় যাচাই করা প্রয়োজন। নীতি আয়োগ শিশু পুষ্টির প্রধান নির্ধারক হিসেবে চিহ্নিত করেছে দারিদ্র, আয়ের অসম বণ্টন, মায়ের শিক্ষার হার এবং নারীর সামাজিক অবস্থানকে। কিন্তু পুষ্টি-বিধানের সরকারি উদ্যোগে এই সামগ্রিক পরিকল্পনা খুঁজে পাওয়া কঠিন। রোজগারে বৈষম্য থেকে যাচ্ছে, আয়বৃদ্ধিকে বহুগুণ ছাড়িয়ে যাচ্ছে খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি, দরিদ্র পরিবার এগুলির অভিঘাত সামাল দিতে পারছে না যার প্রভাব পড়ে শিশুদের উপর। অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলি দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত হয়ে আছে। পরিকাঠামোর সংস্কার প্রয়োজন, মা ও শিশুর জন্য পুষ্টিকর খাবারের জন্য যথেষ্ট বাজেট বরাদ্দ করা দরকার। নজর দেওয়া দরকার নিরাপদ পানীয় জল, শৌচ-নিকাশি ব্যবস্থার দিকে, কারণ ঘন ঘন পেটের রোগ অপুষ্টির অন্যতম কারণ। নজর দেওয়া দরকার প্রান্তিক, বৈষম্য-পীড়িত জনগোষ্ঠীগুলির প্রতি। দলিত, মুসলিম, জনজাতি-প্রধান গ্রাম; ভাটা, খনি বা খাদান-সংলগ্ন এলাকা; বন্ধ বাগান ও কারখানা-সংলগ্ন পরিবার; পরিযায়ী শ্রমিক, অনিশ্চিত জীবিকার উপর নির্ভরশীল পরিবার ও তাদের শিশুদের উপর।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারতে ক্ষুধা দূরীকরণের গতি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। ২০০৬ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে ভারতের জিএইচআই স্কোরের উন্নতি হয়েছিল ৮.২ পয়েন্ট। সেখানে ২০১৮ থেকে ২০২৬ সালের ব্যবধানে অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ১.৭ পয়েন্ট। ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে ভারতের ‘স্কোর’ ২০০০ সালে ছিল ৩৮.১। ২০২৬ সালে ২৪.১-তে এসেছে। শ্রীলঙ্কা একই সময়ে ২১.৪ থেকে উন্নীত হয়েছে ১০.২ অবস্থানে, চিন ১৩.৪ থেকে ৫-এরও নীচে। যা ফের স্পষ্ট করে, বিশ্বায়িত অর্থনীতির সুবিধা ভারতের অধিকাংশ মানুষের কাছে পৌঁছতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। অতি মন্থর গতিতে, অতি সামান্য পরিবর্তনকে ‘উন্নতি’ বলা চলে না, বিশেষত যেখানে বিলম্বের মূল্য চোকাতে হচ্ছে শিশুদের।

শিশুদের অপুষ্টি, পুষ্টিকর খাবারের নাগাল এবং দরিদ্র পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তার মতো সমস্যাগুলির স্থায়ী সমাধান জরুরি। অর্থনৈতিক বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে শিশুদের পুষ্টির পরিস্থিতিতে কতটা প্রভাব ফেলছে, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব ক্ষুধা সূচকের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দিচ্ছে — ভারতে ক্ষুধা ও অপুষ্টি মোকাবিলায় এখনও অনেকটা পথ চলা বাকি রয়েছে।
লেখক গণ আন্দোলনের কর্মী।