| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ জয়ন্ত দে-র ছোটগল্প ‘সংসারযাত্রা’ রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের লক্ষ্যে কার্যকরী উদ্যোগ : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৭/২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পাষাণকন্যার পুনরুত্থান — পৌরাণিক অহল্যা ও বর্তমান সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি : রিঙ্কি সামন্ত শিল্পী সোমনাথ হোর : যোগেন চৌধুরী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৭/১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মহাবিশ্বের ব্ল্যাকহোলের সন্ধানে দুই বাঙালি পদার্থবিজ্ঞানী : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার বিস্মৃতপ্রায় শিশুসাহিত্যিক যোগীন্দ্রনাথ সরকার : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৫/৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ফ্রানস বালথাজার সলভিনস ও উত্তর কলকাতার ঘোড়ার সহিস : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৫/২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার জনসংযোগের বিপণনে দুর্গোৎসব : পান্নালাল রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৫/১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আকাশ প্রদীপ — পুরাণ, ভক্তি ও বিশ্বাস : যশোবন্ত রায় ৮১ বছরে জাতিসংঘ: সবার প্রত্যাশা পূরণে কতটা সক্ষম? : নিকোলাস বিশ্বাস বোধিসত্ত্ব সঞ্জয়-এর ছোটগল্প ‘স্যার’ কুমারটুলির সহিসমহল্লা ও দেবী দুর্গার বাহন ঘোটকমুখী সিংহ : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার বিজয়াদশমীর ভাঙ-সিদ্ধি : অসিত দাস কলকাতায় এমন দুর্গাপুজো দেখিনি তো আগে : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘ওঝা’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘নিখোঁজের দর্শক সংখ্যা’ নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘সর্বংসহা’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই কোজাগরী লক্ষ্মী পূর্ণিমার আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com, আমাদের পোর্টালের কিছু ছবি বাদে প্রায় সব ছবিই অন্তর্জাল থেকে সংগ্রহ করা হয়। কারুর যদি কপিরাইট থাকে জানাবেন। আমরা সেই ছবি পোর্টাল থেকে ডিলিট করে দেব।

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গা / ৫২ Views জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬

[সংক্ষিপ্তসার — গ্রান্ট এখানে সারফ সিক্কা (Serf Sicca) নামে পরিচিত দশম আবওয়াব আলোচনা করেছেন — যেটা সুবার সব আনুপাতিক আবওয়াবের মধ্যে নীতিগতভাবে যুক্তিসঙ্গত ও সহনীয় হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভিন্ন পরিস্থিতি ও অব্যবস্থাপনায় এই আবওয়াব দেশের জন্য অসহনীয় হয় এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের সম্পদ আত্মসাৎ ও জালিয়াতির প্রধান উৎস হয়ে ওঠে। সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমল থেকে সাম্রাজ্যের বাণিজ্যিক অঞ্চলে প্রচুর রূপো-প্রবাহ শুরু হয়। সিক্কা টাকার ওজন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ১১.৫ থেকে ১০ মাশায় নামিয়ে আনা হয়। আলমগীরের আমলে এই প্রক্রিয়া পৌঁছায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে; বেতন সিক্কা মুদ্রায় দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু বাজারে মুদ্রা প্রচলনের সঙ্গে সঙ্গে শ্রফ, সাহুকার এবং হিন্দু ব্যাংকারদের মুদ্রা জাল করা, ওজন কমানো, মান কমিয়ে দেওয়ার মত কারচুপি ব্যাপক আকার ধারণ করে। সম্রাট আলমগীরের আমল থেকেই প্রতি বছর মুদ্রা নতুন করে ঢালাই (recoinage) করার নিয়ম শুরু হয়। মুদ্রার মান এমন হারে কমানো হয় — যাতে টাঁকশালের খরচ পুষিয়ে সরকারি কোষাগারে বড় আয়ও নিশ্চিত হয়। জাফর খান, প্রশাসনিক কেন্দ্র ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে সরানোর পর জগৎ শেঠ পরিবার হল আদায় করা রাজস্বের কিস্তি নেওয়া আর দিল্লি পাঠানোর একমাত্র ব্যবস্থাপক। সিক্কা টাকার মান তিন বছরে ১১৬ থেকে ১১১ অনুপাতে কমিয়ে আনা হলে বার্ষিক তিন লক্ষাধিক টাকার লাভ হয়। জমিদার ও রাজস্ব কর্মকর্তাদের বক্তব্য ছিল — এই ব্যবস্থায় তাদের ক্ষতি হচ্ছে; এই অজুহাতে তারা কৃষকদের থেকে নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি বাট্টা আদায় করতেন। কিন্তু এই দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন — কারণ তারা সিক্কা টাকাতে রাজস্ব পরিশোধের চুক্তি যথাযথভাবে পালন করলে কেন ক্ষতির সম্মুখীন হবেন? কাসিম আলী এই জালিয়াতি ধরেন এবং ভবিষ্যতে অতিরিক্ত আদায়করা অর্থ রাষ্ট্রের কোষাগারে জমা করার ব্যবস্থা করেন। অন্য সুবাদারি খাজনার মতোই পরিমিত ও সুনির্দিষ্ট হার নির্ধারণ করা হল। এর হার জমিদারদের খেয়ালের ওপর নির্ভরশীল ছিল বলে, এই আবওয়াবের চাপে কৃষকদের প্রভূতক্ষতি হয়েছে। প্রতি টাকায় দেড় আনা হারে সারফ বা বিনিময়ের বাটা নামে অতিরিক্ত কর মূলত মুৎসুদ্দি বা হিসাবরক্ষকরা কারসাজি করে খালসা জমা হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। টোডরমলের দেওয়ানি ভূমির আসল তুমারি অনুযায়ী প্রায় ৪৮ লক্ষ টাকা ছিল, বেড়ে বর্তমানে দুই কোটি টাকারও বেশি কর-নির্ধারণে পরিণত হয়। বার্ষিক মুদ্রা পুনর্গঠন বা বাটার অজুহাতে আগে গোপনে আদায়করা ৫ শতাংশ এখন সরকারি কোষাগারে জমা করার ব্যবস্থা করা হল; যার আইনি গড় পরিমাণ হল ৪,৫৩,৪৪৮ টাকা। মীর কাসিমের নিজস্ব করের মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ১৯,২৬,০৮৭ সিক্কা টাকা। সরকারি কর্মচারী, ব্যবসায়ী আর সেবকদের বেতন পরিশোধ করা হতো নিম্নমানের ইলাহি সিক্কা টাকাতে — এতে শুদ্ধ রূপোর পরিমাণ ছিল শূন্য থেকে ১০ শতাংশ মাশা ওজনের তারতম্যসহ ১০৮ থেকে ১১৬ অনুপাতে। যদি কেবল বেশি মূল্যবান সিক্কা মুদ্রা তৈরি করা হতো এবং পর্যায়ক্রমিক হ্রাস ছাড়াই চালু রাখা হতো, তার জন্য রাষ্ট্রকে প্রতি বছর অন্তত পনেরো লক্ষ টাকার লোকসান গুনতে হতো।]

আবওয়াব।

১০ম। সারফ সিক্কা (Serf Sicca) ০.৫ আনা। সুবার সমস্ত আনুপাতিক আবওয়াবের মধ্যে এই আবওয়াবকেই হয়ত নীতিগতভাবে সম্ভবত সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত এবং প্রয়োগের ক্ষেত্রে সহনীয় বলে গণ্য করা যেত — যদি মূল রাজস্ব-নির্ধারণের প্রকৃতি ও পরিধি জনসাধারণ ঠিকভাবে জানাত এবং সরকারি কর্মকর্তারা সেই নীতি কঠোরভাবে মেনে চলতেন। কিন্তু বাস্তবে এই আবওয়াব দেশের জন্য অসহনীয় অভিযোগে পরিণত হয়েছে; আর একই ধরনের অব্যবস্থাপনার ফলেই এই আবওয়াব হিন্দুস্তান জুড়ে মধ্যস্বত্বভোগী অর্থ-মধ্যস্থতাকারীদের আত্মসাৎ আর জালিয়াতির অন্যতম প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমল থেকে সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অঞ্চলগুলোতে প্রচুর পরিমাণে রূপা আসতে থাকে। এর ফলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, বিভিন্ন সময়ে সিক্কা টাকায় বিশুদ্ধ রূপোর আদর্শ ওজন ১১৬ ভাগের মধ্যে ১১.৫ থেকে ১০ মাশায় নেমে আসে। বিশুদ্ধ রূপোর ওজনে এই পরিবর্তন সম্ভবত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগেই করা হয়েছিল। বিশেষ করে সম্রাট আলমগীরের শাসনামলে এই প্রক্রিয়া সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়া হয়। লক্ষ্য ছিল মুদ্রা বিনিময়ের অসুবিধা দূর করা এবং চালু মুদ্রার মান কমে যাওয়ার সমস্যার সমাধান। এই উদ্যোগের আওতায় সব বেসামরিক ও সামরিক কর্মচারীর বেতন সিক্কা মুদ্রায় দেওয়ার নির্দেশ জারি হয়। তখন থেকে সাম্রাজ্য জুড়ে এই মুদ্রা সাধারণত ‘ইলাহি’ (Ellahee) নাম পেল এবং এর ভিত্তি ছিল ১০ মাশা ওজন — যা বাংলা টাকার ১১৬ ভাগের মধ্যে প্রায় ১০৮ ভাগের সমান।

নির্ধারিত বিশুদ্ধতার মানদণ্ড অনুযায়ী নতুনভাবে মুঘল টাঁকশালে ছাপমারা টাকা বাজারে আসার সঙ্গে সঙ্গে — সেটা জীবনযাত্রার প্রয়োজনীয় বা বিলাসদ্রব্য কেনার কাজেই হোক, কিংবা উচ্চদামের বা নিকৃষ্ট ধাতু বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবেই ব্যবহৃত হোক — আইনসম্মত মূল্য কিছুটা কমে যেত। এর সঙ্গে যুক্ত হত শ্রফ ও সাহুকারদের মতো হিন্দু ব্যাংকারদের প্রতিকারহীন কারচুপি — মুদ্রা জাল করা, মুদ্রা কেটে ওজন কমানো, মুদ্রার মান কমানো এবং নিজেদের স্বার্থে বাজারে মুদ্রার আপেক্ষিক মূল্য বাড়ানো বা কমানো। এত বড় বিশৃঙ্খলার প্রতিকার খুঁজে বের করা সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যে পরিণত হয়। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী, সম্রাট আলমগীরের প্রশাসনকালে দীর্ঘদিন ধরে এই পরিস্থিতির গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে এর সম্ভাব্য বিস্তার রোধের উপায় বা আরও কার্যকর সমাধানে উপনীত হবার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছিল, সে কথা স্বীকার করতেই হবে। সমাধান হিসেবে প্রতি বছর মুদ্রা নতুন করে ঢালাই করার (recoinage) নিয়ম প্রবর্তন করা হয়। আর প্রচলিত মুদ্রার মান ইচ্ছাকৃতভাবে এমন এক হারে কমানো হয় — যাতে বিনিময় হার বা বাট্টাও জুড়ে ছিল — যাতে তা দিয়ে টাঁকশালের খরচই পোষানোর সঙ্গে সঙ্গে সরকারি কোষাগারে শুল্ক বা রাজস্ব হিসেবে উল্লেখযোগ্য আয়ও আসে। বাজারে চালু অধিকাংশ নগদ অর্থই এই প্রক্রিয়ায় সরকারি কোষাগারে জমা হত। অবশ্য এর আগে মুদ্রার মান যাচাই (touch) করা হতো এবং মধ্যস্থ স্রফ বা মুদ্রা-বিনিময়কারীদের মুনাফা কেটে নেওয়া হতো। এই স্রফ বা শরফরাই সম্ভবত এই পরিকল্পনা প্রণয়ন করে এবং তখন থেকেই তারা রাষ্ট্রের অপরিহার্য সহযোগী ও অংশীদার হিসেবে কাজ করছে।

আঞ্চলিক রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে — বিশেষ করে বাংলায় — জাফর খান প্রশাসনিক কেন্দ্র ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে নিয়ে যান এবং জগৎ শেঠের পরিবারকে রাজস্বের কিস্তি (মাসিক জমা) নেওয়া ও দিল্লিতে পাঠানোর একমাত্র দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে নিয়োগ করেন। কিস্তি বিভিন্ন ধরনের প্রচলিত মুদ্রায় শোধ করা হতো। এরপর বার্ষিক মুদ্রা পুনর্গঠন বা নতুন করে মুদ্রা তৈরির (recoinage) পদ্ধতি চালু হয়। এই ব্যবস্থায় ৭ পেনিওয়েট ওজনের বর্তমান মানের সিক্কা টাকার মান তিন বছরে ১১৬ থেকে ১১১ অনুপাতে ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রথম বছর মুদ্রার আইনগত মান অপরিবর্তিত রাখা হতো, যাতে প্রচলিত রূপো মুদ্রার সিংহভাগ নতুন করে টাঁকশালে জমা দিয়ে নতুন করে তৈরি [ঢালাই] করা যায় এবং সরকারের নির্দিষ্ট পরিমাণ লাভ সম্ভব হয় (প্রায় ২ শতাংশ খরচ বাদে)। এই প্রক্রিয়ায় বার্ষিক তিন লক্ষাধিক টাকা লাভ হতো। তবে এই লাভের বড় অংশ স্রফ বা মুদ্রা-পরীক্ষকদের (shroffs) ফি বা প্রক্রিয়াজাতকরণ খরচে যেত। এই খরচ নির্ধারিত প্রায় ৫ শতাংশ হ্রাসের বাকি অংশটুকু গ্রাস করত — অবশ্য মুদ্রার ওজনে মূল ঘাটতি পূরণের অনিবার্য খরচ মেটানোর জন্য প্রয়োজনীয় অংশটুকু বাদ দিয়ে।

জমিদার ও অন্য রাজস্ব কর্তাদের মাধ্যমে মফস্বলের আদায় ব্যাংকে জমা হতো। এই মধ্যস্বত্বভোগী কর্মকর্তারা দাবি চালু ব্যবস্থায় তাদের ক্ষতি হচ্ছে। এই অজুহাতে তারা সাধারণ কৃষকদের (রায়ত) থেকে চুপিসারে চালু হারের চেয়ে বেশি বাট্টা (discount) আদায় করতেন — যদিও তা সার্বভৌম শাসকের সুবিধার জন্যই নির্ধারিত ছিল। কিন্তু ক্ষতিপূরণের এই দাবি ভিত্তিহীন। কারণ রাজস্ব ইজারাদার হিসেবে তারা বছরের মধ্যে দেওয়ানি রাজস্ব সিক্কা টাকায় পরিশোধের নিজস্ব চুক্তি যথাযথভাবে পালন করতেন — যেখানে সিক্কা টাকা বলতে কেবল রাজার রাজত্বকালের নির্দিষ্ট সময়ে তৈরি ও প্রচলিত মুদ্রাকেই মানসম্মত ধরা হতো — তবে বিনিময়ের ক্ষতি বা বাড়তি খরচের (যেমন সার্ফ বা বাট্টা ফি) থাকার কথা না।

কাসিম আলী কর্তাদের জালিয়াতি ধরেন। সম্ভবত তাদের নিজস্ব আঞ্চলিক এখতিয়ারের প্রকৃত সক্ষমতা সম্পর্কে তাদের জ্ঞানের প্রমাণ হিসেবেই এটা গণ্য করা হয়েছিল। অর্থাৎ তারা জানত যে রেব্বা (রাজকোষের নির্ধারিত পাওনা) বা বার্ষিক বন্দোবস্তে তারা যে করের কথা স্বীকার করেছিল, তার চেয়ে বেশি কর বহনের ক্ষমতা তাদের এলাকার ছিল। এই অনিয়ম সংশোধনের লক্ষ্যে ভবিষ্যতে অতিরিক্ত আদায় করা অর্থ রাষ্ট্রের কোষাগারে জমা করার ব্যবস্থা হয় এবং অন্য সুবাদারি করের মতোই পরিমিত ও সুনির্দিষ্ট হার নির্ধারণ করা হয়। অথচ এর আগে এই দাবি ছিল সম্পূর্ণ খেয়ালখুশিমতো জমিদারদের ইচ্ছাধীন, যা কৃষকদের জন্য খুব চাপের ছিল।

আবওয়াবের মূল প্রকৃতি আর নীতি সম্ভবত ছিল — প্রতি টাকায় দেড় আনা হারে সারফ (serf) বা বিনিময়ের অতিরিক্ত কর। মূলত মুৎসুদ্দি বা হিসাবরক্ষকদের কারসাজিতে খালসা জমা (সরকারি খাস আয়ের হিসাব) হিসেবে অভিহিত হতো। দুর্ভাগ্যবশত, ধারাবাহিক আর্থিক সংস্কারের ফলে এর পরিমাণ পাল্টাতে থাকে। টোডরমলের দেওয়ানি ভূমির আসল তুমারি (মূল রাজস্ব হিসাব) অনুযায়ী ছিল ৪৮ লক্ষ টাকা, যা বেড়ে বর্তমান সময়ে দুই কোটি টাকারও বেশি হয়েছে। শাসক প্রশাসনের অবহেলার সুযোগে রাজস্ব আদায়কারীদের সুযোগ থাকত — তাদের মূল বা বর্ধিত যেকোনো অঙ্কের ওপরই প্রতি শতকে নয় টাকার বেশি হারে অতিরিক্ত অর্থ আদায়। অথচ গাণিতিক হিসাবে, নির্ধারিত ১২ আনা হারে মোট অনুমোদিত গড় উৎপাদনের অনুপাতে বিচার করলে — বা আরও যথাযথভাবে বললে, শুরুতেই যদি তৎকালীন খালসা দেওয়ানি অংশের (১৭২২ সালে জাফর খাঁর সংশোধিত সুবার প্রকৃত কার্যকর আসল জমা বা মূল রাজস্বের প্রায় ৯০ লক্ষ টাকা) ওপর এটি প্রয়োগ করা হতো — তবে মূল ভিত্তি স্পষ্ট হতো। আমরা দেখি, বার্ষিক মুদ্রা পুনর্গঠন বা বাটার অজুহাতে দেশের প্রচলিত রাজস্বের অর্থ গোপনে আদায় করা ৫ শতাংশ, এখন সরকারি কোষাগারে জমার ব্যবস্থা করে চালু কর-নির্ধারণের আওতায় আনা হলো; আইনি সীমায় গড় পরিমাণ দাঁড়াল ৪,৫৩,৪৪৮ টাকা।

এভাবে মীর কাসিমের নিজস্ব করের মোট পরিমাণ দাঁড়াল কেবল ১৯,২৬,০৮৭ সিক্কা টাকা।

বাজারে মুদ্রা চালু রাখা রাজকীয় ক্ষমতার অন্যতম সর্বোচ্চ বিশেষাধিকার এবং বাণিজ্যিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাজকীয় প্রশাসনের সম্ভবত সবচেয়ে স্পর্শকাতর ক্ষেত্র। এ প্রসঙ্গে আরও কিছু বিষয় লক্ষ্য করা যাক। সরকারের বেসামরিক ও সামরিক কাঠামোর কর্মকর্তা-কর্মচারী, ব্যবসায়ী ও সেবকদের বেতন, পারিতোষিক বা অন্য পাওনা শোধ করতে গিয়ে সাধারণত সুবার সব রাজস্বই ব্যয় হয়ে যেতো — দেওয়া হতো অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের টাকা, ইলাহি সিক্কায় (Ellahee Siccas)। বিশুদ্ধ রূপোর পরিমাণের তারতম্য শূন্য থেকে ১০ শতাংশ মাশা ওজনে এবং বাংলা ছাড়া হিন্দুস্তানহুড়ে ১০৮ থেকে ১১৬ অনুপাতে চালু বৈধ মুদ্রা হিসেবে গণ্য হতো — অযোধ্যা, এলাহাবাদ, হায়দ্রাবাদ ও আরকটের টাঁকশালগুলোতে মুদ্রিত হতো। সুতরাং, যদি বেশি করে দামি সিক্কা মুদ্রা তৈরি করে, নিয়মিত ব্যবহারের ফলে ওজনে দৃশ্যত ঘাটতি দেখা না দেওয়া পর্যন্ত মূল্যমান না কমিয়ে চালু রাখা হতো, তাহলে রাষ্ট্রের প্রতি বছর অন্তত পনেরো লক্ষ টাকার লোকসান হতো। এই পদক্ষেপ কেবল তখনই যৌক্তিক হতো যদি সেই কারণ বিদ্যমান থাকত, যা সম্ভবত ইলাহি মানদণ্ড প্রবর্তনে প্রভাব ফেলেছিল — অর্থাৎ প্রচুর পরিমাণে দামি ধাতুর মুদ্রার (specie) আগমনই চলতি মুদ্রার ভাণ্ডারের মূল্য হ্রাসের কারন।

টিকা ১

গ্রান্টের এই বিশ্লেষণ বাংলার মুদ্রা ও রাজস্ব ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর উন্মোচন করে — আমেরিকার সোনা-রূপো আসার ফলে মুদ্রার মান কমছিল — যা বাট্টা ও রিকয়নেজ ব্যবস্থার মাধ্যমে সামলানো হচ্ছিল। কিন্তু এই ব্যবস্থার সুফল স্থানীয় শ্রফ ও ব্যাংকাররাই ভোগ করত; কৃষক ও কারিগররা ক্ষতিগ্রস্ত হতো। এই আবওয়াব নীতিগতভাবে সহনীয় হলেও — মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজিতে তা কৃষকদের জন্য অসহনীয় হয়ে ওঠে। জমিদাররা দাবি করতেন — তাদের ক্ষতি হচ্ছে; অজুহাতে কৃষকদের কাছ থেকে গোপনে বেশি বাট্টা আদায় করতেন। কাসিম আলী জালিয়াতি ধরে ফেলে ভবিষ্যতে অতিরিক্ত আদায়কৃত অর্থ রাষ্ট্রের কোষাগারে জমা করার ব্যবস্থা করেন — যা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার। কিন্তু গ্রান্ট এই সাফল্যের কৃতিত্ব কাসিম আলীকে দিতে চাননি। জাফর খান জগৎ শেঠ পরিবারকে রাজস্বের কিস্তি গ্রহণ ও স্থানান্তরের একমাত্র ব্যবস্থাপক নিযুক্ত করেন — যা মুদ্রা ব্যবস্থায় তাদের একচেটিয়া প্রভাব প্রতিষ্ঠা করে। ১৭৬৫ সালে দেওয়ানি লাভের সময় দেশীয় প্রশাসন এই প্রকৃত হিসাব গোপন করে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে রাজস্বের পরিমাণ কমিয়ে দেখায়। সারফ সিক্কার প্রকৃত পরিমাণ — ৪,৫৩,৪৪৮ টাকা — সেই আত্মসাতের প্রমাণ।

টিকা ২

মুঘল ও নবাবি মুদ্রা কাঠামো ও টাঁকশাল ব্যবস্থা

মুঘল আমলে তিন ধাতুর মুদ্রা প্রচলিত ছিল — সোনা (মোহর), রূপো (টাকা) এবং তামা (দাম)। শের শাহ প্রথম রূপোর মুদ্রা চালু করেন; সম্রাট আকবরের আমলে পরিমার্জিত ও প্রসারিত হয়। মুঘল আমলে টাকার ওজন ছিল প্রায় ১৭৮ গ্রেন। ৪০ দামে এক টাকা। দাম ছিল তামার মুদ্রা — ওজন প্রায় ৩২৩.৫ গ্রেন। এছাড়া কড়ি ছিল গ্রামীণ বাংলার প্রধান বিনিময় মাধ্যম — ৪ কড়ি = ১ গণ্ডা, ২০ গণ্ডা = ১ পণ, ৪ পণ = ১ আনা, ৪ আনা = ১ কাহন, ৪ কাহন = ১ টাকা (২৮,৮৮০ কড়ি)।

মুঘল টাকা ছিল প্রায় বিশুদ্ধ রূপোয় তৈরি। বিদেশি পর্যটকরা মুঘল মুদ্রার বিশুদ্ধতার প্রশংসা করেছেন। কিন্তু মুদ্রা হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে তৈরি হত বলে জাল মুদ্রা তৈরি সহজ ছিল। সাম্রাজ্যের অবক্ষয়ের সাথে সাথে বাজারে জাল মুদ্রার বন্যা দেখা দেয়।

মুঘল আমলে মুদ্রার ওজন ও খাঁটিত্ব সময়ের সাথে কমতে থাকে। সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে সোনা-রূপোর অনুপাত ছিল ১২-১; শাহজাহানের আমলে ১৪-১; আওরঙ্গজেবের আমলে ১৬-১। মুদ্রার মান কমার ফলে বাট্টা বা ছাড়ের ব্যবস্থা চালু হয়। সিক্কা টাকার ওপর বাট্টা ছিল ১ থেকে ২ শতাংশ। পুরনো মুদ্রার (চালানি) ওপর বাট্টা ছিল ১ থেকে ৩ শতাংশ।

মুঘল আমলে টাঁকশাল (মিন্ট) রাষ্ট্র পরিচালনা করত। সম্রাট আকবরের আমলে ৭৬ টাঁকশাল ছিল। সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে ৭০ টাঁকশাল রূপোর মুদ্রা তৈরি করত। প্রধান টাঁকশাল ছিল — আগ্রা, দিল্লি, লাহোর ও আহমেদাবাদ। বাংলায় প্রধান টাঁকশাল ছিল মুর্শিদাবাদ ও ঢাকা — বছরে কমপক্ষে পাঁচ লক্ষ টাকা আয় হতো।

মুঘল আমলে বার্ষিক মুদ্রা পুনর্নির্মাণ (recoinage) প্রথা চালু ছিল। পুরনো মুদ্রা টাঁকশালে জমা দিয়ে নতুন মুদ্রা তৈরি করা হতো। এই ব্যবস্থায় রাষ্ট্র লাভবান হতো — কারণ মুদ্রার মান কমানো হতো এবং সেইনিওরেজ বা মুদ্রা তৈরির কর আদায় করা হতো।

বাংলার জগৎ শেঠ পরিবার ছিল মুদ্রা ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় ব্যাংকার। তারা রাজস্বের কিস্তি গ্রহণ, মুদ্রা বিনিময়, হুন্ডি কাটা — সব কাজ করত। জাফর খান তাদের রাজস্বের কিস্তি গ্রহণ ও স্থানান্তরের একমাত্র ব্যবস্থাপক নিযুক্ত করেন — যা তাদের একচেটিয়া প্রভাব প্রতিষ্ঠা করে। ইংরেজরা বাংলার টাঁকশাল থেকে মুদ্রা তৈরির অধিকার পাওয়ার চেষ্টা করলে জগৎ শেঠরা বাধা দেন — যা তাদের প্রভাবের প্রমাণ।

নবাবি আমলে মুদ্রা ব্যবস্থায় দুটি সমস্যা দেখা দেয় — টাঁকশালের রাজস্ব কমে যাওয়া এবং রূপোর অভাবে সিক্কা টাকা তৈরির অসুবিধা। সুজা-উদ-দৌলা এই সমস্যা সমাধানের জন্য বাইরের মুদ্রার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন এবং বিনিময় হার বাড়ান। আলিবর্দি খানের আমলে মুদ্রা ব্যবস্থার আরও অবনতি ঘটে — যার ফলে বাট্টা ও সারফ সিক্কা ব্যবস্থা আরও জটিল হয়ে ওঠে।

গ্রান্ট এই অংশে সারফ সিক্কা, মুদ্রা ব্যবস্থার অবক্ষয়, জগৎ শেঠ পরিবারের ভূমিকা এবং ব্রিটিশ উপনিবেশিক বর্ণনার সীমাবদ্ধতা বিশ্লেষণ করছেন। তিনি দেখান — সারফ সিক্কা নীতিগতভাবে সহনীয় হলেও — মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজিতে তা কৃষকদের জন্য অসহনীয় হয়ে ওঠে। কাসিম আলী এই জালিয়াতি ধরে ফেলে সংস্কার করলেও — গ্রান্ট সেই সাফল্যের কৃতিত্ব দিতে চাননি। তাঁর মন্তব্য — আবওয়াবের পরিমাণ বা অনিয়ম নয়; বরং জমিদারদের অতিরিক্ত আদায়, মুদ্রা ব্যবস্থার জটিলতা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজি — এই তিনটিই ছিল জনগণের অসন্তোষ ও রাজকীয় আয়ের ঘাটতির মূল কারণ। কিন্তু এই বর্ণনা আসলে উপনিবেশিক স্বার্থরক্ষার একটি হাতিয়ার — যা ঐতিহাসিক তথ্য ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে খণ্ডন করা জরুরি।

চলবে

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

পেজফোরনিউজ-এর নববর্ষ বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Currently Maintained by the2.dev