| | |
এই মুহূর্তে ::
শিল্পী সোমনাথ হোর : যোগেন চৌধুরী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৭/১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মহাবিশ্বের ব্ল্যাকহোলের সন্ধানে দুই বাঙালি পদার্থবিজ্ঞানী : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার বিস্মৃতপ্রায় শিশুসাহিত্যিক যোগীন্দ্রনাথ সরকার : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৫/৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ফ্রানস বালথাজার সলভিনস ও উত্তর কলকাতার ঘোড়ার সহিস : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৫/২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার জনসংযোগের বিপণনে দুর্গোৎসব : পান্নালাল রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৫/১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আকাশ প্রদীপ — পুরাণ, ভক্তি ও বিশ্বাস : যশোবন্ত রায় ৮১ বছরে জাতিসংঘ: সবার প্রত্যাশা পূরণে কতটা সক্ষম? : নিকোলাস বিশ্বাস বোধিসত্ত্ব সঞ্জয়-এর ছোটগল্প ‘স্যার’ কুমারটুলির সহিসমহল্লা ও দেবী দুর্গার বাহন ঘোটকমুখী সিংহ : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার বিজয়াদশমীর ভাঙ-সিদ্ধি : অসিত দাস কলকাতায় এমন দুর্গাপুজো দেখিনি তো আগে : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘ওঝা’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘নিখোঁজের দর্শক সংখ্যা’ নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘সর্বংসহা’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯১/২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাজারাজড়া ও বণিকের দুর্গাপূজায় নিম্নবর্গ ছিল রবাহূত : অসিত দাস প্রজনন অধিকার নিশ্চিত হলেই সুস্থ্য বাংলাদেশ গড়া সম্ভব : নিকোলাস বিশ্বাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯১/১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই কোজাগরী লক্ষ্মী পূর্ণিমার আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com, আমাদের পোর্টালের কিছু ছবি বাদে প্রায় সব ছবিই অন্তর্জাল থেকে সংগ্রহ করা হয়। কারুর যদি কপিরাইট থাকে জানাবেন। আমরা সেই ছবি পোর্টাল থেকে ডিলিট করে দেব।

শিল্পী সোমনাথ হোর : যোগেন চৌধুরী

Reporter
যোগেন চৌধুরী / ১০৭ Views জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬

‘মনে হয় সোমনাথ হোরই একমাত্র শিল্পী যিনি শিল্পসৃষ্টির ক্ষেত্রে সঠিক ধারনা, পরীক্ষা নিরীক্ষা ও সততার মধ্য দিয়ে বাইরের হৈ-হল্লা বা বাণিজ্যিক প্রলোভনে না মেতে এ সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে শিল্পচর্চা করে যাচ্ছেন। তার মতো আত্মমগ্ন শিল্পী এদেশে খুব কমই আছেন।’

প্যারিস থেকে ফিরেই ১৯৬৯ সালে শিল্পসম্পর্কিত একটি লেখা লিখে যা কখনই প্রকাশিত হয়নি। তাতে আমি উপরের এই মন্তব্যটি করেছিলাম শিল্পী সোমনাথ হোর সম্পর্কে লিখতে গিয়ে। এই সঙ্গে আরো কিছু কথা লিখেছিলাম। তার শেষ দু-টি লাইন ছিল :

‘তাঁর সমসাময়িক কাজকর্ম দেখবার সৌভাগ্য আমার হয়নি। তাই এ মতামত সবটাই চার পাঁচ বছর আগে পর্যন্ত তাঁর যে সামান্য কাজকর্ম দেখেছি তার ওপর নির্ভর করে গড়ে তুলেছি।’

আমি নিজে খুব অবাক এবং গর্বিত এইকারনে যে আজ থেকে বছর বাইশেক আগেই শিল্পী সোমনাথ হোর সম্পর্কে এতখানি সঠিক ধারনা করতে পেরেছিলাম।

শিল্পী পরিতোষ সেন সীগাল পাবলিশিং আয়োজিত সোমনাথ হোরের বিশাল পূর্বাপর প্রদর্শনীটি দেখে উচ্ছসিত হয়ে যে কথাগুলি একটি দৈনিক পত্রিকাতে লিখেছেন তা এখানে উদ্ধৃত করবার লোভ সমলাতে পারছিনা। তিনি বলেছেন, — এটা খুব সহজসাধ্য ব্যাপার নয়। বহুকালের তপস্যার ফলেই এ সম্ভব হয়। এবং ওঁর ক্ষেত্রে আমি ‘তপস্যা’ শব্দটার ওপর বেশি জোর দিচ্ছি এই মনে করে যে, উনি চুপচাপ শান্তিনিকেতনের আশ্রয়ে নিজের মনে দিন রাত কাজ নিয়ে মগ্ন থাকেন।’

‘….আজকের শিল্পকলার বাজারে এত বেশি ব্যবসায়িক বৃত্তি নজরে পড়ে যে, সোমনাথ বাবুর মতো একজন একনিষ্ঠ এবং একাগ্র চিত্তের মানুষ ক্রমশঃই দুর্লভ হয়ে উঠছে।’

এই উদ্ধৃতিটি প্রমান করে যে আমার ধারনা কতটা সঠিক ছিল সেই বাইশ বছর আগেই। তখন পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় কিংবা সাক্ষাৎ হয়নি। হবার কোনো কারণও ছিল না। একবার মাত্র তাঁকে দেখেছিলাম, কলকাতার সরকারী চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ের তে-তালা থেকে সিড়ি ভেঙ্গে তিনি নিচে নেমে আসছেন। একটু মাথা নীচু করে হাঁটার ভঙ্গি। লম্বাপানা চেহারা। যথারীতি কাঁধে ব্যাগ। তখন ১৯৫৭-৫৮ কি ৫৯ হবে। এর বেশী তাঁকে তখনও আমি চিনি না। তবে তাঁর ছবি, উডকাট ইত্যাদির সঙ্গে পরিচয় হয়েছে বলা যায় আমার স্কুল জীবন থেকেই। ‘স্বাধীনতা’ কিংবা ‘পরিচয়’ পত্রিকায় তার ছবির প্রিন্ট দেখেছি। পরে আর্টিস্ট্রি হাউসে একটি প্রদর্শনীতে তার কিছু অরিজিনাল ছবির প্রিন্ট দেখে মুগ্ধ হই। যতদূর মনে পড়ে সেগুলি ছিল তেভাগা আন্দোলনের কৃষকদের নিয়ে কাঠখোদাই-এর কাজ। অতঃপর প্রায় তিরিশ বছর পর আমার সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে ১৯৮৬ তে লেডিজ স্টাডি গ্রুপ আয়োজিত চারজন বাঙালী শিল্পীর প্রদর্শনী উপলক্ষ্যে বিড়লা একাডেমীতে। ইতিমধ্যে তাঁর সম্পর্কে তার ছবির নানা পর্যায়ক্রম সম্পর্কে আমি যথেষ্ট ওয়াকিবহাল তার তেলরঙা ছবি, এচিং, যা ললিতকলা আকাদেমীতে প্রদর্শিত এবং পুরস্কৃত হয়েছিল, তা দেখে আমি শিল্পী হিসেবে তার প্রতি অত্যন্ত অনুরক্ত হয়ে পড়ি।

অবশেষে ১৯৮৭-র মার্চে আমি দিল্লী থেকে শান্তিনিকেতন কলাভবনে শিক্ষকতা করতে আসি। সেই থেকে অগ্রজ শিল্পী ‘সোমনাথ দা’ অর্থাৎ সোমনাথ হোরের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ট যোগাযোগের সূত্রপাত। শান্তিনিকেতনের একটি বৈশিষ্ট্য এই যে এখানে অনেক নামী গুনী মানুষজন এখানকার পথে ঘাটে সহজভাবে চলাফেরা করেন পায়ে হেটে, সাইকেলে কিংবা রিক্সায়। শিল্পী সোমনাথ হোরও প্রায় রোজই সকাল ন-টা দশটা নাগাদ সাইকেল করে বাড়ী থেকে বেড়িয়ে আসেন দোকান বাজার করতে কিংবা পোষ্টাফিস থেকে চিঠি সংগ্রহ করতে। মাঝে মাধ্যে আসেন কলাভবনে। এসে চাতালে বসেন কিংবা বসেন ‘চীনা বটতলা’ তে শিক্ষকদের সঙ্গে। সামান্য কথাবার্তা বলেন। মনির দোকানের চা খেয়ে চলে যান। কোনো কোনো দিন বেশ খানিকটা গল্প করেন। যেদিন যেমন হাতে সময় থাকে তাঁর। কোনো দিন আসেন ‘মানি’ অর্থাৎ অধ্যাপক কে.জি. সুব্রহমনিয়ন-এর সঙ্গে দেখা করতে কোনো ব্যক্তিগত প্রয়োজনে। তবে বাজে সময় নষ্ট করতে তাঁকে দেখিনি খুব একটা। মাঝে মধ্যে কলাভবন ছাড়াও তাঁর সঙ্গে দেখা হয়ে যায়, পোস্টাফিসের সমানে, রাস্তায় কি ‘নন্দনে’র সামনে। দাড়িয়ে দাড়িয়ে কথা হয় কোনো জরুরী বিষয়ে।

শান্তিনিকেতনের উত্তরায়নের ঠিক উত্তর-পশ্চিম দিকে লাল বাঁধের মস্ত জলাধার। তার উত্তরপাড় দিয়ে টানা মাটির রাস্তা পশ্চিমে গিয়ে লাল বাঁধের গ্রামের সাথে মিশেছে। এই গ্রামেই মাটির বাড়ী সবুজ গাছপালার মাঝে পাঁচ সাত কাঠা জমির ওপর ছোট্ট একটি বাড়ী। শুধু দোতলায় একটি গেষ্টরুম ছাড়া সবটাই একতলা। সেখানেই শিল্পী সোমনাথ হোর, তার সহধর্মিনী রেবা হোর এবং কন্যা চন্দনা এই তিনজনের ছোট্ট নিবিড় সংসার। শ্রীমতী রেবা হোর শিল্পী হিসেবে স্বনামধন্যা। সবার কাছে তিনি ‘রেবাদি’ বলে পরিচিত। মেয়ে চন্দনাও কলাভবন থেকে চিত্রকলায় স্নাতক হয়ে শিল্প চর্চায় ব্যস্ত। ফলে লালবাঁধের এই ছোট্ট বাড়ীটি এই তিন শিল্পীর শিল্পচর্চার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।

বাড়ীটির দক্ষিন-পশ্চিম দিক ঘিরে একটি গ্রীল দেওয়া মনোরম বারান্দা। তার পূর্বদিকে একটু বসার জায়গা। কয়েকটি ছোটখাট আরম্বরহীন চেয়ার ও মোড়া পাতা রয়েছে সেখানে। পশ্চিম অংশে পার্টিশানের ওপাশে শিল্পী রেবা হোরের কাজের জায়গা। সেখানে তিনি মাটি দিয়ে নানা ছোট ছোট মূর্তি গড়েন। তারই একপাশে কাজ করেন সোমনাথ হোর। নতুন ব্রোঞ্জের কাজের প্রাথমিক প্রস্তুতি হিসেবে মৌ-মোমের কাজ আবার শুরু করেছেন ক’দিন হল। বেশ ক’দিন লেখালেখি নিয়ে খুব ব্যস্ত ছিলেন। ব্রোঞ্জের কাজ তাতে বন্ধ ছিল। দু-ধরনের কাজ একসঙ্গে করতে পারেন না। যখন যেটাতে মন লাগান সেটা তাকে এমন নিবিড়ভাবে পেয়ে বসে যে সে সময় আর কিছু করা সম্ভব হয় না তার পক্ষে।

বারান্দায় একটি এচিং প্রিন্টের প্রেস পড়ে আছে। ওপরে তাকে ইতস্ততঃ ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য পুরোনো জিঙ্ক প্লেট, কাঠ খোদাইয়ের কাজে ব্যবহৃত কাঠ ইত্যাদি। এ সবই এখন ইতিহাসের অংশ। মনে পরে যায় একসময় তিনি কত ছাপাই ছবির কাজ করেছেন। একদিন বলেছিলেন, বয়সের কারনে এবং অসুস্থতার জন্য তাকে ছাপাই ছবির থেকে অনেক আগেই সরে আসতে হয়েছে। একসময় প্রিন্ট মেশিনের রোলার খুব সহজেই ঘোরাতে পারতেন, আজকাল তা ভাবাই যায় না — অবশ্য প্রয়োজনও পরে না খুব একটা। তবে শরীরের ওপর তার প্রভাব বেশ ভালরকমেরই পড়েছে।

ছোট্ট বাড়ীর মাঝখানের ঘরটি বেশ বড়। তাতে কাঠের পাটাতন দিয়ে একটি দোতলা গোছের তৈরী করে নিয়েছেন। ঘরের মধ্যেই কাঠের সিড়ি পাতা ওপরে উঠবার জন্য। সেখানে শ্রীমতী রেবা হোর ছবি আঁকতেন। তার অনেক পুরোনো ছবিও জড়ো করা আছে সেখানে। বারান্দা হয়ে ঘরে ঢুকতেই ডান দিকে চন্দনার জন্য ছোট্ট একটি ঘর। তাতে তার নিজস্ব টুকিটাকি জিনিষপত্র, বই, এসব সযত্নে রাখা। বাড়ীর পূবদিকে একটি নতুন ঘরের সংযোজন হয়েছে। এখন ওটিই হয়েছে বসবার ঘর। তবে ঘরে আসবাব পত্র বলতে প্রায় কিছুই নেই। এ বিষয়ে সোমনাথ হোর বলেছিলেন, তিনি এবং স্ত্রী রেবা হোর কারুরই সোফা, টিভি, ফ্রিজ এমনকি সোনার গয়না এসব কোনও কিছু সম্পর্কেই কোনরকম মোহ নেই। তাই ঘরের পরিবেশ অত্যন্ত সাদাসিধে। ছোট ছোট দু-টি বেতের চেয়ার। একটি নীচু খাট, তাতে চাদর পাতা। আর একদিকে দু-টি বাস্ক জোড়া দিয়ে খাটের মত করা হয়েছে। চাদর পেতে তাতেও বসার বেশ ব্যবস্থা হয়েছে। সে বাস্ক দুটি ভর্তি শ্রীমতী রেবা হোরের অসংখ্য রেখাচিত্র। রোজ দুপুরে এ ঘরে বসেই উনি ড্রইং করেন, কাগজকালির ছবি আঁকেন।এই ঘরের মেঝের ওপরই একপাশে একটি টেবিলের নীচে দশ পনেরোটি ব্রোঞ্জের কাজ রাখা আছে। আর ওপরে একটি তাকে থাকে থাকে রাখা আছে শ্রীমতী হোরের প্রায় কুড়ি পঁচিশটি পোড়ামাটির কাজ। দেওয়ালে চন্দনার আঁকা কয়েকটি ছবি।

বাড়ীটির চারদিক ঘিরে নানা জাতীয় গাছের ভীড়, সবুজ ছায়াঘন পরিবেশ। একটি আঙুরলতা ঠিক দোড়গোড়ায়। বছরে এক আধবার থোকা সুদৃশ্য নয়ন মনোহর আঙুর ফলে তাতে। সেগুলি শুধু দেখার জন্যই, খাবার জন্য নয়। গাছের ডালে ডালে সারাদিন পাখীর কিচির মিচির। চড়াই, টুনটুনি, মৌটুসি এমন সব পাখীরা একগাছ থেকে আর এক গাছে উড়ে বেড়ায়। এরা যেন এখন পরিবারের অঙ্গ হয়েগেছে। পাখীরা বাসা বানিয়ে ডিম পাড়ে, বাচ্চা হয়। তখন শ্রীমতী হোরের দুশ্চিন্তার অন্ত থাকে না। কখন কাক বা অন্য পাখীরা এসে খেয়ে যাবে সেই ভয়ে। বাড়ীর সামনেই উঠোনে মাটিতে সাজানো রয়েছে সীগাল পাবলিসিং যে বিশাল প্রদর্শনী করেছিলেন সেখান থেকে ফিরে আসা বড় ব্রোঞ্জের কয়েকটি মূর্তি। ওগুলি রাখবার মত জায়গা ঘরের মধ্যে কোথাও নেই — তাই, উঠোনে রাখা ছাড়া গতি নেই।

দুই

সেদিন সোমনাথ হোরের বাড়ীতে সবে গিয়ে বসেছি। ইতিমধ্যে দেখা করতে এলেন শম্ভু মিত্র। বিশ্বভারতীর সমাবর্তনে দেশিকোত্তম সম্মান নিতে এসেছিলেন। সেই সুবাদে অনুজ শিল্পীবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে আসা। এখন চোখে দেখতে অসুবিধা হয়। আটাত্তর বছর বয়স হল। সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী, সনৎ বোস। একটু পরেই এলন কৌশিকদা, শিল্পী দিনকর কৌশিক। এক সময় কলাভনের অধ্যক্ষ ছিলেন। যিনি ভবনের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছিলেন সে সময়। নানা বিষয় নিয়ে কথা হচ্ছিল। একসময় সবাই শান্তিনিকেতনের পাখী ও সাপ নিয়ে খুব গল্পে মেতে গেলেন। শ্রীমতী হোর বার দু-য়েক চা করে বন্ধুদের আপ্যায়ন করলেন আন্তরিক ভাবে। গত কয়েকবছর আগেও শারীরিক অসুস্থতার কারনে তিনি প্রায় শয্যাগত হয়েছিলেন। সে অসুস্থতা শরীরে ছাপ ফেলেছে। কিন্তু মনের দিক থেকে তিনি অত্যন্ত সজাগ। সমস্ত বিষয়েই তিনি তার স্পষ্ট মতামত জানাতে দ্বিধা করেন না। সোমনাথ হোর নিজেও অত্যন্ত স্পষ্টবাদী। সমাজ, জীবন, রাজনীতি এবং শিল্পকলা সবকিছু সম্পর্কেই তার ধরনা ও মতামত অত্যন্ত স্বচ্ছ। সে সব মতামতগুলি তিনি গভীর বিশ্বাস ও আদর্শের ওপর ভিত্তি করে অত্যন্ত যত্ন ও সতর্কতার সঙ্গে প্রকাশ করেন।

রাজনৈতিক বিশ্বাস ও আদর্শ হিসেবে খুব তরুন বয়স থেকেই তিনি মার্কসবাদকে গ্রহন করেছিলেন। সে বিশ্বাস তার এখনও অটুট আছে। বিশেষ করে মার্কসবাদ যেখানে নিপীড়িত ও শোষিত মানুষের কথা বলেছে, যেখানে শোষিত জীবনের মুক্তির কথা বলেছে। যদিও আজকের মার্কসবাদী পার্টিগুলি কিংবা পার্টি কর্মীদের আন্তরিকতা ও কাজকর্ম সম্পর্কে তিনি যথেষ্ট সন্দিহান। তিনি বিশ্বাস করেন, একদিন না একদিন শোষনমুক্ত সমাজ গড়ে উঠবেই। হয়তো তার জন্য প্রতীক্ষা দীর্ঘতর হবে মাত্র। কারণ, তার কথাতেই বলি, ‘শোষন থাকলে অবসানের প্রশ্ন আসবেই।’ হয়তো সে পরিবর্তন ঘটবে শান্তিপূর্ণ ভাবেই।

একটি কথা আমাদের কাছে স্পষ্ট তা হলো শিল্পী সোমনাথ হোরের জীবনে রাজনীতির একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। তা সত্বেও আমার মনে হয়েছে তার জীবনের মূল কাঠামোটি অর্থাৎ জীবন বোধ ও আদর্শ কিন্তু তার নিজস্ব একটি ব্যক্তি চরিত্রকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে, যেখানে তিনি সততা ও নির্লোভকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। তাছাড়া মানুষের প্রতি সহমর্মিতা ও দরদের পরিচয় আমরা তার কাছ থেকে বারে বারে পেয়েছি। তেভাগার ডাইরীতে দেখতে পাই নিপীড়িত গরীব কৃষকদের প্রতি তাঁর প্রগাঢ় সহানুভূতি এবং একাত্মতা। শিল্পকলার ক্ষেত্রেও তার প্রতিফলন ঘটেছে সহজেই। তাঁর ব্রোঞ্জের কাজ গুলিতে যে মানুষের রূপ প্রতিফলিত হয়েছে তাতে দেখতে পাই তার মনের গভীরতর মমতা ও দরদ। এগুলির গড়ন এবং আকারগত টানাপোড়েন যেমন কাজগুলিতে শিল্পসম্মত মাধুর্য এনে দিয়েছে তেমনি তাঁর মানবিক ভাবাদর্শ একটি অর্থপূর্ণ মাত্রা যোগ করতে পেরেছে সেগুলিতে। এর পাশাপাশি শিল্পীর বৈশিষ্ট্যময় ব্যক্তি চরিত্র এবং বিশেষ অভিজ্ঞতা তাঁর সৃষ্টিকাজ গুলিতে এনে দিয়েছে নিজস্ব রূপ ও ভাষা। তাঁর মূর্তি গুলোতে যেন এদেশের মানুষের হৃদস্পন্দন শোনা যায়। এইসব কারনে তার ব্রোঞ্জের ছোট ছোট কাজগুলি হয়ে উঠেছে অনন্য এবং শিল্পকর্ম হিসেবে অসাধারন।

তিন

মানুষ সোমনাথ হোর একদিকে যেমন দৃড়চেতা অন্যদিকে তেমনি স্পর্শকাতর এবং অনুভূতিশীল। শিল্পীদের চরিত্র এমনই হয়ে থাকে। নিজের সম্পর্কেও তিনি অত্যন্ত সচেতন এবং কঠোর আত্ম সমালোচক। নিজের ভুলত্রুটিকে তিনি স্বীকার করতে দ্বিধা করেন না। তাঁর সঙ্গে মেলামেশার সুযোগে এটা বুঝতে পেরছি যে তিনি এমন একটা জীবন যাপন পছন্দ করেন না যা অকারণ প্রাচুর্যে পূর্ণ। তা তার কাছে অযাচিত। তিনি জানান, আজীবন সামন্য পাওয়াতেই অভ্যস্ত তাই সেখানে ‘অসামান্য’ কিছু অর্থাৎ ফ্রিজ, সোফা, টিভি ইত্যাদি জীবনে যেন অনর্থক বোঝার মতো হয়ে ওঠে। সেজন্য এ সব কিছু থেকে দূরে থাকতেই তাঁর স্বস্তি। একই সঙ্গে আমার মনে হয়েছে সাধারণ গরীব মানুষের কষ্টকর জীবন যাপনের অনুভবই তাঁকে তাদের মত নিরাবরণ কিংবা নিরাভরণ জীবন যাপনে উৎসুক করেছে। দীন দুঃখী মানুষের কষ্টবোধ তার মধ্যবিত্ত মনকে যে সর্বদা পীড়ন করে সে কথা আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ‘তেভাগার ডাইরীর’ কৈফিয়তে তিনি যখন বলেন, ‘দীন দয়াল শকরুদ্দিন, তোমাদের দুঃখ আমরা বুঝি, কিন্তু প্রতিদিনের সেই দুঃখ ভোগ করি না। এই দুইয়ে ফারাক খুব বেশি।’

নিজের শিল্পকর্ম সম্পর্কে তিনি অত্যন্ত বিনীত হয়ে থাকেন, বলেন ‘এর যদি কিছু মূল্য থাকে তবে আপনারাই তার বিচার করবেন।’ এমন দুর্লভ বিনম্রতা মনে মনে লজ্জা এনে দেয়। শুধু তাই নয়, নিজের ক্ষমতা সম্পর্কেও কোনো ভুল বোধ তাঁর মনে কখনই নেই। অকাতরে বলেন, ‘আমি আনি আমার ক্ষমতা ডিঙিয়ে যাবার জিন (gene) আমাতে নেই।’

কয়েকটা বিষয়ে তার অনুৎসাহ প্রায় সর্বজন বিদিত। প্রচারকে তিনি যথাসম্ভব এড়িয়ে চলেন। এ বিষয়ে একাধিক ঘটনার কথা আমি জানি। তেমনি চান না নানা প্রদর্শনীতে অংশ নিতে। চান না তার শিল্পকর্ম বিক্রী করতে। নানা পুরস্কার ফেরত দিয়েছেন অত্যন্ত সহজভাবে। বম্বেতে টাইমস অফ ইন্ডিয়ার ১৫০তম বার্ষিকীতে যে প্রদর্শনী হয় তাতে যোগ দিতে তিনি অস্বীকার করেন। উদ্যোক্তদারে প্রতিনিধি সুন্দরী শিখা ত্রিবেদীকে খালি হাতে ফিরে যেতে হয় তার শান্তিনিকেতনের বাড়ী থেকে। শিল্পকর্ম বিক্রী সম্পর্কে অত্যন্ত স্পষ্ট ধারনা পোষন করতেন তিনি। তিনি মনে করেন আর্থিক প্রয়োজন তার সীমিত তাই শুধু নিজের কাজকর্ম চালিয়ে যাবার মত খরচপত্র জোগার হলেই হল। তাছাড়া নিজের কাজ নানা জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে এটা তিনি চান না। ভারত সরকারের ‘পদ্মশ্রী’ তিনি সহজেই প্রত্যাখ্যান করেছেন। এ বিষয়ে তার মনোভাব অত্যন্ত স্পষ্ট। সরকারী সম্মান ইত্যাদির প্রতি তার কোনও মোহ নেই যেমন অনেকের থাকে। তাঁর মনের দৃঢ় বিশ্বাস ও প্রত্যয়ই এখানে প্রকাশ পেয়েছে যা আজকাল দুর্লভ হয়ে উঠেছে বলা যায়।

সোমনাথ হোর অত্যন্ত মিতভাষী। তার চিন্তার স্বচ্ছতা এবং কথার স্বভাবগত প্রখরতা ও অর্থপূর্ণতা আমাদের কাছে আকর্ষণীয় লাগে। তিনি যখন কথা বলেন, যে বিষয় নিয়ে বলেন, যে ভাবে বলেন এবং যে সব বিষয় নিয়ে তার ঔৎসুক্য তাতে কখনও মনেই হয় না তিনি যথেষ্ট বৃদ্ধ হয়েছেন। বরং তাঁর চলা বলা ঢিলে ঢালা। পেষাকে-আষাকে নতুনত্ব ও নম্রতার নীচে চাপা রয়েছে একটি তারুন্য যুক্ত মন। তার সৃষ্টিশীলতার পরিচয় ফুটে ওঠে কাঁধের ব্যাগটিতেও। যা তিনি নিজের হাতে জোড়াতালি দিয়ে সেলাই করেন পছন্দমত ভাবে। নানা কারুকাজ থাকে তাতে গড়নে এবং ডিজাইনে। এমনকি গরমের দিনে যে তালপাতার টোকাটি তিনি মাথায় দিয়ে শান্তিনিকেতনের পথে পথে চলাফেরা করেন তার ওপর নিজের হাতে কালি দিয়ে চিত্র-বিচিত্র করেন দর্শনীয় ভাবে।

আমি তাঁকে সত্তর অতিক্রান্ত বয়সে দেখেছি। সেই বয়সেও তিনি নিরলস ভাবে শিল্পসৃষ্টির মধ্যে আত্মমগ্ন। জীবনে শিল্পচর্চার নানা পর্যায় সফলভাবে অতিক্রান্ত করেছেন। এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে সে সব কথা বলা সম্ভব হল না। তার অনুজ শিল্পী হিসেবে শান্তিনিকেতনে তার মত একজন বড় শিল্পী ও মানুষের সান্নিধ্য আমার অত্যন্ত আনন্দের ও গর্বের বস্তু।

সোমনাথদাকে নিয়ে যোগেনদাকে লিখতে বলেছিলাম। দু-তিনবার কথা বলার পর বললেন, জ্যোতি ভীষণ ব্যস্ত সোমনাথদাকে নিয়ে এই মুহূর্তে নতুন করে কিছু লিখতে পারবো না। তবে বহুদিন আগে একজন বলেছিল লিখতে লিখেছিলাম। কিন্তু সেটা কোথাও ছাপা হয়েছে বলে মনে পরে না। তুমি কি সেই লেখাটা নেবে? একটু নিজের মতো করে এডিট করে নিও, তুমি তো সম্পাদক। অগতির গতি আমি বললাম অবশ্যই নেব — পাঠান। যোগেনদা লেখা পাঠালেন আর আমার আবদার মতো একটা ছবি পাঠালেন কভার করার জন্য। এই হলো এই লেখার পেছনের ইতিহাস।

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

পেজফোরনিউজ-এর নববর্ষ বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Currently Maintained by the2.dev