
“আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জীর।
ধরণীর বহিরাকাশে অন্তর্হিত মেঘমালা।
প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতার আগমনবার্তা।”
আজ মহালয়া। মহালয়া মানেই রেডিও আর রেডিও মানেই ভোরে উঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্ত কণ্ঠের কাছে পৌঁছে যাওয়া। বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্ত কন্ঠে আগমনী বার্তার মাধ্যমেই বাঙালির শারদ উৎসবের সূচনা হয়। তাঁর উদাত্ত কণ্ঠে চিন্ময়ীকে মৃন্ময়ীতে আবাহন না শুনলে আমাদের পুজো শুরু হয় না এখনও। এইভাবে বাঙালির মনে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের নাম।
মহালয়ার শুভক্ষণে মাতৃবন্দনার শুরুর মধ্য দিয়েই বাঙালির উৎসবের ঢাকে কাঠি পড়ে। বিশ্বে বেজে উঠে আলোর বেণু। মহালয়ার ভোরে সেই সুর শুনে বাঙালি মেতে উঠে দুর্গাপুজোর আনন্দে। মেতে উঠে ভুবন। মহালয়া মানেই মা আসছেন প্রতিটি বাঙালির ঘরে এরকম একটা অনুভূতি। তাই পূজোর প্রস্তুতি তুঙ্গে উঠে মহালয়ার দিন থেকে। শিউলির গন্ধ মাখা ভোরের শিশির সে কথা আগেই জানান দিয়েছিল আগমনী বার্তার। কাশবনে দোলা লাগিয়ে এবার মর্ত্যে আবির্ভূতা হবেন চিন্ময়ী দেবী। স্বর্গলোক থেকে মর্ত্যলোকে ভক্তদের দর্শন দিতে আসেন দশভূজা দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গা। মহালয়ার পূর্বাহ্নে দেবীর ঘট প্রতিস্থাপন ও পূজোর মধ্যদিয়ে শুরু হবে দেবী আগমনের মুহূর্ত গণনা।
শারদোৎসবের সূচনায় পিতৃপক্ষের শেষ ও দেবীপক্ষের সূচনার সন্ধিক্ষণকে বলা হয় মহালয়া। মহালয়ার দিন দেবী বন্দনার সুর আপামর বাঙালির হৃদয়ে ধ্বনিত হয়। দূর থেকে কানে ভেসে আসে ঢাকের আওয়াজ। মনে জাগে তীব্র আনন্দ। কারণ মা আসছেন। আশ্বিনের শারদপ্রাতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের অনির্বচনীয় কণ্ঠস্বর রেডিওতে বেজে উঠলেই বাঙালির জীবনে সূচিত হয় মহালয়া। বাঙালির কাছে এই মহালয়া এক অন্য তাৎপর্য নিয়ে হাজির হয়। মহালয়া অর্থাৎ মহান যে আলয়, এই কথাটির ব্যাখ্যা নানা ভাবে করেছেন প্রাজ্ঞজনেরা। যেহেতু মহালয়া থেকেই দেবী দুর্গার আবাহন মুহূর্তটি চিহ্নিত হয়ে যায়, তাই অনেকের মতে দেবী স্বয়ং হলেন এই আলয় বা আশ্রয়। ভিন্নমতে, এই মহান আলয় হল পিতৃলোক। যেহেতু এটি পিতৃপক্ষের অবসান চিহ্নিত করে। ঠিক এর পরদিন থেকে দেবীপক্ষের সূচনা। পিতৃপক্ষের এক পক্ষকাল পিতৃপুরুষরা মনুষ্যলোকের কাছাকাছি চলে আসেন। পুরাণমতে, ব্রহ্মার নির্দেশেই গড়ে ওঠে এই মহামিলনক্ষেত্রটি। এই সময় তাই পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণ করে মানুষ। এই তর্পণ কথার অর্থ হল, যাতে অন্যের তৃপ্তি হয় সেই উদ্দেশ্যে জলদান। তর্পণ তাই শুধু পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যেই নয়, সর্বভূতের উদ্দেশেই করতে হয়। তর্পণের মন্ত্রের ভিতরই নিহিত রয়েছে সেই নির্দেশ —
আব্রহ্মস্তম্বপর্যন্তং দেবর্ষিপিতৃমানবাঃ।
তৃপ্যন্ত পিতরঃ সর্বে মাতৃমাতামহোদয়ঃ।।
আব্রহ্মস্তম্বপর্যন্তং জগৎ তৃপ্যতু। অর্থাৎ, দেবগণ, ঋষিগণ, পিতৃগণ, নরগণ — ব্রহ্মা হইতে তৃণশিখা পর্যন্ত সমস্ত জগৎ আমা কর্তৃক প্রদত্ত অন্নজলে তৃপ্তিলাভ করুন। এই হল তর্পণের গূঢ় কথা। শাস্ত্র বলে, সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম- অর্থাৎ, সমস্ত জগৎ ব্রহ্মময়। তাই জলদান করতে হয় সর্বভূতের উদ্দেশ্যেই।
শাস্ত্রে কথিত আছে, মহালয়ার দিনেই মহিষাসুর বধের দায়িত্ব গ্রহণ করেন দেবী দুর্গা। মহিষাসুরের কবল থেকে দেবগণকে উদ্ধার করার লগ্ন যেহেতু এখান থেকেই সূচিত হচ্ছে, তাই পরমা প্রকৃতি বিশ্বজননীর আশ্রয়ই হল মহান আলয়, অনেকেই এমত মত পোষণ করেন। আবার শ্রীশ্রী চণ্ডীপাঠের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার আবাহনও মহালয়া হিসেবে পরিচিত। মহালয়া শব্দের আক্ষরিক সমার্থ হলো ‘আনন্দ নিকেতন’। আলয় যেদিন মহময় অর্থাৎ আনন্দময় হয়ে ওঠে, সেই দিনই হলো মহালয়া। মহালয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। আশ্বিনের অমাবস্যার এই মহালয়া নামটির উৎসের মধ্যেই এর ধর্মীয় সংস্কারগত তাৎপর্য খুঁজে পাওয়া যায়। মহালয়া নিয়ে নানা ব্যাখ্যা, নানা মত রয়েছে। মহালয়া শুভ না অশুভ এ নিয়েও অনেক দ্বন্দ্ব বা তর্ক রয়েছে। তবে সে যাহোক মহালয়ার ভিতর যে মহামিলনের ইঙ্গিত তা বৃহত্তর সম্প্রীতি আর মেলবন্ধনের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। তর্পণের মধ্য দিয়েও সর্বভূতের সঙ্গে মানবের একাত্মতার তত্ত্বটিই প্রকাশিত। এই তাৎপর্যয়ই মহালয়াকে গরিমা দান করেছে।
বাঙালির কাছে অবশ্য পিতৃপক্ষের এই শেষ দিনটি আলাদা তাৎপর্য বহন করে। দেবীপক্ষের সূচনা চিহ্নিত হওয়া মানেই বাঙালির সেরা উৎসব দুর্গাপুজো এসে পড়া। সেই সুরটি বাঁধা হয়ে যায় রেডিওতে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ অনুষ্ঠানটির সম্প্রচারে। আপামর বাঙালির কাছে তা মহালয়া নামেই পরিচিত। পিতৃপক্ষের অবসানের ভোরে সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানটি বাঙালি জীবনের অঙ্গ হয়ে ওঠে কালক্রমে। বর্তমানে আমরা ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র যে রূপটি শুনতে পাই, তা ১৯৬৬ সালে রেকর্ড করা। যেখানে বাণীকুমারের গ্রন্থনায় চণ্ডীপাঠ করেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। বাঙালির কাছে এই অনুষ্ঠানটি ছাড়া মহালয়া যেন সম্পূর্ণতা পায় না। আজকের ডিজিটাল যুগে, ফেসবুক, হোয়াটস্অ্যাপের যুগে, টুইটার-ব্লগ-ইন্সটাগ্রাম-এর অভ্যস্ত জীবনেও বাঙালি তার সব কাজের ব্যস্ততাতেও এক অপেক্ষায় থাকে -’মহালয়া কবে? কারণ মহালয়া মানেই শারদীয় দুর্গোৎসবের সূচনা। আর এই শারদীয়া উৎসবের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে মহালয়ার ভোরে রেডিওতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্ত কন্ঠে দেবীর আবাহন — ‘আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জীর। ধরণীর বহিরাকাশে অন্তর্হিত মেঘমালা, প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতার আগমনবার্তা, আনন্দময়ী মহামায়ার পদধ্বনি অসীম ছন্দে বেজে উঠে রূপলোক ও রসলোকে আনে নব ভাবমাধুরীর সঞ্জীবন; তাই আনন্দিতা শ্যামলী মাতৃকার চিন্ময়ীকে মৃন্ময়ীতে আবাহন।’ মহালয়ার ভোরে সম্প্রচারিত ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ আজও বাঙালির হৃদয় জুড়ে রয়েছে। যে কারণে, আজও মহালয়ার দিন ভোরে বাঙালির ঘুম ভাঙে, আজও তারা শোনে….
“জাগো দুর্গা
জাগো দশপ্রহরণধারিণী
অভয়াশক্তি বলপ্রদায়িনী তুমি জাগো।”
অনেকেই এ বিষয়ে হয়ত দ্বিমত পোষণ করবেন। তারা হয়ত বলবেন যেখানে টিভির পর্দায় ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র দৃশ্যায়ন দেখা যায় সেখানে রেডিওতে সম্প্রচারিত ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র আবেদন কতটুকু। তাদের কথা অবশ্যই সত্য কিন্তু আংশিক ভাবে। কারণ প্রবীনদের কাছে রেডিওতে সম্প্রচারিত মহালয়ার আকর্ষণ আজও ক্ষুন্ন হয় নি। আজও তারা মহালয়ার আগের দিন পুরোনো রেডিও খুঁজে বের করে তাতে নতুন ব্যাটারী লাগিয়ে পরদিন ভোরের অপেক্ষায় থাকেন কখন বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্ত কণ্ঠে রেডিওতে ভেসে আসবে ‘আশ্বিনের শারদ প্রাতে…’। আজকের প্রজন্মের কাছে রেডিওতে হোক কিংবা টেলিভিশনে প্রচারিত মহালয়ার প্রতি কোনো আগ্ৰহ নেই। এটাও অনেকটা অর্ধসত্য। শুধুমাত্র প্রৌঢ়রাই নয়, এখনও এই প্রজন্মের একাংশের কাছে মহালয়া শোনার ক্ষেত্রে ইন্টারনেটের তুলনায় রেডিও প্রথম পছন্দ। তারা সাধারণত এখন রেডিও শুনে না তবে মাঝে মধ্যে এফএম শোনে। তাদের মধ্যে অনেকেই আছে যারা মহালয়া রেডিওতে শুনতে পছন্দ করে। তারা মনে করে ভোর বেলা রেডিওতে মহালয়া শোনার মধ্যে অদ্ভুত এক আনন্দ আছে যেটা ইউটিউবে পাওয়া যায় না। এতে জড়িয়ে রয়েছে এক অদ্ভুত নস্টালজিয়া। মহালয়া যে কী পরিমাণ নস্টালজিক ব্যাপার সেটা বোধ হয় বাঙালি ছাড়া আর কেউ বুঝবে না। এই নস্টালজিয়া বেঁচে থাক অনন্তকাল।