
“এক মচ্ছর আদমি কো হিজড়া বনা দিতা হ্যায়!” কিম্বা ‘বেহতর হ্যায় তু আপনা ইরাদা বদল দে, নেহি তো ম্যায় তেরা নক্সা বদল দুঙ্গা…’ — এমনই সব তীক্ষ্ণ ও কালজয়ী সংলাপের জাদুতে যিনি দশকের পর দশক ধরে কাঁপিয়েছেন রূপালি পর্দা, তিনি আর কেউ নন, ভারতীয় চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা নানা পাটেকার। তাঁর অনবদ্য ডায়লগ ডেলিভারি এবং পর্দায় ক্ষিপ্র ও তীব্র ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি তাঁকে বলিউডের ইতিহাসে এক অনন্য আসনে বসিয়েছে। ‘পরিন্দা’ ছবির সেই ভয়ংকর সাইকোটিক গ্যাংস্টার আন্না শেঠ কিংবা ‘ক্রান্তিবীর’-এর অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা প্রতাপ,কিংবা ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’ ছবির সেই নির্বাক বাবা জোসেফ ব্রাগানজা — প্রতিটি চরিত্রেই তিনি সাধারণ অভিনেতার গণ্ডি পেরিয়ে হয়ে উঠেছেন জীবন্ত কিংবদন্তি।
মহাকালের নিয়মে কিংবদন্তিদেরও শারীরিক প্রস্থান ঘটে।আজ ৮ অক্টোবর ২০২৬, বৃহস্পতিবার ভোরে গোয়ার বাসভবনে আকস্মিক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৭৫ বছর বয়সে থমকে গেলো রুপালি পর্দার সেই চিরপরিচিত বজ্রকণ্ঠ, স্তব্ধ হলো এক অদম্য অভিনয় সত্তা। সকলকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন ভারতীয় সিনেমার অন্যতম শক্তিমান ও দাপুটে অভিনেতা নানা পাটেকর।
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ছিলেন নানা পাটেকর। তাঁর জীবন যেমন ছিল বৈচিত্র্যময়, তেমনই ছিল চরম সংগ্রাম ও লড়াইয়ের গল্পে ভরপুর।তাঁর জীবনের ফেলে আসা কিছু অবিস্মরণীয় অধ্যায়ের ওপর সংক্ষেপে চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক:
১ জানুয়ারি ১৯৫১ সালে মহারাষ্ট্রের মুরুদ-জাঞ্জিরায় একটি সাধারণ পরিবারে তাঁর জন্ম। নাম ছিল বিশ্বনাথ পাটেকর। শৈশবে তাঁর পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো থাকলেও এক আত্মীয়ের সাথে ব্যবসায়িক ধাক্কায় তাঁরা মারাত্মক আর্থিক সংকটে পড়েন। একসময় মাত্র ৩৫ টাকার বিনিময়েও তাঁকে কাজ করতে হয়েছিল। নিজের পড়াশোনার খরচ চালাতে রাস্তায় ও দেওয়ালে সিনেমার বিলবোর্ড এবং পোস্টার পেইন্টার হিসেবেও তিনি কাজ করেছিলেন।জীবনের শুরুতে এমনও দিন গেছে যখন ঠিকমতো খাবার জোটাতে পারতেন না, তখন তিনি বন্ধুদের বাড়িতে গিয়ে খাবার বা ‘ভাকরি’ (রুতি জাতীয় খাবার) চেয়ে খেতেন।
পরবর্তীতে তিনি মুম্বাইয়ের বিখ্যাত Sir J. J. Institute of Applied Art থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন এবং অভিনয়ে আসার আগে বিজ্ঞাপন জগতে একজন পেশাদার ভিজ্যুয়াল আর্টিস্ট হিসেবে যুক্ত ছিলেন।তাঁর যখন ২৮ বছর বয়স, তখন তাঁর বাবা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এত বড় শোকের মধ্যেও তিনি অভিনয় জগৎ ছাড়েননি এবং বাবার মৃত্যুর পরপরই তিনি একটি নাটকে অভিনয় করেছিলেন।
১৯৭৮ সালে ‘গমন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তাঁর বলিউড যাত্রা শুরু হয়। প্রথাগত চকোলেট বয় বা সুদর্শন নায়কের ধারণাকে ভেঙে সম্পূর্ণ নিজস্ব ঘরানার বাস্তবসম্মত অভিনয় দিয়ে তিনি দর্শকদের চমকে দেন।
১৯৮৮ সালে মীরা নায়ারের অ্যাকাডেমি পুরস্কারের জন্য মনোনীত ছবি ‘সালাম বম্বে’ এবং ১৯৮৯ সালে বিধু বিনোদ চোপরার ক্রাইম ড্রামা ‘পারিন্দা’-তে তাঁর অভিনয় সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করে।শুধু গম্ভীর বা অ্যাকশন চরিত্রই নয়, ‘ওয়েলকাম’ সিনেমার ডন ‘উদয় শেঠি’র মতো কমেডি চরিত্রেও তাঁর কমিক টাইমিং দর্শকদের মুখে চিরস্থায়ী হাসি ফুটিয়েছে।
১৯৯৭ সালের কালজয়ী অপরাধধর্মী চলচ্চিত্র ‘গোলামে মোস্তফা’-তে ‘মোস্তফা’র চরিত্রে নানা পাটেকারের মুখে শান্ত অথচ মারাত্মক হুমকির ডায়ালগ থরথর করে কাঁপিয়ে দিয়েছিল খলনায়কদের, একই সাথে মন্ত্রমুগ্ধ করেছিল সিনেমা হলের দর্শকদের। পর্দায় সাধারণ অপরাধীদের মতো চিৎকার না করে, সম্পূর্ণ আন্তরিকতা ও এক অদ্ভুত শান্ত ভঙ্গিতে যেভাবে তিনি হিংস্র সংলাপগুলো ছুঁড়ে দিতেন, তা দর্শকদের মনে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ভয়ের সৃষ্টি করত।
একদিকে আন্ডারওয়ার্ল্ডের একনিষ্ঠ ও মারাত্মক অপরাধী, অন্যদিকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া, বড়দের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং এক নর্তকীর ভালোবাসায় আমূল বদলে যেতে চাওয়া এক আবেগপ্রবণ মানুষ — মোস্তফা চরিত্রটির এই জটিল মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বকে নানা পাটেকার তাঁর অসাধারণ সংলাপ প্রক্ষেপণ ও তীব্র অভিনয়ের মাধ্যমে জীবন্ত করে তুলেছিলেন। ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে ‘গোলামে মোস্তফা’ শুধু একটি অ্যাকশন ছবিই নয়, বরং নানা পাটেকারের অভিনয় জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক মাইলফলক হিসেবে অমর হয়ে রয়েছে।
তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একমাত্র অভিনেতা, যিনি সেরা অভিনেতা, সেরা পার্শ্ব অভিনেতা এবং সেরা খলনায়ক — তিনটি ভিন্ন ক্যাটাগরিতেই জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জেতার অনন্য রেকর্ড গড়েন!
অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি দেশসেবার সাথেও যুক্ত ছিলেন। ১৯৮৮ সালে তিনি ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’ সিনেমার প্রস্তুতির জন্য ৩ মাসের সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়ে টেরিটোরিয়াল আর্মিতে ক্যাপ্টেন হিসেবে যোগ দেন।১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধের সময় তিনি মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টে মেজর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ২০১৩ সালে তিনি লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদ থেকে অবসর নেন।
পর্দার রুক্ষ এবং রাগী মানুষটির আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক বিশাল দয়ালু মন। মহারাষ্ট্রের খরা কবলিত অবহেলিত কৃষকদের পরিবারদের সাহায্য করতে তিনি এবং অভিনেতা মকরন্দ অনাসপুরে মিলে ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘নাম ফাউন্ডেশন’ (Naam Foundation)। নিজের উপার্জনের একটি বড় অংশ তিনি নিঃস্বার্থভাবে দরিদ্র কৃষক ও আর্তমানবতার পেছনে ব্যয় করতেন।
বলিউডের গ্ল্যামার ও বিলাসবহুল জীবন থেকে দূরে থাকতে ভালোবাসতেন নানা। মুম্বাইয়ের আন্ধেরিতে একটি সাধারণ ১-বিএইচকে (1BHK) ফ্ল্যাটে তিনি বসবাস করতেন। নিজের উপার্জনের একটি বড় অংশ তিনি নীরবে মানুষের কল্যাণে দান করে দিতেন।
রুপালি পর্দার চাকচিক্য থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, অত্যন্ত সাধারণ এবং একই সাথে নানা উত্থান-পতন ও পারিবারিক ট্র্যাজেডিতে ভরা ছিলো তার জীবন।১৯৭৮ সালে নীলকান্তি পাটেকরের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন নানা। নীলকান্তি পেশায় একজন ব্যাংকার এবং থিয়েটার শিল্পী ছিলেন। নানা পাটেকরের ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের স্ট্রাগলিং দিনগুলোতে নীলকান্তি আর্থিক ও মানসিকভাবে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে তাঁদের মধ্যে পারস্পরিক দূরত্ব তৈরি হয় এবং তাঁরা আলাদা হয়ে যান (separated)। আইনিভাবে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ না হলেও তাঁরা দীর্ঘদিন যাবত একে অপরের থেকে আলাদাই বসবাস করতেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে অভিনেত্রী মনিষা কৈরালা এবং আয়েশা জুলকার সাথে তাঁর সম্পর্কের গুঞ্জন বিনোদন মাধ্যমে চর্চিত হয়েছিল।
নানা ও নীলকান্তি দম্পতির ঘরে দুটি পুত্রসন্তানের জন্ম হয় — দুর্বাসা এবং মালহার। দুর্বাসা জন্মের পর থেকেই নানাবিধ শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন এবং তাঁর একটি চোখের দৃষ্টিশক্তিও দুর্বল ছিল। মাত্র আড়াই বছর বয়সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুর্বাসা মারা যান। প্রথম সন্তানের এই অকাল মৃত্যু নানা পাটেকরকে মানসিকভাবে গভীরভাবে বিপর্যস্ত করেছিল। পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে তিনি প্রকাশ করেছিলেন যে, সন্তানের অসুস্থতার সময়েও তিনি কতটা আত্মকেন্দ্রিক ছিলেন এবং এই অপরাধবোধ তাঁকে সারাজীবন তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। তাঁদের দ্বিতীয় পুত্র মালহার পাটেকর লাইমলাইট থেকে দূরে থাকতেই পছন্দ করেন। তবে বাবার মৃত্যুর সময় সমস্ত আনুষ্ঠানিকতার দেখভাল তিনিই করছেন।
বলিউডের শীর্ষ তারকাদের মতো বিলাসবহুল জীবনযাপনের পরিবর্তে নানা পাটেকর মুম্বাইয়ের বাইরে পুনে ও লোনাভলার কাছে একটি ১৪ একরের খামারবাড়িতে সাধারণ মানুষের মতো জীবন কাটাতেন।
একদা জনপ্রিয় টেলিভিশন শো ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’-তে অমিতাভ বচ্চন তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, এত বিপুল নাম ও অর্থ থাকা সত্ত্বেও কেন তিনি মুম্বাইয়ের বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে গ্রামের শান্ত পরিবেশে চাষবাস করে দিন কাটান? নানাজি তাঁর স্বভাবসুলভ নম্রতায় উত্তর দিয়েছিলেন যে, মুম্বাইয়ের এই জাঁকজমক ও মেকি গ্ল্যামার তাঁর কাছে অর্থহীন। নিজের খামারে মাটির সাথে যুক্ত থাকাই তাঁকে আসল শান্তি দেয়। আজ ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুও তাঁর এই বিরল সরলতা ও অনগ্রসর মানুষের প্রতি গভীর প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
অভিনয় ও সমাজসেবার পাশাপাশি নানা পাটেকরের রাইফেল শুটিংয়ের প্রতি গভীর অনুরাগ ছিল। তিনি জাতীয় স্তরের শুটিং প্রতিযোগিতা ‘জি ভি মাভলঙ্কার রাইফেল শুটিং চ্যাম্পিয়নশিপ’ -এ অংশ নিয়েছিলেন এবং সেখানে পুরস্কারও অর্জন করেছিলেন। এছাড়া স্কেচিং বা ছবি আঁকায় তাঁর দক্ষতা থাকায় একসময় তিনি মুম্বাই পুলিশের জন্য অপরাধীদের স্কেচ তৈরির কাজও করেছিলেন।
তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই শোকের ছায়া নেমে আসে গোটা দেশে। ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু, উপ-রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীসহ চলচ্চিত্র জগতের অজস্র গুণীজন তাঁর প্রয়াণে গভীর শোকপ্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁকে সমাজের কুসংস্কার ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করা এক সত্যিকরের ‘ক্রান্তিবীর’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। মহারাষ্ট্র সরকারের পক্ষ থেকে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় (State Funeral) শেষ বিদায় জানানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে এবং তাঁর নিজ শহর পুনেতে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে।
পরিশেষে বলা যায়, নানা পাটেকরের প্রস্থান কেবল একজন শক্তিমান অভিনেতার বিদায় নয়, বরং ভারতীয় চলচ্চিত্র ও সমাজসেবার জগতের একটি অধ্যায়ের অবসান। পর্দার ‘আন্না শেঠ’ কিংবা ‘ক্রান্তিবীর’ চরিত্রের অনমনীয় তেজস্বিতা যেমন তাঁকে রুপালি পর্দায় অমর করে রাখবে, তেমনই ‘নাম ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমে হাজারো অসহায় কৃষকের মুখে ফোটানো হাসি তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে মানুষের বাস্তব জীবনে।
গ্ল্যামারের চাকচিক্য বর্জন করে মাটির কাছাকাছি থাকা এই বিরল ব্যক্তিত্ব তাঁর সততা, নির্ভীকতা এবং মানবতাবোধের যে নজির রেখে গেছেন, তা নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য চিরকাল অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। রুপালি পর্দার সেই সুপরিচিত দাপুটে কণ্ঠ হয়তো আর নতুন কোনো সংলাপে গর্জে উঠবে না, তবে কোটি কোটি ভক্তের স্মৃতি আর ভালোবাসায় নানা পাটেকর অমর হয়ে থাকবেন চিরকাল। তাঁর এই মহাপ্রয়াণে পেজ ফোরের তরফ থেকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।