
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে গত নয় বছরের বেশী সময় ধরে বাংলাদেশের ক্যাম্পগুলোতে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের মানবিক ও ত্রাণ ব্যবস্থাপনা গুরুত্ব পেয়েছে এবং পাচ্ছে। বাংলাদেশ ক্রমহ্রাসমান ত্রাণ সহায়তার চাপ মোকাবেলা করে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক দাতাদের সহায়তায় এই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহলে রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প জীবনের অবসান ও স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে নেয়া উদ্যোগে অগ্রগতি নেই। সময় এসেছে রোহিঙ্গাদের এই সংকট সমাধানে বাস্তবায়নযোগ্য সমাধানের জন্য কাজ করা। এই সংকট সমাধানে মিয়ানমার সরকারের রোহিঙ্গাদের গ্রহণযোগ্যতা ও রাখাইনে তাদের সহবস্থান নিশ্চিত করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ হলেও এই বিষয়গুলোতে বিভিন্ন কারনে কোন অগ্রগতি হয়নি। ফলশ্রুতিতে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ এই বোঝা টেনে চলছে।
রোহিঙ্গাদের জন্য অর্থায়ন কমে যাওয়া এবং বিশ্বের মনোযোগ অন্যদিকে সরে যাওয়ায় বাংলাদেশকে অব্যাহত সমর্থন এবং সংকটের সমাধান খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের ঘাটতিই এর মূল কারণ। রোহিঙ্গাদের জন্য সহায়তা অত্যন্ত প্রয়োজন হলেও বর্তমানে মানবিক সহায়তার পরিমানও কমে আসছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, জাতিসংঘ এবং এ অঞ্চলের ভেতরে ও বাইরের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে এ সংকটের সমাধান নিশ্চিত করতে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরে যেতে আগ্রহী এবং তারা ‘নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে’ ফিরে যেতে চায়। ৯ বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে মানবিক দায়িত্ব পালন করে আসছে। মিয়ানমারের রাখাইনে চলমান সহিংসতার কারণে এখনো মানুষ সেখান থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১ তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারিক রহমান দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকটের অবসানে রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় ও নিরাপদে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের জন্য একটি রোডম্যাপ এবং বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর জন্য আরও মানবিক সহায়তার প্রস্তাব দেন। জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ‘রোহিঙ্গা সংকট: দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির অবসানে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিসহ টেকসই সমাধানের আহ্বান’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে তিনি ‘সহমর্মিতা থেকে মূল কারণ ও এর সমাধান খোঁজার দিকে, প্রতিশ্রুতি থেকে পদক্ষেপের দিকে এবং বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা থেকে তা অবসানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পক্ষে তাঁর মত জানান। বাংলাদেশ ও গাম্বিয়া যৌথভাবে এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের আয়োজন করে। গাম্বিয়া ২০১৯ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধন চালানোর অভিযোগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মামলা করেছিল এবং এখন ওই মামলা রায় ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ‘গণহত্যা কূটনীতি ও রোহিঙ্গা: বিচার, স্বীকৃতি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার রাজনীতি’ শীর্ষক গবেষণা-নীতি সংলাপে রোহিঙ্গা গণহত্যার স্বীকৃতি আদায়ে ক্যাম্পের ভেতরেই একটি ‘রোহিঙ্গা গণহত্যা সেল’ গঠন এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা রোহিঙ্গা প্রবাসীদের যুক্ত করে গণহত্যার স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও প্রমাণ সংরক্ষণের পরামর্শ বিষয়ক একটি প্রস্তাব আসে। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত গণহত্যার ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠীই স্বীকৃতির লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এবং রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রেও সেই দায়িত্ব তাদের নিজেদের নিতে হবে। এই সেলের সাথে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা রোহিঙ্গা প্রবাসীদের যুক্ত করতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও নথি সংগ্রহ করে একটি আর্কাইভ তৈরি করতে হবে। সংগৃহীত এসব তথ্য উপাত্ত বিভিন্ন আইনি সহায়তা ও প্রমান হিসেবে ভবিষ্যতে কাজে লাগবে এবং রোহিঙ্গা প্রতিনিধিরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের দাবীগুলো তুলে ধরতে পারবে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে পাঁচটি জরুরি পদক্ষেপের প্রস্তাব দেন। প্রধানমন্ত্রীর পাঁচটি প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ প্রণয়ন; রোহিঙ্গাসহ বেসামরিক জনগণের ওপর সহিংসতা বন্ধ এবং তাদের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; রোহিঙ্গা ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা; বিচার ও জবাবদিহির ব্যবস্থা জোরদার করা এবং মাদকনির্ভর অর্থনীতি, মানব পাচার, ডিজিটাল প্রতারণা, অবৈধ অস্ত্র ও অন্যান্য আন্তসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সব অংশীজনকে আলোচনার টেবিলে এনে এই সংকট সমাধানে কাজ করতে হবে।
বাংলাদেশ, মিয়ানমার, সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশ এবং মিয়ানমারের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে কিংবা প্রয়োজনীয় সম্পদ সরবরাহ করতে পারে, এমন দেশগুলোকে ও এই আলোচনায় রাখতে হবে। সংকট সমাধানে একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া দরকার যেখানে মিয়ানমার সরকারকে তাদের আইনগত দায়িত্বের কথা জানাতে হবে, যাতে তারা তাদের জনগণকে ফিরিয়ে নেয় এবং একই সাথে মিয়ানমারের ভেতরে রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে সহায়তা করে। রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গারা এখনো নির্বিচার আটক, চলাচলে বিধিনিষেধ, জোরপূর্বক শ্রম, নিরাপত্তাহীনতাসহ নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং ‘আরাকান আর্মি’—উভয়ের বিরুদ্ধেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ থাকায় সেখানে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি হয়নি। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন দেশগুলোকে এই সংকট সমাধানে আরও বেশি দায়িত্ব নিতে হবে।
দীর্ঘস্থায়ী এই সংকটের কারণে বাংলাদেশের ওপর সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত চাপ ক্রমেই বাড়ছে এবং রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি কক্সবাজারের স্থানীয় আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর ওপরও এর তীব্র প্রভাব পড়ছে। দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ও হতাশা মানব পাচার, অবৈধ অভিবাসী পাচার, মাদক পাচারসহ বিভিন্ন ধরনের আন্তর্দেশীয় অপরাধ সহ নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ ও নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করছে। চলমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এই সংকট পুরো অঞ্চলের জন্যই নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন যে, মানবিক সহায়তার উদারতা রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না এবং বাংলাদেশ একা অনির্দিষ্টকালের জন্য রোহিঙ্গাদের দায়ভার বহন করে যাবে এমনটাও প্রত্যাশা করা উচিত না। বাংলাদেশে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতে প্রতিবছর হাজার হাজার শিশুর জন্ম হচ্ছে এবং নতুন আরেকটি প্রজন্ম এই সংকটে নতুন মাত্রা যোগ করছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চার দিনের নিউইয়র্ক সফরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ সংক্রান্ত বিভিন্ন কর্মসূচির পাশাপাশি ১১টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকসহ মোট ৩০টি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে যোগ দেন। এসব বৈঠক ও কর্মসূচিতে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট, স্বাস্থ্য, জলবায়ু ও আন্তর্জাতিক শান্তিসহ বিভিন্ন বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ মহাসচিব, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার হাইকমিশনার, এবং মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূতে জুলি বিশপের সঙ্গে বৈঠক করেন। এসব আলোচনায় আঞ্চলিক সহযোগিতা, বাণিজ্য, যোগাযোগ, পর্যটন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও রোহিঙ্গা সংকটসহ পারস্পরিক স্বার্থের বিষয় উঠে আসে। বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রোহিঙ্গা ও অন্যান্য বিষয়গুলো তুলে ধরতে তৎপর রয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্কের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের অগ্রাধিকারের জায়গা থেকে বিশ্বসমাজের সামনে নিয়ে এসেছে। রোহিঙ্গা সংকটকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব হিসেবে তুলে ধরার পাশাপাশি এই সংকটের একটি কার্যকর সমাধানের আহ্বান ছিল তাঁর ভাষণের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পাঁচ দফা কৌশল বাস্তবায়নে কাজ করছে। বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা থেকে এই বাস্তুচ্যুতির অবসানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে। রোহিঙ্গা তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে তাদের পুনঃ একীভূত হওয়ার জন্য প্রস্তুত করতে হবে। বাংলাদেশ চায় রোহিঙ্গারা নিজেদের অধিকার নিয়ে নিরাপদে ও সম্মানের সঙ্গে নিজ ঘরে ফিরে যাক এবং এই লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও তাদের যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে হবে। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি ট্র্যাক-১, ট্র্যাক-২ ও ১.৫ ট্র্যাক কূটনীতির মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের পরিচয় ও নাগরিক অধিকার আদায়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন তৈরিতে কাজ চালিয়ে যেতে হবে। রোহিঙ্গা সংকটকে শুধুমাত্র মানবিক সংকট হিসেবে বিবেচনায় না নিয়ে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার থেকে বিতাড়নের রাজনৈতিক ইস্যুটি বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে বারবার তুলে ধরতে হবে। এই সংকট সমাধানে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তার পাশাপাশি তাদের রাজনৈতিক অধিকার ও মর্যাদার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান মোঃ শামসুদ্দীন, এন ডি সি, এ এফডব্লিউ সি, পি এস সি, এম ফিল (অবঃ)মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা বিষয়ক গবেষক