
মুনাফা সর্বাধিক করার জন্য বিশ্বপুঁজি বিশ্বায়নের প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে গত তিন দশকে মানুষের চিন্তার কাঠামো বদলে দিতে চেয়েছে। পরিবর্তিত চিন্তার আধারে উন্নয়নের সংজ্ঞা নির্ধারিত করছে যা কেবলমাত্র জিডিপি বৃদ্ধিকেন্দ্রিক, রাষ্ট্র সংঘ ঘোষিত সার্বিক স্থায়ী সর্বাত্মক উন্নয়নের থেকে রাষ্ট্রকে সরিয়ে বাজারের মাধ্যমে মানুষের জীবন ও চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করছে পুঁজি। এরই অঙ্গ হিসেবে উন্নত জীবনের মাপকাঠি, জীবন দর্শন মূল্যবোধ বদলে ফেলেছে।
মানুষকে মুহূর্তে বাঁচার দর্শনে উদ্বুদ্ধ করছে নয়া পুঁজিবাদ। মানুষকে করে তোলা হচ্ছে চরম আত্ম কেন্দ্রিক। বৃহত্তর সমাজ নিয়ে তরুণ প্রজন্মকে ভাবতে দেওয়া হচ্ছে না। সর্বস্তরে জীবিকার সংকটকে ইচ্ছে করেই তীব্র করে রাখা হয়েছে এমনভাবে যাতে প্রতিটা মানুষ নিজের অস্তিত্ব বাঁচাতে ইঁদুর দৌড়ে ব্যস্ত থাকে। জীবন মানেই প্রতিযোগিতা। অতএব দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। এই দুশ্চিন্তা বিভিন্ন কারণে। পেশাগত সংকট, সামাজিক অবস্থা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, পারিবারিক সমস্যা এমন হরেক রকম দুশ্চিন্তা গ্রাস করে চলেছে আজকের দুনিয়ায় মানুষকে। এর মধ্যে আছে ভয়, উৎকণ্ঠা, হতাশা, অহং-এর দূষণ। এগুলো কার্যত পুঁজিবাদেরই সৃষ্টি কারণ এগুলি উসকে দিয়েই পুঁজি নিজের মুনাফার জন্য মানুষকে তার দাস বানায়। “দিল মাঙ্গে মোর”, তাই মানুষ বিশ্বাস করতে থাকে জীবন তো একটাই। তাই সকলেরই মনের কথা: আমাকে আমার মতো বাঁচতে দাও।মানুষকে এই যে বদলে দিতে পেরেছে তারই প্রবৃত্তির মধ্যে থাকা রিপুকে ব্যবহার করে,এটাই পুঁজির মুনাফা সর্বোচ্চ করার আধুনিক কৌশল। আজকের মানুষকে মনস্তাত্বিক দিক থেকে বদলে শুধুই ভোগ্যপ্রবন করে তোলার জন্য পুঁজি বদলে ফেলেছে লাগাতার প্রচার, গণ মাধ্যম ও সিনেমার মতো হন সংস্কৃতির প্ল্যাটফর্ম গুলি ব্যবহার করে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক গঠন। তাই বদলে গেছে আজকের মানুষের বিশ্বাসের প্রকরণ ও মূল্যবোধ।
এখন মানুষ মনে করে জীবনে নিজেরটা বুঝে নেওয়াই একমাত্র কাজ। তাই আরও টাকা থাকলে তবেই সেটা আরও ভালো করে সম্ভব। আরও চাই আরও চাই।এ স্বভাব ছিল চিরকালই। আদিম যুগ থেকে মানুষের এই আরও চাই ই তাকে নতুন উদ্ভাবন ও আবিষ্কারের দিকে এগিয়ে চলেছে। মানব সভ্যতার আজকের যে প্রগতি তার সবটুকুই সম্ভব হয়েছে মানুষের ভেতরের এই আরো চাই প্রবণতার জন্য। কিন্তু এই প্রবণতা ধীরে ধীরে এমন জায়গায় পৌঁছাচ্ছে যা মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।বিজ্ঞানের মাত্র কয়েক শতাব্দীর বিস্ময়কর অগ্রগতিতে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, দীর্ঘতর জীবন, বিশ্বব্যাপী সংযোগ এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতি মানুষকে অবিশ্বাস্য গতিতে এগিয়ে দিয়েছে। তবুও এই অগ্রগতির পাশাপাশি এমন কিছু অনাহূত শক্তিও রয়েছে, যা লক্ষ নীরবে সভ্যতার মূল ভিত্তিকেই ক্ষয় করে চলেছে।
প্রযুক্তির সর্বোত্তম উন্নয়নের পর যদি দেখা যায় সেই প্রযুক্তির মানুষকেই ধ্বংস করছে তাহলে তাকে কি আর প্রগতি বলা সম্ভব? যে উন্নয়ন মানুষকে বিপন্ন করে তা কি উন্নয়ন? আজ এই প্রশ্ন মানুষের সামনে কারণ মানুষই তার জন্য দায়ী।একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে এসে মানুষই নিজেকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে, এমনই দাবি করছেন বিজ্ঞানীরা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বিজ্ঞানের দুটো অগ্রগতির মানুষের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে। এই প্রযুক্তির শীর্ষস্থানীয় কর্পোরেট সংস্থা অ্যানথ্রোপিকের গবেষক জ্যাকব কোকসন পদত্যাগ করে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, এই প্রযুক্তি অবিশ্বাস্য গতিতে এগিয়ে চলেছে। ‘আমরা যদি এখনই এই অগ্রগতির রাশ টেনে না ধরি, তাহলে এটার বড় সম্ভাবনা রয়েছে যে অদূর ভবিষ্যতে আমরা সবাই মারা যেতে পারি।’ অ্যানথ্রোপিকের প্রধান দারিও আমোদেইও অবশ্য তার সংস্থার থেকে পদত্যাগীর বিজ্ঞানী দাবি কে সমর্থন করেছেন। তার বক্তব্য হ্যাঁ কৃত্রিম প্রযুক্তি বিদ্যায় মানুষের অগ্রগতি মানুষকে বিপন্ন করে তুলতে পারে তাই এই ব্যাপারে ধীরে এগোনো সঠিক পথ হবে।ওপেন এ আই এর কর্ণধার স্যাম অল্টম্যান এবং এক্সএআইয়ের প্রধান ইলন মাস্ক আমোদেইয়ের প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছেন। তাঁরা শিল্পজুড়ে কাজের পুরো গতি কমানো, কঠোর নিয়ম নীতি চালু এবং এ আই মডেল উন্নয়নে স্বাধীন তদারকির উপর জোর দিয়ে বলেছেন এই প্রক্রিয়ায় পৃথিবীর সব উন্নত দেশের সরকারকেও একত্রিত করতে হবে , সঙ্গে নিতে হবে রাশিয়া চীনের মতন প্রভাবশালী বিশ্বশক্তিকে।
আমোদেইও লিখেছেন, প্রযুক্তির উন্নয়ন নিয়ে প্রশ্ন নেই। কিন্তু এর সঙ্গে যে ঝুঁকি রয়েছে, তা ‘গুরুতর’। এসব ঝুঁকি মোকাবিলা করতে সম্প্রতি সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে কিছুটা সময় দিতে হবে। অ্যানথ্রোপিকে যোগ দেওয়ার আগে ওপেনএআইয়ে কাজ করেন জ্যাকব কোকসন। দুই শীর্ষ সংস্থার গবেষক হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি যা বলেন তাতে স্পষ্ট এই বিশ্ব ভয়ানক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে অদূর ভবিষ্যতে। তবে এআইয়ের কারণে মানবজাতির চরম বিপর্যয় বা ধ্বংস কেমন হতে পারে, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। কিন্তু অ্যানথ্রোপিক প্রধান আমোদেইও একটি বড় ঝুঁকির কথা স্পষ্টই উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, অসংখ্য স্বয়ংক্রিয় প্রোগ্রাম (বট) একজোট হয়ে একটি শক্তিশালী সুপার কম্পিউটারের মতো রূপ নিতে পারে এবং পুরো ইন্টারনেট দখল করে নিতে পারে। কক্সন মনে করেন, আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যেই। এর জন্যই তাদের বক্তব্য সকল প্রতিষ্ঠান বিশ্বজুড়ে একটি সুরক্ষার উপরেখা তৈরি করে একযোগে সমন্বিতভাবে কাজ করুক যাতে আইনসম্মতভাবে এবং যাচাইযোগ্য উপায়ে শক্তিশালী মডেল গুলোকে বাজারে ছাড়া হয়। নইলে পারস্পরিক প্রতিযোগিতা এই পৃথিবীকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। মানবজাতির ধ্বংসের জন্য মানুষ নিজেই নিজেকে বিপন্ন করে তুলছে।আজকে সেটা বোঝবার শেষ সময় এসেছে।
অন্যদিকে উন্নয়ন করতে গিয়ে ধ্বংস করছে প্রকৃতির ভারসাম্য। শব্দ, জল, খাদ্য, প্লাস্টিক বা যে বাতাসে আমরা শ্বাস নিই, যে জল পান করি, যে খাবার খাই বা যে মাটিতে বসবাস করি-সেগুলি বিশুদ্ধ ও জীবনদায়ী হওয়ার বদলে ক্রমশ বিষাক্ত হয়ে উঠছে। গোটা পৃথিবীজুড়ে এখন পরিবেশ ধ্বংস করে উন্নয়নের ভাবনা ভাবা হচ্ছে। যত আগ্নেয়গিরি দাবানল মানুষকে পোড়াচ্ছে পুঁজি সেখানে নতুন করে নিয়োগের সম্ভাবনা দেখছে। যুদ্ধ এখন শুধু অস্ত্র বেচার ব্যবসা নয়, যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে ধ্বংসলীলা সম্পন্ন করে নতুন করে সড়ক থেকে নগরনির্মাণের ব্যবসাতে রূপান্তরিত হচ্ছে। পুঁজির মুনাফা বৃদ্ধির এই ভয়ংকর কৌশলগত পরিবর্তন রাষ্ট্রকে ধ্বংসাত্মক উন্নয়নের পক্ষে টেনে নিচ্ছে আরও বেশি অর্থনৈতিক উন্নয়নের বৃদ্ধির হার অর্জনের গাজর ঝুলিয়ে। তাতে যে সমূহিক ক্ষতি তাই নিয়ে আশ্চর্য রকম উদাসীনতা মানুষকে আরও বেশি বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েছে রাষ্ট্র।উদার নীতি, অর্থনৈতিক সংস্কার করে বিনিয়োগ বাড়াতে গিয়ে বাজারের শক্তিকে প্রবলতর করার দর্শনে উন্নয়নকে সমাজ কল্যাণের দিকে ধাবিত করতে যে নিয়ন্ত্রণ রাখা দরকার সেটাই শিথিল কিংবা বিমুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে।তাতে ভোগবাদী অর্থনীতিতে সর্বদা ভোগ্যপণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি করতে মানুষের মধ্যে সব সময় লাভ, লোভ, ঈর্ষা, হিংসা, পরশ্রীকাতরতা মতো নেতিবাচক প্রবণতাকে উসকে দিয়ে বিজ্ঞাপন করা হচ্ছে পণ্য বা পরিষেবাগুলির বাজারকে আরও গরম করার জন্য। ফলে একই সঙ্গে পরিবেশ দূষণ ছাড়াও সম্প্রতি মাত্রা ছাড়িয়েছে ডিজিটাল দূষণ। পরিবেশের মতোই সমানভাবে আক্রান্ত হচ্ছে মানব মনের সূক্ষ্ম অনুভূতির গতিপ্রকৃতি। অনভিপ্রেত মানসিক প্রবৃত্তি তৈরি হচ্ছে। মানুষকে ভেতর থেকে ধংস করে চলেছে যতটা ধোঁয়া, রাসায়নিক পদার্থ এবং প্লাস্টিক বাইরে থেকে ধংস করে। এই নিয়ে ‘টক্সিক স্টোরিজ, সায়েন্স অ্যান্ড রেমিডিজ ফর এ ক্লিনার মাইন্ড, বডি অ্যান্ড স্পিরিট’ বইটিতে বিস্তৃত ভাবে আলোচনা করেছেন লেখক মুকেশ বাত্রা। বহু বছর ধরে অজস্র রোগী দেখার ফলাফল বিশ্লেষণ করে তিনি এমত সিদ্ধান্তে এসেছেন যে এই সময়ে সবচেয়ে বিষাক্ত হলো ডিজিটাল দূষণ। আর আমাদের সবচেয়ে বড় বন্ধু এবং একই সঙ্গে শত্রু হলো মোবাইল ফোন। এই মোবাইল-আসক্তি থেকে বহু বিচিত্র ধরনের রোগব্যাধি হচ্ছে। তালিকাটি দীর্ঘ। মোবাইলের সমাজ মাধ্যমের কনটেন্ট অত্যধিক উৎকণ্ঠা তৈরি করে। তার থেকেও শরীরে বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগ দেখা দিতে পারে। অথবা হৃদরোগ। মোবাইল থেকে বাতের ব্যথা, চোখের রোগ, ঘাড় স্টিফ হয়ে যাওয়া ইত্যাদি রোগ হতে পারে। মনোযোগ ক্ষমতা কমে যাওয়া, অস্থিরতা, অধৈর্য এবং ক্রমাগত খিটখিটে হয়ে ওঠা একটার পর একটা প্রজন্মকে জীবন বিমুখ আত্মকেন্দ্রিক সভ্যতা বিরোধী করে তুলছে।