
তখন অষ্টম শ্রেনীতে পড়ি। গ্রীষ্মের গনগনে তাপদহন চারিদিকে। রোদজ্বলা আলোকোজ্জ্বল দিন। আমি জ্বরাক্রান্ত হয়ে ঘুমাচ্ছি। শরীর খুবই দুর্বল। এমন সময় বড় ভাই ডেকে তুললেন ঘুম থেকে। পাপড়ি, পাপড়ি ওঠ — এই গল্পটা পড়, তোর জ্বর ভালো হয়ে যাবে। এর আগে কাজলরেখা, আলমাস কুমার এইসব লোকগাথা, রূপকথা পড়েছি। ততদিনে কবিতার সাথেও কিছু পরিচিতি ঘটেছে। যাহোক জ্বরাক্রান্ত শরীর নিয়েই পড়তে শুরু করি জিনের বাদশা। জিনের বাদশা গল্পের আখ্যান বেড়ে উঠেছে আড়িয়াল খাঁ নদীর তীরবর্তী মোহনপুর গ্রামের চুন্নু ব্যাপারীর ছেলে আল্লারাখা এবং নারদ আলী শেখের মেয়ে চানভানুকে আবর্তিত করে।
আল্লারাখা এমনই ত্যাঁদড়, বাউন্ডুলে,ওকে মুসলমানরা বলত, ‘ইবলিশের পোলা’, কায়েতরা বলত, ‘অমাবস্যার জম্মিৎ!’ বাপ বলত, ‘হালার পো’, মা আদর করে বলত — ‘আফলাতুন!’ চুন্নু ব্যাপারী মাতবর গোছের লোক হলেও কৃষি কাজ করত নিজেই। আল্লারাখা কোনোদিনই গেরস্থালী কাজ করত না। দুইদিন ধানক্ষেতে গিয়েছিল বাপের কথা শুনে। একদিন ধানক্ষেতে আগুন দিয়ে এসেছে, অন্যদিন সব ধান কেটে অন্যের ক্ষেতে রেখে এসেছে। এরপর আর কোনোদিনই চুন্নু ব্যাপারী ছেলেকে কাজেকর্মে ডাকেনি। আল্লারাখা বাবুটি পুঁথি পড়ে বেশ আধুনিক হয়ে উঠেছে। মাথায় সুগন্ধি তেল মাখা, আতর লাগানো, বিড়ি ফুঁকা এসব সে ভালোই রপ্ত করেছে। একদিন বিলাসিতার টাকা চেয়ে পায়নি বলে নিজের ঘরে আগুন লাগিয়ে বিড়ি ধরিয়ে খেয়েছে। তারপর স্বগতোক্তি – আজ দেশলাই ছেল না। ঘরে আগুন দিয়ে বিড়িটা খাওয়া গেল। বাপ শাস্তি দিতে গেলে বলল- এরপর অন্যদের ঘরে আগুন দেবে। বাপ বেচারা নিজেই কেঁদেকেটে ক্ষমা চেয়ে নিল। আর অন্যদিকে চানভানুর বাপ স্বচ্ছল এবং নিরীহ হলেও বউটি মানুষ ক্ষ্যাপানোতে ওস্তাদ। আর মেয়ে চানভানু মায়ের গুনই পেয়েছে। গল্পের আল্লারাখা বাবুটি পুঁথি পড়তে পড়তেই ভাবে — সেই হানিফ গাজী এবং চানভানু তার সোনাভান।
এই ভাবনা ভাবতে ভাবতে একদিন চানভানুর কেশরঞ্জন বানু ভরদুপুরে গিয়ে ওঠে চানভানুর বাড়িতে।
এই নাম চানভানুই আল্লারাখাকে দিয়েছে।
চানভানু তখন দাওয়ায় বসে একরাশ পাকা করমচা নিয়ে বেশ করে নুন আর কাঁচা লঙ্কা ডলে পরিপূর্ণ তৃপ্তির সাথে টাকরায় টোকর দিতে দিতে তার সদ্ব্যবহার করছিল। সে তার টানা টানা চোখ দুটো বার দুয়েক পাকিয়ে আল্লারাখার তিন তেড়িকাটা চুলের দিকে কটাক্ষ করে বলে উঠল, ‘কেশরঞ্জন বাবু আইছেন গো, খাডুলিডা লইয়া আও।’ বলেই সুর করে বলে উঠল —
‘এসো-কুডুম বইয়ো খাটে,
পা ধোও গ্যা নদীর ঘাটে,
পিঠ ভাঙবাম চেলা কাঠে!’
এই বলেই হিহিহি করে হেসে ঘরের ভেতর প্রবেশ চলে যায়।
এই অপমানের প্রতিশোধ নেয় আল্লারাখা তার দলবল নিয়ে অই রাতে গ্রামের সকল বাড়ির সদর দরোজার সামনে মলত্যাগ করে রাখে। এমনকি নিজের বাড়িও বাদ দেয় না। বাদ রাখে শুধু চানভানুর বাড়ি। চানভানু এই দয়াকে অপমান হিসেবেই দেখে। এরপর ঘটতে থাকে নানা ঘটনা। আল্লারাখা জলদানো হয়ে চানভানুকে ভয় দেখিয়ে বলে — আল্লারাখার সঙ্গে বিয়ে না দিলে ভূত তার স্বামীর ঘাড় মটকে দেবে। আবার নিজেই পাঁজাকোলে করে ডাঙায় তোলে। সম্বিৎ ফিরে এলে বাড়ি পৌঁছে দেয়। এরভেতর চানভানুর শরীর-মন প্রেমের বিষে নীল হতে শুরু করে। আল্লারাখাকে সারাক্ষণই মনে পড়তে থাকে। শান্ত হয়ে যায়। চানভানুর মা বুঝে নেয় মেয়ের মায়া এবার ছাড়তেই হবে।
বিয়ের ব্যবস্থা করে। আল্লারাখা হয়ে ওঠে জিনের বাদশা, ভূত। যে ভূত আল্লারাখার সাথে চানভানুকে বিয়ে দিতে বলে। কোনো উপায় না পেয়ে কলকাতা থেকে জিনের বাদশার নামে এক পত্র ছেপে নিয়ে আল্লারাখা। কিন্তু ছিরাজ হাওলাদার অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং ঠান্ডা মাথার মানুষ। সে বুঝতে পারে এসব আল্লারাখার কাজ। আর নারদ আলী স্বচ্ছল মানুষ। তার মেয়ের সাথে ছেলের বিয়ে দিলে সে লাভবান হবে।
এরই ভেতর একদিন ভর সন্ধ্যায় জনমানবহীন এলাকায় নদীর ধারে বটগাছের নীচে আল্লারাখা চিৎকার করতে থাকে সাপ, সাপ! আর অইপথেই যাচ্ছিল চানভানু। দৌড়ে গিয়ে বলে আল্লারাখার বুকে চুমুক দিয়ে কিছু রক্ত বের করে আনে চানভানু। চানভানু যখন জিজ্ঞেস করে কী সাপ কামড়েছে? আল্লারাখা চানভানুর দুটো চোখ দেখিয়ে দেয়। পরদিন থেকে আর জিনের বাদশার কোনো কর্মতৎপরতা দেখা যায় না। যেদিন চানভানু তার চাঁদমুখ দিয়ে ওর বুকের রক্ত স্পর্শ করেছিল সেই দিন থেকে তার রক্তের সমস্ত বিষ — সমস্ত হিংসা দ্বেষ লোভ ক্ষুধা — সব যেন অমৃত হয়ে উঠেছিল। তার মনের দুষ্ট শয়তান সেই একদিনের সোনার ছোঁওয়ায় যেন মানুষ হয়ে উঠেছিল। পরশমণির ছোঁওয়া লেগে ওর অন্তরলোক সোনার রং-এ রেঙে উঠেছিল। তার মনের ভূত সেই দিনই মরে গেল।
বিয়ে হয়ে গেল চানভানুর। চানভানুর যে রাত্রে বিয়ে হয়ে গেল, তার পরদিন সকালে আল্লারাখার বাপ মা ভাই সকলে আল্লারাখাকে দেখে চমকে উঠল। তার সে বাবরি চুল নেই, ছোটো ছোটো করে চুল ছাঁটা, পরনে একখানা গামছা, হাতে পাঁচনি, কাঁধে লাঙ্গল! তার মা সব বুঝল। চানভানু ব্যাকুল হৃদয়ে দৌড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল — কে তোমার এমন দশা করল? শান্ত আল্লারাখা উত্তর দিল- জিনের বাদশা।
সেদিনের সেই জ্বরাক্রান্ত অষ্টম শ্রেণির বালিকার শরীর, মন, মগজ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল জিনের বাদশা গল্প পড়ে।
সেই তরুণী ভেবেছিল- প্রেমের কী দুর্নিবার শক্তি! গল্পের চরিত্রায়ন, ন্যারেটিভস এতই শক্তিশালী যে মনে হয় সব আমি দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পেয়েছি। আজও আমার সকল আস্থা প্রেমেই। প্রতিহিংসা আর পুঁজি আজও আমি ঘৃণা করি। জগৎ সংসার বেঁচে থাকলে প্রেমের জোরেই বেঁচে যাবে। এরপর নজরুলের রাক্ষুসি এবং পদ্মগোখরো গল্পদুটো ও খুব ভালো লেগেছিল।
ছোট গল্পের মূল ভগীরথ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনিই বাংলা ছোট গল্পের সার্থক রূপকার। নবম-দশম শ্রেনীতে আমাদের পাঠ্য ছিল কাবুলিওয়ালা গল্পটি। বাঙালি লেখকের বাকপটু শিশু কন্যার সাথে পিতৃসুলভ ভালোবাসার গল্প কাবুলিওয়ালা। কাবুলিওয়ালা মিনিকে পেশতা বাদাম, কিসমিস দিত আর দুজনে সাতরাজ্যের গল্প করত। কাবুলিওয়ালা মিনিকে জিজ্ঞেস করত খোখি তুমি সসুর বাড়ি যাইবে? মিনিও জিজ্ঞেস করত- তুমি যাবে শশুর বাড়ি? দুজনের সেই গভীর হৃদ্যতায় ছেদ পড়েছিল কাবুলিওয়ালা যখন খুনের অভিযোগে হাজতবাস করতে গেল। বহু বছর পর কাবুলিওয়ালা যেদিন জেল থেকে মুক্তি পেয়ে মিনির সাথে দেখা করতে আসে সেদিন মিনির বিয়ে। সেদিন ও কাবুলিওয়ালা মিনির জন্য কিসমিস আর পেস্তাবাদাম নিয়ে আসে। লেখক যখন কাবুলিওয়ালার পিতৃহৃদয়ের আকূলতার পরিচয় পান তখন বধুবেশী মিনিকেই দাঁড় করান কাবুলিওয়ালার সামনে। কাবুলিওয়ালা জিজ্ঞেস করে – খোখী তুমি সসুর বাড়ি যাইবে? মিনি লজ্জা পেয়ে মুখ লুকায়। কাবুলিওয়ালা বুঝতে পারে- মিনির মতো কাবুল দেশে রেখে আসা তার মেয়েটিও বড় হয়েছে। তার সাথেও করতে হবে নতুন আলাপ। সম্পর্কের রূপান্তরের এই গল্পে নিজেকেই কখনো কাবুলিওয়ালা মনে হয়। আর মনে হয়- কোথায় আমার সেই শিশুপুত্র? অফিস থেকে ফিরলে যে আমার চুল নিয়ে খেলত আর আমি গভীর ঘুমদেশে ডুবে যেতাম…
ছুটি গল্পটিও পড়েছিলাম যতদুর মনে পড়ে নবম শ্রেণিতে বসেই। ফটিকের জন্য বহুদিন মন কেমন করা ছিল। আহা জগৎ সংসারে কতশত ফটিক যে আছে! ফটিক আজও বুকের গভীরে এক নোনাব্যাথার নাম।
এইচ এস সি তে পাঠ্যবইয়ে পড়েছিলাম হৈমন্তী। আজও হৈমন্তী আমার মননে গভীর দাগ কেটে আছে। সমাজ, সংসার, পরিবারকে উপেক্ষা করে সৎসাহস নিয়ে ক’জন পুরুষ ভালোবাসে? ভালোবেসে নারী ঘর ছাড়ে, বর ছাড়ে, সমাজ ছাড়ে কিন্তু আজ অব্দি ক’জন পুরুষ কী ছেড়েছে?
রবীন্দ্রনাথের যে দুটো গল্প আমাকে সমূহ নাড়িয়ে দিয়েছিল সেই গল্প দুটি হল — পোস্ট মাস্টার ও মাল্যদান ।
পোস্ট মাস্টার যেদিন বললেন তিনি আজই চলে যাচ্ছেন। অনাথ বালিকা রতন জিজ্ঞেস করল- কোথায় যাচ্ছে এবং কবে আসবে? রতনের দাদাবাবু বললেন আর আসবেন না। রতন জিজ্ঞেস করে বসল — আমাকে তোমাদের বাড়িতে নিয়ে যাবে? রতন আর দাদাবাবুর সম্পর্কটা যে আত্মিক বাঁধনে বাঁধা হয়ে গিয়েছিল রতনের কাছে। পোস্ট মাস্টার বললেন — সে কী করে হবে? জগৎ সংসারের জটিল নিয়ম দাদাবাবু আর রতনকে বুঝিয়ে বলতে গেলেন না। শুধু বললেন — নতুন পোস্ট মাস্টারকে বলে যাবেন তিনি যেন রতনকে রাখেন। রতন চিৎকার করে বলল- কিছু বলতে হবে না। সে থাকতে চায় না। দাদাবাবু যখন বেশ পরিমাণ টাকা দিল — রতন পায়ের ওপর পড়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল — আমি কিছু চাই না দাদাবাবু। এরপর পোস্ট মাস্টারের নৌকা তখন ছেড়ে দিয়েছে। তিনি একবার ভাবেন ফিরে গিয়ে নিয়ে আসবেন রতনকে। আবার ভাবেন — ফিরিয়া গিয়া কী কাজ? জগতে এত মৃত্যু, এত বিচ্ছেদ! এই সংসারে কে কাহার! পোস্ট মাস্টার শিক্ষিত, শহুরে মানুষ। সভ্যতা আর সমাজের জটিল হিসেব ঠিকই বুঝে ফেলেছিলেন। কিন্তু বোঝেনি অনাথ বালিকা রতনের ছোট্ট হৃদয়। সে কেবলই পোস্ট মাস্টারের বাড়ির চারিদিকে ঘুরে ঘুরে কাঁদতে লাগলো। মানুষ যখন বাসে, ট্রেনে, ট্রামে যাতায়াত করে তখনও পথসঙ্গীর সাথে গড়ে ওঠে এক মধুর সম্পর্ক। সে নিজেও জানে এই সম্পর্ক খুবই ক্ষনস্থায়ী। তারপর ও মানুষের মনন আর মন এই বিভ্রমের আগুনেই বারবার পুড়তে চায়। পোস্ট মাস্টার বাংলা সাহিত্যের এক সমুজ্জ্বল নক্ষত্র। যার আবেদন কখনো ফুরিয়ে যাবার না।
মাল্যদান আরেকটি নিঃশর্ত সমর্পণের গল্প। এই গল্পটি নিছক প্রেমকাহিনি নয়। এখানে রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন —
প্রেম সবসময় দখল বা দাবি নয়। গভীর প্রেম অনেক সময়ই হয়ে ওঠে কেবলই নিঃস্বার্থ দান।
অন্যদিকে এও তীব্র সত্য — সমাজের বাঁধন মেনে নিতে হলেও অন্তরের আবেগকে চিরকাল লুকোনো যায় না, তার প্রতীক রূপেই আসে মাল্যদান।
আমার কাছে মনে হয় মানবিকতা, আত্মসমর্পণ আর নীরব ভালবাসাই এই গল্পের মূল বার্তা। যা একুশ শতকের প্রেমে প্রায় অনুপস্থিতই বলা যায়।
এইচ এস সি থেকে পড়া শুরু হয় সিরিয়াস সাহিত্যের সব উপন্যাস। অষ্টম-নবম শ্রেনীতে পরিচিতি ঘটেছিল ডি এইচ লরেন্স এর ল্যাডি চ্যাটার্লিজ লাভার এবং আল মাহমুদ এর ডাহুকী, রবীন্দ্রনাথ এর শেষের কবিতার সাথে। এইচ এস সি তে উঠেই শুরু হল সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিম চট্টোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র, মানিক বন্দোপাধ্যায়, বিভুতিভূষন, শহিদুল্লা কায়সার, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আবুল ফজল, সমরেশ মজুমদার, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সব উপন্যাস। তৃতীয় বর্ষে পড়তে শুরু করি রুশ সাহিত্য, কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার, সক্রেটিসের জবানবন্দি, সাথে ইউরোপিয়ান হিষ্টি, ইন্ডিয়ান ফিলোসোফি এসব। তখন সবকিছুই বুঝে যেতাম এমন নয় কিন্তু পড়তাম। তখন ছোট গল্পের সাথে আমার একরকম সাময়িক বিচ্ছেদ ঘটে। তারপর আবার একটা শক্ত সখ্য তৈরি হয় যখন দ্বিতীয় মেয়াদে লিখতে শুরু করি ২০১৭ সালে। তখন আবার এফোঁড়ওফোঁড় করে পড়তে শুরু করি ছোট গল্প। তখনই পড়ি মানিক বন্দোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, কমলকুমার মজুমদার,আখতারুজ জামান ইলিয়াস, সৈয়দ শামসুল হক, শহিদুল জহির, কায়েস আহমেদ, হাসান আজিজুল হক, আবু বকর সিদ্দিক, ফ্রান্সিস কাফকা, গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ, সাদাত হোসেন মান্টো, চিনুয়া আচেবে, মাসুদ নাইয়ার, হারুকি মুরাকামি-সহ হালের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক জাকির তালুকদার, পাপড়ি রহমান, অমর মিত্র, নলিনী বেরা এবং স্বপ্নময় চক্রবর্তীদের গল্প।
এ পর্যায়ে শুরুতেই আসি গল্পের প্রোফেট মানিক বন্দোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গে।
রবীন্দ্রনাথ বহু গল্পেই নর-নারীর সম্পর্ককে নিষ্কাম, দেবত্ব আরোপ করেছিলেন। সময় এবং সম্পর্ককে কেবলই বিমূর্ত করে শুচিশুভ্র করে তুলেছিলেন। মানিক বন্দোপাধ্যায় সেটিকে মুড়মুড় করে ভেঙে দিয়েছেন। তিনি আঁকলেন মানুষের কোষে থাকা অন্ধকার, রিরংসা, লোভ, প্রতিহিংসা, সর্বোপরি ক্ষুধা ও কামের মহত্ত্ব। মানিক বন্দোপাধ্যায়ের প্রিয় গল্পের সংখ্যা অনেক কিন্তু প্রাগৈতিহাসিক আর সরীসৃপ গল্পের কথা না বললেই নয়।
প্রাগৈতিহাসিক গল্পের আখ্যানভাগে দেখা যায় ভিখু একজন ডাকাত। বৈকুন্ঠ সাহার বাড়িতে ডাকাতি করে এবং খুন করে পালিয়েছে। সারারাত নদীর জলে ডুব দিয়ে থেকে পেহ্লাদের কাছে আশ্রয় নিতে আসে। সিনজুরি গাছে মাচান বেঁধে পেহ্লাদ ভিখুকে থাকার জায়গা দেয়। ডাকাতি করার রাতে ভিখু ডান হাতে বর্শার আঘাত পেয়েছিল। সেই আঘাতে হাতে ঘা হয়ে যায়। তো একসময় পেহ্লাদ দুরাবস্থা দেখে ভিখুকে খড় বিছিয়ে নিজের ঘরের মাচানে স্থান দেয়। তথাপি ভিখু একটু সুস্থ হয়েই কামোত্তেজনার বশবর্তী হয়ে পেহ্লাদের অনুপস্থিতিতে তার বউয়ের হাত ধরে টানাটানি করে। যদিও তার ডান হাতটি অকেজো হয়ে যায় চিরতরে। বাম হাত নিয়েই পেহ্লাদের সাথে সংঘর্ষে মেতে ওঠে। ভিখুকে পেহ্লাদ এবং তার শ্যালক মেরে তাড়িয়ে দেয়। এর প্রতিশোধ নিতে ভিখু পেহ্লাদের বাড়িতে আগুন দিয়ে পালায়।
এরপর নদীর সাঁতরে মহাকুমা শহরে গিয়ে শুরু করে ভিক্ষাবৃত্তি। শরীর যখন একটু জল, খাবার পায়। তখনই মাথাচাড়া দেয় কাম। লুকিয়ে নারীদের গোসল করা দেখে। তার ইচ্ছে পৃথিবীর যাবতীয় খাবার সে একা খাবে এবং সকল নারী সে একা ভোগ করবে। অই শহরেরই ভিক্ষুক পাচী। ভিখু পাচীকে নিজেরএকান্ত করে পেতে চায়। কিন্তু পাচী বিয়ে করে আরেক জোয়ান ভিক্ষুক বশীরকে। পরিশেষে বশীরকে খুন করে খোঁড়া পাচীকে পিঠে চড়িয়ে রাতের আঁধারে বেরিয়ে যায় নতুন জীবনের খোঁজে।
একটা স্রোতস্বিনী নদীর পুরো শরীর জুড়ে যেমন স্রোত আর দুর্নিবার ছোটার আকাঙ্ক্ষা তেমনি ভিখুর পুরো ধমনী আর শিরা জুড়ে জীবনের প্রত্যাশা। সিনজু গাছের মাচানে পাশের গাছে সাপ দেখা যাওয়ায় ভিখু লাঠি হাতে নিয়ে পুরো বেলা সাপ তাড়িয়েছে। জোঁক ধরে নিজেই ঘায়ের চারপাশে দিয়েছে বিষাক্ত রস শুষে নেয়ার জন্য। জীবনকে ভিখু উপভোগ করতে চায়। উদারতা এবং উদাসীনতা ভিখুর অভিধানে নেই। ভিখু জীবনকে উপভোগ করতে চায় জীবনের মধ্যমাঠে দাঁড়িয়ে। যেমন পেটের ক্ষুধা নিবৃত্ত হতে হবে তেমনি নিবৃত্ত হতে মস্তিষ্কের জৈবিক চাহিদা -যৌনতা। ভিখুর জবানবন্দিতে আমরা পাই — “স্ত্রীর চোখের সামনে স্বামীকে বাঁধিয়া মারিলে তাহার মুখে যে অবর্ণনীয় ভাব দেখা দিত, পুত্রের অঙ্গ হইতে ফিনকি দিয়া রক্ত ছুটিলে মা যেমন করিয়া আর্তনাদ করিয়া উঠিত; মশালের আলোয় সে দৃশ্য দেখা আর আর্তনাদ শোনার চেয়ে উম্মাদনাকর নেশা জগতে আর কী আছে?” জীবনের সব আয়োজন নিয়ে ভরপুর আনন্দ-ফুর্তি নিয়ে বাঁচতে চাওয়া এক জয়ী জীবন সৈনিক ভিখু। লেখকের ন্যারেশনে আমরা পাই — “নদীর ধারে খ্যাপার মতো ঘুরিতে ঘুরিতে তাহার মনে হয় পৃথিবীর যত খাদ্য ও যত নারী আছে একা সব দখল করিতে না পারিলে তাহার তৃপ্তি হইবে না।”
গল্পের দর্শন এবং মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করলে যে বিষয়গুলো প্রতিভাত হয়- আলো আর অন্ধকার চিরকাল সৃষ্টিতে জমজ বোন হয়ে বেড়ে উঠেছে। আলোতে যেমন মানুষের অগ্রগতি, সমৃদ্ধি এবং অন্বেষণ; তেমনি অন্ধকারে মানুষের প্রবৃত্তির মুক্তি। শুধু আলোর সাথে যেমন মানুষ আলোর পোকা হয়ে বাঁচতে পারে না। তেমনি শুধু অন্ধকারে মানুষ প্যাঁচা হয়েও বাঁচতে পারে না। তথাপি একথা নিঃসন্দেহে বলা চলে আলোর চাইতে অন্ধকার শতগুণ নিরেট, প্রাগাঢ় এবং সৎ। দিনের চাইতে রাত আরও বেশি নির্ভেজাল এবং মৌলিক। আর এই অন্ধকার মানুষ জন্মের সময়েই নিয়ে এসেছে কোষে করে। মানিক বন্দোপাধ্যায়ের জবানবন্দিতে পাই- যে ধারাবাহিক অন্ধকার মাতৃগর্ভ হইতে সংগ্রহ করিয়া দেহের অভ্যন্তরে লুকাইয়া ভিখু ও পাঁচী পৃথিবীতে আসিয়াছিল এবং যে অন্ধকার তাহারা সন্তানের মাংসল বেষ্টনীর মধ্যে গোপন রাখিয়া যাইবে তাহা প্রাগৈতিহাসিক, পৃথিবীর আলো আজ পর্যন্ত তাহার নাগাল পায় নাই, কোনোদিন পাইবেও না।
বাংলা সাহিত্যে আমার পড়া সবচেয়ে শক্তিশালী চরিত্র ভিখু। সে একজন দুধর্ষ ডাকাত শুধু না, একজন শক্তিশালী পুরুষ এবং দুর্দান্ত প্রেমিক। বৈকুন্ঠ সাহার গদিতে ডাকাতি করে সবাই ধরা খেলেও সে বর্শাবিদ্ধ হাত নিয়ে পালিয়েছে। নিজেকে বাঁচাতে সারাদিন কাদার মধ্যে ডুব দিয়ে থেকেছে এবং সমস্ত প্রতিকূলতার সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে থেকেছে। তেমনি প্রথমে পায়ের ঘা নিয়ে আপত্তি থাকলেও পরে ঘা নিয়েই পাঁচীকে নিজের কাছে যেতে বলে। পরিশেষে খঞ্জ ভিখারিকে খুন করেই পাঁচীকে জিতে নেয় ভিখু। প্রেমিক ভিখুর কাছে খুনি ভিখু যেন মৃয়মান হয়ে যায়।
পাঁচীর হাঁটতে কষ্ট হলে, ভিখু তাকে পিঠে চাপায়। এমন প্রেমিক তো সকল নারীর সাত জনমের আরাধনা। ভিখুকে কেবলই দুধর্ষ ডাকাত ভাবা সমীচীন মনে হয় না। একইসাথে বিজয়ী জীবন যোদ্ধা এবং দুর্মর অপরাজেয় প্রেমিক বটে।
সরীসৃপ গল্পটা মানুষের রিরংসা এবং নিষ্ঠুরতার গল্প।
“সরীসৃপ” গল্পে বনমালী এবং পরীর চরিত্রচিত্রণ করা হয়েছে, যারা সমাজের দৃষ্টিতে ভদ্রলোক হলেও ভেতরে লুকিয়ে থাকে হিংস্র প্রবৃত্তি। সরীসৃপ যেমন ঠাণ্ডা, ধীর, নিঃশব্দে শিকার করে, ঠিক তেমনি মানুষের মধ্যেও অনেক সময় প্রবৃত্তিগত পশুসুলভ নিষ্ঠুরতা কাজ করে।
গল্পে মানবজীবনের ভেতরের অন্ধকার, লালসা ও শিকারি প্রবৃত্তি মানিক বন্দোপাধ্যায় চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। গল্পের শেষে দেখা যায় প্রতিহিংসা বশবর্তী হয়ে পরী নিজের বোনের অপ্রকৃতিস্থ ছেলেকে গন্তব্যহীন ভাবে ট্রনে তুলে দেয়। আর তাতে বনমালী ও নেহাৎ অখুশি নয়। গল্পের শেষ লাইনটি আমাকে সমূহ নাড়িয়ে দেয় — প্লেনটি সুন্দর বনের ওপর পৌঁছিয়া গেল। মানুষের সঙ্গ ত্যাগ করিয়া বনের পশুরা যেখানে আশ্রয় লইয়াছে।
তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়ের অনেক গল্পের ভেতর দুটো গল্পের কথা বলতেই হয়। তারিণী মাঝি এবং নারী ও নাগিনী। তারিণী মাঝি একজন দুর্বার শক্তিশালী মাঝি। নদীর ঢেউ এবং নদীর সাথে যার দারুণ বোঝাপড়া। সেই তারিণীই আবার সুখীর দুর্মদ প্রেমিক। কিন্তু নদীতে পানি কমে যায়। মাঝি নৌকা বাইতে পারে না। এরভেতর আবার চালু হয় ইঞ্জিন চালিত নৌকা। শেষে আসে বন্যা। তারিণী মাঝি সুখীকে পিঠে চাপিয়ে পাড়ি দিতে চায় বন্যা। কিন্তু জলের পাকের ভেতর পড়ে সে যখন মৃত্যুর মুখোমুখি হয় এবং সুখী তাকে আষ্টেপৃষ্টে জাপটে ধরে তখন সে নিজেই নিজেকে পরিত্রাণ দিতে বদ্ধপরিকর হয়। প্রবল শক্তিতে সুখীকে গলা টিপে মেরে সে ওঠে জলের ওপর। প্রেম সুস্থ এবং স্বচ্ছল জীবনের জন্য। সবার আগে জীবন। গল্পের শেষ লাইন- আ: আ:- বুক ভরিয়া বাতাস টানিয়া লইয়া আকূল- ভাবে সে কামনা করিল, আলো ও মাটি। তারিণী মাঝি গল্পের ভাষাও শিল্পোত্তীর্ণ সাহিত্য ভাষার নিদর্শন।
নারী নাগিনী গল্পের নায়ক এক নাগিনীকে পূষেছিল। নীনারী ও নাগিনী’ গল্পে ব্রাত্য সমাজভূক্ত খোঁড়া শেখের প্রবৃত্তি তাড়িত তীব্র যৌনসক্তিজনিত আচার আচরণ এবং তার ভয়ঙ্কর পরিণাম বর্ণিত হয়েছে। মনুষ্য ও মনুষ্যেতর প্রাণীর আত্মিক মেলবন্ধন নিয়ে লেখা এক গল্প। গল্পে খোঁড়া শেখ “সাপের ওঝা। শুধু ওঝা নয়, সাপ লইয়া খেলাও সে করে।” একটা ছোট উদয়নাগকে কেন্দ্র করে খোঁড়ার দাম্পত্য জীবনে রীতিমতো রহস্যময়তার সৃষ্টি হয়। সে সাপিনীর নাকে মিনি পরায়, শিরে সিঁদুর লাগিয়ে তাকে নিকে করে আদর করে, জোবেদার সতীন বলে পরিচয় করিয়ে দেয়, চুম্বন করে। নাগিনীকে কেন্দ্র করে মানবীর বুকে ঈর্ষার আগুন জ্বলে খোঁড়া শুধু সকৌতুকে হাসে। নাগিনীর আসঙ্গলিপ্সা চরিতার্থ করার জন্য তাকে মাঠে ছেড়ে দিয়ে এলেও কোনো এক দূর্বোধ্য মায়ায় সে খোঁড়ার বাড়িতে ফিরে আসে। তাকে দেখে জোবেদা ঘুঁটে ছুঁড়ে মারলে রাতের অন্ধকারে জোবেদাকে সে দংশন করে। আর তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় অসামান্য শিল্পকৌশলে গল্পটির সমাপ্তি টানেন খোঁড়ার কথায় –শুধু তোর দোষ কি, মেয়ে জাতের স্বভাবই ঐ। জোবেদাও তোকে দেখতে পারত না।”
বিশ্বসৃষ্টির আদিম জীবন স্পন্দন এক নতুন সুরে ধ্বনিত হয়েছে। গল্পটির মূল আবেদন জৈবিক, প্রবৃত্তিগত জীবন রহস্যকে আদিমতায় অবনত করে মানুষ ও পশুর প্রভেদের মূল্যায়ণ করেছেন। অরণ্য প্রকৃতির রহস্য ও প্রকৃতিগত সত্যকে বিস্ময় ও অর্ধপরিচয়ের রহস্যে আবৃত করে তারাশঙ্কর এই কাহিনিকে রূপ দিয়েছেন। জৈবিক জীবনের ক্ষেত্রে মানুষের প্রাগৈতিহাসিক রূপটি জোবেদা এবং উদয়নাগের মধ্যে এক অনুপম শিল্পরূপ অর্জন করেছে। নারীর প্রতিহিংসা, কতৃত্বপরায়নতা, সাম্রাজ্যবাদীতা জোবেদা এবং উদয়নাগের ভেতর দিয়ে দারুণ ভাবে মূর্ত করে তুলেছেন তারাশঙ্কর। বিশ্ব সাহিত্যের যেকোনো গল্পের সাথে এই গল্প স্বমহিমায় প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে পারে।
শহিদুল জহিরের কাঠুরে ও দাঁড়কাক, ডুমুর খেকো মানুষ, কাঁটা অত্যন্ত প্রিয় গল্প। কাঠুরে ও দাঁড়কাক এবং ডুমুর খেকো মানুষ গল্পে দারুণ সব দৃশ্য কল্প এবং চিত্রকল্প তৈরি করেছেন শহিদুল জহির। কিন্তু কাঁটা শহিদুল জহিরকে পৌঁছে দিয়েছে এক অনন্য উচ্চতায়।
কাঁটা গল্পের আখ্যান গড়ে উঠেছে ১৯৬৪ সালের দাঙ্গা, ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং ১৯৯২ সালের বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পটভূমিতে। গল্পে বারবার একই চরিত্র এবং একটি কুয়ার প্রসঙ্গ পাওয়া যায়, যে কুয়ায় বার বার এক দস্পতির মৃত্যু ঘটে। গল্পে সুবোধ চন্দ্র ও তার স্ত্রী স্বপ্না বারবারই উঠানের কুয়োয় পড়ে মৃত্যু বরণ করে। এই কুয়োটা যেন রাষ্ট্র কাঠামো আর সমাজ কাঠামো। যে সমাজ কাঠামো ধর্মের যাঁতাকলে মানুষ সুবোধ চন্দ্র আর স্বপ্নাদের হত্যা করেই চলেছে। গল্পের আখ্যানে শহিদুল জহির পুরান ঢাকার ভাষা ব্যবহার করেছেন। যা গল্পের রসবোধ বাড়িয়ে আরও সুখপাঠ্য করে তুলেছে। এই গল্প চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়-সুবোধ চন্দ্র আর স্বপ্নারা যেন কোনো কালেই রাষ্ট্রের নাগরিক হয়ে উঠতে পারে না। কেবলই থেকে যায় সংখ্যা লঘু।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের প্রায় সব গল্পই অবশ্য পাঠ্য মনে হয়। তথাপি পিতৃবিয়োগ গল্পের কথা না বললেই নয়। পিতৃবিয়োগ গল্পের আখ্যান বেড়ে উঠেছে আবাল্য এতিম ইয়াকুবের পিতার মৃত্যু এবং তার পরবর্তী ঘটনাকে কেন্দ্র করে। গল্পে দেখা যায় ইয়াকুব খুব ছোট বেলায় মা’কে হারিয়েছে। তার বাবা আশ্রাফ আলী পোস্ট মাস্টার গ্রামে গ্রামে ঘুরে চাকরি করেছে। ইয়াকুব বড় হয় নানা বাড়িতে। আশ্রাফ আলী এতই স্বল্পভাষী এবং রাশভারি যে ইয়াকুবের খালারা তাকে বলতো পোষ্টবক্সের সীল। ইয়াকুবের বাবার কাছে যেতে, আদর করতে খুব ইচ্ছে হত। মামারা যখন তাদের ছেলেমেয়েদের আদর করত তখন ইয়াকুবের খুব আফসোস হত। একবার ইয়াকুব দৌড়ে গিয়ে আমার আব্বু বলে আশ্রাফ আলীর গলা জড়িয়ে ধরেছিল। আশ্রাফ আলী গলা ছাড়িয়ে নীচে নামিয়ে ছেলেকে বলেছিল- বড় হলে ন্যাকামো মানায় না। অথচ মৃত্যুর পর সেই আশ্রাফ আলীকে নিয়েই- একেকজন একেকরকম গল্প করছে। কেউ বলছে সে গ্রামের এহসান ডাক্তারের সাথে মদ খেতো। আবার কেউ বলছে- তার মেয়ে গাছ থেকে পড়ে পা ভেঙেছে বিধায় তাকে মাগুর মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খাইয়ে দিয়েছে। ইয়াকুব তার বাবার প্রকৃত চেহারা মেলাতে পারে না। অবশেষে ইয়াকুব পিতার কুলখানি না করেই চলে যায়।
প্রকৃত অর্থে মানুষের শত শত চেহারা আছে। আমরা সেই চেহারায়ই মানুষকে চিনি এবং মূল্যায়ন করি যা সে দেখায়। ঠাস বুনটের এই গল্পটির দৃশ্য কল্প এবং চিত্রকল্প চমৎকার। পিতৃবিয়োগ মনযোগী পাঠকের মনস্তত্বকে এলোমেলো করে দেয়। গল্পে কয়েকটি বিষয় খুবই স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় : ১. একজন একা পোস্ট মাস্টারের জীবন সংগ্রাম। ২. পিতৃ-মাতৃহীন ইয়াকুবের একাকীত্ব এবং বাবার স্পর্শ ও আদরের আকাঙ্খা। ৩. মৃত ব্যক্তিকে নিয়ে নিন্মবিত্তের মানুষের লোকগল্প ও কুলখানির বন্দোবস্ত। ৪. মানুষ একই দেহের ভেতর বহু সত্তায় বিভাজিত, বহু সম্পর্কে সম্পর্কিত।
‘পিতৃবিয়োগ’এর পর আমি বলতে চাই কথাসাহিত্যিক জাকির তালুকদারের শত্রু সম্পত্তি গল্পের কথা। জাকির তালুকদারকে আমার মনে হয় মানিকোত্তর গল্পের প্রোফেট। ছোট গল্পের মানচিত্রে নিজের নাম তিনি খোদাই করেছেন মেধা, পরিশ্রম এবং কঠিন সাধনা দিয়ে।
শত্রু সম্পত্তি গল্পের আখ্যান ভাগে দেখা যায় পাইন্যা বৈকুন্ঠ তিন তাসের জুয়ায় বউ ইন্দুবালাকে বাজি ধরে সুধীর কামারের সাথে। সেই জুয়া সুধীর কামার জিতে বউ হারায় পাইন্যা বৈকুন্ঠ। কথকের ভাষ্যে লেখক লিখেছেন – “বউকে বাজিতে তোলা যায়ই। কুরুক্ষেত্রের পাঁচালিতেই তো সবাই শুনতে পায় বউ দ্রৌপদীকে বাজি ধরে ধম্মপুত্তুর যুধিষ্টির জুয়া খেলেছিল শকুনির সাথে। বাজিতে হারায় দ্রৌপদী গেল দুর্যোধনের দখলে। তখন রাজসভায় তার বস্ত্রহরণ। কিন্তু দ্রৌপদীর সহায় তার সখা। কৃষ্ণঠাকুর বলে কথা। সে-ই বাঁচাল দ্রৌপদীর ইজ্জত। দুর্যোধন কাপড় টানতে থাকে, কাপড় আসতেই থাকে, শেষ আর হয় না। দ্রৌপদীকে ন্যাংটো করার খায়েশ মিটল না দুর্যোধনের-দুঃশাসনের। কিন্তু ইন্দুবালা তো আর দ্রৌপদী নয়। তার শাড়িও এগারো হাতের বেশি লম্বা নয়। কাজেই তা খুলতে সুধীর কামারের কয়েকটা হ্যাঁচকা টানের বেশি লাগেনি।”
সিরাজ মোক্তারের পুত্ররা জড়িত আছে ক্ষমতাসীন দুই রাজনৈতিক দলের সাথে। গল্পের সময় ২০০২। তখন ক্ষমতাসীন হয় বি. এন.পি। সংখ্যা লঘুদের তখন ৭১ সাল। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের সাহায্যে ইন্দুবালার সম্পত্তি মানে সুধীর কামারের কাছ থেকে পাওয়া ভিটা হাতছাড়া হয়। সকলে ইন্দুবালাকে পরামর্শ দেয় ইন্ডিয়া চলে যেতে। কিন্তু ইন্দুবালাও কিছুতেই ইন্ডিয়া যাবে না। কারণ অইখানে বৈকুন্ঠ থাকে। তার সাথে দেখা হওয়ার চাইতে নরকে যাওয়াও ভালো।
লেখক শত্রু সম্পত্তি গল্পের শরীর বিনির্মান করেছেন রাজনৈতিক বাস্তবতা, মিথ, সংখ্যা লঘুদের প্রতি রাজনৈতিক ভায়োলেন্স সবকিছু নিয়ে। এক গল্পে এতকিছুর নিখুঁত সন্নিবেশ কজন গল্পকার করতে পারেন! গল্পের ভাষা পুরোপুরি নাটোরের কথ্য ভাষার মতো। গল্পটা যেন তিনি বলছেন, লিখছেন না। এই গল্পে একই সাথে তিনি সন্নিবেশিত করেছেন সমাজ বাস্তবতা, রাজনৈতিক বাস্তবতা, মিথোলজি, নারীর প্রতি সহিংসতা, নারীর মনস্তত্ব এবং সর্বোপরি এক অনন্য ভাষাভঙ্গি। চিত্রিকল্প এবং দৃশ্যকল্পে গল্পটা দারুণ ভাবে শিল্পোত্তীর্ণ।
প্রিয় গল্প নিয়ে বলতে গেলে একটা বই লিখতে হবে। একটা নিবন্ধে কখনো সেটা সম্ভব না। মনে পড়ছে আরও বহু গল্পের কথা কমল কুমার মজুমদারের – লাল জুতা, মধু, মতিলাল পাদ্রী, আব্দুল মান্নান সৈয়দের -সত্যের মতো বদমাশ, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের — টোপ, প্রেমেন্দ্র মিত্রের- তেলেনাপোতা আবিষ্কার, পাপড়ি রহমানের- ঘুম ও স্বপ্নের মাছরাঙা পাখি সহ আরও বহু গল্প। এছাড়া রয়েছে বিশ্ব সাহিত্যের অনেক প্রিয় গল্প।
পরিশেষে বলতে চাই আমি নিজে যখন গল্প লিখতে শুরু করি কাউকেই সচেতন ভাবে অনুসরণ কিংবা অনুকরণ করিনি। আমি একেবারেই ছোট গল্পের স্বতন্ত্র মানচিত্র আঁকতে চেয়েছি। নিজস্ব জীবন দর্শন, চরিত্র চিত্রন, ভাষাভঙ্গি এবং চিত্রকল্প ও দৃশ্যকল্প বিনির্মাণ করতে দৃঢ়ভাবে সচেষ্ট হয়েছি। তারপর ও আমার সব প্রিয় গল্পকাররাই আমাকে ছোট গল্প রচনায় শুধু উদ্বুদ্ধই করেননি। রীতিমতো উস্কে দিয়েছেন। আমার সব প্রিয় গল্পের গল্পকারকে অশেষ শ্রদ্ধা এবং প্রণতি।